04/08/2026
টাকা দিয়ে অনেক কিছু হয় কিন্তু সব হয় না
হাসানের চেম্বারের বাইরে অপেক্ষার ঘড়ি যেন কাটতেই চায় না। পেশায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হাসান প্রতিদিন শত শত মানুষের হৃৎস্পন্দন মেপে চললেও, নিজের স্ত্রী শিমুর মনের খবর নেওয়ার সময় তার ছিল না। কাজের পাহাড়, জরুরি সার্জারি আর হাসপাতালের ব্যস্ততায় তাদের চার বছরের সংসারটা ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা ঘরে পরিণত হয়েছিল। শিমু চেয়েছিল একটুখানি সঙ্গ, দিনশেষে দুটো মন খুলে কথা বলা—যা হাসান কখনোই দিতে পারেনি।
একদিন ড্রয়িংরুমের এসির সমস্যার কারণে বাড়িতে ডাক পড়ে আরিফের। আরিফ স্থানীয় এক তরুণ ইলেকট্রিক মেকানিক। কাজের প্রতি তার যেমন একাগ্রতা, তেমনি মানুষের সাথে কথা বলার ভঙ্গিটাও বেশ সহজ-সরল। এসি ঠিক করার ফাঁকে আরিফ শিমুর বিষণ্ণ মুখটি খেয়াল করে। কাজের পর টুকটাক সৌজন্যমূলক কথা থেকে শুরু, তারপর মোবাইল নম্বর দেওয়া-নেওয়া।
হাসানের অবহেলা এবং একাকীত্বের শূন্যতা শিমুকে দিন দিন আরিফের দিকে ঠেলে দেয়। যেখানে হাসানের কাছে শিমু ছিল কেবল এক রুটিনমাফিক দায়িত্ব, সেখানে আরিফের কাছে শিমু হয়ে ওঠে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। আরিফের ছোট ছোট যত্ন, ফোন করে খোঁজ নেওয়া, আর শিমুর প্রতিটি কথায় কান দেওয়া—এই সাধারণ বিষয়গুলোই শিমুর কাছে অমূল্য মনে হতে থাকে। সে বুঝতে পারে, অর্থ আর সামাজিক মর্যাদার চেয়ে একজন মানুষের সহানুভূতি ও ভালোবাসাই তার বেঁচে থাকার জন্য বেশি প্রয়োজন।
সম্পর্কের এ টানাপোড়েন যখন তুঙ্গে, তখন শিমু এক কঠিন কিন্তু স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়। সে নিজেকে প্রতারণার অন্ধকারে রাখতে চায়নি। একদিন শান্ত গলায় হাসানকে সবটা জানিয়ে ডিভোর্সের কাগজ সামনে তুলে ধরে। হাসান স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল ঠিকই, তবে সে অনুধাবন করতে পেরেছিল যে টাকার পেছনে ছুটতে গিয়ে সে শিমুর মনটাকে কখন হারিয়ে ফেলেছে।
সব দ্বিধা ও সামাজিক লোকলজ্জা পেছনে ফেলে শিমু সাইন করে দেয় বিচ্ছেদের কাগজে। এরপর কোনো আড়ম্বর ছাড়াই আরিফের হাত ধরে এক ছোট্ট ঘরে নতুন জীবন শুরু করে।
আজ আরিফের জমানো স্বল্প আয়ের সংসারে দামি আসবাব হয়তো নেই, তবে সেখানে বিকেলের চায়ে জমে ওঠে হাসিমুখের গল্প। অবহেলা ভরা বড় প্রাসাদের চেয়ে আরিফের ছোট ঘরটিই এখন শিমুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিময় নীড়।