30/04/2025
পূর্ব-পশ্চিম
লেখক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “পূর্ব-পশ্চিম” কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি সময়ের দলিল, একটি দেশের জন্মের ইতিহাস, এবং হাজারো মানুষের নিঃশব্দ আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। দুই বাংলার বিভাজন, মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে ওঠা, রাজনৈতিক জটিলতা এবং আত্মপরিচয়ের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক মহাকাব্যিক রূপ।
এই উপন্যাসের ক্যানভাস বিস্তৃত—ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ, এবং তার চারপাশের রাজনৈতিক উত্তাল সময়। একদিকে রয়েছে ইতিহাসের ভয়াল মুখ, আরেকদিকে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, যন্ত্রণা ও যুদ্ধ। পাঠক হিসেবে কখনো আপনি পাবেন কলকাতার অলিগলি, আবার কখনো পৌঁছে যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘামে-মাটি-মৃত্যুতে গড়া শিবিরে।
সুনীলের লেখায় এক অনন্য মুন্সিয়ানা রয়েছে। তাঁর ভাষা সাহিত্যের সৌন্দর্য ধরে রাখে, কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতাকেও অম্লানভাবে তুলে ধরে। “পূর্ব-পশ্চিম”-এ তিনি ইতিহাসকে গল্পে পরিণত করেছেন, আর গল্পকে রক্তমাংসের মানুষের বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন। চরিত্রগুলো এত জীবন্ত যে, পাঠ শেষে মনে হয়—তারা যেন আপনার আশেপাশের কেউ। তাঁদের প্রেম, ভয়, লজ্জা, প্রতিরোধ—সব কিছুই আপনাকে ভাবাবে, থমকে দেবে, আবার জাগিয়েও তুলবে।
এই উপন্যাস শুধু মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান। পূর্ব আর পশ্চিমের মানসিক বিভাজন, ভাষা ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, দেশভাগের যন্ত্রণায় ভরপুর এক সময়কে ধরেছেন লেখক দুর্দান্ত নিপুণতায়। এটি এমন একটি বই, যা ইতিহাস জানতে ও বুঝতে পড়া উচিত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি, মানুষকে বোঝার জন্য পড়া দরকার।
“পূর্ব-পশ্চিম” পড়ার পর মনে হয়—আমরা ইতিহাসের পাতা নয়, রক্তাক্ত মানুষদের কথা ভুলে গেছি। এই উপন্যাস আমাদের সেই ভুল মনে করিয়ে দেয়, কাঁপিয়ে দেয়, প্রশ্ন তোলে। আর এটাই একজন মহান লেখকের সার্থকতা।