10/01/2024
ডিসেম্বরের শেষ দুটো সপ্তাহ আর জানুয়ারি শুরুর দিকের কটা দিন অফিসে কিছুই তেমন কাজকম্ম হয় না। ডিসেম্বরের কুড়ি তারিখ থেকেই অফিসে লোকজন হালকা হতে থাকে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহটা কাটিয়ে আজকে নতুন বছরে প্রথম অফিস গেছিলাম। এর মধ্যে আগের উইকেন্ডে বরফ পড়েছে, এই শীতকালের প্রথম বরফ। বরফ এমন একটা জিনিস যেটা ঐ ফেসবুক রিলসে কিম্বা যশ চোপড়ার সিনেমাতেই ভালো লাগে। বরফে যখন বাজার দোকান করতে হয়, অফিস যেতে হয়, আর এই সবকিছুর আগে, নিজের গাড়ির ওপর ঢিপির মত জমে থাকা বরফ সরাতে হয়, ব্যাপারটা মোটেই খুব ভালো লাগার মতো থাকে না।
আজকে যখন ব্রুকলিন ঢুকছি, চারদিকে তখনো বরফজমে কালো হয়ে আছে, ধূসর একটা আকাশ, কালো কালো পাতাহীন গাছ আর দূরে দূরে শ্রীহীন কংক্রিটের বাড়িগুলো একে অপরকে দাঁত খিচোচ্ছে। বরফ জমে কালোটা ভুল করে লিখিনি। চলন রাস্তার ধারের বরফ, নোংরায় কালো হয়ে একটা ভেজা ভেজা ন্যাতা হয়ে পড়ে আছে ফিতের মত, পিচ রাস্তার পাশে। এলোমেলো সিগারেটের টুকরো, ছেঁড়া ওয়ালমার্টের প্যাকেট এদিকওদিক। সকাল থেকেই একটা শিরশিরে হাওয়া, ভাল্লুকের মত জ্যাকেট কেটে হাড়ে হাড়ে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। অফিসের সামনের স্কোয়ারে লোকজন হাতে গোনা কয়েকজন। ফাটাকোট পরে একটা বছর পঞ্চাশের লোক “War Veteran, Help Me” বোর্ড নিয়ে পোষা কুকুরকে নিয়ে ঝিমোচ্ছে।
এখানকার সাদাগুলোকে যেমন ঢপের কিত্তণ দিয়ে ট্রাভেল এজেন্টগুলো রাজস্থান-কেরালার এক্সোটিক, ম্যাজিকাল ইন্ডিয়ার প্যাকেজ বেচে, অনেকটা সেরকম আমাদের মনেও ঝকঝকে হলিউডি মুভির মত বিদেশের একটা ছবি গেঁথে আছে। কোথায় একটা পড়েছিলাম যে হায়দ্রাবাদের একটা সমীক্ষায় দেখা গেছিলো যে অধিকাংশ হায়দ্রাবাদের মানুষ আমেরিকা কেমন ভাবতে বললে, ম্যানহাটানের লম্বা লম্বা বিল্ডিং বোঝে, যে পুরো দেশটা শুধু একশোতলা বিল্ডিং-এ গিজগিজ করছে। আর একটু বলতে বললে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায় যে একটা দারিদ্র্যহীন, সবুজ গালিচায় মোড়া, চেরি আর আপেল গাছ চারদিকে, অজস্র ডিসনির ক্যাসেলে ভর্তি চিরবসন্তের সব পেয়েছির ফ্যান্টাসিল্যান্ড। মানে, ঐ পটি করে ছোঁচায় না, কাগজে মোছে আর মাসে একবার চান করে এরকম কয়েকটা ছোটখাট খুঁতখুঁত ছাড়া বাকি গল্পটা মোটামুটি ইউটোপিয়ান কিছু একটা।
খুব অবাক হই না, আমরা প্রত্যেকে একটু একটু করে আমাদের চিন্তায় হয় 0 নয়তো 1, এরকম বুলিয়ান হয়ে উঠছি। মধ্যপন্থার জায়গা কমে আসছে। কোন এক এক্সট্রিমে দল না বাছলে সেটা আপোষ বা সুবিধাবাদের নামান্তর হয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই বৃত্তগুলো তৈরী করছে, কিন্তু সেগুলো আর আইডিয়োলজিকাল বুদবুদ না। তাদের পাঁচিল ক্রমশ শক্ত হচ্ছে, জেলের বিচ্ছিন্ন কুঠুরির মতো। ঠিক-ভুল, সাদা-কালো, ভাল-মন্দ, আমরা-ওরা এই নির্দিষ্ট অতিসরলীকরণের ডিকোটমির বাইরে যে কোন লেয়ারড কথা শোনার, বোঝার এটেনশান স্প্যান, স্মার্ট-ফোনে রিলস, টিকটক ভিডিয়ো দেখা মানুষের নেই।
ক্যাপিটালিজমের মক্কা, মানবজাতির বড়দা আমেরিকা যার দয়ালু সৈন্য র্যাম্বো-র মেশিনগান চালিয়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন দেখে আমাদের কৈশোর কেটেছে, সেখানেও যে মানুষ ফুড কুপন হাতে লাইনে দাঁড়ায় এইগুলো মেন্সট্রিম ন্যারেটিভে বললে লোকে বলবে অল্টারনেট লিটারেচার বেচছি। নিউ-ইয়র্ক, শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টনের ফুটপাথে দাড়িতে বরফ কুঁচি নিয়ে ঘোলাটে চোখা দারিদ্র আপনার কাঁচ তোলা গাড়ির জানলায় দুটো ডলার চায় খাবার জন্য, এইসব কথা 0 নয়তো 1 এর বুলিয়ান খাপে তেমন যায় না। জাতিবৈষম্যে ধুঁকতে থাকা কালো চামড়াদের জীবন, হিস্পানিক বা এদেশের আদি-বাসিন্দা রেড-ইন্ডিয়ানদের জীবন, তাদের আন-এমপ্লয়মেন্ট, ক্রাইম রেট এইসবও Rom-com সিনেমার চেরি আর আপেল গাছের আমেরিকার সাথে যায় না।
পি আচার্যের বাংলা রচনা বইতে ছিলো, প্রদীপের শিখা আর তার নীচের অন্ধকার। ক্যাপিটালিজম সিস্টেমটা সারভাইভ করে একটা নির্দিষ্ট দারিদ্র্যের বিনিময়ে। সে হিসাব ওড়িশার কালাহান্ডি হোক বা কানসাস, কিম্বা অ্যালাব্যামা, খুব আলাদা হয় না। বইয়ের পাতার যৌথখামার দেখি নি কোনদিন। কিন্তু যৌথ পেটের ক্ষিধেকে হাতে হাত ধরে ভিক্ষা চাইতে দেখেছি নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস, হারলেম, কুইন্সের রাস্তায়। শেওড়াফুলি বাজারে পোনা ময়রার দোকানের পাশে একটা চোখে পিছুটিপড়া পাগল বসে বসে চেঁচাতো, ভাত এমন ভীষণ জিনিষ, খোদার সাথে উনিশ-বিশ।
গ্লোবালাইজেশান শুধু কোকা-কোলা, রিবক, ম্যাকডোনাল্ডসের হয়না।
ভাত, কাপড়, ফাটা চামড়া, তোবড়ানো গাল আর হেরে যাওয়া চোখের গ্লোবালাইজেশান দুনিয়ার অনেক পুরনো হিসেব।
-সৌম্য চট্টোপাধ্যায়, ইউএসএ