07/08/2026
#বুক_রিভিউ
রিভিউ দাতা: nilufa's Bookish Journey
বই নাম:মাসকারেড হোটেল
লেখক:কেইগো হিগাসিনো
অনুবাদক:কাবিদ হাসান
সহ-অনুবাদক:সালেহ আহমেদ মুবিন
জনরা: ক্রাইম থ্রিলার
পৃষ্ঠা সংখ্যা:৩২০
প্রকাশনা: ঋদ্ধ প্রকাশ
প্রারম্ভিক কথন:কেইগো হিগাসিনোর লেখা মাসকারেড হোটেল একটি জনপ্রিয় জাপানি ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাস।এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, একটি অভিজাত হোটেলে ধারাবাহিক খুনের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে গোয়েন্দা ও হোটেল স্টাফদের যৌথ প্রচেষ্টা। এছাড়া বইটিতে, অপরাধের রহস্যের পাশাপাশি, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও পেশাদার আচরণের ভেতরের দিকগুলো খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নামকরণের সার্থকতা:মাসকারেড হোটেল নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়।মাসকারেড মানে ছদ্মবেশ বা মুখোশধারী একদল লোক, যা এখানে রুপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। হোটেলে আগত অতিথিরা প্রায়শই তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অপরাধ লুকিয়ে রাখতে মুখোশের আড়ালে ভিন্ন ব্যক্তিত্বের রুপ ধারণ করে আসে। অপরদিকে কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র কোসুকে নিত্তা খুনিকে ধরার জন্য রিসেপশনিস্টের ছদ্মবেশ ধারণ করে। হোটেলটি যেনো ছদ্মবেশ ধারণ করার একটি বলয়। যেখানে সবাই তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এদিক থেকে,মাসকারেড হোটেল নামকরণটি গল্পের সাথে একদম সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। অন্য কোনও নামকরণ করলে হয়তো এতটা মানানসই হতো না।
কাহিনী সারসংক্ষেপ: গল্পের শুরুতে জাপানের টোকিও শহরে একের পর এক খুন হতে দেখা যায় এবং খুনি প্রতিটি ঘটনাস্থলেই সংকেত রেখে যায়। একপর্যায়ে, পুলিশ বুঝতে পারে যে, পরবর্তী খুনটি হোটেল কর্তেসিয়া টোকিও তে হতে পারে।খুনির পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য, পুলিশ বাহিনী ছদ্মবেশ ধারণ করে হোটেল কর্তেসিয়া তে অবস্থান নেয়।এই সময় তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন গোয়েন্দা কোসেকে নিত্তা, রিসেপশনিস্টের ছদ্মবেশ ধারণ করেন এবং নিত্তার ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, হোটেলের পেশাদার রিসেপশনিস্ট নাওমি ইয়ামাগিশিকে।
হোটেলে আগত প্রত্যেকটা অতিথির চরিত্রই ছিল অত্যন্ত রহস্যময়।তারা প্রায় সবাই ই কোনো না কোনো ছদ্মবেশে আসতেন। যেমন কেউ নিজের পরিচয় গোপন করে আসতেন,কেউ স্ত্রীকে লুকিয়ে অন্য সঙ্গী নিয়ে আসতেন,কেউবা কোনো অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে আসতেন। নাওমি ইয়ামাগিশি ,অতিথিদের সন্দেহ না করে,সেবার পাত্র হিসেবে দেখতেন।তার কাছে অতিথিদের মুখোশ উন্মোচন করার চাইতে তাদের আরাম ও গোপনীয়তা রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অপরদিকে, কোসুকে নিত্তা, হোটেলে আগত প্রতিটি অতিথিদের চোখে চোখে রাখতেন এবং তাদের লুকানো মুখোশের আড়ালে আসল রুপ খোজার চেষ্টা করতেন। অতিথিদের যেকোনো অস্বাভাবিক আচরণকেই তিনি অপরাধের ইঙ্গিত হিসেবে সন্দেহ করতেন। কারণ, তার প্রধান লক্ষ্যই ছিল খুনিকে খুঁজে বের করা।নিত্তার এই ধরনের আচরণের জন্য শুরুর দিকে নাওমি ও নিত্তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিত। কিন্তু, একপর্যায়ে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং অপরাধীকে খুঁজে বের করার জন্য নাওমি নিত্তাকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতে থাকে। এভাবেই গল্পটা এগোতে থাকে। একপর্যায়ে খুনি এমন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে যা ছিল পুলিশদের পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বাইরে। আচ্ছা কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত ?পুলিশ রা কি ধূর্ত এই খুনিকে ধরতে পেরছিল? নাকি হোটেল কর্তেসিয়া তে খুনির হাতে জীবন দিতে হয়েছিল আরও একটি তরতাজা প্রাণকে। জানতে হলে, অবশ্যই মাসকারেড হোটেল উপন্যাসটি পড়তে হবে।
ব্যক্তিগত মতামত: সত্যি বলতে, বইটি পড়ে আমি এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছি। উপন্যাসের বুদ্ধিদীপ্ত প্লট ও হোটেলে আগত মুখোশধারী চরিত্রগুলোর বৈচিত্র্যময় ও অদ্ভুত আচরণ আমাকে অভিভূত করেছে। এছাড়া আমার কাছে মনে হয়েছে, গোয়েন্দা নিত্তার হোটেলের রিসেপশনিস্ট হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করা এবং হোটেলের কঠোর নিয়ম মেনে কাজ করা তার জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবুও সে তার দায়িত্ব পালনে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গল্পের মাঝে গোয়েন্দা নিত্তা ও নাওমির মধ্যে কাজের দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তীতে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠার বিষয়টি আমি দারুণভাবে উপভোগ করেছি।
তবে, আমাকে যদি বলা হয়, এই উপন্যাসে আমার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র কোনটি? আমি নিঃসন্দেহে, নাওমির নামটিই উচ্চারণ করবো। তার তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্যসব চরিত্র থেকে আলাদা করে তুলেছে। এছাড়া নাওমির পেশাদারিত্ব ও কর্তব্যপরায়ণতা একজন পাঠক হিসেবে আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে। নিজের পেশার প্রতি কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত এই বিষয়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে নাওমি চরিত্রটি।
প্রকাশনী ও অনুবাদকের উদ্দেশ্য কিছু কথা: ঋদ্ধ প্রকাশনী নিয়ে নতুন করে আর কি বলবো! বইয়ের নান্দনিকতা ও টেকসই কোয়ালিটির জন্য, ঋদ্ধ প্রকাশনী যে বর্তমানে কতটা জনপ্রিয় এটা আমরা যারা বইপ্রেমীরা আছি ,সবাই কম-বেশি জানি।মাসকারেড বইটি ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বইয়ের প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং, কাগজের মান সবকিছু যথেষ্ট ভালো ছিল।
এছাড়া, আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই, বইটির অনুবাদক কাবিদ হাসান ও সহ- অনুবাদক সালেহ আহমেদ মুবিন কে।এত চমৎকার একটি জাপানি ক্রাইম থ্রিলার বই অনুবাদ করার মাধ্যমে আমাদের মতো পাঠকদের পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি তাদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সত্যি বলতে, আমার কাছে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে, আমি কোনো অনুবাদ করা বই পড়ছি।অনুবাদের ভাষা সহজবোধ্য ও সাবলীল হওয়ায় পুরো গল্পটা দারুণভাবে উপভোগ করেছি। সবমিলিয়ে, গল্পটা আমার কাছে দারুণ শিক্ষণীয় ও উপভোগ্য ছিল।
পার্সোনাল রেটিং:৮/১০