02/08/2026
সাফোয়ান শাহ - পর্ব ১
আজ আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন।
উচ্চমাধ্যমিকের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। ভেবেছিলাম, এইচএসসি শেষ হলেই বুঝি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারব। সকালগুলো আর এত তাড়াহুড়ো করে শুরু হবে না। কিন্তু জীবন যেন মানুষের ভাবনার ঠিক উল্টো পথেই হাঁটতে ভালোবাসে।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ঘরে ঢোকেনি। তার আগেই মায়ের চেনা ডাক কানে ভেসে এলো।
— "এই পুষ্প... পুষ্প! এখনও উঠিসনি? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো মা। আজ না তোর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন?"
চোখ মেলে বিছানায় উঠে বসতেই আধোঘুমে উত্তর দিলাম—
— "আসছি মা..."
"তাড়াতাড়ি আয়। নাস্তা করতে হবে।"
"এই তো... আর এক মিনিট।"
অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। মুখে জল দিয়ে, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিজের মতো করে তৈরি হলাম। নতুন সাদা-নীল সালোয়ার-কামিজটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। নতুন একটা পথ... নতুন কিছু মানুষ... নতুন এক পৃথিবী।
নাস্তার টেবিলে বসতেই মা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
"এখন তো বড় হয়ে গেছিস। এই বাচ্চামো স্বভাবগুলো কবে যাবে বল তো?"
আমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললাম,
"মা... আজকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন। আজকেও তোমার এই লক্ষ্মী মেয়েটাকে বকবে?"
মা হেসে ফেললেন।
"না রে, বকছি না। কিন্তু বড় হয়েছিস বলেই তো আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। এখনও তোকে ছোট্ট বাচ্চার মতো সামলাতে হয়।"
আমি মুচকি হেসে বললাম,
"আমি তো তোমারই মেয়ে। আমাকে না সামলালে কাকে সামলাবে?"
মায়ের চোখে মুহূর্তেই আদরের আলো নেমে এলো।
"হয়েছে, এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো নাস্তা খেয়ে নে। তোমার আদরের ভাই-এখনো ঘুমোচ্ছে, তাকেও উঠাতে হবে তো"
"হুম..."
মা হঠাৎ গ্লাসটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"দুধটা কিন্তু শেষ করবি।"
আমি বিরক্ত মুখে বললাম,
"মা, প্রতিদিন এই ডিম আর দুধ... আমার একদম ভালো লাগে না।"
মা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"ডিম-দুধ না খেলে বুদ্ধি হবে কী করে? এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বি, আর মাথায় যদি বুদ্ধিই না থাকে!"
আমি শিশুর মতো মুখ বাঁকিয়ে বললাম,
"মা-আ-আ..."
আমার সে মুখভঙ্গি দেখে মা হেসে উঠলেন। তারপর কপালে একটা আলতো চুমু এঁকে দিয়ে বললেন,
"আমার মেয়েটা কত লক্ষ্মী! আমার পুষ্পর মতো বুদ্ধি আর কার আছে বল?"
আমি লজ্জা পেয়ে বললাম,
"হয়েছে হয়েছে... আর আদর করতে হবে না। আমি এখন আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
মা হঠাৎ মনে করিয়ে দিলেন,
"শোন, যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে দেখা করে যাস। না হলে আবার রাগ করবে।"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
"এই সকাল সকাল বাবার ধমক খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি বলে দিও না?"
মা মাথা নাড়লেন।
অগত্যা বাবার ঘরের দিকে হাঁটলাম।
দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
"এসো।"
ঘরে ঢুকে দেখি আমার বাবা রুদ্রপ্রতাপ সরকার— প্রতিদিনের মতো আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। তাঁর মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। যেন অনুভূতিগুলো বহু আগেই কঠিন মুখোশের আড়ালে বন্দি হয়ে গেছে।
আমি ধীরস্বরে বললাম,
"বাবা... আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি।"
তিনি কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,
"সাবধানে যেও। আর ওই ড্রয়ারে কিছু টাকা রাখা আছে। যা লাগে নিয়ে যাও।"
আমি ইতস্তত করে বললাম,
"বাবা, আমার কাছে টাকা আছে।"
তিনি এবার কাগজ ভাঁজও করলেন না।
"তোমার কাছে আছে কি নেই, সেটা আমি জানতে চাইনি। আমি নিতে বলেছি।"
কথাগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এমন দৃঢ় যে আর কিছু বলার সাহস হলো না।
"জি... বাবা।"
ড্রয়ার থেকে কিছু টাকা নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
বাবার ভালোবাসা যেন সবসময় কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তিনি কখনও আদর করতে জানেন না, শুধু দায়িত্ব পালন করতে জানেন। অথচ সেই কঠিন গলার ভেতরেও যে অদৃশ্য এক স্নেহ লুকিয়ে আছে, তা আমি বুঝি। তবু প্রতিবারই তাঁর ঘর থেকে বের হলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে যায়।
মুখটা গম্ভীর করেই বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু মন খারাপ বেশিক্ষণ টিকল না।
দেখলাম দারোয়ান মামা একসঙ্গে অনেকগুলো ফুলের টব নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। টবগুলো সামলাতে গিয়ে তিনি নিজেই প্রায় হোঁচট খাচ্ছেন। দৃশ্যটা দেখে আমার অজান্তেই হাসি পেয়ে গেল।
আর ফুল...
ফুল তো আমার দুর্বলতা।
আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম,
"মামা, দাঁড়াও। আমি আসছি।"
দারোয়ান মামা মিষ্টি হেসে বললেন,
"আপনার তো দেরি হয়ে যাবে, দিদিমণি।"
"আমার দেরির চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। কিছু টব আমাকে দাও।"
"না না, আমি পারব।
" এত না করলে কিন্তু আরও দেরি হবে।"
শেষ পর্যন্ত তিনি হেসে কয়েকটা টব আমার হাতে দিলেন।
হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞেস করলাম,"মামা, কত রকমের ফুল এনেছ?"
"এই তো... দশ রকমের হবে দিদিমণি।"
আমার চোখ যেন আনন্দে জ্বলে উঠল। "কিন্তু খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললাম মামা তোমাকে কতবার বলেছি, দিদিমণি না বলে পুষ্প বলবে।"
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, "আচ্ছা... দিদিমণি।"
এক মুহূর্তের নীরবতার পর দু'জনেই হেসে উঠলাম।
দারোয়ান মামা বললেন,
"দিদিমণি, আপনি থাকলে গাছগুলো খুব সুন্দর হয়। আপনার হাতে যেন জাদু আছে।"
আমি মুচকি হেসে বললাম, "তাই নাকি? তবে বুঝি আমি ফুলের পরী!"
"জ্বী। ভগবান আপনাকে রূপও দিয়েছেন, গুণও দিয়েছেন।"
"আচ্ছা আচ্ছা, এত প্রশংসা করতে হবে না। সত্যিই এবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"গাড়ি বের করে দিই, দিদিমণি?"
— "না। আজ রিকশায় করেই যাব। প্রথম দিনের শহরটাকে একটু কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করছে।"
দারোয়ান মামা মৃদু হেসে রাস্তা থেকে একটি রিকশা ডেকে দিলেন।
রিকশায় বসে আমি শহরটাকে নতুন চোখে দেখতে লাগলাম। সকালের ব্যস্ততা, রাস্তার পাশের কৃষ্ণচূড়া, পুরোনো বাড়ির বারান্দা, চায়ের দোকানের ধোঁয়া— সবকিছু যেন আজ অন্যরকম লাগছিল।
হয়তো নতুন জীবনের শুরু বলেই।
প্রায় পনেরো মিনিট পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ফটকের সামনে এসে নামলাম।
এবারই বুঝলাম আসল বিপদ।
আজ বান্ধবীর সঙ্গে একসঙ্গে ক্লাসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার দেরি হয়ে যাওয়ায় সে নিশ্চয়ই অনেক আগেই ক্লাসে চলে গেছে।
আর আমি?এই বিশাল ক্যাম্পাসে বাংলা বিভাগের অবস্থানই তো চিনি না।
চারদিকে অচেনা মুখ, অচেনা ভবন, নতুন এক পৃথিবী।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর মনে মনে সাহস সঞ্চয় করলাম।
কাউকে না কাউকে তো জিজ্ঞেস করতেই হবে...
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, অজান্তেই, আমার জীবনের গল্পে প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে আসছিলো আরেকটি নতুন চরিত্র ...