20/06/2020
নকশি কাঁথা...
হ্যাঁ,নামটা শোনার পর পরই মাথায় আসে আমার গ্রাম-বাংলার মায়েদের হাতে বুনা রঙিন কোনো কাঁথার ছবি...
বাংলার লোকসংস্কৃতি আর গ্রামীণ কুটির শিল্পের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে কাঁথা।
আজকে এই নকশি কাঁথারই কিছু জানা-অজানা কথা জানার চেষ্টা করবো এখানে...
নকশি কাঁথা হলো সাধারণ কাঁথার উপর সুই-সূঁচ আর রঙিন সুতো দিয়ে নানা ধরনের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথা।
নকশি কাঁথা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সেলাই শিল্প এবং অন্যতম প্রাচীন একটি সংস্কৃতি।
বাড়িতে সন্তান জন্ম নেওয়ার সময়ে তার জন্য নতুন কাঁথা তৈরির রেওয়াজ টিকে আছে দীর্ঘদিন ধরে। বাড়িতে বিয়ে কিংবা পার্বণের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথিদের নতুন কাঁথা দিয়ে বরণ করে নেওয়ার চিরাচরিত রেওয়াজ পাওয়া যায় বাংলার কোনো কোনো গ্রামে। বিয়ের পরে মেয়েকে শ্বশুরালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় উপহারের তালিকায় থাকে নকশী কাঁথা।
কাঁথা শব্দটির কোন উৎস স্পষ্টভাবে জানা যায় নি। সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় কাঁথা শব্দটি পূর্বে উচ্চারিত হত "খেতা" বলে। নিয়াজ জামানের মতে, কাঁথা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃতি শব্দ "কঁথা" হতে। "কঁথা" শব্দটির বাংলা হলো ত্যানা। বা কাপড়ের টুকরা। বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে কাঁথাকে খাতা, খেতা বা কেথা, কেতা নামে অভিহিত হয়। রংপুর অঞ্চলে কাঁথাকে ‘দাগলা’, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর অঞ্চলে ‘গুদুরি’ বলা হয়।
পুরো বাংলার গ্রামে গঞ্জেই প্রচলিত রয়েছে নকশিকাঁথার সংস্কৃতি তবে রাজশাহী, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও যশোর নকশিকাঁথার জন্য বিখ্যাত।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহারেও দেখা যায় বৈচিত্রপূর্ণ কাঁথার সমাহার। বিহারের 'সুজনী' কাঁথার আছে আন্তর্জাতিক মহলে 'ভৌগলিক স্বীকৃতি'। যদিও একই নামে এবং প্রায় একই ধরনের কাঁথা বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলেও প্রচলিত আছে।
খানিকটা ছিড়ে যাওয়া, পুরাতন হয়ে যাওয়া শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি কিংবা চাদরকেই সাধারণত কাঁথা বানানোতে কাজে লাগানো হয় তবে কাঁথা বানাতে শাড়ির আছে আলাদা কদর। পুরুত্বের দিক থেকে ক্ষেত্রবিশেষে একটি কাঁথায় তিনটি থেকে সাতটি শাড়িও ব্যবহার করা হয়। কাঁথা মিতব্যয়ীতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
নকশি কাঁথায় থাকে নানান ফোঁড়। যেমন- কাইত্যা ফোঁড়, এক ফুঁইড়া, লিক ফোঁড়, ক্রসস্টিচ, তারা ফোঁড়, কাটা ফোঁড়, বরকা ফোঁড, তেসরি ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, বৈকা, বোতাম ঘর, হেরিং বোন, চেইন, কাঁথা ফোঁড়, রান ফোঁড়, ডবল রান, তেরছা ফোঁড়,নারকেল পাতা ও নৌকাবিলাস আরো বহু নামের নকশিকাঁথা রয়েছে।
জেনে নিই কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথার নাম ও তার ব্যবহার-
১)লেপকাঁথা: এই কাঁথা শীতকালে লেপের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। এটি অন্যান্য কাঁথার তুলনায় পুরু ও ভারী।
২)দস্তরখান: অতিথিকে খাবার সময় বাসনের নিচে পেতে দেয়া হয়।
৩)সুজনী কাঁথা: বিছানার চাদর হিসেবে এ কাঁথা ব্যবহার করা হয়। নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও যশোর এলাকায় এই কাঁথাকে পাড়নী কাঁথা বা নাছনী কাঁথা বলে। অতিথি এলে বসার জন্য এই কাঁথা বিছিয়ে দেয়া হয়।
৪)নকশি থলে: বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পান-সুপারি বহনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
৫)আরশীলতা: এটি আয়না ও চিরুনি জড়িয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
৬)বর্তন ঢাকনা: অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের খাবার দেয়ার সময় বাসনের আচ্ছাদন বা ঢাকনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
৭)গাঁটরি বা বোঁচকা কাঁথা: কাপড় চোপড় বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।
৮)গিলাফ : আল-কুরআন ও অন্যান্য ধর্মীয় কিতাবের খোল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৯)আসন কাঁথা: হিন্দুদের পূজা-অর্চনা বা বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কনেকে বসতে দেয়া হয় আসন হিসেবে।
১০)রুমাল কাঁথা: এটি রুমাল হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।
১১)চাদর কাঁথা : শীতকালে গায়ের চাদর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গ্রাম বাংলার নারীদের অনুপম দক্ষতায় কাঁথার জমিনে ফুটে উঠে গাছ, পাখি কিংবা লতাপাতার ছবি। কোনোসময় কাঁথায় উঠে এসেছে দুঃখ আর সুখের কাহিনী, কখনো লন্ঠনের নিভু আলোয় শোনা পুঁথির গল্পই সূচ দিয়ে কাঁথায় ফুটিয়ে তুলেছেন নারীরা।
নকশি কাঁথার নকশাগুলোতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ এরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অমর এক আখ্যানের নাম ‘নকশী কাঁথার মাঠ’
"বিয়ের পরে রুপাই আর সাজুর ভালোবাসায় আখ্যান বেশি দূর যেতে পারেনি। ফেরারি হয়ে যায় রুপাই। স্বামীর অপেক্ষায় স্ত্রী সাজু বাকি জীবন নকশী কাঁথা বুনতে শুরু করে, দিন-মাস-বছর যায়। সাজু নকশী কাঁথায় সুঁইয়ের আচড় দিয়ে যায়, কাঁথায় লেখে কত গল্প, রুপাই ফিরে আসে না। সারা জীবন সাজুর এভাবেই কেটে যায়। সাজুর নকশী কাঁথা বোনা যেদিন শেষ হয়ে যায় সেদিন সে মাকে অনুরোধ করে, তার মৃত্যুর পর যেন তার কবরের উপরে নকশী কাঁথাটি বিছিয়ে দেওয়া হয়। বহুদিন পরে নকশী কাঁথার নিচে শুয়ে থাকা সাজুর কবরের পাশে ভিনদেশী বংশীবাদকের মরদেহ পাওয়া যায়।"
"কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে,
মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকসী কাঁথাটি ধরে,
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশিটি বাজায় করুণ সুরে,
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ওগাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে।"
('নকশী কাঁথার মাঠ'; জসীম উদদীন)
এভাবেই বাংলার নারীরা স্বামীর বিরহে নকশী কাঁথা বুনেছে, প্রবাসে কিংবা বিদেশ বিভূঁইয়ে আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিবার পরিজনের স্মৃতি কাঁথার জমিনে জীবন্ত হয়ে ওঠেছে। কেউ হয়তো স্বজনের কাছে নতুন কাঁথা তুলে দিতে পেরেছে, কেউ রুপাই-সাজুর মতো পারেনি।
নকশী কাঁথার নকশা শুধু কাঁথার জমিনে সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফুটিয়ে তোলা নকশাই নয়,
একেকটি নকশী কাঁথার জমিনে লুকিয়ে থাকে গল্প, কখনো ভালোবাসার, কখনো দুঃখের।
বাংলার পথে প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া গল্পকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি নকশী কাঁথা....