16/06/2025
১৩৯ বছর আগের পৃথিবী।
তখনও বিশ্বযুদ্ধ হয়নি একটিও। মানুষের হাতে ছিল না টেলিভিশন, ছিল না মোবাইল ফোন তো দূরের কথা, রেডিওর অস্তিত্বই তখনকার মানুষের অজানা। মানুষ চাঁদে যাওয়ার যোগ্য হবে এর আরও ৮৪ বছর পরে।
নিউ ইয়র্কের গগনচুম্বী এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং নির্মিত হতে তখনও বাকি ৪৫ বছর।
নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম নিতে লাগবে আরও ৩৩ বছর, আর মাইকেল জ্যাকসনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৭৩ বছর।
বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ পেনিসিলিন আবিষ্কৃত হবে এই সময়ের ৪৩ বছর পরে; যার আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং তখন মাত্র ৪ বছরের এক শিশু, খেলা করছেন স্কটল্যান্ডের গ্রামে, সময়ের ইতিহাসে অনামা এক ক্ষুদ্র উপস্থিতি হয়ে।
আর ঠিক তখনই, ওই স্কটল্যান্ডেই, আরেক তরুণ—ভারতবর্ষ থেকে রসায়নের পাঠ নিতে আসা ছাত্র, ২৪ বছর বয়সী প্রফুল্লচন্দ্র রায়—এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠবেন আধুনিক ভারতের এক মহান বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ, যাঁর হাত ধরেই ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চা একটি আত্মনির্ভর অধ্যায় শুরু করবে।
হ্যাঁ, ছবিটি সেই সময়েরই। ১৩৯ বছর আগের, ১৮৮৫ সালের ১০ই অক্টোবর।
এটি ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত ধারণ করে রাখা ছবি।
এই ছবির নাম “Women in Medicine”।
এটিকে শুধু একটি ছবি বলা চলে না; বরং বলা হয়—বিশ্ব নারীর ক্ষমতা, মেধা ও সাহসের প্রতীকী দলিল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনজন তরুণী, চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রী।
তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল "Women's Medical College of Pennsylvania", মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে অবস্থিত, যা ছিল বিশ্বের প্রথম কিছু নারীবিশেষ মেডিকেল কলেজগুলোর একটি।
এই তিনজন তরুণী এসেছিলেন পৃথিবীর তিনটি সুদূর এশীয় দেশ থেকে।
তাঁরা একসাথে শুধু পড়াশোনা করেননি, একসাথে সময়ের গ্লানিকেও জয় করেছিলেন।
নিম্মের ছবিতে—
বাঁ দিকে বসে আছেন: ডা. আনন্দীবাই জোশী, ভারতের মহারাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে আগত। তিনি প্রথম ভারতীয় হিন্দু নারী যিনি পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষালাভ করেন এবং এম.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে: ডা. কেই ওকামি, জাপানের টোকিও থেকে আগত, যিনি জাপানের প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে পশ্চিমা মেডিকেল ডিগ্রি অর্জন করেন।
ডানে বসে: ডা. তাবাত এম. ইসমবুলী, সিরিয়ার দামেস্ক থেকে আগত, যিনি ছিলেন প্রথম আরব নারী চিকিৎসকদের একজন।
তিনজনই তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত।
তিনজনই তাঁদের দেশের সমাজ-সংস্কার, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, লিঙ্গবৈষম্য, প্রথা আর কুসংস্কার—সব কিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছিলেন, শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ নির্মাণ করার অদম্য ইচ্ছায়।
তখনকার দিনে নারীদের লেখাপড়া করানোই যেখানে সমাজে বিরোধিতা পেত, সেখানে চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো “পুরুষ-প্রধান” একটি ক্ষেত্রে নারীদের পদচারণা রীতিমতো বিপ্লবের নামান্তর।
আর তাঁদের সেই বিপ্লব শুরু হয়েছিল এক সাহসী যাত্রা দিয়ে—সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে।
তখনকার আমেরিকাও ছিল নারীদের প্রতি সদয় নয়। এই ছবির তোলার পরেও নারীদের ভোটাধিকার পেতে লেগে যাবে আরও ৩৫ বছর!
তবু তাঁরা এসেছিলেন, শিখেছিলেন, এবং নিজেদের দেশে ফিরেও চিকিৎসা, সমাজসেবা ও শিক্ষায় রেখেছেন অমূল্য অবদান।
নিম্মের ছবিটি কেবল তিনজন নারী চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্রীর দলবদ্ধ ছবি নয়, এটি সময়কে অতিক্রম করা নারীর অগ্রযাত্রার দলিল।
এটি এক মৌন দ্রোহ—সময়ের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, সমস্ত "তুমি পারবে না" বলা মনোভাবের বিরুদ্ধে।
তাঁরা দেখিয়ে গেছেন—জেদ, মেধা, সাহস আর লক্ষ্য থাকলে—সমুদ্র পাড়ি দেওয়া যায়, ইতিহাস লেখা যায়।
এবং—নারী মাত্রই সে পারে।
📷 “Women in Medicine” – Philadelphia, 10 October 1885
একটি ছবি, তিনটি জীবন, এক ইতিহাস।