28/04/2026
১৯৪০ সালে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের ক'বছর আগে, বিভূতিভূষণ যে হাজারি বাবুর্চিকে নির্মাণ করলেন যার স্বপ্ন একটি 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' দেয়া।
'আদর্শ খাবার হোটেল' নয় কেন? বা কেবল 'হিন্দুদের' জন্য কেন?
সাহিত্য সমালোচনায় 'নামকরণ' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রশ্নটা সে-কারণেই রাখা। এছাড়া পাঠক হিসেবেও তো খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে, আসা অসঙ্গতও নয়।
প্রকৃত কারণ কী, তা কে জানে? তবে আমরা সমালোচনা করি অনেক কিছুর সাথে তুলনা করে, স্থান, কাল বিবেচনায় নিয়ে। সেক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন ছুড়ে দিলে অনেক উত্তর চলে আসে, অথবা উত্তর প্রাপ্তির পথ সুগম হয়।
সমস্যা হলো, আমরা প্রশ্ন করে করে সাহিত্য পড়তে অভ্যস্ত নই। আশপাশের পড়ুয়া নমুনা হিসেবে নিয়ে এমন অভিমত আমার।
উপন্যাসের নাম 'হাজারি', বা 'স্বপ্নপূরণ' বা এ-জাতীয় নাম হলে পাঠক কি আপত্তি করতেন, বা করবেন এখনো? আমার ধারণা- 'না'।
কারণ নামকরণের কার্যকারণ সম্পর্ক এখানে প্রস্ফুটিত হয়নি মনে করি। এখানে যা হয়েছে, সবকিছুই হাজারির কথামতে 'রাধা-বল্লভ'র কল্যাণে।
এইখানে একটা ইঙ্গীত পাই, কিন্তু সিদ্ধান্তে আসার মতো পর্যাপ্ত কিনা এজন্য আরো গভীরে যাওয়া দরকার।
খুব সাধারণভাবেই চিন্তা করুন। হাজারির স্বপ্নের হোটেলের বর্ণনা খুব সামান্য। যেটাকে তিনি আদর্শ বলছেন, কিছু আরাম আয়েশের সুবিধা বেশি থাকা অর্থে শুধু৷ এবং বলার অপেক্ষা রাখে না, তা কেবল হিন্দুদের জন্য।
হাজারি ব্রাহ্মণ হিন্দু। এটা নিয়ে তার গর্বও দেখা যায়। কিন্তু হোটেলের খদ্দের- এই হিন্দু কারা? বা সেখানে সব বর্ণের হিন্দুরা একইসাথে বসে খাবে কিনা, সেই দিকটি কি এখানে উল্লেখ আছে? বা না-ই খেল একসাথে, বা অন্য যেকোনো অর্থেই হোক, হিন্দু হোটেলের আগে 'আদর্শ' যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব কী, বা এই 'আদর্শ'র স্বরূপই বা কী- উপন্যাসে তার ব্যাখ্যা আছে কি?
নাই৷
শুধু আরাম আয়েশের সামান্য সুযোগ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ আছে, যা দ্বারা আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি না, 'আদর্শ' কথাটার মান এখানে রক্ষা পেয়েছে।
এই উপন্যাসের কাহিনি অত্যন্ত দুর্বল! কিন্তু পাঠক-নন্দিত! তাই এইভাবে বলা আমার জন্য বেশ দুঃসাহসিক কাজ বটে!
প্রধান পাত্র হাজারি চায় তার দারিদ্র্য ঘুচুক। পাঠক হিসেবে আমরাও কি চাইনি? কিন্তু টাকা সে পায় অপ্রত্যাশিত ভাবে; তা এমনই যে কার্য-কারণ মেলানো কঠিন হয়ে ওঠে, যা শেষমেশ অতিনাটিকীয় হয়ে ওঠে। তিনজন অনাত্মীয় মেয়ে তাকে টাকা দেয়ার জন্য যেন তাকেই খুঁজছিল।
স্বপ্নের হোটেল হলো। সেখানে দারুণ ব্যবসায়।
এরপর রেল কর্তৃপক্ষ থেকে আরেকটি হোটেলও বরাদ্দ পায়।
মজার ব্যাপার হলো, এই দুটো হোটেলই দারুণভাবে ব্যবসায় করে! অথচ হাজারি কিন্তু এখন আর সেখানে রান্না করে না, সেখানে আলাদা রাঁধুনি রাখা হয়েছে।
কিন্তু উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, হাজারির রান্নার জাদু, যার কারণেই লোকজন খেতে আসতো, এবং হাজারিকে তাড়িয়ে দেয়ার কারণেই বেচু চক্কতির ব্যবসায় লাটে ওঠে।
অথচ হাজারির হোটেলে এখন আর হাজারি রান্না করে না, কিন্তু খদ্দের সামাল দিতে হিমশিম খায়! জাদুটা কী, বা কার জানা গেল না।
তারচেয়েও আশ্চর্যজনক হলো, হাজারি এলাকা ছাড়ে তার স্বপ্নের আদর্শ হিন্দু হোটেল, এবং বরাদ্দ পাওয়া হোটেল ছেড়ে!
কেন? নতুন স্টেটে কিছু লোকের রান্না করার অফার পেয়ে।
হোটেল, বা রান্নার জাদু উবে গিয়ে পাঠকের মনে হাজারির ইমেজ দাঁড়ায়- ফিনানশিয়াল সলভেন্সির জন্য মরিয়া একজন হোটেল বাবুর্চির, যে মেয়ে-জামাই নির্বাচন করেছে প্ল্যান করে, হোটেল দেখভাল করবে৷ এমনকি যখন তার টাকা আর দরকার নেই, তখনও একটা মেয়ের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়েছে, ব্যবসায় আরো বড় করবে সে।
হাইলি গ্রিডি এম্বিশাস!
হোটেল করাতে কোনো সংগ্রাম নেই, প্রতিবন্ধকতা নেই, হয়ে ওঠার গল্প নেই, সবই হয়ে যাচ্ছে৷
অথচ কেউ কেউ জীবনযুদ্ধে হাল না ছাড়ার জন্য মোটিভেশান নেন নাকি হাজারি থেকে! তা লটারি ভাগ্য কে না চায়?
শেষ করি শুরুর প্রসঙ্গে। কেন 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' উপন্যাসের নাম, তা রহস্য রয়ে গেল৷
উপন্যাসটির রচনাকাল দেশভাগের আগে। এমন উত্তাল সময়ে বিভূতির মাথায় কেন 'হিন্দু হোটেল' ধারণার চিন্তা এলো, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সাহিত্যিক হিসেবে আমরা যেমন তাকে চিনি, তেমন গো-রক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবেও চিনি।
বঙ্কিমের মতো তিনিও হিন্দুরাষ্ট্রের চিন্তা করতেন কি না, বা একক হিন্দুর ভাবনা কেন তার চিন্তায় এলো, সেই প্রশ্ন তোলা যায়। তবে তেমনটা যদি হয়ও হাজারি একেবারেই সেখানে দুর্বল সৈনিক।
লেখা: এইচ. এম. মেহেদী হাসান
#আদর্শ_হিন্দু_হোটেল #বুক_রিভিউ #রানার_ডট_কম