26/08/2026
আপনারা যারা মুখের উপর ঠাসঠাস করে খোঁচা মেরে কথা বলাকে বলেন স্পষ্টবাদিতা! মনে করেন সাহসিকতা! ভাবেন স্মার্টনেস — তারা কি জানেন আল্লাহ আপনাদের এই স্বভাবটাকে কী নামে ডেকেছেন?
আজ মানুষ এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কাউকে অপমান করে খুব সহজেই বলে দেয়, আমি তো সত্য কথাই বলি। কাউকে বিব্রত করার পর অনায়াসেই বলে ফেলে, আমি মুখের উপর বলে দিই। বিষয়টা তার কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মনে হয়। অথচ মুখের উপর বলা আর মুখের উপর আঘাত করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। সত্য কথা বলা ইবাদত হতে পারে, কিন্তু সত্যের নামে মানুষের হৃদয় ভেঙে দেওয়া কখনোই ইবাদত নয়। বরং অনেক সময় সেটা নফসের অহংকার, যা আমরা স্পষ্টবাদিতার সুন্দর মোড়কে ঢেকে রাখি।
কুরআন এই স্বভাবের মানুষদের জন্য খুব কঠিন একটি শব্দ ব্যবহার করেছে "লুমাযাহ"। আর আল্লাহ বলেন—
﴿وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ﴾
"দুর্ভোগ প্রত্যেক পশ্চাতে নিন্দাকারী ও সম্মুখে বিদ্রূপকারীর জন্য।" [সূরা আল-হুমাযাহ: ১] যারা নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়।
লুমাযাহ! আপনি কি জানেন লুমাযাহ কে? এই নামে আখ্যিয়াত শুধু তাদের জন্য নয়, যারা গালাগালি করে। বরং যে মানুষের দোষ খোঁজে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, ব্যঙ্গ করে, কটাক্ষ করে, এমন কথা বলে যা মানুষের হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধে যায়— সে-ও লুমাযাহর অন্তর্ভুক্ত।
আজ আমরা এমন অনেক কথাকে "রোস্ট", "স্যাভেজ রিপ্লাই", "সেন্স অব হিউমার", "স্পষ্টবাদিতা" ইত্যাদি নামে বৈধতা দিচ্ছি, যেগুলো কুরআনের ভাষায় ভয়ংকর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ হাততালি দিচ্ছে, কিন্তু আসমানে সেই কথাগুলো কী নামে লেখা হচ্ছে—সেটা কি কখনো ভেবে দেখেন? ভাবার সময় পেয়েছেন? আদৌ যে ভাবা উচিত এটা কখনো আপনার মস্তিষ্কে এসেছে?
এরপর আল্লাহ বলেন—
﴿كَلَّا لَيُنبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ﴾ —
"কখনোই নয়! তাকে অবশ্যই নিক্ষেপ করা হবে হুতামাহতে।" (সূরা আল-হুমাযাহ: ৪)
তাদের অবস্থান হবে হুতামাহ'য়। আল্লহ নির্দিষ্ট করে তাদের স্থান বলে দিয়েছেন। কিন্তু হুতামাহ আসলে কি? কেন?
কারণ হুতামাহ শব্দটি এসেছে حطم ধাতু থেকে, যার অর্থ—চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া, গুঁড়িয়ে ফেলা, ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। যেন এটি এমন এক আগুন, যা শুধু পোড়ায় না; মানুষের অহংকার, ঔদ্ধত্য এবং কঠিন হৃদয়কে চূর্ণ করে দেয়।
তারপর আল্লাহ বলেন—
﴿وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ﴾ —
"তুমি কি জানো হুতামাহ কী?
﴿نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ﴾
"এটি আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।" [সূরা আল-হুমাযাহ: ৫–৭।]
এখানে বলা হয়নি এই আগুন শুধু চামড়া পোড়াবে কিংবা হাড় পোড়াবে। বরং আল্লহ বলেছেন, এটি হৃদয়ে পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেন হৃদয়? কারণ দুনিয়ায় এই মানুষগুলোও তো মানুষের হৃদয়েই আঘাত করতো। তাদের জিহ্বা ছিল ছোট, কিন্তু ক্ষত করতো অন্তরে। তারা হয়তো একটি বাক্য বলেই ভুলে গিয়েছে, কিন্তু সেই একটি বাক্যের ভার অন্য একজন বছরের পর বছর বয়ে বেড়িয়েছে। একটি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের হাসি, একটি অপমান, একটি ব্যঙ্গ—কত মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে, তার হিসাব কি সে জানে? নাহ, জানেনা। [আল্লহু আ'লাম]
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় যে —এই স্বভাব আজ আমাদের সমাজে দোষ হিসেবে নয়, গুণ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। মানুষ বলে, সে খুব স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, মুখের উপর বলে দেয়, কারও পরোয়া করে না। কত চমৎকার! অথচ একজন মুমিনের পরিচয় কখনো এমন হওয়ার কথা ছিলো?
আমাদের আইডল, আমাদের আদর্শ সয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ —কখনো অশ্লীলভাষী ছিলেন? কঠোরভাষী ছিলেন? কখনোই না। তিনি কখনো মানুষের সম্মান নষ্ট করে কথা বলতেন না।তাঁর সত্য ছিল সত্য, কিন্তু সেই সত্যের ভেতরে লুকায়িত ছিলো রহমত, হিকমাহ এবং উত্তম চরিত্র। আজ আমরা সেই আদব হারিয়ে ফেলেছি, অথচ নিজেদের সাহসী ভাবছি। বাহ্! সুবহান আল্লহ!
📍রিমাইন্ডার, আমি আপনার বোন উম্মে উসমান আপনাকে অনুরোধ করছি প্লিইজ! কথা বলার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন— আমি কি সত্যিই সত্য বলছি, নাকি আমার নফসের অহংকারকে "স্পষ্টবাদিতা" ট্যাগ বসিয়ে দিচ্ছি? আমি কি একজন মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকছি, নাকি আমার কথার আঘাতে তাকে ভেঙে দিচ্ছি?
মনে রাখবেন, মানুষ আপনাকে স্পষ্টবাদী বললেও কোনো লাভ হবে নাহ। যদি কুরআন আপনাকে "লুমাযাহ" বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর যার জন্য আল্লাহ হুতামাহর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন, তার চেয়ে ভয়ংকর পরিচয় একজন মানুষের জন্য আর কী হতে পারে?
#উম্মে_উসমান