05/06/2026
কুকুর যদি এতই অপবিত্র হয়, আল্লাহ কেন কুকুর সৃষ্টি করেছেন?
মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সত্তা এক পরম প্রজ্ঞার সুতোয় গাঁথা। ইসলামি অধিবিদ্যায় এই পরম প্রজ্ঞাকে বলা হয় 'হিকমত'। সৃষ্টির কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়, কোনো রূপই অর্থহীন নয়।
তাসাউফ বা সুফি দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো; জগতে যা কিছু বিদ্যমান, তা পরম সত্তার কোনো না কোনো গুণের প্রকাশ বা দর্পণ। কিন্তু মানুষের সীমিত বুদ্ধিবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান প্রায়শই এই হিকমতের গভীরতা স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে মানুষের তৈরি সামাজিক, ধর্মীয় বা ব্যবহারিক উপযোগিতার মাপকাঠিতে যখন কোনো সৃষ্টিকে 'অনুপযোগী' বা 'অপবিত্র' বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন এক গভীর দার্শনিক সংকটের জন্ম হয়।
এই সংকটের এক জীবন্ত প্রতীক হলো 'কুকুর'। ইসলামি শরিয়তের বিধানে এর লালা অপবিত্র, এর স্পর্শ কাপড়ে লাগলে বা খাবার পাত্রে মুখ দিলে কঠোর শোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এর মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ, এবং বিনা কারণে একে গৃহপালিত করাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মানুষের বস্তুগত জীবনে যার কোনো ইতিবাচক উপযোগিতা নেই, কেন স্রষ্টা তাকে অস্তিত্বের আলোয় নিয়ে এলেন?
কিন্তু শরিয়তের এই বাহ্যিক কাঠামোর সমান্তরালে যখন আমরা হাকিকত বা আধ্যাত্মিক সত্যের জগতে প্রবেশ করি, তখন এই অবহেলিত অবয়বের আড়ালে এক পরম সত্যের ইশারা দেখতে পাই। এটিই সৃষ্টিতত্ত্বের এক অনুপম বৈপরীত্য। মানুষের অহংকার, বুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক বিচ্যুতির বিপরীতে এই প্রাণীটি হয়ে ওঠে এক পরম শিক্ষক। যেখান থেকে মানুষ শেখে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, যা সুফি দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
শরিয়ত ও হাকিকতের টানাপোড়ন: নিষেধের অন্তরালে প্রজ্ঞার রূপরেখা
ইসলামি চিন্তাধারায় শরিয়ত (বাহ্যিক বিধান) এবং হাকিকত (অভ্যন্তরীণ সত্য) একে অপরের পরিপূরক, বিরোধী নয়। কুকুরের ক্ষেত্রে শরিয়তের কঠোরতা মূলত মানুষের দৈনন্দিন পবিত্রতা, স্বাস্থ্য এবং আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের সুরক্ষার জন্য। সালাতের সম্মুখভাগ দিয়ে কালো কুকুরের গমনে মনোযোগের বিঘ্ন ঘটা, কিংবা পাত্রে মুখ দিলে সাতবার ধৌত করার বৈজ্ঞানিক ও ফিকহি কারণ রয়েছে। এর লালায় বিদ্যমান নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, যা মাটির খনিজ উপাদান দ্বারা রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়।
তবে দর্শনের দৃষ্টিতে এই 'অপবিত্রতা' বা 'দূরত্ব' সৃষ্টির উদ্দেশ্য তাকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করা নয়, বরং মানুষের জন্য একটি আধ্যাত্মিক সীমানা নির্ধারণ করা। ফারসি সুফি কবিদের মতে, আল্লাহ কোনো সৃষ্টিকে কেবল ঘৃণা করার জন্য সৃষ্টি করেননি। যদি কোনো সত্তাকে বাহ্যিকভাবে 'অপবিত্র' ঘোষণা করা হয়, তবে তার ভেতরেই আবার 'বিশ্বস্ততা' ও 'আনুগত্যের' এমন এক নুরানি গুণ দেওয়া হয়েছে, যা জগতের অনেক 'পবিত্র' দাবিদার মানুষের মধ্যেও অনুপস্থিত।
শরিয়ত আমাদের শেখায় দূরত্বের আদব, আর হাকিকত আমাদের দেখায় সেই দূরত্বের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার তীব্রতা। যখন একজন মুমিন দেখে যে, সমাজ ও শরিয়তের বিধানে প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও এই প্রাণীটি তার স্রষ্টার দেওয়া স্বভাবজাত ধর্মে (ফিতরাত) বিন্দুমাত্র বিচ্যুত নয়, তখন মানুষের ভেতরের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়।
আসহাবে কাহফের ঘটনার রূপক বনাম বাস্তবতা
কুরআনের সূরা আল-কাহফে বর্ণিত গুহাবাসীদের কাহিনী কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক রূপক। অত্যাচারী রাজা ডিকিয়াসের দ্বীন-বিদ্বেষী শাসন থেকে নিজেদের ঈমান বাঁচাতে একদল যুবক যখন পাহাড়ি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন তাদের সঙ্গী হয়েছিল একটি সাধারণ কুকুর।
"তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা ঘুমন্ত। আমি তাদের ডান পাশে ও বাম পাশে আবর্তন করাতাম; এবং তাদের কুকুরটি গুহার চৌকাঠে তার দুই বাহু প্রসারিত করে ছিল।"
(সূরা আল-কাহফ: ১৮)
এই ঐশী বাণীতে কুকুরের এই অবস্থানের উল্লেখ এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। সেই যুগে বা সেই যাত্রায় যুবকদের নিরাপত্তার জন্য কোনো বলবান মহিষ, রাজকীয় ঘোড়া কিংবা বনের রাজা সিংহ সঙ্গী হতে পারত। বাহ্যিক শক্তি ও গাম্ভীর্যের বিচারে তারা অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু আল্লাহ বেছে নিলেন এক দুর্বল, লাঞ্ছিত প্রাণীকে। কেন?
সুফি ভাবধারা ও মাওলানা রুমির কাব্যিক উড্ডয়ন সুলতানুল আরেফিন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (র.) তাঁর অমর গ্রন্থ 'মসনভি'-তে সৃষ্টির এই রহস্যকে কবিতার ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন। যার বাংলা অনুবাদ হলো:
"বিশ্বে যখন বাঘ-সিংহের মাথা হেঁট হলো, তখন আসহাবে কুকুর ভাগ্যে এগিয়ে গেলো।
ঘৃণ্য আকৃতির জন্য আসহাবে কাহফের কুকুরের আর কি ক্ষতি,
যখন তার আত্মা ডুবে আছে নুরের সমুদ্রে।" এই পঙ্ক্তিমালা মানুষের তৈরি বাহ্যিক সৌন্দর্যের
ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। জগৎ যাকে তার বাহ্যিক অবয়ব বা শরিয়তের বিধানের কারণে 'ঘৃণ্য' বা 'অস্পৃশ্য' মনে করে, তার অভ্যন্তরীণ জগতটি যদি স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসায় মগ্ন থাকে, তবে সে নুরের সমুদ্রে অবগাহন করে। বাঘ বা সিংহ তাদের শারীরিক শক্তি ও রাজকীয়তার অহংকারে মত্ত থাকে, তাই তারা ঐশী নুরের এই বিশেষ অংশ থেকে বঞ্চিত হলো। আর যে কুকুরটি মানুষের দরজায় লাঞ্ছিত হতো, সে সাধকদের সংস্পর্শে এসে নুরের ভাগীদার হলো।
রুমির দর্শন অনুযায়ী, আসল আকৃতি মানুষের চামড়ায় বা প্রাণীর লোমে থাকে না; আসল আকৃতি হলো 'জান' বা আত্মা। যার আত্মা জাগ্রত, সে-ই প্রকৃত মানুষ বা প্রকৃত প্রেমিক। আসহাবে কাহফের কুকুরটি তার বাহ্যিক রূপ হারিয়ে আধ্যাত্মিক অর্থে মানুষের স্তরে উন্নীত হয়েছিল, যা তার পরম বিশ্বস্ততার পুরস্কার।
ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদেকেও জানার সুযোগ করে দিবেন, ইনশাআল্লাহ।
Nur Islam