Jimi The Story Teller

Jimi The Story Teller Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Jimi The Story Teller, Shopping & retail, Dhaka.

যে যাবেনা সে থাকুক ,চলো, আমরা এগিয়ে যাই ।
যে-সত্য জেনেছি পুড়ে, রক্ত দিয়ে যে-মন্ত্র শিখেছি,
আজ সেই মন্ত্রের সপক্ষে নেবো দীপ্র হাতিয়ার ।
শ্লোগানে কাঁপুক বিশ্ব, চলো আমরা এগিয়ে যাই ।
------------------ রুদ্র

“দুই বছর পর হঠাৎ আমার প্রাক্তন স্বামী ফোন করে তার নতুন মেয়ের আকিকার দাওয়াত দিল… আমি শুধু বলেছিলাম— ‘আমি হাসপাতালে। আমার ...
10/05/2026

“দুই বছর পর হঠাৎ আমার প্রাক্তন স্বামী ফোন করে তার নতুন মেয়ের আকিকার দাওয়াত দিল… আমি শুধু বলেছিলাম— ‘আমি হাসপাতালে। আমার ছেলের ওপেন হার্ট সার্জারি চলছে… কোথাও যেতে পারব না।’

কখনো ভাবিনি, ওর কণ্ঠ আবার শুনবো।

সকালে আমি ঢাকার একটা বড় হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে ছিলাম। হাতে তসবিহ, ঠোঁটে শুধু একটা দোয়া— “আল্লাহ, আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিও…”

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠলো।

স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটা নাম— “সাব্বির রহমান”

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

কলটা কেটে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ধরলাম… কারণ জানতাম, না ধরলে সে থামবে না।

— “কী চাই তোমার?”

ওপাশে সাব্বিরের গলায় অদ্ভুত এক অহংকার।

— “আজ আমার মেয়ের আকিকা। ভাবলাম তোমাকে দাওয়াত দিই… আল্লাহ যেই সুখটা আমাকে দিয়েছে, যেটা তুমি দিতে পারোনি।”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

আমি ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি সামলালাম।

— “সাব্বির… আমি হাসপাতালে। আমার ছেলে ‘আরিশ’ এখন অপারেশন থিয়েটারে… প্লিজ, এসব নিয়ে আজ কথা বলো না।”

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে ঠান্ডা গলায় বলল—

— “ওহ! তাই নাকি? মানে তুমি আবার বিয়েও করেছো… সন্তানও হয়েছে? ভালোই তো।”

এরপর লাইন কেটে দিল।

আমি চুপচাপ করিডোরের বেঞ্চে বসে রইলাম।

চারপাশে মানুষের ভিড়, নার্সদের ছোটাছুটি, স্ট্রেচারের শব্দ… কিন্তু আমার কানে শুধু ভেসে আসছিল দুই বছর আগের সেই রাতটার কথা।

যেদিন সাব্বির আমাকে একটা ব্যাগ হাতে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।

আমাদের ডিভোর্সটা ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে হয়নি…

হয়েছিল কারণ ওর পরিবার বিশ্বাস করেছিল, আমি কখনো মা হতে পারব না।

শাশুড়ি প্রতিদিন খোঁটা দিতেন— “এমন মেয়ে ঘরে রেখে কী লাভ?” “আমার ছেলের জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!”

আর সাব্বির?

সে একবারও আমার পাশে দাঁড়ায়নি।

ডাক্তারের রিপোর্ট আসার আগেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল— সমস্যাটা আমার।

ডিভোর্সের কাগজে সই করার সময়ও আমি বিশ্বাস করতাম, একদিন সে সত্যিটা জানবে।

কিন্তু সে অপেক্ষা করেনি।

তার ঠিক দুই মাস পর আমি জানতে পারি… আমি মা হতে চলেছি।

সেদিন বৃষ্টির মধ্যে আমি একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলাম।

কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের খবরটা শোনানোর মতো মানুষটাও তখন আর আমার ছিল না।

এক ঘণ্টা পর নার্স এসে আমাকে একটা ব্যাগ দিল।

— “রোগীর জামাকাপড় রাখেন।”

আমি ব্যাগটা নিতে গিয়েই থমকে গেলাম।

সামনেই দাঁড়িয়ে সাব্বির।

দামী পাঞ্জাবি, হাতে গাড়ির চাবি… কিন্তু মুখটা অদ্ভুত ফ্যাকাশে।

সে চারপাশে পাগলের মতো তাকাচ্ছিল।

— “ছেলেটা কোথায়?”

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

— “তুমি এখানে কেন? আর হাসপাতালের কথা জানলে কীভাবে?”

সে আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না।

দ্রুত কাঁচঘেরা কেবিনের দিকে চলে গেল, যেখানে অপারেশনের আগে আরিশকে রাখা হয়েছিল।

ছোট্ট আরিশ অক্সিজেন মাস্ক পরে নিঃশব্দে শুয়ে ছিল।

সাব্বির কাঁচের ওপরে হাত রাখলো।

তারপর ফিসফিস করে বলল—

— “এটা… এটা তো ছোটবেলার আব্বুর মতো দেখতে…”

আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে সরাতে চাইলাম।

— “চলে যাও এখান থেকে!”

সাব্বির ঘুরে আমার দিকে তাকালো।

চোখদুটো কাঁপছিল।

— “তুমি তো বলেছিলে ডাক্তার বলেছে তুমি মা হতে পারবে না… তাহলে?”

আমি হঠাৎ হেসে উঠলাম।

সেই হাসির মধ্যে রাগ ছিল, অপমান ছিল, বছরের পর বছর জমে থাকা কষ্ট ছিল।

— “আমি কখনো বলিনি আমি মা হতে পারব না। তোমার মা আর তোমার বর্তমান স্ত্রী মিলে রিপোর্ট বদলে ফেলেছিল… যেন আমাকে সরিয়ে তোমার মামাতো বোনকে বিয়ে দিতে পারে!”

সাব্বির যেন দাঁড়িয়ে থেকেও পড়ে গেল।

সে দুহাতে মাথা চেপে ধরলো।

— “মানে… আরিশ আমার ছেলে?”

আমার চোখ ভিজে উঠলো।

— “যেদিন আমাকে দরজা থেকে বের করে দিয়েছিলে, সেদিনই তুমি ওর বাবা হওয়ার অধিকার হারিয়েছো।”

ঠিক তখনই করিডোরে হাইহিলের শব্দ।

আমরা দুজনেই তাকালাম।

সাব্বিরের বর্তমান স্ত্রী তানিয়া দৌড়ে আসছে।

গায়ে জমকালো শাড়ি, হাতে এখনো মেহেদির রঙ… কিন্তু মুখটা মৃত মানুষের মতো সাদা।

সে আরিশের স্ট্রেচারের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠলো—

— “সাব্বির! তুমি এখানে কী করছো?! ওই ছেলে বাঁচতে পারবে না… ওকে বাঁচানো যাবে না!”

আমি হতবাক।

সাব্বির চিৎকার করে উঠলো—

— “তানিয়া! তুমি কী বলছো?! ও আমার ছেলে!”

তানিয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

— “না! তুমি বুঝছো না… ওই ছেলেটা বেঁচে থাকলে আমার মেয়ে মারা যাবে!”

আমার মাথার ভেতর ঝাঁকুনি লাগলো।

সাব্বির পেছনে সরে গেল।

— “মানে?”

তানিয়া দেয়ালে হেলান দিয়ে ভেঙে পড়লো।

— “তোমার মেয়ের বিরল রক্তের রোগ ধরা পড়েছে… ডাক্তার বলেছে বোন ম্যারো লাগবে। আর পুরো রিপোর্টে একমাত্র ম্যাচ এসেছে ওই ছেলেটার সঙ্গে…”

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে আরও বলল—

— “কারণ… কারণ আরিশ শুধু তোমার ছেলে না…”

করিডোরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আমার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ হচ্ছিল।

সাব্বির কাঁপা গলায় বলল—

— “তাহলে?”

তানিয়া চোখ তুলে তাকালো।

তারপর এমন একটা কথা বলল, যেটা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল—

— “কারণ আমার মেয়েও তোমারই সন্তান, সাব্বির… আরিশ আর ও একই বাবার সন্তান বলেই ম্যাচ করেছে…”

আমি জমে গেলাম।

সাব্বির যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।

আর আমার মাথার ভেতর তখন শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—

তাহলে… তানিয়া এতদিন কী লুকিয়ে রেখেছিল?

আর কেন সে চাইছিল আমার ছেলেটা মারা যাক?

অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা তখনও জ্বলছিল… আর আমি বুঝতে পারছিলাম, আজ শুধু একটা অপারেশন না— অনেক বছরের লুকানো সত্যও খুলে যেতে চলেছে।

চলবে…

#শেষ_অধ্যায়ের_আগে

[লেখক #গল্প_ঘর ]

#শেষ_অধ্যায়ের_আগে #পর্ব_২

লেখক: #গল্প_ঘর

অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে আমি শুধু তানিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

মেয়েটা হাঁপাচ্ছিল।

চোখের কাজল গলে মুখজুড়ে কালো দাগ পড়ে গেছে।

সাব্বির কাঁপা হাতে ওর বাহু চেপে ধরল।

— “সব খুলে বলো, তানিয়া! একটাও মিথ্যা বলবে না!”

করিডোরের বাতাস যেন জমে গিয়েছিল।

দূরে কোথাও একটা বাচ্চা কাঁদছিল… আর এখানে তিনটা মানুষের জীবন একসাথে ভেঙে পড়ছিল।

তানিয়া ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল—

— “তোমার মা… সব জানতো।”

আমার বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠলো।

— “মানে?”

তানিয়া মাথা নিচু করল।

— “তোমাদের ডিভোর্সের আগে তোমার আসল রিপোর্ট এসেছিল। সেখানে পরিষ্কার লেখা ছিল— সমস্যা তোমার না… সমস্যা ছিল সাব্বিরের।”

সাব্বির যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

— “না… না, এটা মিথ্যা…”

— “মিথ্যা না!” তানিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো। “খালা রিপোর্ট বদলে ফেলেছিল! কারণ ও চেয়েছিল তুমি আমাকে বিয়ে করো। তোমাদের বিয়ের আগেই আমাদের সম্পর্ক ছিল…”

আমার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

সাব্বির দু’পা পিছিয়ে দেয়ালে হেলে পড়লো।

তার চোখে সেই প্রথমবার আমি ভয় দেখলাম।

একজন পুরুষের ভয়।

যে হঠাৎ বুঝতে পারে— সে নিজের হাতেই নিজের জীবন ধ্বংস করেছে।

তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল—

— “আমি তখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম… কিন্তু তোমাকে বলিনি। কারণ খালা বলেছিল, তুমি যদি জানতে বাচ্চাটা আসছে, তাহলে কখনো ওই মেয়েকে—”

সে আমার দিকে তাকাল।

কথাটা শেষ করতে পারলো না।

আমি ধীরে ধীরে বললাম—

— “তাহলে তোমরা সবাই মিলে আমাকে সরিয়ে দিয়েছিলে।”

তানিয়া ফুঁপিয়ে উঠলো।

— “আমি ভুল করেছি… অনেক বড় ভুল…”

ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেল।

আমরা সবাই একসাথে তাকালাম।

ডাক্তার মাস্ক খুলতে খুলতে বললেন—

— “অপারেশন সফল হয়েছে। কিন্তু—”

আমার বুক থেমে গেল।

— “ওর দ্রুত বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট দরকার। সময় খুব কম।”

সাব্বির তৎক্ষণাৎ বলল—

— “আমি দেব! আমার যা লাগে আমি করব!”

ডাক্তার ধীরে মাথা নেড়ে বললেন—

— “আপনার ম্যাচ হয়নি। সবচেয়ে ভালো ম্যাচ আপনার মেয়ের সাথেই।”

করিডোরে আবার নীরবতা নেমে এলো।

তানিয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

— “আমার মেয়েটা খুব ছোট, ডাক্তার…”

ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন—

— “আমরা ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করব। কিন্তু দুই শিশুর জীবনই এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।”

আমি কাঁচের ওপাশে তাকালাম।

ছোট্ট আরিশ ঘুমিয়ে আছে।

মুখে অক্সিজেন মাস্ক।

বুকটা খুব আস্তে উঠানামা করছে।

হঠাৎ আমার মনে হলো— এই ছোট্ট বাচ্চাটা তো কোনো দোষ করেনি।

তানিয়ার মেয়েটাও না।

দোষ ছিল বড়দের।

আমাদের অহংকারের।

আমাদের নোংরা সিদ্ধান্তের।

আমি ধীরে ধীরে তানিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সে মাথা নিচু করে কাঁদছিল।

আমি শান্ত গলায় বললাম—

— “তোমার মেয়ের নাম কী?”

তানিয়া অবাক হয়ে তাকালো।

— “আ… আয়রা।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

তারপর খুব আস্তে বললাম—

— “আরিশ বাঁচবে। আয়রাও বাঁচবে। আমি কোনো শিশুকে তার বাবা-মায়ের ভুলের শাস্তি পেতে দেব না।”

সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার চোখে অপরাধবোধ, অনুতাপ, লজ্জা— সব একসাথে জমে ছিল।

সে হঠাৎ আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।

করিডোরে থাকা কয়েকজন মানুষ থেমে তাকালো।

কিন্তু সে কিছুই খেয়াল করলো না।

কাঁপা গলায় বলল—

— “আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনি… আমি তোমার পাশে দাঁড়াইনি… আমাকে একবার ক্ষমা করে দাও।”

আমার চোখ ভিজে উঠলো।

দুই বছর আগের সেই রাতটা মনে পড়লো।

বৃষ্টিভেজা রাস্তা।

একটা ব্যাগ।

বন্ধ দরজা।

একটা মেয়ের পৃথিবী ভেঙে যাওয়ার শব্দ।

আমি নিচু হয়ে সাব্বিরের দিকে তাকালাম।

— “ক্ষমা আর ফিরে পাওয়া এক জিনিস না, সাব্বির।”

সে মাথা নিচু করলো।

আমি ধীরে বললাম—

— “আমি তোমাকে ঘৃণা করি না আর। কারণ ঘৃণা ধরে রাখার মতো শক্তি আমার আর নেই। কিন্তু যেদিন তুমি আমাকে দরজা থেকে বের করে দিয়েছিলে… সেদিন আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

সাব্বির নিঃশব্দে কেঁদে ফেললো।

প্রথমবার।

হয়তো জীবনে সত্যিকারের প্রথমবার।

---

দুই মাস পর।

হাসপাতালের ছাদে বিকেলের আলো পড়েছে।

আকাশে হালকা মেঘ।

দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসছে।

আরিশ ছোট্ট একটা বল হাতে দৌড়াচ্ছে।

তার বুকের অপারেশনের দাগটা এখনো স্পষ্ট… কিন্তু মুখে প্রাণভরা হাসি।

আর একটু দূরে হুইলচেয়ারে বসে আয়রা তাকে দেখছে।

দুজনেই বেঁচে গেছে।

ডাক্তাররা একে অলৌকিক বলেছিল।

আমি বেঞ্চে বসে ওদের দেখছিলাম।

ঠিক তখন সাব্বির পাশে এসে দাঁড়ালো।

আগের সেই অহংকার নেই।

চোখের নিচে ক্লান্তি।

চুলে অল্প পাক ধরা।

সে ধীরে বলল—

— “তানিয়া মেয়েকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে।”

আমি চুপ রইলাম।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “জানো, এতদিন ভাবতাম সুখ মানে বড় বাড়ি, পারফেক্ট পরিবার… কিন্তু আসলে সুখ ছিল ওই রাতে, যখন তুমি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে আমাকে চা দিতেও।”

আমার বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো।

কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় না।

শুধু মানুষ দেরি করে ফেলে।

আমি আকাশের দিকে তাকালাম।

— “আমাদের গল্পটা এখানেই শেষ হওয়াই ভালো, সাব্বির।”

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নেড়ে হাসলো।

একটা ভাঙা, ক্লান্ত হাসি।

— “হয়তো এটাই আমাদের শাস্তি।”

দূরে আরিশ দৌড়ে এসে আমার হাত ধরলো।

— “আম্মু! দেখো আমি কত দ্রুত দৌড়াতে পারি!”

আমি হাসলাম।

চোখের কোণে পানি জমে উঠলো।

তারপর ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলাম।

সাব্বির দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছিল।

তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শান্তি।

কারণ সে বুঝে গেছে—

সব সম্পর্ক ফিরে পাওয়া যায় না।

কিন্তু কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়… দূর থেকেও।

শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে হাসপাতালের ছাদে ছড়িয়ে পড়ছিল।

আর বহু বছরের মিথ্যা, বিশ্বাসঘাতকতা আর কান্নার পর—

অবশেষে
লাল বাতিটা নিভে গিয়েছিল।
#শেষ_অধ্যায়ের_আগে_পর্ব_২

—সমাপ্ত—

08/05/2026

#নীল_নকশা
পর্ব: ০২


পুরো হলরুম যেন মুহূর্তের মধ্যে একটা বরফজমা স্তব্ধতায় ডুবে গেল। বিশালাকার স্ক্রিনে আরাফাত আর তানজিয়ার সেই দৃশ্যগুলো জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড আগে যে মানুষটা আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল, সেই আরাফাতের মুখটা এখন ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। সে থমকে দাঁড়িয়ে আছে, হাত থেকে মাইক্রোফোনটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
তানজিয়া, যে একটু আগে বিজয়ের হাসি হাসছিল, তার চোখের পলক আর পড়ছে না। সামনের সারিতে বসা বোর্ডের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। ফিসফিসানি শুরু হতেও সময় লাগল না।
আমি হলের একদম পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলাম। মাঝখানের আইল দিয়ে হেঁটে যখন স্টেজের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন সবার নজর আমার দিকে। আরাফাত আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে কোনো জ্যান্ত ভূত দেখছে।
আমি স্টেজে উঠে আরাফাতের হাত থেকে কাঁপতে থাকা মাইক্রোফোনটা নিলাম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
"প্রেজেন্টেশনটা কি একটু অন্যরকম হয়ে গেল, আরাফাত? তুমি তো চেয়েছিলে সবাইকে চমকে দিতে। দেখো, সবাই কতটা অবাক হয়েছে!"
আরাফাত তোতলাতে শুরু করল, "নীলা... তুমি... এটা কী... মানে..."
"এটা আমাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা," আমি অডিটোরিয়ামের সবার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকলাম। "তবে কোম্পানির নয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনের। যে মানুষটা নিজের ঘর আর বিশ্বাস সামলাতে পারে না, সে এই বিশাল গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের দায়িত্ব সামলাবে—এটা ভাবা কি ঠিক হবে?"
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চাচা, যিনি বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য, উঠে দাঁড়ালেন। উনার ইশারায় সিকিউরিটি গার্ডরা স্টেজের দিকে এগিয়ে এল। চাচা গম্ভীর গলায় বললেন, "আরাফাত চৌধুরী, আজকের এই মিটিং এখানেই স্থগিত করা হলো। আর সেই সাথে বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, তোমার এমডি হওয়ার প্রস্তাব চিরতরে বাতিল করা হলো। নৈতিক স্খলনের দায়ে তোমাকে কোম্পানি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হচ্ছে।"
হলরুম জুড়ে শোরগোল পড়ে গেল। তানজিয়া ততক্ষণে হলরুম থেকে পালানোর পথ খুঁজছে, কিন্তু মিডিয়ার ক্যামেরাগুলো তাকে ঘিরে ধরেছে। কারণ আজকের এই ইনভেস্টর মিটিংয়ে বেশ কিছু সাংবাদিকও আমন্ত্রিত ছিল।
আরাফাত হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরল। ওর চোখে এখন ভয় আর ক্রোধের মিশ্রণ। "তুমি জানো তুমি কী করলে? তুমি আমাকে পথে বসিয়ে দিলে নীলা! এই কোম্পানি, এই সম্মান—সব শেষ করে দিলে!"
আমি ওর হাতটা ঝটক দিয়ে সরিয়ে দিলাম। আমার ঠোঁটে তখন এক চিলতে হাসি।
"আমি কিছুই শেষ করিনি, আরাফাত। তুমি নিজে যখন বনানীর ফ্ল্যাটে বসে কফির বদলে অন্য কিছু খুঁজছিলে, তখনই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু আজ পর্দাটা সরিয়ে দিলাম।"
আমি স্টেজ থেকে নেমে আসলাম। বাইরে তখন বৃষ্টির তোড়। গুলশানের সেই অফিসের গেট দিয়ে যখন বের হচ্ছিলাম, তখন বুকটা হালকা লাগছিল। ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। তানজিয়ার নম্বর থেকে মেসেজ:
"তুমি এটা ঠিক করলে না। আমি তোমাকে ছাড়ব না।"
আমি নম্বরটা পার্মানেন্টলি ব্লক করে দিলাম। গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললাম, "বাসায় চলো।"
তবে সেটা বনানীর সেই অ্যাপার্টমেন্ট নয়। সেটা আমার বাবার বাড়ি, যে বাড়িটা আরাফাতের পরিবার কৌশলে দখল করে নিতে চেয়েছিল।
বাসায় পৌঁছে দেখি শাশুড়ি মা ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। উনার হাতে ফোন, নিশ্চয়ই খবর পৌঁছে গেছে। আমাকে দেখেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "কী করেছিস তুই এসব? আমার ছেলের জীবনটা ধ্বংস করে দিলি? অকৃতজ্ঞ মেয়ে!"
আমি উনার দিকে তাকালাম। আমার দৃষ্টিতে কোনো করুণা ছিল না।
"আপনার ছেলে আপনার আদর্শেই বড় হয়েছে মা। অন্যের সম্পদ আর অন্যের বিশ্বাস নিয়ে খেলা করাটা ওর রক্তে। তবে মনে রাখবেন, খেলাটা এখন আমার হাতে। কাল সকালের মধ্যে আপনাদের মালপত্র নিয়ে এই বাড়ি ছাড়বেন। কারণ এই বাড়ির দলিল এখন আমার নামে।"
তিনি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি নিজের ঘরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করলাম। আজ রাতে আমি শান্তিতে ঘুমাব।
কিন্তু আমি জানতাম না, আরাফাত এত সহজে হার মানার পাত্র নয়। মাঝরাতে ড্রয়িংরুমে কাঁচ ভাঙার প্রচণ্ড শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

#নীল_নকশা
পর্ব: ০৩


কাঁচ ভাঙার শব্দটা আসছিল নিচের তলার বড় হলরুম থেকে। আমি দ্রুত নিচে নেমে দেখলাম, ড্রয়িংরুমের বিশাল ঝাড়বাতিটা মেঝেতে ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরাফাত। ওর টাই খোলা, শার্টের হাতা গোটানো, আর চোখের দৃষ্টিতে এক ভয়ংকর হিংস্রতা। সোফায় বসে ওর মা ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
আমাকে দেখেই আরাফাত একটা ভাঙা কাঁচের টুকরো লাথি দিয়ে সরিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল।
"খুব আনন্দ হচ্ছে, না নীলা?" ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল। "বাবার সম্পত্তিতে আজ মালিকানা দেখাচ্ছ? ভুলে যেও না, গত পাঁচ বছর ধরে এই সাম্রাজ্য আমি একা টেনেছি। তোমার বাবার রেখে যাওয়া ডুবন্ত নৌকাকে জাহাজ বানিয়েছি আমি!"
আমি শান্তভাবে সিঁড়ির হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। "জাহাজ তুমি বানিয়েছো ঠিকই আরাফাত, কিন্তু তাতে ফুটোটাও তুমিই করেছ। আর এখন যখন লোনা জল ঢুকতে শুরু করেছে, তখন নাবিক সেজে লাভ নেই।"
"আমি তোমাকে ডিভোর্স দেব না," ও হুংকার দিয়ে উঠল। "তোমাকে এই বাড়িতেই পচে মরতে হবে। আমি দেখব কোন কোর্ট তোমাকে এই বাড়ির দখল দেয়। আমি সব ডকুমেন্ট বদলে দেব!"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ওর এই মরিয়া ভাবটা আমার কাছে করুণ মনে হচ্ছিল। "ডকুমেন্ট বদলানোর সময় তুমি আর পাবে না। চাচা অলরেডি অডিট টিম পাঠিয়ে দিয়েছেন। গত দুই বছরে কোম্পানির ফান্ড থেকে তানজিয়ার নামে তুমি যে ফ্ল্যাট আর গাড়ি কিনেছ, তার সব প্রমাণ এখন পুলিশের হাতে।"
আরাফাতের চেহারাটা মুহূর্তের মধ্যে নীল হয়ে গেল। ও হয়তো ভেবেছিল তানজিয়ার সাথে ওর সম্পর্কটা শুধুই আবেগীয়, কিন্তু আমি জানতাম আরাফাত আবেগ দিয়ে নয়, ক্যালকুলেশন দিয়ে চলে। ও কোম্পানির টাকা তছরুপ করে নিজের জন্য আলাদা একটা জগত তৈরি করছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে কলিংবেল বেজে উঠল।
মাঝরাতে কলিংবেলের শব্দে সবাই চমকে উঠল। শাশুড়ি মা দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা এবং আমার ছোট চাচা।
চাচা এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত রাখলেন। তারপর আরাফাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আরাফাত, তোমার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এবং জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।"
"চাচা, আপনি কি পাগল হয়েছেন? আমি আপনার নিজের জামাই!" আরাফাত চিৎকার করে উঠল।
"জামাই হওয়ার আগে তুমি আমার ভাইয়ের মেয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ," চাচা কড়া গলায় বললেন। "আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি আমার ভাইয়ের কষ্টের গড়া প্রতিষ্ঠানকে লুটে খেয়েছ। পুলিশ, নিয়ে যান একে।"
পুলিশ যখন আরাফাতকে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন ও বারবার আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাইছিল। যে দম্ভ নিয়ে ও সকালে আমার কপালে চুমু খেয়েছিল, সেই দম্ভ এখন ধুলোয় মিশে গেছে।
আরাফাooতকে নিয়ে যাওয়ার পর বাড়িটা হঠাৎ একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শাশুড়ি মা মেঝেতে বসে পড়লেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম, "কাল সকাল ১০টার মধ্যে ড্রাইভার আপনাদের গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আপনার ব্যাগ গোছানো শুরু করুন।"
আমি সোজা ছাদে চলে গেলাম। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। বনানীর অ্যাপার্টমেন্টের সেই বিষাক্ত কফির ঘ্রাণ থেকে আমি আজ মুক্ত। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম তানজিয়ার কয়েকটা মিসড কল। সম্ভবত ও জেনে গেছে যে পুলিশ তাকেও খুঁজছে।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা বড় শ্বাস নিলাম। প্রতিশোধ হয়তো মিষ্টি হয়, কিন্তু মুক্তি তার চেয়েও বেশি শান্তি দেয়।
তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়। কারণ পরের দিন সকালে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আমি একটা ছোট চিরকুট পেলাম। চিরকুটটা আমার ড্রয়ারের ভেতর থেকে কেউ বের করে আয়নায় সেঁটে রেখেছে।
তাতে লেখা ছিল:
"খেলাটা তুমি শুরু করেছ নীলা, শেষটা আমি করব। ইতি— তানজিয়া।"
আমি বুঝতে পারলাম, নীল নকশাটা কেবল আমি একাই আঁকিনি। অন্য পাশেও কেউ একজন তার ঘুঁটি সাজিয়ে বসে আছে।

চলবে...

পরের পর্ব পড়ার জন্য সাথেই থাকুন। কাহিনী এখন কোন দিকে যাবে বলে আপনার মনে হয়? কমেন্টে জানান!

আমার স্বামীর প্রেমিকা আমাকে তাদের একটি ঘনিষ্ঠ ভিডিও পাঠিয়েছিল আমাকে অপমান করার জন্য... আর আমি সেটি চালিয়ে দিলাম তার কোম...
08/05/2026

আমার স্বামীর প্রেমিকা আমাকে তাদের একটি ঘনিষ্ঠ ভিডিও পাঠিয়েছিল আমাকে অপমান করার জন্য... আর আমি সেটি চালিয়ে দিলাম তার কোম্পানির বার্ষিক বোর্ড মিটিংয়ে।
​বনানীর অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে যখন কফি ঢালছিলাম, তখনই মেসেজটা এল।
​অচেনা নম্বর।
কোনো সালাম নেই। কোনো প্রসঙ্গ নেই।
​শুধু একটা ভিডিও... আর নিচে লেখা একটি লাইন:
“যাতে তুমি দেখতে পারো তোমার স্বামী কী করে যখন সে বলে যে সে অফিসের কাজে ব্যস্ত।”
​মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল।
​আমি চিৎকার করিনি।
আমি কাঁদিনি।
ফোনটা হাত থেকেও ফেলে দিইনি।
​আমি শুধু বরফশীতল আঙুলে স্ক্রিনে ট্যাপ করলাম এবং দেখলাম আমার চেনা পৃথিবীটা দুই ভাগে ফেটে যাচ্ছে।
​সেখানে আরাফাত ছিল।
আমার স্বামী।
মার্জিত, নিখুঁত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী আরাফাত।
​সে একটা হোটেল রুমে ছিল—টাই নেই, চুলগুলো এলোমেলো, আর একজন নারীর সাথে হাসাহাসি করছে যাকে আমি প্রথম তিন সেকেন্ড চিনতে পারিনি।
​কিন্তু চতুর্থ সেকেন্ডে আমি তাকে চিনতে পারলাম।
​তানজিয়া সুলতানা।
কর্পোরেট কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর।
​সেই একই নারী যে গত মাসের পার্টিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল:
— “ভাবি, আপনার কপালটা সত্যি খুব ভালো, আরাফাত ভাইয়ের মতো এমন ট্যালেন্টেড মানুষ এখনকার দিনে পাওয়াই যায় না।”
​আমি ভিডিওটা আবার চালালাম।
তারপর আবারও।
এবং আবারও।
​সন্দেহ ছিল বলে নয়।
বরং যখন ব্যথার ক্ষত খুব গভীর হয়, তখন সেটাকে বারবার যাচাই করতে হয় এটা নিশ্চিত হতে যে—হ্যাঁ, এটাই বাস্তব।
​বাথরুমের শাওয়ার বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম।
​আরাফাত যে কোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে।
​আমার কাছে দুটো পথ ছিল।
​সেখানেই ভেঙে পড়া... অথবা অপেক্ষা করা।
​আমি অপেক্ষাকেই বেছে নিলাম।
​ফোনটা লক করলাম। কাপটা কাউন্টারে রাখলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। মাত্র একটা।
​সে যখন শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে হাতে ঘড়ি নিয়ে সামনে এল, তখন প্রতিদিনের মতোই আমার কপালে চুমু খেল।
​“আজ রাতের ডিনারের জন্য তৈরি তো?”
​আমি সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালাম।
​আমার চোখের একটি পলকও কাঁপল না।
​এই অংশটাই আমাকে সবথেকে বেশি ঘৃণা দিচ্ছিল।
​ভিডিওটা নয়।
তানজিয়াও নয়।
​বরং সেই প্রশান্তি, যার সাথে সে অবলীলায় মিথ্যা বলে যাচ্ছিল। শরীর থেকে দামী পারফিউমের ঘ্রাণ আর এমন এক ধৃষ্টতা ঝরছিল যেন সে বিশ্বাস করে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
​“হ্যাঁ,” আমি জবাব দিলাম। “পুরোপুরি তৈরি।”
​সেদিন রাতে ছিল ‘চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর গ্র্যান্ড বোর্ড মিটিং।
​বোর্ড মেম্বার, ইনভেস্টর আর ডিরেক্টররা সবাই উপস্থিত।
​বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত।
​যে রাত নির্ধারণ করবে আরাফাত এই বিশাল সাম্রাজ্যের পরবর্তী এমডি (MD) হতে পারবে কি না।
​এই রাতটির জন্য সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি শব্দ আর প্রতিটি হাসি নিখুঁত করার প্র্যাকটিস করেছে।
​আমিই তাকে টাই পছন্দ করে দিয়েছিলাম।
আমিই তার স্যুটগুলো লন্ড্রি থেকে আনিয়ে গুছিয়ে দিয়েছি।
তার প্রতিটি বক্তৃতা আমি মুগ্ধ শ্রোতার মতো বারবার শুনেছি।
​আমি—সেই স্ত্রী যে সবসময় নেপথ্যে থাকতাম, শুধু একটা সুন্দর ডেকোরেশন পিসের মতো পার্টিগুলোতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
​সেই একই স্ত্রী যাকে তার শাশুড়ি বারবার শুনিয়েছেন যে, এই পরিবারে আমাকে জায়গা দেওয়া হয়েছে এটাই আমার অনেক বড় ভাগ্য।
​আমার ফোনটা আবার কেঁপে উঠল।
​সেই একই নম্বর।
​এবার মেসেজ এসেছে:
“যদি তোমার সামান্যতম আত্মসম্মান থাকে, তবে আজকের অনুষ্ঠানের আগেই সরে দাঁড়াও। আরাফাত অলরেডি আমাকে বেছে নিয়েছে।”
​শব্দগুলো পড়ার পর অদ্ভুতভাবে আমার মনের ভেতরের জ্বালাটা থিতিয়ে এল।
​ঠিক যেন ভেতর থেকে কোনো একটা দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
ঠিক যেন রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে কোনো এক ভয়ংকর প্রতিশোধের জন্ম নিল।
​আমি মাত্র চারটা শব্দে উত্তর দিলাম:
“খবরটার জন্য ধন্যবাদ, তানজিয়া।”
​আর কোনো উত্তর আসেনি।
​সে হয়তো ভেবেছিল আমি কান্নাকাটি করব।
হয়তো আমি ফোনে তাকে গালিগালাজ করব।
কিংবা আমি আরাফাতের সাথে সিনক্রিয়েট করব—যা তাদের দুজনকে আরও শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে সাহায্য করবে।
​সে আমাকে চিনতে ভুল করেছিল।
​রাত ৮:১০ মিনিটে আমি আরাফাতের আগেই বেরিয়ে গেলাম।
​আমি তাকে বলিনি কোথায় যাচ্ছি।
সে জিজ্ঞাসাও করেনি।
​আমি সরাসরি গুলশানের হেডকোয়ার্টার্সে চলে গেলাম।
​রিসেপশন দিয়ে গেলাম না। আমি এমন এক পথে গেলাম যা এই পরিবারের গোপন রাস্তা।
​আমি এই অফিসের প্রতিটি কোণা চিনি।
সবাই ভাবত আমি শুধু একজন সাধারণ গৃহিণী—কিন্তু তারা জানত না এই ব্যবসার মূল ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছিলেন আমার বাবা।
​আমি ১৪ তলায় উঠলাম।
​বোর্ডরুমে নয়।
​একেবারে শেষ প্রান্তের একটি অফিসে।
​যে অফিসের দরজার ফলকে আমার বাবার নাম লেখা, যা এই পরিবারটি এখন আর কেউ মনে রাখতে চায় না।
​আমি ভেতরে ঢুকলাম। সেখানে বসে ছিলেন আমার ছোট চাচা, যিনি এখনো বোর্ডের প্রভাবশালী একজন সদস্য।
​আমি ফোনটা বের করলাম। ভিডিওটা তার সামনে রাখলাম। একটা শব্দও বললাম না।
​তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভিডিওটা দেখলেন।
​তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
​তিনি আমার দিকে তাকালেন। অনেক বছর পর তিনি আমাকে আরাফাতের স্ত্রী হিসেবে নয়, বরং উনার ভাইয়ের মেয়ের মতো চোখে দেখলেন।
​“মামণি, তুমি যদি এটা করো,” তিনি নিচু স্বরে বললেন, “তবে ফেরার কোনো পথ থাকবে না। আরাফাতের ক্যারিয়ার আজই শেষ হয়ে যাবে।”
​আমি হাসলাম।
​দুঃখে নয়।
বরং একটা অদ্ভুত জয়ের আনন্দ নিয়ে।
​“ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই চাচা,” আমি উত্তর দিলাম। “সেই কারণেই আমি আজ এখানে।”
​রাত ৯টা।
​যখন মেইন হলের বড় পর্দাগুলো জ্বলে উঠল এবং আরাফাত মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে দাঁড়াল, আমি তখন পেছনের আবছা অন্ধকারে বসে আছি। দেখলাম তানজিয়া লাল শাড়ি পরে একরাশ অহংকার নিয়ে সামনের সারিতে বসছে।
​সে জানত না মূল প্রেজেন্টেশনের ফাইলটা আমি ইতিমধ্যে বদলে দিয়েছি।
​আরাফাত সবার দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসল এবং বলল:
​“সবাইকে ধন্যবাদ। আমাদের কোম্পানির ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আমরা একটি চমৎকার ভিডিও প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছি। চলুন দেখে নেওয়া যাক...”
​আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বড় পর্দায় সেই ভিডিওটি চলতে শুরু করল। পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা।

চলবে,,,,,,

#নীল_নকশা
পর্ব:০১


©

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Jimi The Story Teller posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share