20/08/2026
🔴ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট (পর্ব :১)🔴
– ফিয়োডোর ডস্টয়েভস্কি
লেখক পরিচিতি
ফিয়োডোর ডস্টয়েভস্কি ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ই নভেম্বর মস্কো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি যোগদান করেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। সুবিস্তৃত রুশ সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি তখন জার।
ফিয়োডোর শৈশব থেকেই ছিলেন ভাবুক, কল্পনাপ্রবণ। তাই এ চাকরিজীবন বেশিদিন ভাল লাগলো না তার। তিনি চাইলেন তার মনের নিত্যনতুন ভাবগুলো লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলবেন। বই লিখবেন স্থির করলেন তিনি।
১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের মাত্র ২৪ বছর বয়সে বের হলো তাঁর বই পুয়োর ফোক বইটি পড়ে সবাই মুগ্ধ হলেন।
তাঁর দিকে কঠোর দৃষ্টি রাখলো রাশিয়ার আমলাতন্ত্র। আমলারা ভাবলেন দরিদ্রের সুখ-দুঃখ নিয়ে এর এত মাথাব্যথা কেন? গরিব হয়ে যারা জন্মেছে, অভিশপ্ত জীবন-যাপনই হচ্ছে তাদের নিয়তি। তার বিরুদ্ধে ইঙ্গিত দিতে সাহস করে, কে এই লোক?
ভয়েভস্কি পুলিশের দৃষ্টি এড়াতে পারলেন না। তিন বছর পরে এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জার তাকে পাঠালেন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে…।
ফিয়োডোর নেই। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ২৮শে জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু পৃথিবী যতকাল থাকবে, মানুষের স্মৃতিপটে তিনি অবিনশ্বর হয়ে থাকবেন।
...
🔴 পর্ব :১🔴
জুলাইয়ের শুরু, প্রচণ্ড গরম।
খুপরির মত ঘর থেকে নেমে এল এক তরুণ।
এগিয়ে চলল কোহুশকিন ব্রীজের দিকে।
সবে সন্ধ্যে হয়েছে। তার হাঁটার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কোনদিকে যাওয়া যায়–এখনো ভেবে ঠিক করে উঠতে পারেনি। ঘরে বসে থাকতেও ভালো লাগছ না; তাই পথে বেরিয়ে আসা।
ভাড়া করা খুপরি ঘর থেকে নেমে আসবার সময়ে বাড়িওলির চোখে ধুলো দিয়েছে প্রতিবারের মতো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই বাড়িওলির রান্নাঘর। দরজা খোলা থাকে সব সময়ে। ঠিক এই সময়টাতে বুক ঢিব ঢিব করতে থাকে তরুণের। বড় কাপুরুষ মনে হয় নিজেকে, তারপরেই ধিক্কার দেয় নিজেকে–এত ভয় কেন?
ভয় তো দেনার জন্যে। অনেক টাকা পাবে বাড়িওলি। কানাকড়িও দিতে পারেনি তরুণ। থাকে সে পাঁচতলা বাড়ির চিলে কোঠায়। ঘর তো নয়, যেন আলমারি।
অথচ সে সত্যি সত্যি কাপুরুষ নয়। ঠিক উল্টো। মেজাজ খিঁচড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে উৎকণ্ঠায় বেকার হয়ে থাকার দরুন। মনও তাই মুষড়ে আছে। বিমর্ষতা চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছলে মন-মেজাজ এইরকমই দাঁড়ায়। একলা থাকতে ইচ্ছে হয়। দুনিয়ার কারো সঙ্গে মুখোমুখি হতে মন চায় না–বাড়িওলির সঙ্গে তো নয়ই।
এই ভয় থেকেই এসেছে কাপুরুষতা। কিছুদিন ধরে দারিদ্র্যের বোঝাও যেন ওকে খুঁড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিন কত কাজই তো থাকে–আগ্রহ নেই কোনো কাজে। আগ্রহ যে ফিরিয়ে আনবে সে আগ্রহও নেই তার। কেউ যেন চারদিকে ঘোর ষড়যন্ত্র জাল বুনে চলেছে মানুষটাকে ঘিরে। ভয় বাড়িওলিকে নয়–কাউকেই নয়। থোড়াই কেয়ার করে সে ষড়যন্ত্রকে–অথচ মন মুষড়ে আছে নিদারুণ।
সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময়ে বাড়িওলির চোখে পড়লেই রোজই শুনতে হয় সেই একই গান…একই ঘ্যানঘ্যানানি…একই ভয় দেখানো। ভাড়া না দিলে অমুক করেঙ্গা, তমুক করেঙ্গা! বানিয়ে বানিয়ে কাঁহাতক আর মিথ্যে বলা যায়। তার চাইতে বেড়ালের মত পা টিপে টিপে নেমে যাওয়া ভাল।
রাস্তায় নেমে এসে কিন্তু বেজায় হাসি পেল তরুণের। এত ভয় বাড়িওলিকে।
হাসিটা কিন্তু তার অদ্ভুত ধরনের। কথাও বলে সে আপন মনে–আশ্চর্য! যা করব বলে ভেবে রেখেছি, সে কাজ তো পুরুষ মানুষের হাতের পাঁচ! তবুও এত ভয়!…না, বড্ড বেশি কথা বলছি আজকাল। মনে মনে আকশ-পাতাল রচনা করছি।
গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না। এত ভিড়, গায়ে গায়ে ঘষাঘষি, ইট-চুন ধুলোর গন্ধ। রাজমিস্ত্রীদের তৈরি বাড়ি, সব মিলিয়ে গ্রীষ্মের এই পচা গন্ধ পিটার্সবার্গবাসীদের সহ্য করতেই হয় প্রতি গ্রীষ্মে–গ্রীষ্ম-কুটিরে বাস করার মতো পয়সা যাদের নেই–তাদেরকেই সহ্য করতে হয়ই এসব।
সামান্য এই ভাড়ার চিন্তায় তরুণের স্নায়ুতে দারুণ চাপ পড়ে। এমনিতেই মনটা খারাপ হয়ে রয়েছে তার ওপর আবার এই অত্যাচার। অসহ্য!
শহরের এদিকটায় মাতালদের ভিড়ও বেশি। মদের দোকানও কম নয়। ছুটির দিন নয় আজ তা সত্তেও মত্ত মানুষদের ভিড় লেগেই আছে। এদের গায়ে গা লাগতেই আরও মুষড়ে যাচ্ছে মন–রাগ বাড়ছে।
এ সবকিছুই ঘৃণা করে তরুণটি। ঘৃণা চেপে রাখতেও পারছে না সে। মুখ বেঁকে গেছে তাই। মুখ মনের অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে পারে সহজেই; তাই সে গোপন করতে পারছে না মনের গভীর ঘৃণাবোধকে।
তরুণের চেহারাটা কিন্তু চমৎকার! রীতিমত সুদর্শন। বেশ লম্বা, দশজনের ভিড়ে দাঁড়ালে মাথা উঁচু হয়ে থাকে সবার ওপরে। ছিপছিপে শরীর অথচ সুগঠিত। দু চোখ গভীর কালো আর ভারি সুন্দর। মাথাভর্তি ঈষৎ কালচে অথচ সোনালি চুল মুখের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণ।
ঘৃণায় মুখ কুঁচকে গিয়েছিল ক্ষণেকের জন্যে। তারপরেই ফের বিভোর হয়ে গেল চিন্তায়। এমনই মশগুল হয়ে রইল গভীর ভাবনায় যে আশপাশে আর নজরই রইল না। নজর দেওয়ার প্রবৃত্তিও নেই। কথা বলে চলছে আপনমনে। নিজের কথা নিজেই শুনছে। বুঝতে পারছে, তালগোল পাকিয়ে রয়েছে মনের ভাবনাগুলো।
দুর্বলতার জন্যেও এমন হতে পারে। এই নিয়ে দুদিন হল, না খেয়ে আছে। জামাকাপড়ের অবস্থাও শোচনীয়। ভিখিরি ভবঘুরেও এমন গরিবহালে দিনের আলোয় পথে বেরোতে লজ্জা পাবে। শহরের এই অঞ্চলে অবশ্য কোনো কিছুই কাউকে অবাক করেনা বলেই রক্ষে। বাজে মেয়ে আর পাঁচ কাজের ব্যাপারীদের ভিড় এখানে এত বেশি যে কোনো কিছুই বিস্ময়কর লাগে না কারো চোখে।
তরুণের রুচিবোধ কিন্তু মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দেয়। জামাকাপড় নিয়ে খুঁতখুঁতুনি তার মধ্যেও আছে। এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়াটার ওপর মনটা তার এমনই বিষিয়ে গেছে যে, নিজের গায়ের ছেঁড়াফাটা জামাকাপড়ের দিকে খেয়াল নেই একেবারেই।
আসলে গোটা দুনিয়াটার ওপর বিদ্বেষে ভরে আছে ওর মনের ভেতরটা। বাইরের দুনিয়ার দিকে তাই ভ্রূক্ষেপ নেই। পুরনো বন্ধু-বান্ধদের সঙ্গে দেখা হলে অবশ্য আলাদা ব্যাপার হতো। কিন্তু যেচে কারো সঙ্গে দহরম-মহরম করতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।
ঠিক এই সময়ে একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি প্রায় এসে পড়ল ওর গায়ের ওপর। মাতাল একটা লোক রয়েছে গাড়ির ওপর। তরুণকে দেখেই আচমকা সে কি চিৎকার–এই ব্যাটা! জঘন্য এই জার্মান টুপিটা মাথায় পরে আছিস কেন?
বলেই হাত নেড়ে বিকট উল্লাস জানিয়ে নিমেষে উধাও হয়ে গেল পাগল লোকটা ঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়ে।
তখনই খেয়াল হল সুন্দর তরুণের, সত্যিই তো! মাথার টুপিটা জিমারমান জার্মান টুপি। তুবড়ে, থেঁতলে এর বেতিকিচ্ছিরি চেহারা হয়েছে। চারদিকে অজস্র ফুটোও আছে। মাথায় তেড়াবেকাভাবে আটকে রয়েছে–লোকে তো হাসবেই।
এ অবস্থায় লজ্জায় মিইয়ে যাওয়া উচিত। তরুণ কিন্তু লজ্জা পেল না। ভয় পেল। মনটাকে সাপের মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অবশ করে তুলল অদ্ভুত এক ভয়।
আবার শুরু হল মনেমনে বকুনি–কী আশ্চর্য! পাঁচজনের চোখে পড়ার মত বিকট এই টুপি পরে আছি কেন? এমন টুপি মাথায় দিতে হবে যা সবার চোখ এড়িয়ে যাবে। গায়ে যেহেতু ছেঁড়া কাঁথার মত জামাকাপড়–মাথার টুপিও হওয়া উচিত কুলি-কামিনের টুপির মতন। দামি জার্মান টুপি পরা খুব ভুল হয়েছে। ছোট্ট এই ভুল থেকেই গোটা প্ল্যানটা ভেস্তে যেতে পারে।
বেশিদূর আর যেতে হল না। বাড়িটার ফটক এখান থেকে আর মাত্র সাতশ তিরিশ পা দূরে। স্বপ্নে এটা সে গুনেছে কতবার।
একটা সময় গেছে যখন এসব স্বপ্নকে মোটেই পাত্তা দেয়নি তরুণ। কদাকার স্বপ্নগুলোকে মনের মধ্যে আনাগোনাও করতে দেয়নি। স্বপ্নের প্রলোভনেও পড়েনি আগে।
ঝাড়া একমাস এইসব লোভনীয় অথচ বীভৎস স্বপ্ন দেখবার পর মনের অবস্থা দাঁড়িয়েছে অন্যরকম। স্বপ্ন এখন ওকে লোভাতুর করে তুলেছে। মন না চাইলেও কুৎসিত স্বপ্নকে রূপ দিতে চলেছে। মনের মধ্যে ইচ্ছে আর অনিচ্ছের লড়াই চলছে বিরামহীনভাবে। বিড়বিড় করে বকেও যাচ্ছে সেই কারণে।
এখন সে চলেছে স্বপ্ন রূপায়ণ সম্ভব হবে কি করে, তা যাচাই করার সঙ্কল্প নিয়ে। এক এক পা এগোচ্ছে। একটু একটু করে মন উত্তেজিত হয়ে উঠছে এ জন্যেই।
প্রকাণ্ড একটা বাড়ির দিকে এগোচ্ছে তরুণ। এ বাড়িটা রয়েছে একটা খালের পাশেই। অন্য পাশে রয়েছে সাদোভাইয়া স্ট্রিট। বুকের মধ্যে যেন সাঁই সাঁই করে হাপর ওঠানামা করছে। শরীরের প্রত্যেকটা মায় সজাগ।
এ বাড়িতে ফ্ল্যাট অনেক। নানা ধরনের বাণিজ্য চলেছে ঘরে ঘরে। দরজি, মিস্ত্রী, রাঁধুনি, জার্মান ধান্দাবাজ, বাজে মেয়ে, কেরানি–আরও কত রকম মানুষ দখল করে রয়েছে এক-একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকবার মুখে উঠোন দুটোয় নানা ধরনের মানুষ আসা-যাওয়া করছে। জনা দুই দারোয়ানও নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে।
নিশ্চিন্ত হল তরুণ। কারোরই চোখ নেই তার মতো বিবর্ণ চেহারার মানুষের দিকে। টুক করে ফটক পেরিয়ে ডাইনে মোড় নিয়ে পা দিল সিঁড়িতে।
এ সিঁড়িটা বাড়ির পেছন দিককার সিঁড়ি। তাই বেশ অন্ধকার। রীতিমত সরু। অথচ কোথায় কি আছে, সবই সে জানে। নখদর্পণে বললেই চলে। এর আগেও এসেছে। সিঁড়ির আঁধার আর নির্জনতা মনটাকে খুশিতে ভরিয়ে তুলেছে। কোনো কৌতূহলী চোখ এই অন্ধকার ফুঁড়ে তাকে দেখতে পাবে না।
চারতলায় উঠেই আবার ভয় ঢুকল মনের মধ্যে। বিড়বিড় করতে লাগল আপনমনে–কাজটা যদি করেই ফেলি, তাহলে কি ঠিক হবে।
চারতলার পথ জুড়ে রয়েছে একটা ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র। এ ফ্ল্যাটে থাকত এক জার্মান কেরানি বউ-বাচ্চা নিয়ে। এখন নিশ্চয়ই ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিচ্ছে–তাই ফার্নিচার বের করছে।
তাহলে তো ভালই হল। চারতলার এই সিঁড়ি পেরিয়ে বুড়ির ফ্ল্যাট ছাড়া আর কোনো ফ্ল্যাট নেই। ভাল…ভাল…
এসে গেছে বুড়ির নিরালা ফ্ল্যাট। দরজার ঘন্টা বাজিয়ে দিল তরুণ। টুনটুন করে বাজছে ঘণ্টা যেন টিন দিয়ে তৈরি–পেতল দিয়ে তৈরি হলে আরও জোর আওয়াজ হতো।
অবশ্য বিশাল এই বাড়ির পায়রার খোপের মত ছোট ছোট ঘরগুলোয় ঘন্টা বাজে এই রকমই মিনমিনে আওয়াজে। ব্যাপারটা ভুলেই গেছিল তরুণ। উৎকণ্ঠায় মনের অবস্থা সত্যিই শোচনীয় হয়ে এসেছে। নইলে ঘন্টার ওই ক্ষীণ আর্তনাদ শুনে অমন শিউরে উঠবে কেন?
ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হল একটু পরেই। পাল্লা ফাঁক হচ্ছে। সামান্য ফাঁক হতেই ফ্ল্যাটের ভাড়াটে বিষম বিতৃষ্ণায় চেয়ে রইল তরুণের দিকে। বিতৃষ্ণা ছাড়াও পিটপিটে দুই চোখে রয়েছে রাজ্যের অবিশ্বাস।
শুধু চোখ দুটোই দেখতে পাচ্ছে তরুণ। ওটুকু ফাঁক দিয়ে সন্দেহ আর অবিশ্বাসভরা একজোড়া চোখ ছাড়া আর কিছু দেখাও যাচ্ছে না। অন্ধকারের মধ্যে ঝিকঝিক করছে শুধু দুটো চোখ।
চৌকাঠ পেরিয়ে সামনের ঘরে ঢুকে গেল তরুণ।
এ ঘরেও অন্ধকার বিরাজ করছে। ঘরের মাঝে একটা কাঠের পার্টিশন। পার্টিশনের ওদিকে ক্ষুদে রান্নাঘর। আর ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে আছে বুড়ি। মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু চাহনির মধ্যেই অনেক জিজ্ঞাসা জেগে রয়েছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তরুণের পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
বুড়ির বয়স প্রায় ষাট। ছোটখাট চেহারা। শুকনো রুটির টুকরোর মতই যেন শুকিয়ে গুটিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। চোখ দুটো কিন্তু বেশ ধারালো আর নোংরা!
টিকালো নাক। ছোট্ট মাথায় টুপি নেই। চুল সামান্য পেকেছে। তেল দিয়ে সেঁটে লাগানো মাথায়। ফ্লানেলের চাদর জড়ানো গলায়। গলাটা সরু আর লম্বা। মোরগের নখওলা থাবার মত উচিয়ে রয়েছে চাদরের ঘেরাটোপ থেকে।
গরমে আইঢাই অবস্থা হয় তরুণের। বুড়ি কিন্তু এই বিচ্ছিরি গরমেও একটা পশুলোমের জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে রেখেছে। কাশছে খখক করে।
এ হেন বিচিত্র মূর্তির দিকে নিশ্চয়ই অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে ধরেছিল তরুণ, নইলে বডির চোখে অবিশ্বাস ফের ঘনিয়ে উঠবে কেন?
তাই দেখেই তড়িঘড়ি বলে ওঠে তরুণ–আমি রাসকোল্নিকভ। ছাত্র। মাসখানেক আগে একবার এসেছিলাম।
এ অবস্থায় বিনয়ের অবতার হওয়া উচিত। তাই বাতাসে মাথা ঠুকে ছোই অভিবাদনও সেরে নেয় সে।
তীক্ষ্ণ গলায় তক্ষুণি জবাব দিল বুড়ি—মনে আছে।
তরুণের মুখের ওপর থেকে কিন্তু সরে গেল না বুড়ির সন্ধানী চোখ।
এত অবিশ্বাস! অস্বস্তি বোধ করে রাসকোল্নিকভ।
আমতা আমতা করে বলে এসেছি একই উদ্দেশ্যে–
একটু ভেবে নিয়ে পাশে সরে দাঁড়ায় বুড়ি –ভেতরে এসো।
যে ঘরে ঢুকল রাসকোল্নিকভ, সে ঘরে তত অন্ধকার নেই। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দেখা যাচ্ছে দেওয়ালে সাঁটা হলদে কাগজ, জানালায় হিজিবিজি জিরেনিয়ামের রঙিন ফুল আর রঙবেরঙের ছিটের পর্দা।
এই দেখেই বিদ্যুঝলকের মতো ভেবে নিল রাসকোল্নিকভ–সেদিনও ঠিক এইভাবে সূর্য ঝকঝক করবে ঘরের মধ্যে!
ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎবেগে চোখ বুলিয়ে নিলো ঘরের সবকিছুর ওপর। কিছুই বাদ দিল না–মনের ম্যাপে টুকে নিলো প্রতিটি জিনিস। এই তো সুযোগ। সবই দেখতে হবে। স্মৃতিতে গেঁথে রাখতে হবে। সময় এলে যেন ঠিক জিনিসটা ঝটপট সরিয়ে ফেলা যায়।
তবে হ্যাঁ, ঘরের মধ্যে সেরকম বিশেষ কিছুই নেই। ফার্নিচার সবই মান্ধাতার আমলের। হলদে কাঠ দিয়ে তৈরি। একটা প্রকাণ্ড পিঠ-উঁচু সোফা–সামনে বসানো একটা কাঠের খোদাইকরা গোল টেবিল। একটা সাজগোজ করার টেবিল। দুটো জানলার ফাঁকে রয়েছে একটা আয়না। দেয়ালের পাশে বসানো খান কয়েক চেয়ার। হলদে ফ্রেমে বাঁধানো কয়েকটা সস্তা ছবি–জার্মান মেয়েদের ছবি নিশ্চয়–পাখি ধরে রয়েছে হাতে।
ফার্নিচার বলতে তো এই। এক কোণে একটা মূর্তি–সামনে জ্বলছে একটা তেলের প্রদিপ।
প্রতিটি জিনিস কিন্তু ঝকঝকে তকতকে। মেঝে আর ফার্নিচার দুটোই নিশ্চয় পালিশ করা হয় রোজ–তাই এত চকচকে।
আপনমনেই ফের বিড়বিড় করে ওঠে রাসকোল্নিকভ–নচ্ছার বিধবা বুড়িদের ঘর এত পরিষ্কার হয়–এক কণা ধুলোও রাখেনি কোথাও।
বলতে বলতে হাত দিল দরজার ছিটের সুতি-পর্দায়। এ পর্দা ঝুলছে দুই ঘরের মাঝের দরজায়। এ ঘরে এখনো ঢোকেনি রাসকোল্নিকভ। ওদিকে রয়েছে বুড়ির শোবার খাট আর জিনিসপত্রের দেরাজ-আলমারি। ফ্ল্যাটে ঘর বলতে এই দুটোই–আর নেই।
ঘরের মধ্যে উঁকি দিতেই বুড়ি ধড়মড় করে এসে দাঁড়াল সামনে। পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।
বলে উঠল কড়া গলায়–-কি চাই।
পকেট হাতড়ে সেকেলে, চ্যাপটা, রুপোর ঘড়িটা বের করে রাসকোল্নিকভ। পেছনের ডালায় খোদাই করা রয়েছে একটা ভূগোলক। শেকলটা ইস্পাতের।
বললে—বন্ধক দিতে এসেছি।
গতবার যেটা বন্ধক রেখে গেলে, তার মেয়াদই ফুরিয়েছে। গতকাল চলে গেছে টাকা দেবার শেষ তারিখ।
একটু ধৈর্য ধরুন, ম্যাডাম। কথা দিচ্ছি, সুদ সমেত আসল ফিরিয়ে দেব।
সেটা তো বলব আমি। মেয়াদ পেরিয়ে গেছে, বন্ধকী বেচেও দিতে পারি এখনি।
ঘড়ির জন্যে কত দেবেন, অ্যালিওনা আইভানোভনা?
কোথাকার রদ্দি এক মর্চে-পড়া ঘড়ি! কারো কাজে লাগবে না। গতবার আংটিটার বদলে নিয়ে গেছিলে দু ফুল। যেটা কোনো গয়নার দোকানে দেড় রুবলেই কিনে নিতে পারতাম।
চার রুব্ল দিন। সব ফেরৎ নেব। এ ঘড়ি আমার বাবার। দিন কয়েকের মধ্যে হাতে বেশ কিছু টাকা আসবে।
দেড় রুলের এক পয়সাও বেশি দেব না–সুদ আগে দিতে হবে। নিতে হলে নাও, নইলে বিদেয় হও।
মাত্র দেড় রুব্ল!
সরে পড়ো, রাসকোল্নিকভের হাতে ঘড়ি গছিয়ে দিয়ে বললো বুড়ি। মাথায় রক্ত চড়ে গেলেও সামনে নিলো সে। ইচ্ছে হচ্ছিল এখুনি ছুটে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তাহলে তো যে মতলবে আসা, সেটাই হয় না।
রুক্ষ গলায় বললো–ঠিক আছে, দিন।
চাবির খোঁজে পকেটে হাত ঢোকায় বুড়ি। তারপর চলে যায় পর্দার ওদিকে পাশের ঘরে।
ঘরে এখন রাসকোল্নিকভ একা। কান খাড়া করে শুনছে পাশের ঘরের ক্ষীণতম আওয়াজও। মনের চোখে অনুসরণ করে চলেছে বুড়িকে। দেরাজ-আলমারি খোলার শব্দ ভেসে এল কানে। নিশ্চয় ওপরের ড্রয়ার, মনে মনে ভেবে নেয় রাসকোল্নিকভচাবির গোছা রাখে ডান-হাতি পকেটে…ইস্পাতের রিঙে রয়েছে সমস্ত চাবি…একটা চাবি অন্য চাবিদের চেয়ে তিন গুণ বড়…মাথায় খাঁজকাটা…দেরাজ-আলমারির চাবি নয় নিশ্চয়…আর একটা আলমারি অথবা সিন্দুক আছে বলে মনে হচ্ছে…অদ্ভুত…সব সিন্দুকেরই চাবি একই রকম…যাচ্ছেতাই কারবার…
ফিরে এল বুড়ি।
এই নাও। রুব্ল পিছু মাসে দশ কোপেক, দেড় রুব্ল থেকে প্রতি মাসের পনেরো কোপেক বাদ। একই হারে, আগের নেওয়া দু ফুল থেকে বাদ গেল বিশ কোপেক। মোট দাঁড়ালো পঁয়ত্রিশ। তাহলে তুমি পেলে এক রুব্ল পনেরো কোপেক–রদ্দিমার্কা এই ঘড়ির জন্যে।
মাত্র এক রুব্ল পনেরো কোপেক!
কড়ায় গণ্ডায়।
তর্কের মধ্যে গেল না তরুণ। বলার অনেক কিছুই ছিল–সেসব কথা জিভের ডগাতেও এসে গেছিল কিন্তু কিছুই না বলে হাত পেতে সামান্য অর্থ নিতে নিতে এদৃষ্টে চেয়ে রইল বুড়ির দিকে–তাড়াহুড়োর লক্ষণ দেখা গেল না হাভভাবে।
তারপর আস্তে আস্তে বললো–দিন দুয়েকের মধ্যে আরও একটা জিনিস আনব। বন্ধুর দেওয়া উপহার। রুপোর সিগারেট কেস।
চুপ মেরে গেল এটুকু বলেই। মাথার মধ্যে যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
যখন আনবে, তখন দেখা যাবে।
তাহলে চলি,বাইরের ঘরে বেরিয়ে যেতে যেতে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বললো সে–ভালো কথা, আপনার বোনকে তো দেখছি না! একলাই থাকেন নাকি?
তা নিয়ে তোমার দরকার কি?
কিসসু না…এমনিই জিজ্ঞেস করলাম…আপনি তো রয়েছেন…চলি, অ্যালিওনা আইভানোভনা!
তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল রাসকোল্নিকভ। উত্তেজনায় কাঁপছে সারা শরীর! একি হঠকারিতা করে বসল সে। পুরো একটা মাস ধরে মনকে এত শায়েস্তা করার পরেও নেমে পড়ল নোংরা এই কাজে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে কতবার থামল আর ঘোলাটে মাথায় কতবার যে নিজেকে ধিক্কার জানালো তরুণ, তা সে নিজেই জানে না।
রাস্তায় এসে বিহ্বলভাবে এদিক ওদিক চাইতেই চোখে পড়ল একটা মদের দোকান। কক্ষণো এসব জায়গায় সে ঢোকে না। কিন্তু আজ তার মনের অবস্থা এমনই যে আপনা থেকেই পা দুটো তাকে টেনে নিয়ে গেল সেটার ভেতরে।
একটু মদ পান করে মাথার মধ্যেকার দাপাদাপি যখন থেমে এসেছে, তখন এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো, জনা দুই মদ্যপ এককোণে বসে আছে বেহুশ অবস্থায়।
আর এককোণে বসে যে লোকটা, তাকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি বলেই মনে হচ্ছে।
লোকটা এত উত্তেজিত কেন?
রাসকোল্নিকভ সবাইকে এড়িয়ে চলছিল কিছুদিন ধরে–কিন্তু এই মুহূর্তে…মনের এরকম তোলপাড় অবস্থায়…ইচ্ছে হচ্ছিল মানুষের সঙ্গ পেতে। মদের দোকানের এই ধুলো আর বদ গন্ধও তাই ওর কাছে অসহ্য ঠেকেনি। বরং স্বস্তিবোধ করছিল অন্য লোক আশপাশে থাকায়। নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল না। ভয়-ভয় ভাবটাও চলে গেলো।
মদের দোকানের মালিক ওপর থেকে নেমে এসে বসল কাউন্টারে। ফাইফরমাশ খাটার ছোকরা কজনও বসে আছে। ওরা প্রত্যেকেই হাই তুলছে আর চেয়ে আছে কোণের উত্তেজিত লোকটার দিকে।
একেই রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারি বলে মনে হয়েছিল রাসকোল্নিকভের। জ্বলজ্বল করা অদ্ভুত চোখে লোকটা একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওর দিকেই। কোটের বোতাম ছেঁড়া। চোখমুখ ফুলো। হতশ্রী অবস্থা। একগাল খোঁচা খোঁচা দাড়ির জন্যে আরও বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে।
আচমকা কথা বলে উঠল লোকটা–দেখে তো মনে হচ্ছে বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। কি করা হয়?
অন্য সময়ে এইভাবে গায়ে পড়ে কেউ কথা বললে জবাব দিত না রাসকোল্নিকভ। কিন্তু এখন ও নিজেই চায় কথা বলতে।
তাই বললো–আমি ছাত্র।
তাই চেহারায় ধার আছে–নেই শুধু জামাকাপড়ে। তাতে কি হয়েছে! আমার জামাকাপড়ের ছিরি তো দেখতেই পাচ্ছেন। আমার নাম মারমেলাডভ।
এরপরেই শুরু হল মারমেলাডভের দীর্ঘ বক্তৃতা। লোকটার প্রথম বউ মারা যাবার পর যাকে বিয়ে করেছিল সে ভদ্রমহিলাও বিধবা। বিধবা হয়েছিল তিনটে বাচ্চা নিয়ে। মারমেলাডভের প্রথম পক্ষের আছে একটি মেয়ে। সোনিয়া তার নাম। বয়স ছিল চোদ্দ–দ্বিতীয় বিয়ের সময়ে। এখন একটু বড় হয়েছে। বাবার চাকরি যাওয়ার পর সন্মায়ের মুখঝামটা খেয়ে ও মেয়েটা রোজগার করতে শুরু করেছে। নিজে থাকে অন্য জায়গায়। রাতে এসে বাবা আর সত্যাকে টাকাপয়সা দিয়ে যায় সংসার চালানোর জন্যে। সেই টাকাই বাক্স থেকে চুরি করে এনে উড়িয়ে দিয়েছে মারমেডত। পাঁচ দিন বাড়ি ফেরেনি। এখন তো না ফিরলেই নয়।
বাড়ি বেশিদূরে নয়। রাসকোল্নিকভই তাকে নিয়ে গেল। চারতলা বাড়ির ওপরতলায় থাকে মারমেডভ। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠবার পর বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখা গেল ঘরের মধ্যেকার দীনহীন অবস্থা। তিনটে বাচ্চার একজন মেঝেতে বসে সোফায় মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছে। অন্য দুজন ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো জামা গায়ে দিয়ে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কালকে কি খাবে– তাই জানে না। উপোসি রয়েছে কদিন ধরেই। ঘরে অন্যমনস্ক হয়ে পায়চারি করছে বছর তিরিশেক বয়সের এক মহিলা।
মারমেলাডভের দ্বিতীয় বউ। ভীষণ রোগা। রোগযন্ত্রণায় সিঁটিয়ে রয়েছে। কাশছে। নিশ্চয় ক্ষয়রোগে ধরেছে।
এ ঘরের কোনো আবরু নেই। ঘরের মধ্যে দিয়েই যেতে হয় আর একটা ঘরে। সেখানে থাকে অন্য ভাড়াটে। তারা হাসছে, কথা বলছে, খেলছে।
মারমেলাডভকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠেছিল তার বউ। মারধরও শুরু করেছিল তক্ষুণি। দৌড়ে এসেছিল ওদিককার ঘরের লোকজন। তারা মজা দেখছিল।
রাসকোল্নিকভ নিঃশব্দে পকেট উজাড় করে খুচরো কোপেকগুলো জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে ফেলে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। একবারও ভাবল না নিজের কি হবে।
টাকাপয়সা নিয়ে সোনিয়া মেয়েটার ওপর আবার যেন চাপ না পড়ে–এই ভেবেই আনন্দ পেল রাসকোল্নিকভ।
অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল রাসকোল্নিকভের। শরীর এখনো ম্যাজম্যাজ করছে।
মেজাজ খিঁচড়ে যায় ঘরের চেহারা দেখে। এত ছোট ঘর যে তাকে খুপরি বলাই উচিত। দেওয়ালের হলদে কাগজ ছিঁড়ে ঝুলছে। সোজা হয়ে দাঁড়ালে মনে হয় ছাদে মাথা ঠুকে যাবে।
মাত্র তিনটা টলমলে চেয়ার আর একটা রঙ-করা টেবিল ছাড়া এ ঘরে রয়েছে একটা বদখত সোফা। পুরনো, ছেঁড়া এবং রাসকোল্নিকভ তাতে শোয়। ছেঁড়া জামা তাল পাকিয়ে মাথার বালিশ করে নেয়। লেপ নেই বলে ওভারকোট গায়ে দেয়। পোশাক পরেই ঘুমোয়।
রঙ-করা টেবিলটার ওপরে বই আর খাতায় পুরু ধুলো জমে আছে। হাত পড়েনি সেখানে অনেকদিন।
কদাকার সোফার সামনে আর একটা ছোট টেবিল। সেখানে ভাঙা চায়ের পাত্র রেখে দাঁড়ালো ন্যাসটাসিয়া-রাসকোল্নিকভের একমাত্র কাজের মেয়ে।
অনেকদিন মাইনে পায়নি ন্যাসটাসিয়া। ফলে ঘর ঝাট দেওয়া বন্ধ করেছে। হাঁটলেই ধুলোর মেঘ ওঠে মেঝে থেকে।
টাকার অভাবে হোটেল থেকেও খাবার আনা হয়নি গত পনেরো দিন।
তা সত্ত্বেও আজ চা এনেছে। কেন, তা ন্যাসটাসিয়াই জানে।
হাঁকাহাঁকি শুরু করে দেয় পাত্র নামিয়ে রেখেই–ওঠো, ওঠো, দশটা বাজল। চা-টা অন্তত খাও, উপোস করেই তো আছে।
মেজাজটা খিঁচড়ে যেতেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল রাসকোল্নিকভ। হাঁকডাক শুনে চোখ খুলে বললো–চা কোত্থেকে এল? বাড়িওলি পাঠালো নাকি?
বাড়িওলির বয়ে গেছে, খানিকটা হলদে চিনি চায়ের পাত্রের পাশে রাখতে রাখতে বললো ন্যাসটাসিয়া–আমার ঘরের চা।
পকেট হাতড়ে খানকয়েক কোপেক বের করে ন্যাসটাসিয়ার হাতে দিয়ে বললে রাসকোল্নিকভতাহলে একটা রুটি আর একটু মাংস এনে দাও।
রুটি না হয় এনে দিচ্ছি। কিন্তু এ সময়ে বাসি মাংস ছাড়া তো কিছু পাবে। তার চাইতে বরং আমার রান্নাঘরের বাঁধাকপির তরকারি খাও।
এল রুটি আর তরকারি। খাওয়া শুরু হল রাসকোল্নিকভের। সেই সঙ্গে ন্যাসটাসিয়ার কথা–বাড়িওলি পুলিশকে খবর দিয়েছেন।
কেন?
টাকা দেবে না, ঘরও ছাড়বে না–পুলিশ তাই এর বিহিত করবে।
আচ্ছা বোকা তো! দেখি বুঝিয়ে বলতে হবে বাড়িওলিকে।
বোকা তো সবাই–-আমিও। তোমার ঘটেই যদি এত বুদ্ধি তো রোজগার নেই কেন? আগে তো ছেলে পড়াতে–
এখন অন্য কাজ করছি।
কি কাজ?
ভাবছি।
ভাবলে টাকা রোজগার হবে।
কি মুশকিল! জুতো কোথায় যে পড়াতে যাব? তাছাড়া পড়াতে আমার ভালো লাগে না।
পেটের খাবারটা তো জুটছিল!
অত কম মাইনেতে পোষায় না।
তবে কি রাতারাতি টাকার কুমির হাতে চাও?
হ্যাঁ, চাই। অদ্ভুত চোখে তাকায় রাসকোল্নিকভ।
এটা একটা কথা হল? শুনলে ভয় হয়। যাকগে, কাল যখন বেরিয়েছিলে, একটা চিঠি এসেছিল তোমার নামে।
চিঠি! আমার নামে? কার চিঠি? কোত্থেকে?
অতশত জানি নে। পিয়নকে তিন কোপেক দিয়ে রেখে দিয়েছি চিঠিটা।
কই সে চিঠি!
নাসটাসিয়া চিঠিখানা নিয়ে এলো। লিখেছে রাসকোল্নিকভের মা। দূর মফস্বল থেকে।
এবার সে চঞ্চল হয়েছে মায়ের চিঠি পেয়ে।
সে ন্যাসটাসিয়াকে হাতে তিনটে কোপেক দিয়ে বলে, যাও, এবার সরে পড়ো!
ন্যাসটাসিয়ার ইচ্ছে ছিল চিঠির কথা শুনবার। তাড়া খেয়ে তাকে বিদেয় হতে হল ঘর থেকে।
খামের ওপর ছোট ছোট মেয়েলি হাতের লেখার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল রাসকোল্নিকভ।
মায়ের হাতের লেখা। যে মা তাকে লিখতে শিখিয়েছে, পড়তে শিখিয়েছে, মানুষ করেছে।
খামটায় আলতো একটা চুমু খেয়ে ছিঁড়ে ফেলে রাসকোল্নিকভ। বেশ বড় চিঠি। দু-খানা বড় বড় কাগজে ছোট ছোট অক্ষরে মা লিখেছে—
রোডিয়া,
দু-মাস আগে তোমার চিঠি পেয়েছি। তোমার টাকার দরকার। কিন্তু যে-টাকা আগে পাঠিয়েছিলাম, তা ধার করা টাকা। এতদিনে তা শোধ হল। আবার ধার করছি। দু-একদিনের মধ্যে পাঠাব।
চিঠির জবাব দিতে মন চায়নি হাতে টাকা ছিল না বলে।
আগে পাঠিয়েছিলাম পনেরো রুব্ল। এবার পাঠাব কুড়ি-পঁচিশ রুব্ল। যে জামিনে পনেরো রুব্ল ধার পেয়েছিলাম, সেই একই জামিনে এখন তার ডবল টাকা পাব। কারণ একটা ঘটনায় সমাজে আমাদের মর্যাদা বেড়েছে। এক সঙ্গে তোমার বোন দুনিয়ার ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
গোড়া থেকে বলি। গত বছর ষাট রুব্ল পাঠিয়েছিলাম মনে আছে? তুমি যখন টাকা চেয়ে পাঠালে, তখন আমাদের হাত খালি। ঠিক তখনি। দুনিয়া ছেলেমেয়ে পড়ানোর কাজ পেয়ে গেল সিদ্রিগয়লভ সাহেবের বাড়িতে। মাইনে ভালই।
আগাম পাওয়া গেছিল একশ রুব্ল। দিয়েছিলেন সিদ্রিগয়লভের স্ত্রী মার্কা পেত্রো। তাই থেকে তোমাকে পাঠাই ষাট রুব্ল–বাকি দিয়ে আমার দেনা শোধ করেছিলাম এখানকার।
বিপদটা এল তারপরেই। সিদ্রিগয়লভ লোকটার বয়স হয়েছে ঠিকই, কথাবার্তাও ভাল, কিন্তু স্বভাবচরিত্র তেমন সুবিধের নয়। দু দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল দুনিয়া কিন্তু চাকরি ছাড়তে পারল না। কারণ একশ রুব্ল যে আগাম নেওয়া রয়েছে।
ভরসা ছিল মাফা-র ওপর। কড়া মহিলা। বেশি খারাপ ব্যবহার নিশ্চয় বরদাস্ত করবেন না।
কিন্তু ঘটনাটা ঘটল ঠিক উল্টো। উনি দুনিয়াকেই ভুল বুঝলেন। সব দোষ নাকি দুনিয়ার। ওকে তাড়ালেন বাড়ি থেকে। শহরময় দুর্নাম ছড়াতে লাগলেন দুনিয়ার নামে। উনি বড়লোক; তাই উনার কথা সবারই বিশ্বাস হল। আমাদের মুখ দেখানো দায় হয়ে দাঁড়াল।
পুরো ব্যাপারটা কিন্তু ঘুরে গেল দুনিয়ার একটা চিঠির জোরে। চিঠিখানা লিখেছিল সিদ্রিগয়লভকে। তার খারাপ ব্যবহারের প্রতিবাদ করে। চিঠি পড়ল গিয়ে মার্কার হাতে। তিনি ভুল বুঝতে পেরে ভীষণ রেগে গেলেন স্বামীর ওপর। যা ভুল করেছেন, তা শোধরানোর জন্যে শহরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে এলেন–দুনিয়া নির্দোষ।
এত কথা লিখছি এই জন্যে যে, মার্কা দিন কয়েক আগে হঠাৎ মারা গেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের অবস্থাটা ঘুরিয়ে দিয়ে গেলেন। অনেকেই যেচে এল আমাদের বাড়িতে। এদের মধ্যে ছিলেন সুজিন নামে এক ভদ্রলোক। মার্কার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। নামী উকিল। বড়লোক। সরকারি চাকুরে।
শহরে আমাদের খাতির বেড়েছে এই লুজিনের জন্যে। আলাপ হওয়ার দু-দিন পরেই বিয়ে করতে চেয়েছেন দুনিয়াকে। কারণ, দুনিয়া সুন্দরী, শিক্ষিতা, গরিব। শেষের কারণটা একটা বড় কারণ লুজিনের কাছে। তার মতে, বড়লোকদের উচিত গরিব মেয়ে বিয়ে করা। তাতে ঘরে শান্তি থাকে। বউ স্বামীর বাধ্য থাকে।
কথাটা আমাদের খুব একটা ভাল না লাগলেও এ নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ওসব বড়লোকি খেয়াল। মোট কথা, দুনিয়াও পছন্দ করেছে লুজিনকে। লোক ভাল, হাতে টাকা আছে, সমাজে প্রতিপত্তি আছে। আত্মীয়তা গড়ে উঠলে আমাদেরই লাভ।
তুমি আইন পড়ছ শুনে লুজিন বলেছেন–ভালই হল। পিটার্সবার্গে আমি অফিস খুলছি। রোডিয়াকে আমার সেক্রেটারি করে নেব।
অর্থাৎ বিয়ের আগেই তোমার চাকরির কথা পাকা হয়ে গেল। পরে ওঁর অংশীদারও হয়ে যেতে পারো।
যাই হোক, তোমার টাকা পাঠাচ্ছি। ইতিমধ্যে লুজিন পিটার্সবার্গে চলে যাচ্ছেন। অফিস খুলবেন। থাকার ঘর নেবেন। আমাদের থাকবারও ব্যবস্থা করবেন। তারপর আমরা যাব। বিয়েটা হয়ে গেলেই আমি ফিরে আসব এখানে আর দুনিয়া যাবে ওর স্বামীর কাছে।
আমাদের বাক্সটা লুজিন সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা যাব পরে নিজেদের খরচে, থার্ড ক্লাসে। এমন কিছু খরচ হবে না।
দেখা হবে হপ্তাখানেকের মধ্যেই তোমার ঘরে।
ইতি
তোমার মা
পলচেরিয়া রাসকোল্নিকভ
চিঠি পড়েই মাথা ঘুরে গেল রাসকোল্নিকভের।
এ কী করতে চলেছে মা আর বোন! এ যে মহাকিপটের গোলামি করা। লুজিন! ব্যাটাকে চোখে না দেখলেও তার কদর্য মনের পরিচয় চিঠির মধ্যে পেয়ে গেছে রাসকোল্নিকভ!
শয়তান! শয়তান! বাক্সটা নিয়ে আসছে যেন কত দয়াই না করছে। কিন্তু যাকে বিয়ে করবে, সে তার মাকে নিয়ে আসবে নিজের খরচে। বাড়ি থেকে ষাট মাইল দূরের রেলস্টেশনে আসবে মালটানা ঘোড়ার গাড়ির চটে বসে-সাতশো মাইল পথ আসবে ট্রেনের থার্ড ক্লাসে!
খুপরি ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় রাসকোল্নিকভ। পাগলের মত ঘুরতে থাকে পথে পথে। মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে দুশ্চিন্তার ঘূর্ণিঝড়!
এ বিয়ে বন্ধ করতেই হবে। প্রবঞ্চক লুজিনকে দুনিয়া বিয়ে করতে চায় কেন সেটা সে বুঝতে পারছে। ভাইয়ের চাকরি হবে। মা সুখে থাকবে–
লুজিন দুনিয়াকে বিয়ে করতে চায় কেন? সে গরিব বলে? আর যখন তখন বায়না করবে না বলে?
ছি! ছি! ছি! এ বিয়ে হতে পারে না–কক্ষণো না।
কিন্তু রাসকোল্নিকভের মুরোদই বা কতটুকু? তিন হাজার রুব্ল নেই বলে কলেজে যেতে পারছে না, আইন পড়তে পারছে না। পেট চলছে কোনোমতে মায়ের ধার করা টাকায়।
ভাবতে ভাবতে কখন জানি রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে গেছিল রাসকোল্নিকভ। সম্বিৎ ফিরল আচমকা সপাং করে পিঠে চাবুক পড়ায়–কানে ভেসে এল খটাখট খটাখট ঘোড়ার খুরের আওয়াজ!
চমকে পাশে সরে গেল বটে রাসকোল্নিকভ। পাশ দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘোড়ার গাড়িটা। কিন্তু রাস্তার লোক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তার দিকে।
ভাবছে, পাগল না কি লোকটা। রাস্তার মাঝে ওইভাবে কেউ দাঁড়ায়? চাবুক খেয়েও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে।
কে যেন একটা বিশ কোপেক মুদ্রা গুঁজে দিয়ে যায় ওর হাতে। চোখ তুলে তাকায় রাসকোল্নিকভ এক প্রৌঢ়া দয়া করছেন তাকে। সঙ্গে ছোট্ট একটি মেয়ে।
প্রৌঢ়ার চোখে করুণা। কিন্তু রাসকোল্নিকভের হাসি পেলো। এত দুঃখেও ইচ্ছে হলো হো-হো করে হেসে ওঠে।
ভিখিরি ভাবা হয়েছে তাকে। তাই এই ভিক্ষে! অথচ সে বড় বংশের ছেলে। শিক্ষিত। আইন পাশ করলেই মোটা রোজগার বাধা।
তার দরকার মোটে তিন হাজার রুব্ল! যার অভাবে বই বেচতে হয়েছে, কলেজ ছাড়তে হয়েছে। মাত্র তিন হাজার রুব্ল! যা পেলে সে প্রতিভার চমক দেখিয়ে এদেশের চেহারা পালটে দেবব আর তাকেই কিনা হাত পেতে বিশ কোপে ভিক্ষে নিতে হল একজন স্ত্রীলোকের হাত থেকে।
ধিক! ধিক! ধিক। নেভা নদীর সেতুতে দাঁড়িয়েছিল রাসকোল্নিকভ। ছুঁড়ে মুদ্রাটা ফেলে দিল নদীর পানিতে।
মনের জ্বালা একটু কমল। হনহনিয়ে নেমে এল সেতু থেকে।
মাথার মধ্যে কিন্তু ঘুরপাক দিচ্ছে একটাই কথা। তিন হাজার রুব্ল! তিন হাজার রুব্ল! যা পেলে সে আবার পড়াশুনো আরম্ভ করতে পারবে। দারিদ্র্যের
অপমানকে কাটিয়ে উঠতে পারবে। কতজনের মঙ্গল করতে পারবে।
লুজিনের মত তো সে টাকার পিশাচ নয়। এই তো গতকালই একটা ঘড়ি বন্ধক দিয়েছিল অ্যালিওনাআইভানোভনাকে। পেয়েছিল মাত্র দেড় রুব্ল। তা থেকেই অতগুলো কোপে দান করেছে মার্মেলাডভ্ভকে।
ঘড়ি বন্ধক রেখে পাওয়া টাক