11/08/2026
‘তাহাফুতুল মালাহিদা’ সিরিজের চতুর্থ বই ‘ইসলাম ও বিবর্তনবাদ’। এটি সম্পূর্ণরূপে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকে কেন্দ্র করে রচিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ।
বইটিতে লেখক দুটি প্রধান উদ্দেশ্য সামনে রেখেছেন। প্রথমত, আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষাতেই বিবর্তনবাদের সীমাবদ্ধতা ও অসংগতিগুলো তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, যেসব মুসলিম চিন্তাবিদ বিবর্তনবাদকে সত্য মনে করে কুরআনের আয়াতের সাথে তার এক ধরনের জোরপূর্বক সমন্বয় খোঁজার চেষ্টা করছেন, তাঁদের তাত্ত্বিক দুর্বলতা স্পষ্ট করা এবং এ বিষয়ে ইসলামের সঠিক অবস্থান তুলে ধরা।
বইটির আলোচনাকে প্রধানত ৪টি অংশে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে:
১. পরিভাষাগত ভিত্তি ও ঐতিহাসিক পটভূমি
জটিল আলোচনার গভীরে প্রবেশের আগে শুরুতেই পদার্থ, মৌল, পরমাণু, অ্যামিনো অ্যাসিড, ডিএনএ, আরএনএ, ক্রোমোজোম, মিউটেশন ও প্রোটিনের মতো ১৯টি আবশ্যকীয় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এরপর অ্যানাক্সিম্যান্ডার ও এম্পেডোক্লেস থেকে শুরু করে ডারউইন-পূর্ব যুগের বিবর্তনীয় চিন্তা এবং আল-জাহিজ, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের মতো মুসলিম পণ্ডিতদের চিন্তাধারার একটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
২. ডারউইনীয় তত্ত্বের বিশদ বিশ্লেষণ
ল্যামার্কবাদের অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশগতি থেকে শুরু করে ডারউইনবাদ, ‘ইউনিভার্সাল কমন ডিসেন্ট’, প্রাকৃতিক নির্বাচন, মাইক্রো ও ম্যাক্রো-ইভোল্যুশনের সূক্ষ্ম পার্থক্য এবং নিও-ডারউইনবাদ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিবর্তনের পক্ষে বহুল প্রচলিত ৫টি প্রধান প্রমাণ (শারীরস্থান-ভ্রূণতত্ত্ব, আণবিক জীববিজ্ঞান, জীবভৌগোলিক বিদ্যা, জীবাশ্ম রেকর্ড এবং মাইক্রো-ইভোল্যুশনের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ) প্রথমে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এরপর সেগুলোর বৈজ্ঞানিক খণ্ডন উপস্থাপন করা হয়েছে।
৩. বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক খণ্ডন
এই অংশে জৈব রসায়ন, প্রোটিন গঠন, ব্যাকটেরিয়াল ফ্ল্যাজেলামের অখণ্ডনীয় জটিলতা (Irreducible Complexity), জেনেটিক্স, মনস্তত্ত্ব, কগনিটিভ সায়েন্স ও প্রত্নতত্ত্বের আলোকে প্রায় ৩০টি সুনির্দিষ্ট যুক্তিতে বিবর্তনবাদের অসংগতি দেখানো হয়েছে। মানব বিবর্তনের কথিত ধাপগুলো (অস্ট্রালোপিথেকাস থেকে হোমো সেপিয়েন্স) আলোচনার পাশাপাশি ‘লুসি’, নিয়ানডার্থাল ও ডেনিসোভান জীবাশ্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যকার তীব্র মতভেদ তুলে ধরা হয়েছে। সেই সাথে কার্বন-১৪ ডেটিং পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতার সীমানাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
৪. ইসলাম ও বিবর্তনবাদ: সমন্বয়ের প্রয়াস ও বাস্তবতা
শেষাংশে ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ও ডক্টর ইসরার আহমদের মতো চিন্তাবিদদের অবস্থান পর্যালোচনা করা হয়েছে, যাঁরা বিবর্তনবাদকে কুরআনিক বয়ানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করতেন। মাওলানা রুমির ‘মসনবি’ কিংবা আল-জাহিজের ‘কিতাবুল হাইওয়ান’-এর বহুল প্রচারিত উদ্ধৃতিগুলো যাচাই করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, এগুলো কোনো ডারউইনীয় বিবর্তনের বয়ান নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও রূপক আলোচনা। আল্লাহর ‘কুন’ (হও) নির্দেশের চার পর্যায় এবং সৃষ্টিতত্ত্ব বনাম ডারউইনবাদের ৫টি মৌলিক দার্শনিক বৈপরীত্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বইটি শেষ হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য:
শুরুতেই প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরিভাষার সংজ্ঞা দিয়ে নেওয়ায় সাইন্স বা বিজ্ঞানের ব্যাকগ্রাউন্ডের বাইরের পাঠকের জন্যও মূল আলোচনা অনুসরণ করা বেশ সহজ হবে। বিপক্ষের যুক্তিগুলোকে আগে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করে তারপর ধাপে ধাপে খণ্ডন করার পদ্ধতি বইটির বস্তুনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করেছে। লেখক নিজেই ‘কিতাবুল হাইওয়ান’-এর সাতটি খণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে, বিবর্তনবাদের পক্ষে আল-জাহিজের নামে প্রচারিত প্রচলিত উদ্ধৃতিটির আদতে কোনো অস্তিত্বই নেই। এই ধরনের প্রাথমিক উৎস (Primary Source) পরীক্ষা করার প্রচেষ্টা বইটির অ্যাকাডেমিক মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমনিভাবে Nature ও Science-এর মতো বিশ্বমানের পিয়ার-রিভিউড জার্নাল থেকে বহু তথ্যসূত্র উদ্ধৃত করেছেন। এর পাশাপাশি অনুবাদক নিজেও প্রাসঙ্গিক অনেক সম্পূরক তথ্য (যেমন: ডেনিসোভান সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য) যুক্ত করে বইটিকে আরও পূর্ণাঙ্গ করেছেন।
সবমিলিয়ে বলা যায়, বিবর্তনবাদ ও এর খণ্ডন নিয়ে বাংলা ভাষায় এমন সুবিন্যস্ত ও বিস্তৃত সংকলন বেশ বিরল। যারা বিবর্তনবাদ নিয়ে বাংলা ভাষায় ইসলামি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সুসংগঠিত, তথ্যসমৃদ্ধ ও পরিভাষাগতভাবে স্পষ্ট আলোচনা খুঁজছেন, তাদের জন্য এই বইটি হতে পারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সম্পদ। বিশেষ করে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বিজ্ঞানেরই একটি তত্ত্বকে বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে বইটি দারুণ এক সংযোজন।