06/08/2017
#বন্ধুত্ব
ও
#ভালবাসা
বন্ধু শব্দের মাঝে মিশে আছে নির্ভরতা আর বিশ্বাস। বন্ধু আর বন্ধন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বন্ধুত্ব মানেই যেন হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে, ভালোবাসা দিয়ে মন খুলে জমানো কথা বলা। বন্ধুর জন্য গেয়ে ওঠা- হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমার-আমার অন্যদিনের ভোরে।
বন্ধুত্ব এবং ভালবাসা এই দুটি শব্দের মধ্যে অনেক পার্থক্য । কিন্তু কেউ কেউ বন্ধুত্ব এবং ভালবাসা না বুঝে একটির ভিতরে অন্যটি ডুকিয়ে বসে থাকে। বন্ধুত্ব নির্ভর আন্তরিকতার উপর আর ভালবাসা নির্ভর করে আত্মবিশ্বাসের উপর। আপনি হয়তো কাউকে ভালবাসেন তার উপর আপনার কোন আত্ম বিশ্বাস নেই। তাকে আপনার বিশ্বাস হয় না সব সময় তার জন্য আপনার মনে একটি সন্দেহ থেকেই যায়। একজন আরেকজনকে যদি অবিশ্বাস করেন তাহলে মনে করবেন আপনাদের হৃদয়ে প্রকৃত ভালবাসার জন্ম হয়নি। আপনাদের দুজনের মন এক হয়নি। ভালবাসা মানে এককথায় জীবন সাথী আর বন্ধু মানে কাছের একজন মানুষ। যার সাথে সুখ দুঃখ এমন কি ভালবাসার মানুষের সাথে একটু মনমালিন্য হলে সে কথা গুলো বন্ধুর সাথে অনায়াসে শেয়ার করা যায়। যা অন্য কারো সাথে করা যায় না। মানুষের জীবনে এমনও কিছু ঘটনা ঘটে । এমন কিছু কথা আছে যা কাউকে বলা যায় না এমন কি জীবন সাথীকেও না কিন্তু বন্ধুর সাথে শেয়ার করা যায় ।
বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট্ করে সে তফাৎ ধরা যায় না। বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরতে বারণ নাই। গায়ে দিয়ে আরাম পাইলে হবে। কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেঁড়া থাকবে না, ময়লা হবে না, পরিপাটি হবে।
বন্ধুত্বকে কোনো পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। মাপার দরকারও নেই। কিন্তু ভালো বন্ধু খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। সবাই ভালো বন্ধু হতেও পারে না। বন্ধু যেহেতু আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তাই বন্ধু নির্বাচনে একটু সচেতন হতে হয়। বন্ধুত্বে হাত বাড়ানো অন্যায় নয়। তবে ভুল মানুষকে না বুঝেই বন্ধু বানিয়ে ফেলা ঠিক না। বন্ধু নির্বাচনের আগে কয়েকটি মানবিক গুণ তার মধ্যে খুঁজে নেওয়া উচিত। সৎ ও সত্যবাদী মানুষ ভালো বন্ধু হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম, বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ।’ বন্ধুকে অনেকে প্রেমের সঙ্গে অথবা ভালোবাসার সঙ্গে এক করে ফেলেন। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’
বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাছেঁড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালোবাসা তাহা সয় না। আমাদের ভালোবাসার পাত্র হীন প্রমোদে লিপ্ত হইলে আমাদের প্রাণে বাজে, কিন্তু বন্ধুর সম্বন্ধে তাহা খাটে না; এমন-কি, আমরা যখন বিলাসপ্রমোদে মত্ত হইয়াছি তখন আমরা চাই যে, আমাদের বন্ধুও তাহাতে যোগ দিক! প্রেমের পাত্র আমাদের সৌন্দর্যের আদর্শ হইয়া থাক্ এই আমাদের ইচ্ছা— আর, বন্ধু আমাদেরই মত দোষে গুণে জড়িত মর্ত্যের মানুষ হইয়া থাক্ এই আমাদের আবশ্যক।
বন্ধুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জর্জ হার্ভার্ট বলেছেন, ‘একজন বন্ধু হলো সর্বোৎকৃষ্ট আয়না।’ তার মানে, এই আয়নাতে প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে দেখবে। শুধু বাহ্যিক অবয়বকে নয়, ভেতরটাকেও। বন্ধুত্বটা হওয়া চাই হাত আর চোখের সম্পর্কের মতো। হাতে ব্যথা লাগলে চোখে জল আসে। আর চোখে যদি জল ঝরে, তবে হাত এগিয়ে যায় তা মুছে দিতে।
বন্ধু বয়স ও শ্রেণি মানে না। বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে, ভাইয়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে। সহপাঠী হোক, হোক সমবয়সী। কোনো তফাৎ সেই বন্ধুত্বের গভীরতায় যদি কোনো খাদ না থাকে। জীবনে প্রথম বন্ধু গড়ে ওঠার স্মৃতি থাকে অমলিন। সময়ের প্রয়োজনে কোনো বন্ধু দূরে সরে যেতে পারে কিন্তু মনের দূরত্ব কখনই তৈরি হয় না। বন্ধুর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। স্কুল শুরুর দিনে যে ছেলেটি বা মেয়েটি আপনারা পাশে বসেছিল তাকে কী ভোলা যায় সহজে?
যাদের বন্ধু নেই তারা বিষর্ণতায় ভোগে, একাকিত্ব তাকে গ্রাস করে নেয়। এই জীবন থেকে পালিয়ে ফিরতে অনেকেই নানান পথ খোঁজে। কিন্তু যে পথটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এটা শুধু জানে আপনার কাছের বন্ধুটিই। তাকেই বলেই দেখুন একবার আপনার বিষর্ণতার কথা, একাকিত্বের কথা। বন্ধুটিই আপনাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যাবে খোলা মাঠে। সবুজ ঘাস সেখানে। ছন্দহীন জীবনে ছন্দ, নিরানন্দ জীবনে আনন্দের জোয়ার যোগ করতে বন্ধুর জুড়ি নেই।
বাস্তবিক অর্থে, একেক বন্ধু আমাদের মধ্যে একেকটা দুনিয়ার প্রতিফলন ঘটায়। বন্ধু এমন একজন মানুষ যার কাছে মনের কথা খুলে বলা যায় অবলীলায়। এ কারণে বাবা-মা তার সন্তানের কাছে ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। এটি খুবই জরুরি। অভিভাবক যখন বন্ধু হয়ে ওঠে তখন মানসিক বিপর্যয় ঘটলে অভিভাবক যেন সবার আগে এগিয়ে আসতে পারেন।
অনেকে বলে থাকেন বন্ধুত্ব ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে ভালোবাসায় উপনীত হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা নেমে অবশেষে বন্ধুত্বে এসে ঠেকতে পারে না। একবার যাকে ভালোবেসেছি, হয় তাহকে ভালোবাসবো নয় ভালোবাসবো না; কিন্তু একবার যার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে, ক্রমে তার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হতে আটক নেই। অর্থাৎ বন্ধুত্বের উঠবার নামবার স্থান আছে। কারণ, সে সমস্ত স্থান আটক করা থাকে না। কিন্তু ভালোবাসার উন্নতি অবনতির স্থান নেই। যখন সে থাকে তখন সে সমস্ত স্থান জুড়ে থাকে, নয় সে থাকে না। যখন সে দেখে তার অধিকার হ্রাস হয়ে আসছে তখন সে বন্ধুত্বের ক্ষুদ্র স্থানটুকু অধিকার করে থাকতে চায় না। যে রাজা ছিল সে ফকির হতে রাজি আছে, কিন্তু করদ জায়গীরদার হয়ে থাকবে কিরূপে? হয় রাজত্ব নয় ফকিরী, ইহার মধ্যে তার দাঁড়াবার স্থান নাই।
অনেকে বন্ধুত্ব আর ভালবাসাকে এক দৃষ্টিতে দেখে। মানে দুইটাকে একমনে করে। কেউ বন্ধুত্ব এক সময় ভিন্ন লিঙ্গ হলে প্রেম পর্যায়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ তারা এক সময় একেঅপরের প্রতি দূর্বল হয়ে যায় এবং বন্ধুত্বের সর্ম্পকে প্রেম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এটা ঠিক নয়। এতে বন্ধুত্বকে অপমান করা হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ককে যদিও আপনি ভালবাসার সম্পর্কে পরিনত করেন তাহলে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হবে। সর্ম্পকটা বেশীদিন টিকে থাকবে না। তাই পরিশেষে বলতে চাই বন্ধুর সম্মান বন্ধুত্ব দিয়ে আর ভালবাসার সম্মান ভালবাসা দিয়ে রক্ষা করতে হবে। বন্ধুত্ব এবং ভালবাসাকে কখনো এক দৃষ্টিতে দেখবেন না।
# #কাল্পনিক_লেখক,,