06/05/2025
শিশু, মোবাইল আর আমাদের দায়িত্ব
মোবাইল, স্ক্রীন, রীলস—এই শব্দগুলো এখন আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত। আর এই মোবাইলের স্ক্রীনে যে শিশু আজকাল দেখছে, সে তার চোখের সামনে ‘রীলস’-এর পর রীলস দেখে যাচ্ছে, একটানা, থামানো যাচ্ছে না। কোনো শালীনতা নেই, অশালীনতারও ভেদাভেদ নেই, মাত্র একের পর এক ভিডিও, একের পর এক দৃশ্য, সেই শিশু সব কিছু শুষে নিচ্ছে। এর মধ্যে কি মনোযোগের কোন জায়গা আছে? কল্পনা করুন, এক সময় শিশুরা গুটি গুটি পায়ে ১০-১৫ মিনিটের কার্টুন দেখতো, একে একে বিশ মিনিট ধরে, আর এখন? এখন এক মিনিটের রীলস, পর পর তার সাথে অন্য আরেকটি...পরপর, যেন থামতেই চায় না।
শিশুটি বসে থাকে নিরুদ্দেশ, আর কোনো শব্দ নেই। হাঁটছে না, চেঁচাচ্ছে না, কিছুই করছে না। ধীরগতিতে ভেসে যাওয়া এক অভ্যাসের মতো যেন চুপচাপ বসে থাকে, তার চারপাশে সব কিছু শূন্য হয়ে যায়। একে মনে হতে পারে যেন এটা এক সুষ্ঠু ব্যবস্থা, সুবিধাজনক—ভালোই তো! কিন্তু এর মাঝে যে আসলে অমূল্য একটি ভুল ঘটছে, সেটা কি আমরা কেউ বুঝতে পারি?
একটু গভীরে ভাবুন। সেই শিশুটির মনে কী ঢুকছে? তার নিষ্পাপ, কোমল, অপরিণত মন—যেটা এখনো তৈরি হয়নি, যেটা সহজেই রূপান্তরিত হতে পারে, সেটার ভিতর কি আসলেই কিছু ভালো প্রবৃত্তি ঢুকছে? তার অভ্যন্তরে কি কিছু সুস্থ চিন্তা ঢুকছে? না কি একের পর এক ভাঙা চিন্তা, যা তার মনোযোগ এবং রুচি বিকৃত করে ফেলছে?
এটা কি শুধুই একটি বাচ্চার মন খারাপ বা অলস বসে থাকা? নাকি আরও কিছু গভীর অর্থ রয়েছে এই পরিস্থিতির? পুরনো দিনের চেয়ে এখনকার শিশুরা ‘ফ্রি’ সময় কাটানোর যেসব পদ্ধতি দেখছে, সেগুলোর ভেতর থেকে তারা কতটা সুফল পাবে?
এখন, যখন আপনার শিশুটি মোবাইল হাতে নিয়ে সেই রীলসগুলো দেখে চলেছে, তখন আপনি নিশ্চয়ই ব্যস্ত আছেন। কিন্তু সে যখন নিজের মনোভাব তৈরি করছে, তখন আপনি কিভাবে এর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন? আপনার শিশুটির হাতে মোবাইলটি রেখে যে আপনি তাকে একটু শান্ত রাখতে পারছেন, তার মানে এই নয় যে আপনি তার মানসিক স্বাস্থ্য ও বিকাশকে অবহেলা করতে পারেন। কিভাবে? আমাদের জীবনের অভ্যাস, আমাদের আচরণ, আমাদের চিন্তা—এই সব কিছুই তাকে প্রভাবিত করবে। তাকে শুধু নরমাল ব্যস্ততার মধ্যে ব্যস্ত না রেখে, তার জন্য কিছু সৃজনশীল, মানসিকভাবে সুস্থ ও শৃঙ্খলিত কাজের উপকরণ দিতে হবে।
তাহলে আপনি কি করবেন? একটু ভাবুন, একটু সময় নিয়ে ভাবুন। একে একে কিছু উপায় নিয়ে কাজ করুন। আপনার শিশুটির হাত থেকে মোবাইলটি নিতে হবে, তারপর তাকে কিছু বই দিন—হ্যাঁ, আপনি ভাবতে পারেন, এখন সে বই পড়তে পারবে না। সে নষ্ট করবে। বই নষ্ট হবে! কিন্তু আপনি যখন বলবেন “এটা পড়ো”, তখনই একটি নতুন পথ খুলে যাবে, একটি নতুন সূচনা শুরু হবে।
এখন বলুন, যদি আপনি কিছু বই না দেন, তবে তাকে তো সাদা কাগজ আর রং পেন্সিল দিন। তাকে ক্রিয়েটিভ কিছু করতে দিন। সেগুলো তার মনের বিকাশে সাহায্য করবে। ঘর নোংরা হবে, কিছু তো ছিঁড়বে বা ছড়িয়ে পড়বে—তাতে কি হবে? আসলে, মনের ভিতর যে নোংরা ঢুকছে—সেই তুলনায় তো কোন কষ্টই না। তাকে কিছু করতে দিন, সে যদি কিছু নিজে থেকে রঙ করে, কাটাকুটি করে, নিজের মতো করে কোনো কিছু তৈরি করে, সেই অনুভুতি তার মাথা ও মনকে আলাদা ভাবে খুলে দিবে।
আর যদি এই কিছুও না হয়, তাহলে তাকে ব্লকস দিন, কাঠ বা প্লাস্টিকের। মডেলিং ক্লে দিন। তাও যদি না পারেন, তাহলে পুরনো খেলনাগুলোর দিকে তাকান। পুতুল, গাড়ি, বাটি—যে কিছু তাকে আরামদায়ক মনে হয়। তার মনের ভিতর গড়ে উঠুক কিছু নিজস্ব ভাবনা, নিজস্ব সৃষ্টির আনন্দ—তার নিজের হাতে, মাথায়, মন দিয়ে।
এখনকার মতো আপনার শিশুর মনকে শুদ্ধ এবং উন্নত রাখার জন্য যা যা করার, তার কিছু অন্তত আমরা করতে পারি। কিন্তু যখন আমরা শিশুর হাতে মোবাইল দিয়ে শুধুমাত্র সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে তাকে একা ফেলে দিচ্ছি, তখন সে কোন দিকে যাচ্ছে? তার মনের মধ্যে সৃজনশীলতা কি আসবে? নাকি সে শুধু অন্যের তৈরি, অন্যের শিখানো অস্থিরতা শিখবে?
অন্যরা, যারা সমাজে বসে শিশুদের জন্য নানা সৃজনশীল উপকরণ তৈরি করছে, তারা তো জানেই না, আমাদের দেশের শিশুরা কীভাবে একটি মুঠো ফোনের স্ক্রীনের ভিতর আটকে যাচ্ছে। যারা জানে, তাদের কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেবার চেষ্টা করলে না?
আপনার পরিবারের খুদে সদস্যটির জন্য এমন কিছু খুঁজে বের করুন, যাতে তার হাতে মোবাইল না থাকে। একে একে তাকে নতুন কিছু শেখান। আপনি চাইলে, কিছুই করতে পারবেন না যদি আপনি শিশুর হাতে মোবাইলটি রেখে তাকে এই ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখান।
এটা তো ঠিক—আজকাল সবাই জানে, সময়ের সাথে সাথে কিছু কিছু অভ্যাস বদলাবে, কিন্তু মনে রাখবেন—যে অভ্যাসগুলো শিশুর জীবনে প্রবাহিত হবে, তা একদিন তাকে জীবনের পথে বড় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিন, আপনার শিশুর জন্য কিভাবে একটি ভালো ভবিষ্যত গড়ে তুলবেন।