24/04/2026
বই রিভিউ : রাগ নিয়ন্ত্রণ
লেখক : আশরাফ আলি থানভি রহ
‘রাগ’ মানুষের সৃষ্টিগত চারিত্রিক উপাদান। রাগ নাই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিভিন্ন কারণে রাগ আসে। রাগের ভালো-মন্দ নির্ভর করে এর প্রয়োগের ওপর। যদি রাগ আপনার দ্বীন, সম্মান ও সম্পদ রক্ষার্থে হয়, সেটা প্রশংসনীয়। আর যদি অপরাধী হয়ে অনিয়ন্ত্রিত রাগ করে থাকেন, সেটা অবশ্যই দোষের হবে। রাগ আপনার ঈমান, স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। জিহবা ও মনের ওপর লাগাম পরাতে পারলে রাগ নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সহজ হয়ে যায়। আর বাকি কাজ হলো সিলেবাস অনুসারে চলা।
“যার মাঝে অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত রাগ থাকে, সে হলো বদরাগী। আর যিনি রাগের সময়ও রাগতে জানে না, সে হলো কাপুরষ। বদরাগী এবং কাপুরষ আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নয়।”
বাস্তবিক জীবনে আমার হুটহাট রাগ আসে। কখনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, আবার কখনও পারি না। এই বোধ থেকে ‘রাগ নিয়ন্ত্রণের’ ভাবনা মনে আসে। এই বইটার অনুবাদ ভালো হয়েছে জানতে পেরে দ্রুত কিনে ফেলি। কাল পড়া শেষে আজ পাঠ পর্যালোচনা লিখতে বসলাম।
বইটার ১ম অংশে ৭৮ পৃষ্ঠা জুড়ে লেখক রাগের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন কারণ বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে আছে, রাগ কেন আসে, রাগের ক্ষতিকর প্রভাব, রাগ নিয়ন্ত্রণের শরীয়াহ মোতাবেক বিভিন্ন চিকিৎসা, উম্মাহর মহান খালেস বান্দারা কীভাবে রাগের সময় ধৈর্য ধরেছেন সেই ঘটনাগুলো অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজে আসবে বলে বিশ্বাস করি।
৭৯-১১৯ পৃষ্ঠা জুড়ে সংকলক লেখকের আলোচনা প্রাসঙ্গিক কিছু বিশ্লেষণ যুক্ত করেছেন। যা মূল আলোচনাকে আরো বোধগম্য এবং প্রাণবন্ত করেছে।
বইটা পড়ে রাগের ব্যাপারে অনেককিছু জানার সুযোগ হলো। আগে সাদা চোখে মনে হতো যেকোনো রাগ-ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিন্দনীয়। কিন্তু এই বইতে লেখক প্রশংসনীয় রাগের উল্লেখ করেছেন। কখন রাগ দেখানো আবশ্যক আর কখন অতিরিক্ত রাগ দেখানো দোষের হবে, সেসব খোলাসা করে বলেছেন। সত্যানুসন্ধানী পাঠক বইয়ের আলোচনা বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করতে পারলে অবশ্যই সফলকাম হবে।
লেখকের পরামর্শ অনুসারে চললে রাগকে সহজে বশে আনা যাবে।
রাগ নিয়ন্ত্রণের কিছু কৌশল জানতে পারা ছিল সবচেয়ে বড় লাভ। এগুলোর মধ্যে আছে দাঁড়ানো অবস্থায় রাগ আসলে বসে পড়া। রাগের স্থান ত্যাগ করা, রাগের কারণ না ভেবে কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা, পানি দিয়ে ওজু করা ইত্যাদি। এছাড়া অধিকাংশ নারী কেন রাগ প্রকাশ না করে তা মনের মধ্যে পুষে রাখে, কেন পুরুষের রাগ কম বুঝতে পারে ইত্যাদি মনোজগতের খুঁটিনাটি বিষয় জানা হয়েছে।
রাগ নিয়ে এমন বাস্তবধর্মী বই এর আগে পড়া হয়নি। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলাপ হাইলাইটার দিয়ে দাগিয়ে পড়েছি। আশরাফ আলি থানভী রহ. এর বই পড়লে সহজে বোঝা যায়, কেন তাকে এই উম্মতের চিকিৎসক বলা হয়। কয়েকজন মনোচিকিৎসক আপনাকে কেবল রাগ কমানোর একাডেমিক আলোচনা জানিয়ে আলোচনার সমাপ্তি টানবে। কিন্তু আশরাফ আলি থানভী রহ. আপনার রাগ আধ্যাত্মিক আলোচনার মাধ্যমে গোড়া থেকে নির্মূল করবে। তার প্রতিটি আলাপ আপনাকে ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাওয়াতে বাধ্য করবে। এই বই আরো দশবছর আগে পড়লে এতদিনে রাগ তলানিতে পৌঁছাতো। আমার এই কথাই লেখকের লেখার স্বার্থকথা।
বইটার কাগজের মান খুব দুর্বল পেয়েছি। চুন থেকে পান খসলে পৃষ্ঠা ছিড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। একে তো দুর্বল কাগজ, তার ওপর কাগজ শুকানোর আগে ছাপার কাজ করে ফেলেছে! বই জুড়ে অসংখ্য টাইপ জনিত বানান ভুল পেয়েছি। শারঈ সম্পাদক ছাড়া ইসলামিক বই প্রকাশ বড়সড় অন্যায়। যেখানে হাদিসের নাম থাকলে নাম্বারের উল্লেখ নাই, সেখানে হাদিসের সনদ খোঁজা বোকামি।
ডায়েরি বাইন্ডিং প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। বই হাত নিলে সুখ অনুভব হয়। আলোচনা প্রাসঙ্গিক টীকা সংযোজন বইটার গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে বাড়িয়েছে। অনুবাদের মান খুব ভালো হয়েছে। প্রতিটি শব্দ, বাক্য বুঝতে কোনোপ্রকার বেগ পেতে হয়নি। সাবলীল, ঝরঝরে অনুবাদ খুব আরাম করে পড়া হয়েছে। লেখকের লেখার হাত কঠিন হিসেবে প্রাণবন্ত অনুবাদের জন্য অনুবাদকের কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি।
আলোচনার ইতি টানছি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা ও তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় প্রশান্তকারী দুটো কথার মাধ্যমে...
“যারা রাগ দমন করে ও মানুষকে ক্ষমা করে, তাদেরকে আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন। (সূরা ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
“প্রকৃত বীর সে নয়, যে কুস্ততিতে জিতে যায়; প্রকৃত বীর তিনি, যিনি রাগ দমন করতে জানেন।”
.....................................................
অনুবাদক : ওয়ালী উল্লাহ নোমানী
সংকলক : মুহাম্মদ জায়েদ মাজাহেরি নদবি
প্রকাশনায় : আকীল পাবলিকেশন
Review From : Muhammad Ashraful