01/07/2026
❝ শঙ্করাচার্য এবং তাঁর গুরু গৌড়পাদের মায়াবাদের ওপর বৌদ্ধ প্রভাব❞
আচার্য শঙ্করের গুরু গোবিন্দপাদ। তাঁর গুরু গৌড়পাদ। অর্থাৎ গৌড়পাদ ছিলেন আচার্য শঙ্করের পরমগুরু। আচার্য শঙ্কর তাঁর মাণ্ডুক্যকারিকা ভাষ্যের উপসংহারে ২য় শ্লোকের শেষ চরণে গৌড়পাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, "যস্তং পূজ্যাভিপূজ্যং পরমগুরুমমুং পাদপাতৈর্নতোহস্মি" (১৯১১ খ্রিস্টাব্দ, পুণা আনন্দ আশ্রম)। আচার্য শঙ্করের মতের মূল বিষয়গুলি গৌড়পাদের কারিকায় পাওয়া যায়।
১) গৌড়পাদের "মাণ্ডুক্য কারিকা"-য় বৌদ্ধ উপাদান:
গৌড়পাদের বিখ্যাত গ্রন্থ মাণ্ডুক্য কারিকা। এটিতে চারটি প্রকরণে ২১৫টি কারিকা আছে। চারটি অধ্যায়ের নাম: আগম, বৈতথ্য, অদ্বৈত এবং অলাতশান্তি। গবেষকরা প্রথম প্রকরণটিকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। কারণ এটিই মাণ্ডুক্য উপনিষদের গৌড়পাদকৃত টীকা। দ্বিতীয় প্রকরণটিতে দ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে ন্যায় শাস্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে দ্বৈতবাদ খণ্ডনের চেষ্টা করা হয়েছে। গৌড়পাদ চতুর্থ প্রকরণে অজাতিবাদ, উচ্ছেদবাদ বা সর্বশূন্যতাবাদ প্রভৃতি মতের উল্লেখ করেছেন, সেগুলি বৌদ্ধমত থেকে গৃহীত। তাঁর এই কারিকার ভাষা ও ভাবের সাথে বৌদ্ধ মাধ্যমিক গ্রন্থের সাদৃশ্য আছে। শুধু তাই নয়, জ্ঞানী ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্য গৌড়পাদ এখানে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটি "বুদ্ধ"; যেমন: "বুদ্ধৈঃ প্রকীর্তিতম্" (৪।৮৮), "বুদ্ধৈরজাতিঃ পরিদীপিতা" (৪।১৮)। যদিও "নৈতৎ বুদ্ধেন ভাষিতম্" (৪।৯৯) এ তিনি "তাঁর মত বুদ্ধের মত নয়" অর্থাৎ, বুদ্ধের মত তাঁর মতের থেকে পৃথক বলতে চেয়েছেন। মহাযান বৌদ্ধমতে সঙ্ঘের সমস্ত সদস্যই বোধিসত্ত্ব বা বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হতে পারেন; অনুরূপভাবে অদ্বৈত বেদান্তমতেও সবাই ব্রহ্ম হতে পারেন। গৌড়পাদ নিজেকে বেদান্তের অনুসারী বলে দাবি করেন। নিজের দার্শনিক notion গুলিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি শ্রুতিবাক্য উদ্ধার করেছেন। চেয়েছেন শ্রুতির সমর্থনে নিজের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে; যেমনটা করে থাকেন শ্রুত্যনুসারী বৈদান্তিক মাত্রেই। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের বিরোধী শ্রুতিসমূহের মুখোমুখি হলে তিনি বলেছেন, কেবল "যুক্তিযুক্ত" বাক্যসমূহই গ্রহণ করতে হবে (৩।২৩)। পাশাপাশি সমগ্র গ্রন্থে তিনি বহুবারই নিজের স্বতন্ত্র ধারণার অবতারণা করেছেন। বিভিন্ন শ্রুতির মধ্যে আপাতঃ প্রতীয়মান বিরোধের সমাধানকল্পে গৌড়পাদ ৩।১৪ তে একটি text কে গৌণার্থে ব্যাখ্যার সময় বলেছেন, এটির মুখ্যার্থ যুক্তিসঙ্গত নয়: "গৌণং তান্ন মুখ্যত্বং হি যুজ্যতে"। অদ্বৈতবাদীগণের মধ্যে উপনিষদ-মন্ত্রসমূহের গৌণার্থ করার যে প্রবণতা দেখা যায়, গৌড়পাদ তাঁদের পথিকৃৎ।
১.১) গৌড়পাদের "মায়া" ও বৌদ্ধমতের "মায়া":
গৌড়পাদ বলেন: অদ্বৈতই পরম সত্য। যথা: "অদ্বৈতং পরমার্থতঃ" (১।১৭), "অদ্বৈতং পরমার্থো হি" (৩।১৮), "অদ্বৈতে যোজয়েৎ স্মৃতিং" (২।৩৬)। ২।৩১ কারিকায় তিনি বলেন, "বেদান্ত মতে জগৎ স্বপ্নবৎ, মায়া, গন্ধর্বনগরের মত অলীক।" ১।১৭ তে বলেন, "ভেদ অবাস্তব ও ভ্রমমাত্র।"
২।৫ এ তিনি বলেন, স্বপ্ন ও জাগ্রত দুটিই এক। ২।৬ ও ৪।৩১-এ তিনি বলেছেন, জগৎ মৃগতৃষ্ণিকার মত অলীক। "স্পন্দতে মায়য়া মনঃ" (৩।২৯), "চিত্তং চলতি মায়য়া" (৪।৬১) প্রভৃতি বহুস্থানে তিনি বলেছেন, বহির্জগৎ আসলে মনেরই চাঞ্চল্যের কারণে প্রতীত হয়। চতুর্থ অধ্যায়ের ৪৭-৫২ কারিকায় তিনি বলেন, অলাতচক্র যখন ঘূর্ণমান থাকে, তখনই তার অস্তিত্ব থাকে; স্থির হয়ে গেলে অলাতচক্র আর থাকে না। অনুরূপভাবে যখন "বিজ্ঞান" অস্থির থাকে তখন তা দ্রষ্টা ও দৃষ্ট এই দ্বৈতভাবে প্রতীয়মান হয়। "বিজ্ঞান" স্থির হয়ে গেলে এই দ্বৈতভাব আর থাকে না। লক্ষ্য করার বিষয়, ৪৭-৫২ কারিকায় "মন" শব্দের পরিবর্তে গৌড়পাদ কর্তৃক "বিজ্ঞান" শব্দের ব্যবহার। ৬৩-৬৬ কারিকায় বলেছেন, দ্রষ্টার মন ছাড়া স্বপ্নে দৃষ্ট পশুর অস্তিত্ব নেই, তেমনি জাগ্রত অবস্থায় দৃষ্ট পশুরও দ্রষ্টার মন ছাড়া অস্তিত্ব নেই। এটি স্পষ্ট "বিজ্ঞানবাদ"। বৌদ্ধমতেও জগৎ মনের বিকার। গৌড়পাদের মতে এই বিকার বা ভ্রমের কারণ "মায়া" (৩।২৯, ৪।৬১); লঙ্কাবতার সূত্র ১০।১৫০ অনুসারে ভ্রমের কারণ "বাসনা"। গৌড়পাদের মায়া ও লঙ্কাবতার সূত্রের বাসনা উভয়েই অনাদি, উভয়েই এক। বৌদ্ধমতে "বাসনা"-ই "অতিজাগতিক শক্তি" [উৎস: The Conception of Buddhist Nirvana: Leningrad, 1927, pg 209]।
১.২) গৌড়পাদের "ব্রহ্ম" ও বৌদ্ধমতের "শূন্য":
গৌড়পাদ বলেন, মন যখন সম্পূর্ণরূপে নিরুদ্ধ হবে, চাঞ্চল্য বর্জিত হবে এবং কোন বিষয় গ্রহণ করবে না, তখন সেটি ব্রহ্ম হবে (৩।৪৬)। অর্থাৎ, এখানে গৌড়পাদ বললেন, "চিত্ত"-ই ব্রহ্ম। চিত্তবৃত্তি নিরোধের ফলে অনিদ্র (১।১৬, ৩।৩১, ৪।৮১), অস্বপ্ন (১।১৬, ৩।৩১, ৪।৮১), অনাভাস (৩।৪৬: নিরাভাস, নিরাকার, অরূপক)। চিত্তের আরেকটি উপাধি হল "সনির্বাণ" (৩।৩৭)। ইহাই জ্ঞান কিন্তু অকল্পক বা নির্বিকল্প (৩।৩৩), অসঙ্গ (৪।৭২, ৭৯, ৯৯)। এই কারণে জ্ঞান জ্ঞেয়ের থেকে ভিন্ন নয়- স্বয়ং ব্রহ্ম। এই অবস্থায় মন নিজেই নিজেতে অবস্থান করে: স্বস্থ (৩।৪৭), আত্মস্থ (৩।৩৪)।
বৌদ্ধমতেও মনের নিরোধ বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা বা বিজ্ঞানমাত্রতা অর্থাৎ মন কর্তৃক বিষয় সংগ্রহের সমাপ্তি। (মহাযান সূত্রালঙ্কার ১১।৪৭, বসুবন্ধু রচিত "ত্রিস্বভাব-নির্দেশ", ৩৬)। বৌদ্ধমতে এটি মুক্তি। কারণ মহাযান সূত্রালঙ্কার ১১।৪৭ বলছেন: "তদাখ্যানম্ মুক্তিঃ পরম উপালম্ভস্য বিগমহঃ"।
৩।৩০ কারিকায় গৌড়পাদ ব্রহ্মকে নিত্য বলেছেন, তবে "ব্রহ্ম" এবং "বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা" চিত্ত কি একই পদবাচ্য হন? কারণ যোগাচার বৌদ্ধমতে জ্ঞান নিত্য নয়; ক্ষণিক। বৌদ্ধমতে জ্ঞানকে নিত্য না বলা হলেও "ধ্রুব" বলা হয়েছে।
"সংযুত নিকায়" (পৃষ্ঠা ২৪), "বিশুদ্ধিমগ্গ" (চতুর্থ অধ্যায়) -এর মত প্রামাণিক বৌদ্ধগ্রন্থে "নির্বাণ" অর্থ বোঝাতে নিম্নলিখিত শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়েছে: ধ্রুব, অমৃত, অচ্যুত, অজর্জর প্রভৃতি।
"ধ্রুব" ও "নিত্য" শব্দদ্বয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য একটি উদাহরণ দ্বারা পরিস্কার হবে। ধরা যাক, "সোনা"। একে গলিয়ে বিভিন্ন গয়না প্রস্তুত করা হল। তাতে উপাদান হিসাবে সোনা রয়ে গেল। কিন্তু সোনা আর নিত্য রইল না; ধ্রুব রয়ে গেল। একইভাবে গৌড়পাদের ব্রহ্ম আর বৌদ্ধের বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা অত্যন্ত একার্থক। গৌড়পাদের ব্রহ্ম থেকে "নিত্যত্ব" টুকু বাদ দিলেই তা বৌদ্ধদের শূন্যে পরিণত হয়।
১.৩) গৌড়পাদের "অজাতি-বাদ" এবং নাগার্জুনের "অজাতি":
৩।৪৮ ও ৪।৭১ কারিকায় গৌড়পাদ বলেছেন, সর্বোচ্চ সত্য হল কিছুই সৃষ্টি হয় না। এটিকে অজাতিবাদ বলা হয়। ৩।১৯-৩২ তে তিনি অজাতি-বাদ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, শ্রুতিতে যে সৃষ্টির কথা রয়েছে, তা মায়িক। যা কিছু ইতোমধ্যেই সৃষ্ট, তা পুনরায় সৃষ্ট হতে পারে না। এটি বন্ধ্যার পুত্রের মত অলীক। দ্বিতীয় প্রকরণে গৌড়পাদ তাঁর "অজাতিবাদ"-কে বিভিন্ন শাস্ত্রপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর প্রদর্শিত বহু যুক্তিই বৌদ্ধদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। চতুর্থ প্রকরণে গৌড়পাদ বেদান্ত থেকে কোন কথাই বলেননি। দ্বিতীয় প্রকরণে তিনি যে অজাতিবাদ স্থাপন করেছেন, তারই যাথার্থ্য স্থাপন করেছেন এই প্রকরণে। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, বৌদ্ধদের সাথে এই প্রসঙ্গে তিনি একমত (৪।৫)। শুধু তাই নয়, তাঁর অনুসারী এবং সাধারণ পাঠককেও তিনি এই প্রসঙ্গে বৌদ্ধদের সাথে একমত হতে বলেছেন। আচার্য শঙ্কর ৪।২৭ এর টীকায় এটি সুনিশ্চিত করেছেন। এরপর গৌড়পাদ বৌদ্ধদের বিভিন্ন প্রামাণিক গ্রন্থ থেকে নানা আলোচনা করেছেন।
১.৪) গৌড়পাদ তাঁর কারিকায় বুদ্ধকে বন্দনা করেছেন:
কারিকার চতুর্থ প্রকরণের প্রথম দুটি শ্লোকে গৌড়পাদ মঙ্গলাচরণ করেছেন। প্রথম শ্লোকটি হল:
"জ্ঞানেনাকাশকল্পেন ধর্মান্ যে গগনোপমান্।
জ্ঞেয়াভিন্নেন সংবুদ্ধস্তং বন্দে দ্বিপদাং বরম্।।।"
-জ্ঞেয়তত্ত্ব হতে অভিন্ন জ্ঞানের মাধ্যমে যিনি জগতের প্রতিটি পদার্থের আকাশকল্প ধর্ম সম্পর্কে অবহিত, এবং যিনি নিজেও গগনোপম, সেই বরণীয় দ্বিপদকে আমি বন্দনা করি। (৪।১)
এই শ্লোকের "দ্বিপদ" কথাটি আমরা পাই ঋগ্বেদ ১০।১৬৫।১ মন্ত্রে: "শং নো অস্তু দ্বিপদে শং চতুষ্পদে"। "দ্বিপদ" কথার সাধারণ অর্থ হল "দুটি পা" যা "মানুষ"-কে বোঝায়। সংস্কৃত "দ্বিপদং বর" পালি ভাষায় দ্বিপদোত্তম প্রভৃতিও সমার্থক। মহাভারত বনপর্ব ৫১।৪৫ এ "দ্বিপদং বর" কথাটি পাওয়া যায়: "নৈষধো দ্বিপদং বরঃ" এবং আদিপর্ব ২২০।৩৬ এ "সমীপে দ্বিপদং বর"। সংস্কৃত বা পালি ভাষায় রচিত সমস্ত বৌদ্ধগ্রন্থেই "দ্বিপদোত্তম/ নরোত্তম/ পুরুষোত্তম" বলতে বুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু গৌড়পাদ কৃত "দ্বিপদং বর" পদের অর্থ আচার্য শংকর বলেছেন, "পুরুষোত্তম" অর্থাৎ "নারায়ণ"। হিন্দুগ্রন্থের কোথাও "নারায়ণ"-কে দ্বিপদ বলা হয়নি। কেবল মহাভারত শান্তিপর্ব, ৩৪৩ এ "দ্বিপদাং বরিষ্ঠ" বলতে নারায়ণ ঋষিকে বোঝানো হয়েছে। এখন, গৌড়পাদ "দ্বিপদ বর" বলতে কাকে বুঝিয়েছেন? নারায়ণকে, নারায়ণ ঋষিকে না বুদ্ধকে? তাঁর কারিকা অনুধাবন করলেই এটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
গৌড়পাদ বলেছেন, জ্ঞান আকাশকল্প এবং জ্ঞেয় হতে অভিন্ন এবং ধর্ম গগনোপম। জ্ঞানের একটি লক্ষণ হল জ্ঞান অসঙ্গ (কারিকার ৪।৭২ এবং ৪।৯৬ তে: "অসঙ্গম্ তেন কীৰ্ত্তিতম্")। বৌদ্ধগ্রন্থ লঙ্কাবতার সূত্র (পৃ: ১৫৭) তে বলা হয়েছে: "অসঙ্গলক্ষণম্ জ্ঞানম্।" আরেকটি বৌদ্ধগ্রন্থ "বোধিচর্যাবতার পঞ্জিকা" (পৃ: ৩৫৯) এ বলা হয়েছে: "নিষ্প্রপঞ্চত্বাদ্ আকাশবৎ অসঙ্গম্ অনাস্পদম্ অশেষং"।
জ্ঞান ও জ্ঞেয় অভিন্ন এটি বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদীদের মত। কারণ বহির্জগৎ তাঁদের কাছে অসত্য। দিঙনাগ তাঁর "আলম্বন পরীক্ষা", ৬ তে বলেছেন, "যদান্তর্জ্ঞেয় রূপং তৎ বহির্বৎ অবভাসতে"। এটি আচার্য শংকর তাঁর ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্য ২।২।২৮ এ উদ্ধৃত করেছেন। সুতরাং বৌদ্ধমতে বহির্জগৎ মিথ্যা। লঙ্কাবতার সূত্র, পৃ: ২৮৫ অনুসারে "বাহ্যো ন বিদ্যতে"। বহির্জগৎ আসলে বাসনারই রূপান্তর: "বিজ্ঞানপরিণাম" (বসুবন্ধুর ত্রিংশিকা)। সুতরাং, বৌদ্ধমতেও জ্ঞান অসঙ্গ ও আকাশকল্প, যা গৌড়পাদের মতের সাথে সদৃশ।
"বোধিচর্যাবতার পঞ্জিকা" গ্রন্থে ৫০৪-৫০৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, পরমার্থতঃ সমস্ত কিছুই নিঃস্বভাব ও শূন্য। বন্ধ্যাপুত্রবৎ। তাই তা গগনোপম। শান্তিদেব তাঁর "বোধিচর্যাবতার" ৯।১৫৫ তে বলেছেন, "সর্বং আকাশসঙ্কাশং পরিগৃহ্যন্তি মদ্বিধাঃ"- আমার মত যাঁরা, তাঁরা সবাই এই মত গ্রহণ করবেন যে, সব কিছুই আকাশবৎ। কেন আকাশবৎ? প্রজ্ঞাকরমতি বলেন, "সমারোপিততত্ত্বশূন্যত্বাৎ" - কারণ এটি ধারণামাত্র এবং শূন্য। "অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা" পৃ:২৯৭ তেও একথা বলা হয়েছে। গৌড়পাদ তাঁর কারিকা ৪।৯৬ এ বলেছেন, জ্ঞান অসঙ্গ, তাই আকাশকল্প। কারণ আকাশ অসঙ্গ। লঙ্কাবতার সূত্র ১০।১৭২ এও বলা হয়েছে, আকাশ উৎপত্তিশূন্য তাই অসঙ্গ। আচার্য শংকর এখানে ব্যাখ্যা করেননি, কেন জ্ঞান আকাশকল্প ও ধর্ম গগনোপম। তিনি এখানে কেবল বলেছেন, জ্ঞান জ্ঞেয় হতে অভিন্ন কারণ, জ্ঞেয় অর্থে আত্মা এবং জ্ঞান আত্মা হতে ভিন্ন নয়।
এই কারিকায় ন্যূনাধিক বাইশ বার ব্যবহৃত "ধর্ম" শব্দের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যে অর্থে গৌড়পাদ এটিকে ব্যবহার করেছেন, সেই একই অর্থে এটি সংস্কৃত ও পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ কোন বস্তুর প্রতীতি। আচার্য শংকর "ধর্ম" বলতে বলেছেন, "আত্মা"। কিন্তু সেটি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারিকার কোন স্থলে "ধর্ম" কথাটি "আত্মা" অর্থে প্রযুক্ত হয়নি; এখানেও "ধর্ম" বলতে বস্তুকেই বোঝানো হয়েছে। সমস্ত বৌদ্ধগ্রন্থে "ধর্ম" কথাটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শংকরাচার্য কোন স্থলে ধর্ম কথাটির আত্মা অর্থ করলেও অন্য অনেক স্থলে তিনি কোন ব্যাখ্যা করেননি। কারণ সেই সব স্থলে আত্মা অর্থ করলে তা সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে। যেমন: "সর্বে ধর্মা মৃষা স্বপ্নে" (৪।৩৩) এ আচার্য শঙ্কর অনুযায়ী অর্থ করলে হয়: সমস্ত আত্মাই স্বপ্নবৎ। যদিও ৪।৮২ তে তিনি "ধর্ম" শব্দের প্রকৃত অর্থ করেছেন: "বস্তু"। শংকরাচার্যের অর্থ ধরলে দাঁড়ায় নারায়ণ উপলব্ধি করেছেন, "আত্মা গগনোপম"। কিন্তু এটি কোন শাস্ত্রেই পাওয়া যায় না এবং এই অর্থ বিভ্রান্তিজনক ও অসমঞ্জস। প্রসঙ্গতঃ আচার্য শংকর তাঁর কারিকা ভাষ্যে বহুবার এই প্রয়াস করেছেন, যাতে কারিকার বৌদ্ধ উপাদানকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সুতরাং এই বিস্তৃত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, গৌড়পাদ "দ্বিপদ বর" শ্লোকে বুদ্ধকেই বন্দনা করেছেন।
#সিদ্ধান্ত:
সামগ্রিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, গৌড়পাদের মাণ্ডুক্য কারিকায় বর্ণিত অজাতিবাদ, মায়া ও ব্রহ্মের ধারণাগুলো মূলত বৌদ্ধ শূন্যবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারাই গভীরভাবে প্রভাবিত। গৌড়পাদের দর্শনে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ দর্শনের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। আচার্য শঙ্কর একই সিদ্ধান্তকে বেদান্তের আবরণে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
( চলবে.....)
লেখক —
শ্রীযুত অরিন্দম সরকার
Book Trust