Hayagriva Book Trust

Hayagriva Book Trust Gaudiya Vaishnava Bengali Books Publisher. 'Hayagriva Book Trust'- a project of Svadharmam Education, Research and Publication.

"শ্রী সম্প্রদায়েও একজন প্রভুপাদ চাই"— বসন শ্রীরঙ্গচারী (শ্রী সম্প্রদায়)
24/07/2026

"শ্রী সম্প্রদায়েও একজন প্রভুপাদ চাই"
— বসন শ্রীরঙ্গচারী (শ্রী সম্প্রদায়)

ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব উত্তরোত্তর জয়যুক্ত হোক! রমা শংভু ব্রহ্মামরপতি গণেশার্চিত পদোজগন্নাথঃ স্বামী ...
15/07/2026

ভগবান শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব উত্তরোত্তর জয়যুক্ত হোক!

রমা শংভু ব্রহ্মামরপতি গণেশার্চিত পদো
জগন্নাথঃ স্বামী নযনপথগামী ভবতু মে ॥
(শ্রীশঙ্করাচার্য্যকৃত জগন্নাথাষ্টকম, শ্লোক-১)

— লক্ষ্মী, শিব, ব্রহ্মা, অমরাপতি ইন্দ্র ও গণেশ যাঁর পাদযুগল অর্চনায় সদা নিরত থাকেন, সেই প্রভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হোন।

শুভ রথযাত্রা!

প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধং (পর্ব —৪)❝আচার্য শঙ্করের লেখনীতে বৌদ্ধ উপাদান❞আচার্য শঙ্কর তাঁর পূর্বগুরু গৌড়পাদের সিদ্ধান্তগুলিকেই ব...
04/07/2026

প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধং (পর্ব —৪)
❝আচার্য শঙ্করের লেখনীতে বৌদ্ধ উপাদান❞

আচার্য শঙ্কর তাঁর পূর্বগুরু গৌড়পাদের সিদ্ধান্তগুলিকেই বিস্তৃত করেছেন, কিন্তু তাঁর বিচার প্রণালী গ্রহণ করেননি। শঙ্কর উপনিষদের বাক্যসমূহ দ্বারাই নিজমত খ্যাপন করেছেন। কিন্তু ভিন্ন প্রচারপ্রণালী অবলম্বন করে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার অর্থ তাঁরা উভয়েই একমতাবলম্বী। বরং আচার্য শঙ্করের প্রয়াসে বৌদ্ধমতকে প্রচ্ছন্ন করার প্রবণতাই দৃষ্ট হয়। একারণেই শ্রীমন্মহাপ্রভু বলেছিলেন: বেদাশ্রয়ী নাস্তিক্যবাদ বৌদ্ধ কে অধিক"। আচার্য শঙ্করের ব্যবহারিক ও পারমার্থিক বাদটি বৌদ্ধমতের সম্বৃতি ও পারমার্থিক-এর অনুকরণ। নাগার্জুনের "নেতি" বাদই অদ্বৈতবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে।

​১) আচার্য শঙ্করের "মায়া" ও বৌদ্ধমতে "মায়া"
​"লঙ্কাবতার সূত্র" বৌদ্ধদের একটি অতি প্রাচীন প্রামাণিক গ্রন্থ। সায়নমাধব "সর্বদর্শনসংগ্রহ" গ্রন্থে বৌদ্ধমত বর্ণনায় "লঙ্কাবতার সূত্র"-এর প্রমাণ উদ্ধার করেছেন। এই গ্রন্থে মায়া সম্বন্ধে বলা হয়েছে:

​"মায়া চ মহামতে বৈচিত্র্যাৎ ন অন্যা ন অনন্যা। যদি অন্যা স্যাৎ বৈচিত্র্যং মায়াহেতুকং ন স্যাৎ। অথ অনন্যা স্যাদ্ বৈচিত্র্যান্মায়াবৈচিত্রয়্যোঃ ন স্যাৎ স চ দৃষ্টো বিভাগঃ তস্মান্ন অন্যা ন অনন্যা।"

​বঙ্গানুবাদ: হে মহামতে, বৈচিত্র্যহেতু মায়া ভিন্নাও নন; অভিন্নাও নন। যদি ভিন্না হতেন, তবে মায়াহেতুক বৈচিত্র্য থাকত না; যদি অভিন্না হতেন তবে বৈচিত্র্যহেতুক মায়াবৈচিত্র্য থাকত না। সেই বিভাগ দৃষ্ট হয়েছে। অতএব তিনি ভিন্নাও নন; অভিন্নাও নন।

​আচার্য শঙ্কর তাঁর "বিবেকচূড়ামণি" গ্রন্থের ১১১ শ্লোকে 'মায়া' সম্বন্ধে এই বৌদ্ধমতেরই প্রতিধ্বনি করেছেন। তিনি বলেছেন:
সন্নাপ্যসন্নাপ্যুভয়াত্মিকা নো ভিন্নাপ্যভিন্নাপ্যুভয়াত্মিকা নো।
সাঙ্গাপ্যনঙ্গা হ্যভয়াত্মিকা নো মহাস্তুতানির্বচনীয়া।।"

​অনুবাদ: সেই মায়া সৎ বা অসৎ এই উভয়ের অন্তর্ভুক্তা নন; ভিন্ন বা অভিন্ন এই উভয়ের অন্তর্ভুক্তা নন; সঙ্গ বা অসঙ্গ এই উভয়ের স্বরূপ নন; তিনি অত্যন্ত অদ্ভুত; অনির্বচনীয়রূপা।

​২) আচার্য শঙ্করের "জগৎ" ও বৌদ্ধমতে "জগৎ"
​বৌদ্ধমতে পরিদৃশ্যমান জগৎ স্বরূপতঃ মিথ্যা। ধৰ্ম্মপদ ২৭৯ শ্লোকে বলা হয়েছে:
​"সব্বে ধম্মা অনত্তাত যদা পঞ্ঞায় পস্সতি।
অথ নিব্বিন্দতী দুক্খে এস মাগ্গো বিসুদ্ধিয়া।।"
​অনুবাদ: দৃশ্য বস্তুসকল মিথ্যা। যিনি ইহা জানেন এবং দর্শন করেন, তিনি দুঃখে বিচলিত হন না। ইহাই বিশুদ্ধি লাভের উপায়।
​ধৰ্ম্মপদ ১৭০ শ্লোকে বলা হয়েছে:

​"যথা বুব্বুলকং পস্সে যথা পস্স ে মরীচিকং"
অর্থ: এই জগৎকে বুদবুদ বা মৃগতৃষ্ণিকার ন্যায় দর্শন কর।

​মাধ্যমিক ও যোগাচার সম্প্রদায়ভুক্ত বৌদ্ধগণ "মহাযান" পন্থী এবং সৌত্রান্তিক ও বৈভাষিক "হীনযান" মতাবলম্বী। এঁদের মধ্যে মাধ্যমিক বৌদ্ধগণ 'অসৎখ্যাতি' মতবাদ সমর্থন করেন। 'অসৎখ্যাতি' মতে জগতের বাহ্য ও অন্তর সমস্ত পদার্থই মিথ্যা। সেই অসৎই শূন্যের ন্যায় প্রতিভাত হয়। এই অসতের খ্যাতি বা প্রতীতি বলেই একে 'অসৎখ্যাতি' মতবাদ বলে। মায়াবাদের মধ্যে যে জগন্মিথ্যাত্ববাদ ও জগতের প্রাতিভাসিক সত্যত্ব বিচার দেখা হয়, তা মাধ্যমিক বৌদ্ধের 'অসৎখ্যাতি' মতেরই প্রতিধ্বনি।

​যোগাচার বৌদ্ধগণ 'আত্মখ্যাতি' মতবাদী। তাতে বুদ্ধিরূপ বিজ্ঞানই আত্মা। এছাড়াও আত্মা বলে কোন পদার্থ নেই। বিজ্ঞানই বাইরে বিষয়রূপে প্রতীয়মান হয়। মায়াবাদ এই মতেরই প্রতিধ্বনি।

​আচার্য শঙ্কর তাঁর "বিবেকচূড়ামণি" গ্রন্থের ৩৩৮ শ্লোকে বলেছেন:
​"ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্যন্তা মৃষামাত্রা উপাধয়ঃ"
(ব্রহ্মা হতে তৃণাগুচ্ছ পর্যন্ত যাবতীয় উপাধি মিথ্যামাত্র।)
​বিবেকচূড়ামণিরই ৩৮৯ শ্লোকে:
"যত্র ভ্রান্ত্যা কল্পিতং যদ্বিবে্তকে তস্মাদিভিন্নম্।
ভ্রান্তের্নাশে ভাতি দৃষ্টাহিতত্ত্বং রজ্জুস্তদ্বদ্বিশ্বমাত্মস্বরূপম্।।"

অর্থ: ভ্রমবশতঃ যে পদার্থে যা কল্পিত হয়; জ্ঞানের উদয়ে সে দ্রব্য তৎস্বরূপ হতে পৃথক হয় না; যেমন, ভ্রান্তদৃষ্টিতে রজ্জু সর্পবৎ প্রতীয়মান হলেও ভ্রম অপগত হলে রজ্জুর স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়ে; তেমনি ভ্রান্তি থাকায় জগৎ বলে একটি ব্যাপার দৃষ্ট হলেও ভ্রম অপগমে ব্রহ্মস্বরূপ অনুভূত হয়।
​অপরোক্ষানুভূতি, ৫ম শ্লোকে আচার্য শঙ্কর বলছেন:

"নিত্যমাত্মস্বরূপম্ হি দৃশ্যং তদ্বিপরীতগম্।
এবং যো নিশ্চয়ঃ সম্যক্ বিবেকো বস্তুনঃ স বৈ।।"
​অর্থ: আত্মা নিত্য; দৃশ্য অর্থাৎ জগৎ মিথ্যা। এরূপ যে নিশ্চয় তাকে উত্তম বিবেক বলে।

৩) বৌদ্ধমতে শূন্য ও আচার্য শঙ্করের নির্বিশেষ ব্রহ্ম
​নাগার্জুনের শূন্য আর আচার্য শঙ্করের ব্রহ্ম- এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী তা দেখা যাক। 'শূন্য' মানে 'কিছুই নয়'। আর নির্বিশেষ ব্রহ্ম মানে 'কিছু'। এই 'কিছু' কী? অস্তিত্ব বা সত্ত্বা মাত্র।

​ছান্দোগ্য শ্রুতির ৬।২।১ মন্ত্রের "সৎ" শব্দের ব্যাখ্যায় আচার্য শঙ্কর লিখেছেন, কেবল সত্ত্বা বা অস্তিত্ব মাত্র। সত্ত্বাবিশিষ্ট বস্তু নয়। শ্রুতি কিন্তু "সৎ" বলেছেন; সত্ত্বা বলেননি। যাঁর সত্ত্বা আছে, তিনিই সৎ। সত্ত্বা হল সৎ এর ভাব। সৎ ব্যতীত সত্ত্বার উপস্থিতি কীভাবে হয়? সে ব্যতীত সত্ত্বা অকল্পনীয়। তবুও শঙ্কর বলেছেন, "কেবল সৎ" ("সদেব")। সৎ স্বীকার করলে বিশেষত্ব এসে পড়ে, তাই তাঁর এই অর্থকল্পনা। শঙ্কর সৎকে স্বীকার না করে সত্ত্বামাত্রকে স্বীকার করায় তাঁর "নির্বিশেষ ব্রহ্ম" ও শূন্যে পর্যবসিত হয়েছে। অস্তিত্বমাত্র ব্রহ্ম নাগার্জুনের শূন্যবাদেরই প্রতিধ্বনিমূলক বাকচাতুর্যমাত্র।

#উসংহার
"মায়া" যাঁদের "মতবাদ" তাঁদেরকেই "মায়াবাদী" বলা হয়। অদ্বৈতবাদ অনুযায়ী "ভেদ" মায়া; পরমার্থতঃ সবই "অভেদ"। আর কোন বৈদান্তিক মতেই "ভেদ"-কে মায়া বলা হয় না; তথা "জগৎ"-কে স্বপ্নবৎ বা মিথ্যা বলা হয় না। এটিই অদ্বৈতবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

​বৈষ্ণব বেদান্ত এবং অদ্বৈতবাদের মধ্যে অন্যতম একটি পার্থক্য হল, বৈষ্ণব বেদান্ত জগৎকে "নশ্বর" বা "অনিত্য" বললেও "মিথ্যা" বা "স্বপ্নবৎ" বলেন না। "ভেদ" ও তাঁর মতে "ভ্রম" নয়। বৈষ্ণব বেদান্ত বলেন, জীব ও ব্রহ্মে "ভেদ" আছে। অন্যদিকে অদ্বৈতবাদ বলেন, জীব ও ব্রহ্মে "ভেদ" ভ্রমমাত্র; রজ্জুতে সর্প অথবা শুক্তিতে রজত ভ্রমের মত। বলাই বাহুল্য, অদ্বৈতবাদে এই "ভেদ"-ই "মায়া" বা "ভ্রম"। তাই অদ্বৈতবাদীই "মায়াবাদী"।

​"অদ্বৈতবাদ"-কে "ঔপনিষদ"-বাদ বলা যায় না। কারণ শ্রীরামানুজ, শ্রীমধ্ব, শ্রীল জীব, শ্রীল বলদেব প্রমুখ বৈষ্ণব বেদান্তাচার্যও উপনিষদের আধারেই স্বমত স্থাপন করেছেন। তাই অদ্বৈতবাদী যদি দাবি করেন, তাঁদের মতই উপনিষদে রয়েছেন, তাই তা "ঔপনিষদ-বাদ"; তবে বৈষ্ণব বেদান্তীও বলবেন, বৈষ্ণব বেদান্তও "ঔপনিষদ-বাদ"।

​"অদ্বৈতবাদ"-কে "ব্রহ্মবাদ"-ও বলা যায় না। কারণ সমস্ত বৈদান্তিক মতগুলিই নিজেদের "ব্রহ্ম"-প্রতিপাদক বলে দাবি করেন এবং স্বমত দ্বারা ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য করেন। তাই প্রত্যেক মতই নিজেকে "ব্রহ্ম-বাদ" বলতে পারেন। বস্তুতঃ "অদ্বৈতবাদ" কথাটির গভীরে নিহিত আছে "মায়াবাদ" অর্থখানি। "মায়া"-কে স্বীকার না করলে "অদ্বৈত" স্থাপিতই হতে পারে না; "বিবর্তবাদ"-ও অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ "মায়া" না থাকলে ব্রহ্মের "বিবর্ত" জীব হবেনই বা কীভাবে?
​এইভাবে সূক্ষ্ম বিচার করে এই সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে যে, অদ্বৈতবাদীই "মায়াবাদী"। সমস্ত উল্লেখযোগ্য বেদান্তাচার্যই অদ্বৈতবাদকে মায়াবাদ বলেছেন; অধিক কী অদ্বৈতবাদী আচার্যগণও নিজেদের "মায়াবাদী" বলেছেন।

#সিদ্ধান্ত:
​বৌদ্ধমত ও অদ্বৈতবাদে বিশেষ সাম্য রয়েছে। বৌদ্ধমতে জগৎ মিথ্যা; অদ্বৈতবাদেও জগৎ মিথ্যা। বৌদ্ধমতে 'জীব' কোন তত্ত্ব নয়; অদ্বৈতবাদেও 'জীব' কোন তত্ত্ব নয়। বৌদ্ধমতে দৃশ্যমান জগতের সত্যত্ব ব্যবহারিক, পারমার্থিক নয়; অদ্বৈতবাদেও তাই। বৌদ্ধমতে "জীব" শূন্য; অদ্বৈতবাদে জীব "ব্রহ্ম"। কেবল "শূন্য" ও "ব্রহ্ম" ছাড়া বৌদ্ধমত ও অদ্বৈতবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আচার্য শঙ্কর যদি "আত্মা" বা "ব্রহ্ম"-কে নিত্য না বলতেন, তবে তাঁর মত বৌদ্ধমতই হয়ে যেত।

মূল লেখক:
শ্রীযুত অরিন্দম সরকার

Hayagriva Book Trust
​"

❝ শঙ্করাচার্য এবং তাঁর গুরু গৌড়পাদের মায়াবাদের ওপর বৌদ্ধ প্রভাব❞  ​আচার্য শঙ্করের গুরু গোবিন্দপাদ। তাঁর গুরু গৌড়পাদ। অ...
01/07/2026

❝ শঙ্করাচার্য এবং তাঁর গুরু গৌড়পাদের মায়াবাদের ওপর বৌদ্ধ প্রভাব❞

​আচার্য শঙ্করের গুরু গোবিন্দপাদ। তাঁর গুরু গৌড়পাদ। অর্থাৎ গৌড়পাদ ছিলেন আচার্য শঙ্করের পরমগুরু। আচার্য শঙ্কর তাঁর মাণ্ডুক্যকারিকা ভাষ্যের উপসংহারে ২য় শ্লোকের শেষ চরণে গৌড়পাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, "যস্তং পূজ্যাভিপূজ্যং পরমগুরুমমুং পাদপাতৈর্নতোহস্মি" (১৯১১ খ্রিস্টাব্দ, পুণা আনন্দ আশ্রম)। আচার্য শঙ্করের মতের মূল বিষয়গুলি গৌড়পাদের কারিকায় পাওয়া যায়।

​১) গৌড়পাদের "মাণ্ডুক্য কারিকা"-য় বৌদ্ধ উপাদান:
গৌড়পাদের বিখ্যাত গ্রন্থ মাণ্ডুক্য কারিকা। এটিতে চারটি প্রকরণে ২১৫টি কারিকা আছে। চারটি অধ্যায়ের নাম: আগম, বৈতথ্য, অদ্বৈত এবং অলাতশান্তি। গবেষকরা প্রথম প্রকরণটিকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। কারণ এটিই মাণ্ডুক্য উপনিষদের গৌড়পাদকৃত টীকা। দ্বিতীয় প্রকরণটিতে দ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে ন্যায় শাস্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে দ্বৈতবাদ খণ্ডনের চেষ্টা করা হয়েছে। গৌড়পাদ চতুর্থ প্রকরণে অজাতিবাদ, উচ্ছেদবাদ বা সর্বশূন্যতাবাদ প্রভৃতি মতের উল্লেখ করেছেন, সেগুলি বৌদ্ধমত থেকে গৃহীত। তাঁর এই কারিকার ভাষা ও ভাবের সাথে বৌদ্ধ মাধ্যমিক গ্রন্থের সাদৃশ্য আছে। শুধু তাই নয়, জ্ঞানী ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্য গৌড়পাদ এখানে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটি "বুদ্ধ"; যেমন: "বুদ্ধৈঃ প্রকীর্তিতম্" (৪।৮৮), "বুদ্ধৈরজাতিঃ পরিদীপিতা" (৪।১৮)। যদিও "নৈতৎ বুদ্ধেন ভাষিতম্" (৪।৯৯) এ তিনি "তাঁর মত বুদ্ধের মত নয়" অর্থাৎ, বুদ্ধের মত তাঁর মতের থেকে পৃথক বলতে চেয়েছেন। মহাযান বৌদ্ধমতে সঙ্ঘের সমস্ত সদস্যই বোধিসত্ত্ব বা বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হতে পারেন; অনুরূপভাবে অদ্বৈত বেদান্তমতেও সবাই ব্রহ্ম হতে পারেন। গৌড়পাদ নিজেকে বেদান্তের অনুসারী বলে দাবি করেন। নিজের দার্শনিক notion গুলিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি শ্রুতিবাক্য উদ্ধার করেছেন। চেয়েছেন শ্রুতির সমর্থনে নিজের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে; যেমনটা করে থাকেন শ্রুত্যনুসারী বৈদান্তিক মাত্রেই। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের বিরোধী শ্রুতিসমূহের মুখোমুখি হলে তিনি বলেছেন, কেবল "যুক্তিযুক্ত" বাক্যসমূহই গ্রহণ করতে হবে (৩।২৩)। পাশাপাশি সমগ্র গ্রন্থে তিনি বহুবারই নিজের স্বতন্ত্র ধারণার অবতারণা করেছেন। বিভিন্ন শ্রুতির মধ্যে আপাতঃ প্রতীয়মান বিরোধের সমাধানকল্পে গৌড়পাদ ৩।১৪ তে একটি text কে গৌণার্থে ব্যাখ্যার সময় বলেছেন, এটির মুখ্যার্থ যুক্তিসঙ্গত নয়: "গৌণং তান্ন মুখ্যত্বং হি যুজ্যতে"। অদ্বৈতবাদীগণের মধ্যে উপনিষদ-মন্ত্রসমূহের গৌণার্থ করার যে প্রবণতা দেখা যায়, গৌড়পাদ তাঁদের পথিকৃৎ।

​১.১) গৌড়পাদের "মায়া" ও বৌদ্ধমতের "মায়া":
গৌড়পাদ বলেন: অদ্বৈতই পরম সত্য। যথা: "অদ্বৈতং পরমার্থতঃ" (১।১৭), "অদ্বৈতং পরমার্থো হি" (৩।১৮), "অদ্বৈতে যোজয়েৎ স্মৃতিং" (২।৩৬)। ২।৩১ কারিকায় তিনি বলেন, "বেদান্ত মতে জগৎ স্বপ্নবৎ, মায়া, গন্ধর্বনগরের মত অলীক।" ১।১৭ তে বলেন, "ভেদ অবাস্তব ও ভ্রমমাত্র।"
​২।৫ এ তিনি বলেন, স্বপ্ন ও জাগ্রত দুটিই এক। ২।৬ ও ৪।৩১-এ তিনি বলেছেন, জগৎ মৃগতৃষ্ণিকার মত অলীক। "স্পন্দতে মায়য়া মনঃ" (৩।২৯), "চিত্তং চলতি মায়য়া" (৪।৬১) প্রভৃতি বহুস্থানে তিনি বলেছেন, বহির্জগৎ আসলে মনেরই চাঞ্চল্যের কারণে প্রতীত হয়। চতুর্থ অধ্যায়ের ৪৭-৫২ কারিকায় তিনি বলেন, অলাতচক্র যখন ঘূর্ণমান থাকে, তখনই তার অস্তিত্ব থাকে; স্থির হয়ে গেলে অলাতচক্র আর থাকে না। অনুরূপভাবে যখন "বিজ্ঞান" অস্থির থাকে তখন তা দ্রষ্টা ও দৃষ্ট এই দ্বৈতভাবে প্রতীয়মান হয়। "বিজ্ঞান" স্থির হয়ে গেলে এই দ্বৈতভাব আর থাকে না। লক্ষ্য করার বিষয়, ৪৭-৫২ কারিকায় "মন" শব্দের পরিবর্তে গৌড়পাদ কর্তৃক "বিজ্ঞান" শব্দের ব্যবহার। ৬৩-৬৬ কারিকায় বলেছেন, দ্রষ্টার মন ছাড়া স্বপ্নে দৃষ্ট পশুর অস্তিত্ব নেই, তেমনি জাগ্রত অবস্থায় দৃষ্ট পশুরও দ্রষ্টার মন ছাড়া অস্তিত্ব নেই। এটি স্পষ্ট "বিজ্ঞানবাদ"। বৌদ্ধমতেও জগৎ মনের বিকার। গৌড়পাদের মতে এই বিকার বা ভ্রমের কারণ "মায়া" (৩।২৯, ৪।৬১); লঙ্কাবতার সূত্র ১০।১৫০ অনুসারে ভ্রমের কারণ "বাসনা"। গৌড়পাদের মায়া ও লঙ্কাবতার সূত্রের বাসনা উভয়েই অনাদি, উভয়েই এক। বৌদ্ধমতে "বাসনা"-ই "অতিজাগতিক শক্তি" [উৎস: The Conception of Buddhist Nirvana: Leningrad, 1927, pg 209]।

​১.২) গৌড়পাদের "ব্রহ্ম" ও বৌদ্ধমতের "শূন্য":
গৌড়পাদ বলেন, মন যখন সম্পূর্ণরূপে নিরুদ্ধ হবে, চাঞ্চল্য বর্জিত হবে এবং কোন বিষয় গ্রহণ করবে না, তখন সেটি ব্রহ্ম হবে (৩।৪৬)। অর্থাৎ, এখানে গৌড়পাদ বললেন, "চিত্ত"-ই ব্রহ্ম। চিত্তবৃত্তি নিরোধের ফলে অনিদ্র (১।১৬, ৩।৩১, ৪।৮১), অস্বপ্ন (১।১৬, ৩।৩১, ৪।৮১), অনাভাস (৩।৪৬: নিরাভাস, নিরাকার, অরূপক)। চিত্তের আরেকটি উপাধি হল "সনির্বাণ" (৩।৩৭)। ইহাই জ্ঞান কিন্তু অকল্পক বা নির্বিকল্প (৩।৩৩), অসঙ্গ (৪।৭২, ৭৯, ৯৯)। এই কারণে জ্ঞান জ্ঞেয়ের থেকে ভিন্ন নয়- স্বয়ং ব্রহ্ম। এই অবস্থায় মন নিজেই নিজেতে অবস্থান করে: স্বস্থ (৩।৪৭), আত্মস্থ (৩।৩৪)।
​বৌদ্ধমতেও মনের নিরোধ বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা বা বিজ্ঞানমাত্রতা অর্থাৎ মন কর্তৃক বিষয় সংগ্রহের সমাপ্তি। (মহাযান সূত্রালঙ্কার ১১।৪৭, বসুবন্ধু রচিত "ত্রিস্বভাব-নির্দেশ", ৩৬)। বৌদ্ধমতে এটি মুক্তি। কারণ মহাযান সূত্রালঙ্কার ১১।৪৭ বলছেন: "তদাখ্যানম্ মুক্তিঃ পরম উপালম্ভস্য বিগমহঃ"।
​৩।৩০ কারিকায় গৌড়পাদ ব্রহ্মকে নিত্য বলেছেন, তবে "ব্রহ্ম" এবং "বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা" চিত্ত কি একই পদবাচ্য হন? কারণ যোগাচার বৌদ্ধমতে জ্ঞান নিত্য নয়; ক্ষণিক। বৌদ্ধমতে জ্ঞানকে নিত্য না বলা হলেও "ধ্রুব" বলা হয়েছে।
​"সংযুত নিকায়" (পৃষ্ঠা ২৪), "বিশুদ্ধিমগ্গ" (চতুর্থ অধ্যায়) -এর মত প্রামাণিক বৌদ্ধগ্রন্থে "নির্বাণ" অর্থ বোঝাতে নিম্নলিখিত শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়েছে: ধ্রুব, অমৃত, অচ্যুত, অজর্জর প্রভৃতি।

​"ধ্রুব" ও "নিত্য" শব্দদ্বয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য একটি উদাহরণ দ্বারা পরিস্কার হবে। ধরা যাক, "সোনা"। একে গলিয়ে বিভিন্ন গয়না প্রস্তুত করা হল। তাতে উপাদান হিসাবে সোনা রয়ে গেল। কিন্তু সোনা আর নিত্য রইল না; ধ্রুব রয়ে গেল। একইভাবে গৌড়পাদের ব্রহ্ম আর বৌদ্ধের বিজ্ঞপ্তিমাত্রতা অত্যন্ত একার্থক। গৌড়পাদের ব্রহ্ম থেকে "নিত্যত্ব" টুকু বাদ দিলেই তা বৌদ্ধদের শূন্যে পরিণত হয়।

​১.৩) গৌড়পাদের "অজাতি-বাদ" এবং নাগার্জুনের "অজাতি":
৩।৪৮ ও ৪।৭১ কারিকায় গৌড়পাদ বলেছেন, সর্বোচ্চ সত্য হল কিছুই সৃষ্টি হয় না। এটিকে অজাতিবাদ বলা হয়। ৩।১৯-৩২ তে তিনি অজাতি-বাদ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, শ্রুতিতে যে সৃষ্টির কথা রয়েছে, তা মায়িক। যা কিছু ইতোমধ্যেই সৃষ্ট, তা পুনরায় সৃষ্ট হতে পারে না। এটি বন্ধ্যার পুত্রের মত অলীক। দ্বিতীয় প্রকরণে গৌড়পাদ তাঁর "অজাতিবাদ"-কে বিভিন্ন শাস্ত্রপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর প্রদর্শিত বহু যুক্তিই বৌদ্ধদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। চতুর্থ প্রকরণে গৌড়পাদ বেদান্ত থেকে কোন কথাই বলেননি। দ্বিতীয় প্রকরণে তিনি যে অজাতিবাদ স্থাপন করেছেন, তারই যাথার্থ্য স্থাপন করেছেন এই প্রকরণে। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, বৌদ্ধদের সাথে এই প্রসঙ্গে তিনি একমত (৪।৫)। শুধু তাই নয়, তাঁর অনুসারী এবং সাধারণ পাঠককেও তিনি এই প্রসঙ্গে বৌদ্ধদের সাথে একমত হতে বলেছেন। আচার্য শঙ্কর ৪।২৭ এর টীকায় এটি সুনিশ্চিত করেছেন। এরপর গৌড়পাদ বৌদ্ধদের বিভিন্ন প্রামাণিক গ্রন্থ থেকে নানা আলোচনা করেছেন।

​১.৪) গৌড়পাদ তাঁর কারিকায় বুদ্ধকে বন্দনা করেছেন:
কারিকার চতুর্থ প্রকরণের প্রথম দুটি শ্লোকে গৌড়পাদ মঙ্গলাচরণ করেছেন। প্রথম শ্লোকটি হল:

​"জ্ঞানেনাকাশকল্পেন ধর্মান্ যে গগনোপমান্।
জ্ঞেয়াভিন্নেন সংবুদ্ধস্তং বন্দে দ্বিপদাং বরম্।।।"
​-জ্ঞেয়তত্ত্ব হতে অভিন্ন জ্ঞানের মাধ্যমে যিনি জগতের প্রতিটি পদার্থের আকাশকল্প ধর্ম সম্পর্কে অবহিত, এবং যিনি নিজেও গগনোপম, সেই বরণীয় দ্বিপদকে আমি বন্দনা করি। (৪।১)

​এই শ্লোকের "দ্বিপদ" কথাটি আমরা পাই ঋগ্বেদ ১০।১৬৫।১ মন্ত্রে: "শং নো অস্তু দ্বিপদে শং চতুষ্পদে"। "দ্বিপদ" কথার সাধারণ অর্থ হল "দুটি পা" যা "মানুষ"-কে বোঝায়। সংস্কৃত "দ্বিপদং বর" পালি ভাষায় দ্বিপদোত্তম প্রভৃতিও সমার্থক। মহাভারত বনপর্ব ৫১।৪৫ এ "দ্বিপদং বর" কথাটি পাওয়া যায়: "নৈষধো দ্বিপদং বরঃ" এবং আদিপর্ব ২২০।৩৬ এ "সমীপে দ্বিপদং বর"। সংস্কৃত বা পালি ভাষায় রচিত সমস্ত বৌদ্ধগ্রন্থেই "দ্বিপদোত্তম/ নরোত্তম/ পুরুষোত্তম" বলতে বুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু গৌড়পাদ কৃত "দ্বিপদং বর" পদের অর্থ আচার্য শংকর বলেছেন, "পুরুষোত্তম" অর্থাৎ "নারায়ণ"। হিন্দুগ্রন্থের কোথাও "নারায়ণ"-কে দ্বিপদ বলা হয়নি। কেবল মহাভারত শান্তিপর্ব, ৩৪৩ এ "দ্বিপদাং বরিষ্ঠ" বলতে নারায়ণ ঋষিকে বোঝানো হয়েছে। এখন, গৌড়পাদ "দ্বিপদ বর" বলতে কাকে বুঝিয়েছেন? নারায়ণকে, নারায়ণ ঋষিকে না বুদ্ধকে? তাঁর কারিকা অনুধাবন করলেই এটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

​গৌড়পাদ বলেছেন, জ্ঞান আকাশকল্প এবং জ্ঞেয় হতে অভিন্ন এবং ধর্ম গগনোপম। জ্ঞানের একটি লক্ষণ হল জ্ঞান অসঙ্গ (কারিকার ৪।৭২ এবং ৪।৯৬ তে: "অসঙ্গম্ তেন কীৰ্ত্তিতম্")। বৌদ্ধগ্রন্থ লঙ্কাবতার সূত্র (পৃ: ১৫৭) তে বলা হয়েছে: "অসঙ্গলক্ষণম্ জ্ঞানম্।" আরেকটি বৌদ্ধগ্রন্থ "বোধিচর্যাবতার পঞ্জিকা" (পৃ: ৩৫৯) এ বলা হয়েছে: "নিষ্প্রপঞ্চত্বাদ্ আকাশবৎ অসঙ্গম্ অনাস্পদম্ অশেষং"।

​জ্ঞান ও জ্ঞেয় অভিন্ন এটি বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদীদের মত। কারণ বহির্জগৎ তাঁদের কাছে অসত্য। দিঙনাগ তাঁর "আলম্বন পরীক্ষা", ৬ তে বলেছেন, "যদান্তর্জ্ঞেয় রূপং তৎ বহির্বৎ অবভাসতে"। এটি আচার্য শংকর তাঁর ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্য ২।২।২৮ এ উদ্ধৃত করেছেন। সুতরাং বৌদ্ধমতে বহির্জগৎ মিথ্যা। লঙ্কাবতার সূত্র, পৃ: ২৮৫ অনুসারে "বাহ্যো ন বিদ্যতে"। বহির্জগৎ আসলে বাসনারই রূপান্তর: "বিজ্ঞানপরিণাম" (বসুবন্ধুর ত্রিংশিকা)। সুতরাং, বৌদ্ধমতেও জ্ঞান অসঙ্গ ও আকাশকল্প, যা গৌড়পাদের মতের সাথে সদৃশ।

​"বোধিচর্যাবতার পঞ্জিকা" গ্রন্থে ৫০৪-৫০৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, পরমার্থতঃ সমস্ত কিছুই নিঃস্বভাব ও শূন্য। বন্ধ্যাপুত্রবৎ। তাই তা গগনোপম। শান্তিদেব তাঁর "বোধিচর্যাবতার" ৯।১৫৫ তে বলেছেন, "সর্বং আকাশসঙ্কাশং পরিগৃহ্যন্তি মদ্বিধাঃ"- আমার মত যাঁরা, তাঁরা সবাই এই মত গ্রহণ করবেন যে, সব কিছুই আকাশবৎ। কেন আকাশবৎ? প্রজ্ঞাকরমতি বলেন, "সমারোপিততত্ত্বশূন্যত্বাৎ" - কারণ এটি ধারণামাত্র এবং শূন্য। "অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা" পৃ:২৯৭ তেও একথা বলা হয়েছে। গৌড়পাদ তাঁর কারিকা ৪।৯৬ এ বলেছেন, জ্ঞান অসঙ্গ, তাই আকাশকল্প। কারণ আকাশ অসঙ্গ। লঙ্কাবতার সূত্র ১০।১৭২ এও বলা হয়েছে, আকাশ উৎপত্তিশূন্য তাই অসঙ্গ। আচার্য শংকর এখানে ব্যাখ্যা করেননি, কেন জ্ঞান আকাশকল্প ও ধর্ম গগনোপম। তিনি এখানে কেবল বলেছেন, জ্ঞান জ্ঞেয় হতে অভিন্ন কারণ, জ্ঞেয় অর্থে আত্মা এবং জ্ঞান আত্মা হতে ভিন্ন নয়।

​এই কারিকায় ন্যূনাধিক বাইশ বার ব্যবহৃত "ধর্ম" শব্দের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যে অর্থে গৌড়পাদ এটিকে ব্যবহার করেছেন, সেই একই অর্থে এটি সংস্কৃত ও পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ কোন বস্তুর প্রতীতি। আচার্য শংকর "ধর্ম" বলতে বলেছেন, "আত্মা"। কিন্তু সেটি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারিকার কোন স্থলে "ধর্ম" কথাটি "আত্মা" অর্থে প্রযুক্ত হয়নি; এখানেও "ধর্ম" বলতে বস্তুকেই বোঝানো হয়েছে। সমস্ত বৌদ্ধগ্রন্থে "ধর্ম" কথাটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শংকরাচার্য কোন স্থলে ধর্ম কথাটির আত্মা অর্থ করলেও অন্য অনেক স্থলে তিনি কোন ব্যাখ্যা করেননি। কারণ সেই সব স্থলে আত্মা অর্থ করলে তা সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে। যেমন: "সর্বে ধর্মা মৃষা স্বপ্নে" (৪।৩৩) এ আচার্য শঙ্কর অনুযায়ী অর্থ করলে হয়: সমস্ত আত্মাই স্বপ্নবৎ। যদিও ৪।৮২ তে তিনি "ধর্ম" শব্দের প্রকৃত অর্থ করেছেন: "বস্তু"। শংকরাচার্যের অর্থ ধরলে দাঁড়ায় নারায়ণ উপলব্ধি করেছেন, "আত্মা গগনোপম"। কিন্তু এটি কোন শাস্ত্রেই পাওয়া যায় না এবং এই অর্থ বিভ্রান্তিজনক ও অসমঞ্জস। প্রসঙ্গতঃ আচার্য শংকর তাঁর কারিকা ভাষ্যে বহুবার এই প্রয়াস করেছেন, যাতে কারিকার বৌদ্ধ উপাদানকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সুতরাং এই বিস্তৃত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, গৌড়পাদ "দ্বিপদ বর" শ্লোকে বুদ্ধকেই বন্দনা করেছেন।

#সিদ্ধান্ত:
সামগ্রিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, গৌড়পাদের মাণ্ডুক্য কারিকায় বর্ণিত অজাতিবাদ, মায়া ও ব্রহ্মের ধারণাগুলো মূলত বৌদ্ধ শূন্যবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারাই গভীরভাবে প্রভাবিত। গৌড়পাদের দর্শনে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ দর্শনের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। আচার্য শঙ্কর একই সিদ্ধান্তকে বেদান্তের আবরণে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

( চলবে.....)

লেখক —
শ্রীযুত অরিন্দম সরকার

Book Trust

❝ শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিই মায়াবাদের নির্বিশেষ ব্রহ্ম ❞ ( শ্রীধরস্বামী এবং অন্যান্য বৈষ্ণবাচার্যগণের সিদ্ধান্ত)মায়াবাদীগণ...
29/06/2026

❝ শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গজ্যোতিই মায়াবাদের নির্বিশেষ ব্রহ্ম ❞
( শ্রীধরস্বামী এবং অন্যান্য বৈষ্ণবাচার্যগণের সিদ্ধান্ত)

মায়াবাদীগণের দাবী — ব্রহ্ম যে ভগবানের নির্বিশেষ বিভূতি বা অঙ্গজ্যোতি তা গৌড়ীয়গণের কল্পনাপ্রসূত, এর কোন শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই। বরং নির্বিশেষ ব্রহ্মের সগুণ (মায়াকল্পিত) প্রকাশ হলেন ভগবান। অর্থাৎ, “ভগবান” পারমার্থিক সত্য নন; কেবল নির্গুণ ব্রহ্ম পারমার্থিক সত্য। নিম্নমেধাসম্পন্ন লোক নির্গুণ ব্রহ্মোপলব্ধির জন্য “সগুণ ভগবান”-কে ভজন করে।

█ খন্ডন (Refutation) —

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুসারে, “ভগবান” মায়াকল্পিত নন; “ভগবান” হলেন অদ্বয়তত্ত্বের পূর্ণতম প্রকাশ; ভগবানের নির্বিশেষ প্রকাশ হলেন "নির্গুণ ব্রহ্ম"। উভয়েই মায়ার ঊর্ধ্বে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে অদ্বয়তত্ত্বের কোন প্রকাশ (ব্রহ্ম, পরমাত্মা, ভগবান)-কেই মায়াকল্পিত অর্থাৎ পরমার্থতঃ মিথ্যা বলা হয় নি।

ভগবান-ই ব্রহ্মের উৎস্য — এ বিষয়ে ব্যাস শাস্ত্র এবং প্রামাণিক সম্প্রদায় সমূহের আচার্যগণের টীকায় প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা কয়েকটিমাত্র প্রমাণ প্রদর্শন করছি —

১) শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীধর স্বামীর টীকা হতে ৩টি প্রমাণ -

শ্রীজীব গোস্বামী তাঁর গ্রন্থে শ্রীধর স্বামীর টীকা উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন, “পরম-বৈষ্ণব” শ্রীধর স্বামীও মায়াবাদীদের বিরুদ্ধে গিয়ে ব্রহ্মকে ভগবানের প্রকাশ বলেছেন।

শ্রীমদ্ভাগবত ৬.১৬.৫১ শ্লোকে ভগবান সংকর্ষণ বলেছেন, “শব্দব্রহ্ম পরং ব্রহ্ম মমোভে শাশ্বতী তনূ” : শব্দব্রহ্ম ও পরব্রহ্ম- উভয়ই আমার শাশ্বত তনু।

এই শ্লোকের টীকায় শ্রীধর স্বামী লিখেছেন, “উভে মমৈব রূপে ইত্যাহ শব্দব্রহ্ম ইতি। শাশ্বতী শাশ্বতৌ।”
আক্ষরিক অনুবাদ: “শব্দব্রহ্ম…” ইত্যাদি দ্বারা উভয়ই আমার রূপ- এটি বলছেন। উভয়ই শাশ্বত।

মায়াবাদীরা ভগবানকে ব্রহ্মের সগুণ (মায়িক) প্রকাশ বলে থাকেন। কিন্তু শ্রীধর স্বামী ব্রহ্মকে ভগবানের রূপ বলেছেন।

শ্রীধর টীকার এই অংশ উদ্ধৃত করে শ্রীজীব গোস্বামী বলেছেন, শব্দব্রহ্ম এবং পরব্রহ্ম উভয়ই “সাহচর্য-ন্যায়” দ্বারা ভগবানের তনু বলে স্থাপিত হলেন।

তনু শব্দ দ্বারা সাধারণতঃ শরীর বোঝায়। ✓তন্ ধাতু থেকে “তনু” উৎপন্ন হয়েছে। ✓তন্ = ছড়িয়ে দেওয়া। যেহেতু শব্দব্রহ্ম বা পরব্রহ্ম কারোরই রূপ নেই। তাই এখানে “তনু” শব্দের অর্থ ভগবানের শক্তির নির্বিশেষ প্রকাশ।

এই বক্তব্যের সমর্থনে শ্রীজীব গোস্বামী শ্রীমদ্ভাগবতের ৮.২৪.৩৮ শ্লোকে মৎস্যদেবের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। ভগবান মৎস্যদেব বলছেন, “মদীয়ং মহিমানং চ পরব্রহ্মেতি শব্দিতম্” : আমার মহিমাই পরব্রহ্ম বলে আখ্যাত হয়।

শ্রীজীব গোস্বামী লিখেছেন, “মহিমা” শব্দ দ্বারা নির্বিশেষ বিভূতি (বিভূতিঃ নির্বিশেষমিতি যাবৎ) বোঝানো হয়েছে।

শ্রীধর স্বামী তাঁর টীকায় অন্যত্রও ব্রহ্মকে ভগবানের প্রকাশ বলেছেন। শ্রীমদ্ভাগবত ১১.১৬.৩৭ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,

“পৃথিবী বায়ুরাকাশ আপো জ্যোতিরহং মহান্
বিকারঃ পুরুষোऽব্যক্তং রজঃ সত্ত্বং তমঃ পরম্”

আমি পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল, তেজ (অগ্নি), অহংকার, মহত্তত্ত্ব, বিকার, পুরুষ, অব্যক্ত, রজোগুণ, সত্ত্বগুণ, তমোগুণ এবং পরম।

এই শ্লোকে “পরম” শব্দে শ্রীধর স্বামী টীকা করেছেন, “পরং ব্রহ্ম চ” অর্থাৎ, “পরং শব্দ দ্বারা ব্রহ্মকে বোঝানো হয়েছে”। স্থূলতম পৃথিবী থেকে ব্রহ্ম পর্যন্ত সমস্ত কিছুর উৎস শ্রীকৃষ্ণ।

এইভাবে শ্রীজীব গোস্বামী দেখিয়েছেন— শ্রীধর স্বামী ব্রহ্মকে ভগবানের নির্বিশেষ প্রকাশ/ ঐশ্বর্য/ অঙ্গকান্তি রূপে ব্যাখ্যা করেছেন।

২) পদ্মপুরাণ হতে ২টি প্রমাণ —

#যন্নখেন্দুরুচির্ব্রহ্ম ধ্যেয়ং ব্রহ্মাদিভিঃ সুরৈঃ। গুণত্রয়মতীতং তং বন্দে বৃন্দাবনেশ্বরম্ ॥
(পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড, ৪৬.৫৯)

অনুবাদ:
সদাশিব কহিলেন— "যাঁর নখচন্দ্রের কান্তিরূপ ‘ব্রহ্ম'–কে ব্রহ্মাদি দেবতারাও ধ্যান করেন, সেই ত্রিগুণাতীত বৃন্দাবনেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে আমি বন্দনা করি।”

তদঙ্ঘ্রিপঙ্কজদ্বন্দ্ব-নখচন্দ্রমণিপ্রভাঃ । আহুঃ পূর্ণব্রহ্মণোঽপি_কারণং বেদদুর্গমম্ ॥
(পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড, ৩৮.১১৮)

অনুবাদ:
"তত্ত্বজ্ঞ মহর্ষিগণ বলেন— পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণকমল যুগলের নখরূপ চন্দ্রমণির যে অপ্রাকৃত দিব্য প্রভা (জ্যোতি), তা স্বয়ং ‘পূর্ণব্রহ্মে’রও কারণ এবং তা বেদের সূক্ষ্ম বিচারের পক্ষেও অত্যন্ত দুর্গম।”

অর্থাৎ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নখবিচ্ছ্যুরিত জ্যোতিই নির্বিশেষ ব্রক্ষের প্রতিষ্ঠা।

৩) বিষ্ণুপুরাণ হতে প্রমাণ —

বিষ্ণুপুরাণ ১.১৫.৫৫ শ্লোকে বলা হয়েছে, “স ব্রহ্মপারঃ পরপারভূতঃ” - অর্থাৎ ভগবান বিষ্ণু ব্রহ্মেরও অতীত।

৪) যামুনাচার্য্যের স্তোত্ররত্ন হতে প্রমাণ —

শ্রীসম্প্রদায়ের আচার্য যামুনমুনি তাঁর স্তোত্ররত্নে লিখেছেন— “পরং ব্রহ্ম চ তে বিভূতয়ঃ” : পরম ব্রহ্ম আপনার বিভূতি। [ স্তোত্ররত্ন ১৭, প্রথম সংস্করণ, ২০০১, তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম্]

৪) শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও আচার্য্য কেশব কাশ্মীরির টীকা হতে প্রমাণ —

ভগবদ্গীতা ১৪.২৭ শ্লোকে “ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহম্” ব্যাখ্যা করে নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের আচার্য কেশব কাশ্মীরি তাঁর তত্ত্বপ্রকাশিকা টীকায় বলেছেন, “তথৈকান্তিকস্য” : অর্থাৎ ব্রহ্ম ভগবানের অঙ্গকান্তি।

৫) ব্রহ্মসংহিতা হতে প্রমাণ —

যস্য প্রভা প্রভবতো জগদণ্ডকোটি–
কোটিষ্বশেষবসুধাদিবিভূতিভিন্নম্‌ ।
তদ্‌ব্রহ্ম নিষ্কলমনন্তমশেষভূতং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি
(ব্রহ্ম সংহিতা ৫.৪০)

অনুবাদ:
যাঁর দিব্য দেহের জ্যোতির্ময় প্রভা পরম, পূর্ণ, অনন্ত ও সর্বব্যাপী নিরাকার ব্রহ্ম (ব্রহ্মজ্যোতি); সেই ব্রহ্মজ্যোতির মধ্যেই অগণিত ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত লক্ষ লক্ষ বিচিত্র গ্রহলোক তাদের নিজ নিজ বৈভবসহ প্রকাশিত ও বিদ্যমান রয়েছে; সেই আদিপুরুষ শ্রীগোবিন্দকে ভজনা করি।

ব্রহ্মসংহিতার শ্লোকে শ্লোকে মায়াবাদ সিদ্ধান্ত খন্ডিত হয়। তাই মায়াবাদীগণ ব্রহ্মসংহিতা মানতে চান না, তারা বলেন গৌড়ীয়দের রচিত। (অথচ মহাভারত, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ থেকে শুরু করে মধ্বাচার্য্যাদি আচার্য্যগণ এ সংহিতার উদ্ধৃতি করেছেন)। এ লেখনিতে, অন্যান্য শাস্ত্র প্রমাণ ও আচার্য্য বাক্য দ্বারাও ব্রহ্মসংহিতার বাক্যের প্রামাণিকতা যাচিত হলো!

৬) এবার, গৌড়ীয় সিদ্ধান্তে যে উক্ত শাস্ত্র ও আচার্য্য প্রমাণসমূহ-ই পুনরায় ব্যক্ত হয়েছে, কিরূপে ব্যক্ত হয়েছে তা দেখা যাক —

যদদ্বৈতং ব্রহ্মোপনিষদি তদপ্যস্য তনুভা যদাত্মান্তর্যামী পুরুষ ইতি সোঽস্যাংশবিভবঃ। ষড়ৈশ্বর্যৈঃ পূর্ণো য ইহ ভগবান্ স স্বয়মযং ন চৈতন্যাৎ কৃষ্ণাজ্জগতি পরতত্ত্বং পরমিহ।।
(চৈতন্যচরিতামৃত। প্রথম পরিচ্ছেদ, ১৪)

অনুবাদঃ
উপনিষদে যাকে অদ্বৈত ব্রহ্ম বলা হয়েছে, তা এই শ্রীকৃষ্ণরূপী চৈতন্যেরই তনুভা বা অঙ্গজ্যোতি। যোগীরা যাকে অন্তর্যামী পরমাত্মা বলেন, তিনি এঁরই অংশ। আর যিনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান, তিনি স্বয়ং এই শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কোনো পরমতত্ত্ব জগতে নেই।

শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতের ১।২।১৪ শ্লোকেও বলা হয়েছে—

“ তাঁর অঙ্গ-প্রভা ব্যাপি অনন্ত আকাশে।
সেই প্রভা ব্রহ্মরূপে উপনিষদে ভাসে।।”

#সিদ্ধান্ত:
শ্রীধরস্বামী, যামুনাচার্য্য, কেশব কাশ্মিরী ও গৌড়ীয় আচার্য্য — সকল বৈষ্ণব সম্প্রদায় ও শাস্ত্র প্রমাণের ভিত্তিতে স্থাপিত হলো, মায়াবাদীগণের নির্বিশেষ ব্রহ্ম ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই অঙ্গকান্তি/বিভূতি।

মূল লেখক—
শ্রীযুত অরিন্দম সরকার

সম্পাদনা—
Hayagriva Book Trust

প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ : পর্ব-২​█▒▒▒ পূর্বপক্ষের দাবী ▒▒▒█ ​শ্রীচৈতন্যদেব শঙ্করপন্থী সন্ন্যাসী ছিলেন। তাঁর সন্ন্যাস নাম "কৃষ্ণচ...
28/06/2026

প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ : পর্ব-২

​█▒▒▒ পূর্বপক্ষের দাবী ▒▒▒█
​শ্রীচৈতন্যদেব শঙ্করপন্থী সন্ন্যাসী ছিলেন। তাঁর সন্ন্যাস নাম "কৃষ্ণচৈতন্য ভারতী"। তিনি অদ্বৈতবাদ "আঁচলে বেঁধে" ঘুরতেন বা অদ্বৈতবাদী ছিলেন।
​​
​█খণ্ডন : ​█
শ্রীমন্মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণকে কেন্দ্র করে অধুনা অদ্বৈতপন্থিগণ তাকে নিজ সম্প্রদায়ী বলে দাবী করেন। কলিহত মায়াবাদীরাও শ্রীচৈতন্যের চরণাশ্রয় করবেন সে উদ্দেশ্যে মহাপ্রভুর যে সন্ন্যাস গ্রহণ, সে ইচ্ছা বাস্তবে পূরণ হচ্ছে বই কি!

অথচ সন্ন্যাসের দ্বারা সম্প্রদায় নির্ধারণ হয় — এ দাবীই অযৌক্তিক। সন্ন্যাস একটি আশ্রম মাত্র। কোন সম্প্রদায়েরই অবিচ্ছিন্ন সন্ন্যাস পরম্পরা নেই! খোদ শঙ্করের সম্প্রদায়েই অবিচ্ছিন্ন সন্ন্যাস নেই। প্রথমত শঙ্করাচার্য্যের নিজেরই কোন সন্ন্যাস গুরু নেই, তিনি নিজেই নিজেকে সন্ন্যাসী ঘোষণা করেছেন— তাঁর প্রামাণ্য জীবনী ‘অদ্বৈত সিদ্ধি’’ গ্রন্থপ্রমাণ৷ প্রচুর আচার্য্য ও গবেষকদের তথ্যানুসারে, শঙ্করের পরমগুরু গৌড়পাদ একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন। তাঁর পূর্ববর্তী শুকদেব সন্ন্যাসী ছিলেন না। তাঁরও পূর্ববর্তী বেদব্যাস, বশিষ্ট, শক্তি, ব্রহ্মা সকলেই গৃ্‌হস্থ ছিলেন। অতএব, সন্ন্যাস দ্বারা সম্প্রদায় হয় না৷

শাঙ্কর দশনামী সম্প্রদায় থেকে সন্ন্যাস সংস্কার গ্রহণ বা শিক্ষাগ্রহণ করেছেন অথচ অদ্বৈতবাদ স্বীকার করেননি এরকম উদাহরণ প্রচুর আছে —

১) আচার্য মধ্বের গুরু অচ্যুতপ্রেক্ষ ছিলেন শাঙ্কর সম্প্রদায়ভুক্ত। অথচ আচার্য মধ্ব মায়াবাদের তীব্র বিরোধিতা করে "তত্ত্ববাদ" প্রচার করেছিলেন। তার সম্প্রদায় — ব্রহ্ম-মাধ্ব।

২) বল্লভাচার্য্য মধ্বসন্ন্যাসী মাধবেন্দ্র যতীর নিকট অপ্রকটের ৩৯ দিন পূর্বে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তথাপি তার সম্প্রদায় আলাদা — রুদ্র-বল্লভ সম্প্রদায়।

৩) ​আচার্য রামানুজও অদ্বৈতবাদী যাদবপ্রকাশের কাছে শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু অদ্বৈতবাদের বিরোধিতা করেছেন। তার সম্প্রদায় আলাদা — শ্রী সম্প্রদায়৷

৪) ​মায়াবাদীরা ভাবার্থদীপিকা-কার শ্রীধর স্বামীকে মায়াবাদ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে দাবি করেন। এমনকী তাঁরা শ্রীক্ষেত্রের পূর্বান্নায়-গোবর্ধন মঠের গুরুপরম্পরায় শ্রীধর স্বামীর নাম দেখান। কিন্তু এই শ্রীধর স্বামীর অধিকাংশ মতই অদ্বৈতবাদকে সরাসরি নস্যাৎ করে। এই কারণেই বারাণসীর মায়াবাদী সন্ন্যাসীরা শ্রীধর স্বামীর টীকা নিয়ে বিতর্ক করতে থাকেন এবং টীকাটিকে বিন্দুমাধব মন্দিরে রাখা হয়। কথিত আছে, শ্রীভগবান স্বয়ং "অহং বেত্তি শুকং বেত্তি ব্যাসং বেত্তি না বেত্তি বা/ শ্রীধর সকলং বেত্তি শ্রীনৃসিংহ প্রসাদতঃ" শ্লোক লিখে শ্রীধরের টীকাকে অনুমোদন করেছিলেন। শ্রীধর স্বামীর টীকা যে মায়াবাদ-বিরোধী তার আরেকটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ মায়াবাদী পণ্ডিত ধনপতিসূরি তাঁর "ভাষ্যোৎকর্ষ-দীপিকা" গ্রন্থে শ্রীধর স্বামীর দোষ দর্শন করানোর চেষ্টা করেছেন এবং শাঙ্কর মতের উৎকর্ষতা দেখাতে চেয়েছেন। শ্রীধর স্বামী মায়াবাদী হলে মায়াবাদের সাথে তাঁর মতের বিরোধ থাকতো না এবং কোন মায়াবাদী পণ্ডিত তাঁর মত খণ্ডনের চেষ্টা করতেন না।
​গৌড়ীয় বৈষ্ণবাচার্য এবং কিংবদন্তী ষড়গোস্বামীর অন্যতম শ্রীজীব গোস্বামী তাঁর "ভাগবত সন্দর্ভ"-এর প্রথম সন্দর্ভ "তত্ত্বসন্দর্ভ"-তে শ্রীধর স্বামীকে "পরম বৈষ্ণব" বলেছেন। তত্ত্বসন্দর্ভের "সারঙ্গ রঙ্গদা" টীকায় বেদান্তাচার্য বলদেব বিদ্যাভূষণ শ্রীধর স্বামী কর্তৃক অদ্বৈতবাদের আড়ালে শুদ্ধ বৈষ্ণব সিদ্ধান্ত গুম্ফিত করাকে "বড়িশামিষ ন্যায়" (বড়িশাতে আমিষ গেঁথে মাংসাশী মাছ শিকার) দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।
​শ্রীধর স্বামী বিষ্ণুস্বামী ধারার সন্ন্যাসী ছিলেন, তাই কখনো দশনামী সন্ন্যাস পদবী তার নামের সাথে উচ্চারিত হয় না। বিষ্ণুস্বামী প্রবর্তিত ১০৮ সন্ন্যাস উপাধির অন্যতম হলো ‘স্বামী'। বিষ্ণুস্বামীর মতো আচার্য্য শ্রীধরের সন্ন্যাস উপাধিই ‘স্বামী'।

[ শ্রীধর স্বামী যে বিষ্ণুস্বামী সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব ছিলেন, তার ঐতিহাসিক ও গ্রন্থ প্রমাণসমূহ কমেন্টে দেওয়া আমাদের ব্লগ পোস্টে রয়েছে]

অথচ শ্রীমন্মহাপ্রভুর সন্ন্যাস নাম "শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য"। চৈতন্যভাগবত রচয়িতা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন: "ভারতী" উপাধি শ্রীমন্মহাপ্রভু গ্রহণ করেননি (চৈভা: মধ্য, ২৮।১৭২)। সর্বত্র তিনি "শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য" নাম বলেছেন। তাঁর অনুসারীরাও তাঁকে "শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য" নামে অভিহিত করেছেন। কখনো "ভারতী" পদবী ব্যবহার করেননি। এ কথা চৈতন্যদেবের সকল প্রামাণিক করচা থেকে শুরু করে চরিতামৃত, চরিতাবলি প্রভৃতি জীবনী গ্রন্থে উল্লেখ থাকলেও মায়াবাদীগণ তাদের পুরাতন অভ্যাস মেনে তাকে অদ্বৈতবাদী দাবী করে!

তাহলে দেখা যাক, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অদ্বৈতবাদ সম্পর্কে কি দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করতেন—

আমরা কবিরাজ গোস্বামী রচিত "চৈতন্য চরিতামৃত" গ্রন্থের মধ্যলীলা ৬।১৮২ তে দেখতে পাই শ্রীমন্মহাপ্রভু পদ্মপুরাণ থেকে বিখ্যাত একটি শ্লোক উদ্ধার করে সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে বলছেন আচার্য শংকর যে মায়াবাদ প্রচার করেছেন, সেটি প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমত।

​বিখ্যাত সেই শ্লোকটি হল:
​"মায়াবাদং অসচ্ছাস্ত্রং প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধমুচ্যতে। ময়ৈব কল্পিতং দেবি কলৌ ব্রাহ্মণমূর্তিনা।।"
(পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ২৩৬।৩১)

​বঙ্গানুবাদ: (দেবী পার্বতীকে শ্রীশিব বলছেন) মায়াবাদ হল অসচ্ছাস্ত্র। এটি প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমত। কলিতে ব্রাহ্মণরূপ ধরে আমি এই মত বিধান করব।

​ঠিক এর আগেই আরেকটি শ্লোক লেখা হয়েছে:
​"স্বাগমৈঃ কল্পিতৈস্তুঞ্চ জনান্ মদ্বিমুখান্ কুরু। মাঞ্চ গোপয় যেন স্যাৎ সৃষ্টিরেষোত্তরোত্তরা।।"

​বঙ্গানুবাদ: স্বকপোল কল্পিত আগম দ্বারা মানুষকে মদ্বিমুখ কর। আমাকে এরূপ গোপন কর যেন উত্তরোত্তর সৃষ্টি (বদ্ধজীবের সংখ্যা) বৃদ্ধি পায়। (পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ২৫।৭)।

​এই একই অধ্যায়ের ১৬৮ শ্লোকে শ্রীমন্মহাপ্রভু বলেছেন:
"বেদ না মানিয়া বৌদ্ধ হয় তো নাস্তিক।
বেদাশ্রয়ী নাস্তিক্যবাদ বৌদ্ধ কে অধিক।।"

​শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীধর স্বামী এবং তাঁর "ভাবার্থ দীপিকা" টীকাকে বহুমান করেছেন। অথচ এই শ্রীমন্মহাপ্রভুই শাঙ্কর ভাষ্যকে "লক্ষণা" বা "গৌণ অর্থ", "প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ" / "বৌদ্ধ কে অধিক" (চৈচ ৬।১৬৮) / "নাস্তিক শাস্ত্ৰ" (চৈচ ৬৷১৮০)/ "কল্পনা" (চৈচ ৬।১৭৯) / "মায়াবাদী ভাষ্য শুনিলে হয় সর্বনাশ" (চৈচ ৬।১৬৯)/ "পাষণ্ডী", "অদৃশ্য", "অস্পৃশ্য", "যমদণ্ডী" (চৈচ ৬|১৬৭) / "মুখ্য আচ্ছাদি" (চৈচ ৬।১৫১) বলেছেন। শ্রীমন্মহাপ্রভুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ আচার্য শংকরকে যথেষ্ট সম্মান করলেও তাঁর প্রচারিত অদ্বৈতবাদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। গুরুপারম্পর্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব মাত্রেই "মায়াবাদ-বিরোধী"। তাই এযুগের কোন স্বঘোষিত "Godman" এবং তাঁর শিষ্য শ্রীমন্মহাপ্রভুকে "অদ্বৈতবাদী" বলে দলে টানার চেষ্টা করলে তা যুক্তিসঙ্গত হবে না।

মায়াবাদী সম্প্রদায়ের এক দোষ — তারা বিখ্যাত সকলকেই নিজেদের সম্প্রদায়ী দাবী করেন! তারা শ্রীধরস্বামী, মধ্বাচার্য্যকেও নিজ সম্প্রদায়ী দাবী করেন! মহাপ্রভুকেও নিজ সম্প্রদায়ের দাবী করেন! আরেকদিকে রামকৃষ্ণ, জগদ্বন্ধু, অনুকূল, হরিচাঁদ সকলেই বাংলায় নিজেকে ‘গৌরাচাঁদ' এর অবতার ঘোষণা করে বসে আছে। রামকৃষ্ণের শিষ্যচামুন্ডারা রামকৃষ্ণকে রাম, কৃষ্ণ, যিশু, রসুলের অবতারী পুরুষ বলে দাবী করে। খোদ পুরীর শঙ্করাচার্য্য নিশ্চলানন্দজী আশ্রমবিদ্বেষী কর্মকান্ডের জন্য ‘রামকৃষ্ণ মিশন'কে অহিন্দু ঘোষণা করতে বাধ্য হন! কি বিপদ! শ্রীচৈতন্যদেব জগতগুরু বলে বুঝি সকল সম্প্রদায়েরই তাকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের দাবী করেন!

​ #সিদ্ধান্ত:
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু অদ্বৈতবাদী ছিলেন না।

মূল লেখক—
শ্রীযুত অরিন্দম সরকার
সম্পাদনা—
Hayagriva Book Trust

‘প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধং' : পর্ব- ১(Crypto Buddhism)পদ্মপুরাণে একটি বিখ্যাত শ্লোক আছে —​"মায়াবাদমসচ্ছাস্ত্রং প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধমু...
27/06/2026

‘প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধং' : পর্ব- ১
(Crypto Buddhism)

পদ্মপুরাণে একটি বিখ্যাত শ্লোক আছে —
​"মায়াবাদমসচ্ছাস্ত্রং প্রচ্ছন্নং বৌদ্ধমুচ্যতে। ময়ৈব কল্পিতং দেবি কলৌ ব্রাহ্মণরূপিণা।।"
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ২৩৬।৬-৭)
অর্থ:
শিব বললেন — “হে দেবি, মায়াবাদ অসৎ শাস্ত্র। এটি প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমত। কলিযুগে আমিই ব্রাহ্মণ রূপ ধারণ করে (শঙ্করাচার্য রূপে) এই মত প্রচার করেছি।”
আজ হতে ৫০০ বছর পূর্বে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু যখন পুরীতে পণ্ডিত সার্বভৌমের সাথে এবং কাশীতে প্রকাশানন্দ সরস্বতীর সাথে শাস্ত্রীয় বিচারে অবতীর্ণ হন, তখন মায়াবাদের স্বরূপ বোঝাতে তিনি পদ্মপুরাণের এই শ্লোকটি প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করেছিলেন। (রেফারেন্স: শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত মধ্য, ৬। ১৮২ এবং ​মধ্য, ২৫। ৪২)

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবধারা সমগ্র পৃথিবীতে অতি প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে ধারণা করেন এ শ্লোকটি মহাপ্রভু বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় (অনেকের মতে ISKCON !! ) পরবর্তীকালে পদ্মপুরাণের নামে প্রক্ষিপ্ত করেছেন৷ অথচ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বেও বহু সম্প্রদায়ের আচার্য্য (এমনকি খোদ অদ্বৈতবাদী পন্ডিতগণও) শঙ্করের মতকে প্রচ্ছন্ন বুদ্ধমত ও মায়াবাদ বলেছেন। আসুন, আক্ষেপবাদীদের পূর্বপক্ষ ও তার খন্ডন দেখা যাক —

▒ পূর্বপক্ষ- ১: ▒
​পদ্মপুরাণের নামে এই ‘'মায়াবাদং অসৎশাস্ত্রং প্রচ্ছন্ন বুদ্ধমত…” — শ্লোকদুটি গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা প্রচার করেন। কারণ প্রকৃত সংস্করণে এই শ্লোকদুটি নেই।

█ খণ্ডন: █

ভারতের স্বনামধন্য সকল শাস্ত্র-প্রকাশনা সংস্থা, যাদের নিজেদেরই পন্ডিত মন্ডলী সম্বলিত গবেষক টিম রয়েছে, যারা একই শাস্ত্রের উত্তর-ভারতীয় ও দক্ষিণ-ভারতীয় প্রাপ্ত সকল পান্ডুলিপি ঘেটে পুরাণ প্রকাশ করেন, তাদের সকলের প্রকাশিত পুরাণে এ শ্লোকটি বিদ্যমান —

১) ​বঙ্গবাসী প্রেস থেকে প্রকাশিত ১৯১৫ সালের দক্ষিণভারতীয় দেবনাগরী সংস্করণের পদ্মপুরাণ উত্তরখণ্ড, ২৩৬ অধ্যায়, শ্লোক ৬-৭ এ শ্লোকটি রয়েছে।

২) ভেঙ্কটেশ্বর প্রেস-এর ১৮৯৫ সালের সংস্করণটির উত্তরখণ্ড, ২৩৬ অধ্যায়, শ্লোক ৬-৭ এ শ্লোকটি রয়েছে।

৩) Motilal Banarasidass হতে প্রকাশিত Padma Purana critical edition এর উত্তরখণ্ড, ২৩৬ অধ্যায়, ১৮-২০ তে এবং

৪) আনন্দাশ্রম সংস্করণের ২৬৪ অধ্যায়ের ৭০ শ্লোকে আছে ।

৫) আর বাংলায় বহুল পঠিত ‘নবভারত পাবলিশার্স' হতে প্রকাশিত প্রখ্যাত অদ্বৈতবাদী পন্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত পদ্মপুরাণের উত্তরখন্ডের ২৩৬ অধ্যায়েও এ শ্লোকটি বিদ্যমান। এছাড়া বাংলায় সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ এর প্রকাশিত পদ্মপুরাণেও এ শ্লোক বিদ্যমান।

অতএব, এ শ্লোকগুলো গৌড়ীয় সম্প্রদায় বা ইসকনের তৈরি ন, বরং বেদব্যাস দ্বারা রচিত পদ্মপুরাণে পূর্ব হতেই ছিলো।

এবার দেখা যাক, অন্যান্য সম্প্রদায় আচার্য্যগণও শঙ্করাচার্য্যের মতকে ‘প্রচ্ছন্ন মত' হিসেবে যে স্বীকার করেছেন —

১) ​শ্রীসম্প্রদায়ের শ্রীল যামুনাচার্য (৯১৭-১০৪২ খ্রিঃ) তাঁর "সিদ্ধিত্রয়" গ্রন্থের "আত্মসিদ্ধি" অধ্যায়ে বৌদ্ধমতকে "প্রকটবৌদ্ধমত" ও অদ্বৈতবাদকে "প্রচ্ছন্ন" বৌদ্ধমত বলেছেন। (পৃঃ ২৬, Ubhaya Vedanta Grantha Mala Book Trust, 1972)

২) শ্রী সম্প্রদায়ের ​শ্রীযামুনমুনিকে অনুসরণ করে আচার্য রামানুজ (১০১৭-১১৩৭ খ্রিঃ) তাঁর গ্রন্থে মায়াবাদকে বৌদ্ধমত বলেছেন।
"পরমতভঙ্গম্" গ্রন্থে আচার্য বেদান্তদেশিক (১২৬৯-১৩৭০ খ্রিঃ) বলেছেন, মায়াবাদী "বৌদ্ধ"-দের থেকে বেদ শিখেছেন।

৩) শ্রী সম্প্রদায়ের "শতদূষণী" গ্রন্থে বেদান্তদেশিক আচার্য শঙ্করকে "রাহু মীমাংসক" বলেছেন।

৪) আচার্য মধ্ব এবং তাঁর পরবর্তী সকল আচার্য্যই স্পষ্টতই শঙ্করমতকে "বৌদ্ধ শূন্যবাদ" বলেছেন। মধ্ব সম্প্রদায়ের ত্রিবিক্রমাচার্য্য তাঁর ‘মণিমঞ্জুরী’ গ্রন্থে শঙ্করের গুরু গৌড়পাদকেও বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিসেবে দাবী করেছেন। (পরবর্তী পর্বে গৌড়পাদের মত ও বুদ্ধমতের সাদৃশ্য নিয়ে লেখা হবে)।

#​সিদ্ধান্ত:
​পদ্মপুরাণের শ্লোকটি গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা প্রক্ষিপ্ত করেননি।

​ ▒ পূর্বপক্ষ- ২: ▒
​গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় না করলেও অন্য বৈষ্ণবেরা এই শ্লোক দুটিকে প্রক্ষিপ্ত করেছেন।

█ খণ্ডন: █

তাহলে বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে, অবৈষ্ণব পন্ডিতগণ এর মত কি তা দেখা যাক —

১) ​অবৈষ্ণব বেদান্ত-ভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু (১৫৫০-১৬০০ খ্রিঃ) তাঁর "সাংখ্যপ্রবচন ভাষ্য ভূমিকা"-য় পদ্মপুরাণের এই শ্লোকসমূহ উল্লেখ করে মায়াবাদকে "প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমত" ও "নাস্তিক্যমত" বলেছেন। এছাড়াও ১।২২-এ তিনি বলেছেন, "কোন বেদান্তভাষ্যেই বন্ধনকে ভ্রম বলা হয়নি; কেবল "বেদান্তব্রুব"গণ দ্বারা প্রচারিত এই মহৎ মায়াবাদ ছাড়া। এই মায়াবাদ বৈদান্তিক নয়। বরং নব্য বৌদ্ধমত মাত্র।" ​১৩৪৬ সালে "ভারতবর্ষ" পত্রিকায় রাজেন্দ্রনাথ ঘোষ এবং ফণীভূষণ তর্কবাগীশ মায়াবাদের সপক্ষে এবং চৈতন্য চরিতামৃতের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য রাখেন, গৌড়ীয় পত্রিকায় মহামহোপাধ্যায় সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ সেগুলি লক্ষ্য করে প্রশ্ন তুলেছেন, বিজ্ঞানভিক্ষু "প্রচ্ছন্নবৌদ্ধমত" না বলে অন্য কথাও বলতে পারতেন!

২) ​ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অধ্যাপক জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন সায়নমাধবের "সর্বদর্শনসংগ্রহ" গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ প্রণয়ন করে সাংখ্যদর্শনের বঙ্গানুবাদ প্রসঙ্গে পদ্মপুরাণের এই শ্লোকসমূহ উদ্ধার করে বলেছেন, বৈদান্তিকগণের মধ্যে যে মায়াবাদ নির্দিষ্ট আছে, তা আস্তিক শাস্ত্র নয়, নাস্তিক শাস্ত্র। নিখিল জগতের নাশই এর লক্ষ্য। বাস্তবিক ইহা অবৈদিক।
"পদ্মপুরাণের এই বচনগুলি কল্পিত নয়। যদি কল্পিত হত তবে ব্রহ্মমীমাংসা ও সাংখ্যসূত্রাদির ভাষ্যকার পণ্ডিতপ্রধান বিজ্ঞানভিক্ষু স্বীয় ভাষ্যে সেগুলি উল্লেখ করতেন না।"

​৩) ঔপচারিক ভেদাভেদবাদী ভাস্করাচার্য (নবম শতক) বৈষ্ণব ছিলেন না। তিনি মূলতঃ অভেদবাদী এবং ভেদকে ঔপাধিক বা সাময়িক বলেন। অথচ তিনি তাঁর ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্যে ১।৪।২৫-তে শাঙ্করমতকে "বৌদ্ধমতাবলম্বী মায়াবাদ", "ব্রহ্মসূত্রের অর্থ আচ্ছাদক" প্রভৃতি বলেছেন; একাধিকবার "প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ" বলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন: "বিচ্ছিন্নমূলং মহাযানিকবৌদ্ধগাথায়িতং মায়াবাদং" অথবা "যে তু বৌদ্ধমতাবলম্বিনো মায়াবাদিনস্তেহপি" প্রভৃতি।

#সিদ্ধান্ত:
​পদ্মপুরাণের শ্লোকগুলি বৈষ্ণবরা প্রক্ষিপ্ত করেননি।

▒ পূর্বপক্ষ- ৩: ▒
​বৈষ্ণবরা শঙ্করাচার্য্যের নিন্দা করার জন্য কেবলাদ্বৈতবাদকে ঈর্ষাবশতঃ "মায়াবাদ" বলে থাকেন।

█ খণ্ডন: █

​আচার্য শঙ্করের মতবাদের নাম "মায়াবাদ"। এটি কোন ঈর্ষামূলক উক্তি নয়। বরং আচার্য শঙ্করের অনুগত টীকাকাররাই অদ্বৈতবাদকে "মায়াবাদ" বলেছেন। প্রমাণ—

১) নবম শতাব্দীর অদ্বৈতবাদী আচার্য বাচস্পতি মিশ্র। ইনি আচার্য শঙ্করের ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্যের ভাষ্য রচনা করেছিলেন। সেটির নাম "ভামতী"। বাচস্পতি মিশ্র "ভামতী"-র ২।১।২৯ এ "মায়াবাদিনামিত্যাহ" বা "আমরা মায়াবাদী বেদান্তী" বলে নিজেদের চিহ্নিত করেছেন (চৌখাম্বা প্রেস সংস্করণ)। ২।১।২৮ সূত্রের ভাষ্যে "অনেন স্ফুটিতো মায়াবাদঃ" বলে অদ্বৈতবাদকে "মায়াবাদ" বলেছেন। ৪।১।১৫ সূত্রের ভাষ্যেও "মায়াবাদিনশ্চ" কথাটি ব্যবহার করেছেন।

২) ​বেদান্ত সূত্রের "রত্নপ্রভা" টীকাকার অদ্বৈতমতাবলম্বী শ্রীপাদ গোবিন্দানন্দ ২।১।২৯ সূত্রের টীকায় অদ্বৈতবাদকে "মায়াবাদ" বলেছেন: "উক্তং হি মায়াবাদে"। ২।১।২৮ ভাষ্যে "মায়াবাদং স্ফুটয়তি সূত্রকারঃ" বলে স্পষ্টতই অদ্বৈতবাদকে মায়াবাদ বলেছেন।

​ #সিদ্ধান্ত:
​আচার্য শঙ্কর প্রচারিত অদ্বৈতবাদই "মায়াবাদ"। সমস্ত প্রাচীন বৈদান্তিক ও অবৈদান্তিক দার্শনিক "মায়াবাদ" বলতে অদ্বৈতবাদকেই বুঝিয়েছেন।

লেখক—
শ্রীমান অরিন্দম সরকার

সম্পাদনা—
Hayagriva Book Trust

Address

12 Dayaganj Road, Gendariya
Dhaka
1100

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Hayagriva Book Trust posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share