04/12/2025
পর্ব #৩
পরদিন শহরটা অদ্ভুতভাবে একই ছিল, তবুও কেমন যেনো একই ছিল না।
যারা সেদিন মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীল পাগড়ির মানুষটাকে দেখেছিল, তারা নিজেদের অজান্তেই একটু ধীরে হাঁটছিল।
রাস্তার চায়ের দোকান, ফুটপাতের বইওয়ালা, ভিড়ের তাড়া - সব যেন পুরোনো তালেই চলছিল,
কিন্তু তাদের ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি বদলটা টের পেল সেই যুবক, যে সেদিন প্রথম প্রশ্নটা করেছিল- “আপনি কাউকে খুঁজছেন?”
সেদিন রাতে সে ঘুমাতে পারেনি।
লোকটির কথাগুলো মাথায় এমনভাবে আটকে ছিল যেন কেউ ভেতরে একটা দরজা খানিকটা খুলে রেখে গেছে।
ভোররাতে সে বাইরে বের হলো। শহর তখনো জেগে ওঠেনি।
রাস্তা ফাঁকা, বাতাস ঠান্ডা, আর আকাশে একটা নরম নীলচে আলো ছড়িয়ে ছিল।
মোড়টায় পৌঁছাতেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো -
যেন সেই মানুষটা এখানেই ছিল কয়েক মুহূর্ত আগে।
বাতাসে হালকা গন্ধ, অদৃশ্য কোনো উষ্ণতা, আর শব্দহীন একটা টান।
ঠিক তখনই পিছন থেকে কেউ বলল,
“তুমি তো আবার এসেছ।”
চমকে সে পিছনে ঘুরল।
দেখল একজন বয়স্ক মানুষ চা বানাচ্ছে।
ফুটপাথের ছোট দোকান, পরীক্ষার খাতার মতো ভাঁজপড়া চেয়ার, আর চুলার লাল আগুন।
“আপনি কি কাল তাঁকে দেখেছিলেন?”
যুবক জিজ্ঞেস করল।
বুড়ো মানুষটা গভীরভাবে তার দিকে তাকাল।
তার চোখে এমন এক শান্তি ছিল, যা সাধারণ দোকানদারের চোখে থাকে না।
“হ্যাঁ,” সে বলল, “আমি বহুবার দেখেছি তাঁকে।”
যুবক অবাক হয়ে বলল,
“বহুবার? তিনি তো… এই শহরের নন।”
বুড়ো একটা ছোট্ট হাসি দিল।
অনেকটা সেই নীল পাগড়িওয়ালা লোকটির হাসির মতো।
“এ শহরের নয় -
তাই তো তাকে বারবার দেখা যায়।
যারা ভিড়ের বাইরে দাঁড়াতে পারে,
তাদের কখনো পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা যায় না।”
যুবক থমকে গেল।
- “মানে?”
চা-ওয়ালা কাপের ভেতরে ধোঁয়া উঠাতে উঠাতে বলল,
“মানুষ ভাবে সে মানুষটাকে দেখে ফেলেছে।
আসলে সে নিজের একটা লুকানো অংশকে দেখে ফেলে।
প্রতি শহরে, প্রতি ভিড়ে একটা এমন আত্মা থাকে,
যে মাঝে মাঝে নেমে আসে কাউকে কিছু বলতে।”
যুবকের শরীরে কাঁপুনি উঠল।
“তাহলে… তিনি আবার আসবেন?”
বুড়ো শান্তভাবে বলল,
“যখন সময় হবে।
আর সময় হলে তুমি চিনে ফেলবে।
কারণ তখন তোমার ভেতরেও একটা আলো জ্বলে উঠবে -
যে আলো দেখে সেই মানুষরা ফিরে আসে।”
বাতাস আবার নড়ে উঠল।
যুবক অনুভব করল -
আজকের সকালটাও সাধারণ সকাল নয়।
লোকটি কোথায় আছে, কবে ফিরবে -
এসব আর এত গুরুত্বপূর্ণ লাগল না।
কারণ শহরের কোথাও,
খুব কাছেই,
একটি গল্প আবার শুরু হতে যাচ্ছে।
আর যে গল্প শুরু হয় নীরবতার ভেতর -
তার শেষ কখনো সাধারণ হয় না।