01/01/2026
পর্ব #৭
“যে কথা রাখতে পারবে না, সে কথা দিও না। কারণ তোমার সেই একটা কথার ওপর ভরসা করেই হয়তো কেউ তার পুরো জীবনটা সাজাচ্ছে।”
- সেদিন চায়ের দোকানে ভিড় কিছুটা কম। নীল পাগড়িওয়ালা মানুষটা গল্প বলছিল। কোনো ভারী উপদেশ না, কোনো তাত্ত্বিক কথা না। খুব সাধারণ, অথচ হাড়হিম করা একটা গল্প।
সে ধীর গলায় বলল, “ধরো, তুমি কাউকে ভালোবাসছো। তুমি তাকে এমনভাবে রাখছো যেন তুমি সবসময় থাকবে। তোমার কথা, তোমার যত্ন, তোমার উপস্থিতি সব মিলিয়ে তুমি তাকে একটা মিথ্যে নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে ফেলেছ।”
মানুষটা থামল। চায়ের কাপের টুং টাং শব্দ তখন আর কানে আসছে না।
“সে তখন ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে। সে তার নিজের ভবিষ্যৎ সাজাতে থাকে তোমাকে মাথায় রেখে। সে হয়তো তার জীবনের অন্য সব দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়। অন্য সব সম্ভাবনাগুলোকে সরিয়ে রাখে। কারণ? কারণ তুমি তাকে বলেছিলে ‘আমি আছি’।”
নীল পাগড়িওয়ালা মানুষটার গলা নিচু হয়ে এল, যেন কোনো গোপন সত্য ফাঁস করছে, “কথা দেওয়ার মানে শুধু কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করা না। কথা দেওয়ার মানে কারও জীবনের নকশায় হাত দেওয়া।”
পাশে বসা একজন শ্রোতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। “আর যদি একদিন তুমি হঠাৎ সরে যাও? কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে? কোনো দায়িত্ব না নিয়ে?”
তার চোখে তখন কোনো রহস্য ছিল না। ছিল শুধু কঠিন, নির্মম সত্য। “তখন সে শুধু তোমাকে হারায় না। সে নিজের সিদ্ধান্তগুলোকে সন্দেহ করতে শুরু করে। নিজের বিচারবুদ্ধিকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়।”
সে বলল, “সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানো? সে আর কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না। কারণ একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে, মানুষ শুধু অন্য মানুষকে না নিজেকেও সন্দেহ করতে শুরু করে।”
হাওয়ায় তখন একটা পরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারী, শান্ত, বিষাদগ্রস্ত। নীল পাগড়িওয়ালা মানুষটা উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে শেষ কথাটা বলে গেল,
“ভালোবাসা মানে শুধুই প্রতিশ্রুতি দেওয়া না। ভালোবাসা মানে যে প্রতিশ্রুতি দিলে, তার ওজন বোঝা। যেটা রাখতে পারবে না, সেটা বলো না। কারণ কেউ হয়তো তোমার ওই হালকা কথার ওপর ভর করেই বাঁচতে শেখে।”
সে চলে গেল। আর রেখে গেল একরাশ নিস্তব্ধতা।
আমরা যারা বসে ছিলাম, প্রত্যেকে নিজের ভেতরে হিসাব করতে শুরু করলাম - আমরা কতবার অবলীলায় কথা দিয়েছি, আর অন্য কেউ সেটা কতটা গুরুত্ব দিয়ে বুকে আগলে রেখেছিল !!
#সত্যেরপথ #আত্মারকথা #নীলপাগড়িওয়ালা
#নীরবগল্প #যখনকেউদেখেনা #ভেতরেরআলো