16/07/2026
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখনও নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে ভোগেন। কিন্তু যদি বলা হয়, নদী, সমুদ্র বা ভূগর্ভস্থ জল ছাড়াই শুধু বাতাস থেকে প্রতিদিন হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানীয় জল তৈরি করা সম্ভব? ঠিক এমনই এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন ২০২৫ সালের রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি। বিশেষ আণবিক পদার্থ ব্যবহার করে তৈরি এই যন্ত্র বাতাসের জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে তা পানযোগ্য জলে রূপান্তরিত করে।
মাত্র ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি যন্ত্র প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ লিটার জল উৎপাদন করতে পারে, আবার আরও বড় সংস্করণে সেই পরিমাণ পৌঁছতে পারে ৪,০০০ লিটার পর্যন্ত। কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি? কেন এটি সমুদ্রের জল বিশুদ্ধ করার প্রচলিত পদ্ধতির থেকে আলাদা? আর কেন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে জলসংকটে ভোগা বিশ্বের জন্য এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী সমাধান? জেনে নাও এই প্রতিবেদনে।
---
পৃথিবীর বহু অঞ্চলে এখনও নিরাপদ পানীয় জলের অভাব বড় সমস্যা। রাষ্ট্রসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২২০ কোটি মানুষ এখনও নিরাপদ পানীয় জলের নির্ভরযোগ্য সুবিধা পান না। সেই সমস্যার সমাধানে নতুন দিশা দেখাচ্ছেন ২০২৫ সালের রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের এই অধ্যাপক এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা অ্যাটোকো এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছে, যা সমুদ্র, নদী বা ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর না করে বাতাস থেকেই বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহ করতে পারে। মাত্র ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেনারের সমান আকারের এই যন্ত্র প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১,০০০ লিটার, অর্থাৎ প্রায় ২৬৫ থেকে ২৭০ গ্যালন বিশুদ্ধ জল তৈরি করতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তির মূল শক্তি লুকিয়ে আছে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক, সংক্ষেপে এমওএফ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের ছিদ্রযুক্ত পদার্থে। এগুলিকে অনেকেই আণবিক স্পঞ্জ বলেও ব্যাখ্যা করেন। বাতাসের মধ্যে যত সামান্য জলীয় বাষ্পই থাকুক না কেন, এমওএফ সেই অণুগুলিকে নিজের অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্রের ভিতরে আটকে রাখতে পারে। পরে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মতো খুব কম তাপ প্রয়োগ করলেই সেই জলীয় বাষ্প বেরিয়ে আসে এবং ঘনীভূত হয়ে বিশুদ্ধ জলে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অত্যন্ত বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। এমনকি সূর্যের তাপ বা কম মানের তাপশক্তি ব্যবহার করেও এই ব্যবস্থা চালানো সম্ভব।
এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা হল, এটি প্রচলিত সমুদ্রের জল মিষ্টি করার পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল নয়। সমুদ্রের জল বিশুদ্ধ করতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে এবং সেই সঙ্গে তৈরি হয় অতিরিক্ত লবণাক্ত বর্জ্য, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এমওএফ-ভিত্তিক এই যন্ত্রে এমন কোনও লবণাক্ত বর্জ্য তৈরি হয় না। পাশাপাশি এমওএফ মূলত জলের অণুকেই আকর্ষণ করে, ফলে বাতাসে থাকা বহু দূষিত কণা, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক বা অন্যান্য অশুদ্ধ পদার্থ ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। প্রয়োজনে পরে প্রয়োজনীয় খনিজ মিশিয়ে সেই জল পানযোগ্য করা যায়।
অ্যাটোকোর তৈরি এই যন্ত্র এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে এটি বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়াও কাজ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘ খরা বা কেন্দ্রীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও এই প্রযুক্তি দূরবর্তী এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের উৎস হয়ে উঠতে পারে। মরুভূমি, ছোট দ্বীপ, দুর্গম গ্রাম, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল, শরণার্থী শিবির কিংবা হাসপাতালের মতো জায়গায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। সংস্থাটি আরও বড় একটি বাণিজ্যিক সংস্করণও তৈরি করছে, যা প্রতিদিন প্রায় ৪,০০০ লিটার জল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
ওমর ইয়াঘির কাছে এই আবিষ্কার শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, ব্যক্তিগত জীবনেরও এক গভীর অভিজ্ঞতার ফল। জর্ডানে একটি শরণার্থী পরিবারে তাঁর শৈশব কেটেছে, যেখানে বাড়িতে নিয়মিত জল বা বিদ্যুৎ ছিল না। সপ্তাহে একবার, কখনও আবার দুই সপ্তাহে একবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য জল আসত। সেই সময় পরিবারের সবাই মিলে যত পাত্র ছিল, সব ভরে রাখতে হতো। শৈশবের সেই জলসংকটই তাঁকে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরির স্বপ্ন দেখায়, যা পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে মানুষের নিজের জলের উৎস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
এই আবিষ্কারের পিছনে দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে কম আর্দ্রতার বাতাস থেকে জল সংগ্রহের ক্ষমতা প্রথম পরীক্ষায় দেখানো হয়। ২০১৮ সালে সূর্যের তাপে চলা পরীক্ষামূলক যন্ত্র সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়। ২০১৯ সালে মরুভূমিতে প্রতিদিন প্রায় ১ লিটার জল উৎপাদনকারী সংস্করণ তৈরি হয়। ২০২৩ সালে সম্পূর্ণ বাহ্যিক শক্তি ছাড়া কাজ করা ছোট বহনযোগ্য মডেল তৈরি হয়। এরপর ১২ মে ২০২৬-এ অ্যাটোকো তাদের বড় বাণিজ্যিক প্রোটোটাইপ প্রদর্শন করে, যা বাতাস থেকেই বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানীয় জল সংগ্রহের সম্ভাবনাকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।