27/08/2026
মেয়েটার প্রথম বাচ্চা। ব্যথা শুরু হইসে দুপুরের দিকে। সে হাঁটতেসে, বসতেসে, আবার উঠতেসে, আবার শুইতেসে। তার মা পাশে বইসা আছেন। তার স্বামী বাইরের বেঞ্চে, হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাগের ভিতরে বাচ্চার নতুন কাপড় আর একটা কাঁথা। ডাক্তার আসলেন। মিনিট কয়েক দেখলেন। তারপর বাইরে আইসা লোকটাকে বললেন, রিস্ক নেয়া যাইব না, ওটিতে নিতে হবে, সিজার করবো। লোকটা জিগায় নাই কিসের রিস্ক। জিগানোর কথা তার মাথায়ও আসে নাই। তার সামনে একজন মানুষ দাঁড়ায়ে আছে যে জানে, আর সে নিজে জানে না। ওই সাদা শুভ্র এপ্রোনের মানুষটা তখন তার কাছে ঈশ্বরের পরেই। সে একটা কাগজে সই করল। সম্মতি দিলো অপারেশনের। একটু পরে সে বাচ্চার কান্না শুনলো। নার্স আইস্যা বাচ্চাটারে দেখায়ে নিয়ে গেলো লোকটারে। আনন্দের অশ্রু গড়ায়ে পড়লো লোকটার চোখ দিয়া। ফিস ফিস কইর্যা আজান দিলো, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ আল্লাহু আকবার....
বাচ্চাটা কাঁদতেছে। মেয়েটার মা কানতেসেন। লোকটা মিষ্টি আনতে দৌড়াইল।
আমাদের কারো কাছেই এই গল্পটা অস্বাভাবিক লাগে নাই। বরং খুবই স্বাভাবিক লাগসে।
জ্বি না আমার ভ্রাতা ও ভগিনিরা। এইটা একটা অতি অস্বাভাবিক ঘটনা। মাতৃত্ব কোন রোগ না। সন্তান জন্মদানে তখুনি মেডিক্যাল ইন্টারভেনশন লাগে যখন সেটা কোন মেডিক্যাল জটিলতায় পর্যবসিত হয়। সন্তান জন্ম নেবে বাসায় বা মেটারনিটি সেন্টারে, হাসপাতালে না। খুঁজে দেখেন বাংলাদেশে কয়টা মেটার্নিটি সেন্টার আছে।
মেটার্নিটি সেন্টারে প্রশিক্ষিত ধাত্রী থাকবে, যার কাজটাই হইল ওই মেয়েটার পাশে বইসা থাকা, ঘণ্টায় ঘণ্টায় দেখা, ব্যথাটা ঠিকভাবে আগাইতেসে কি না বোঝা, আর মেয়েটার হাতটা ধইরা বলা যে এইটা স্বাভাবিক, এইটা হওয়ার কথা।
কারণ স্বাভাবিক প্রসব ছয় থেকে দশ ঘণ্টার কাজ। দেশে গত বছর প্রায় সতেরো লাখ নারীর পেট কাটা হইসে। হাসপাতালে যত বাচ্চা জন্মায় তার ঊনআশি শতাংশই এখন অপারেশনে, যেইটা দুনিয়ার সর্বোচ্চ। আর এইটা রাতারাতি হয় নাই। দুই হাজার চার সালে এই দেশে সিজারের হার ছিল চার শতাংশ। সতেরো আঠারো সালে তেত্রিশ। বাইশ সালে পঁয়তাল্লিশ। চার থেকে ঊনআশি। বাইশ বছরে। এই দেশে আর কোনো জিনিস এই গতিতে বাড়ে নাই। বিশেষজ্ঞরা বলতেসেন এইভাবে চললে দুই হাজার ত্রিশের মধ্যে এইটা নব্বই ছাড়াবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উনিশশো পঁচাশি সালে বলসিল, কোনো অঞ্চলের হার দশ থেকে পনেরো শতাংশের উপরে থাকার কোনো যুক্তি নাই। সিজারের হার যতক্ষণ দশ শতাংশের কাছাকাছি থাকে ততক্ষণ মা আর নবজাতকের মৃত্যু কমে। তারপর আর কমে না। দশের পরে যত ছুরি চলে, ওই ছুরিগুলা আর কারও জীবন বাঁচায় না।
দুনিয়ার গড় একুশ। ভারতে সাড়ে একুশ, নেপালে আঠারো, পাকিস্তানে বিশের কাছাকাছি। আর আমাদের? সব জন্ম মিলাইয়া, বাড়িতে হওয়াগুলা ধইরাও, পঁয়তাল্লিশ। প্রতিবেশীর দ্বিগুণ। আর যেই মেয়েটা হাসপাতালের দরজা দিয়া ঢোকে, তার জন্য সংখ্যাটা ঊনআশি। মানে আমাদের মেয়েদের শরীর প্রতিবেশী দেশের মেয়েদের শরীর থেকে আলাদা কিছু না। কিন্তু আমাদের হিসাবটা আলাদা।
এখন প্রশ্ন হইল, এত সিজার হয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা নীতিবাক্যে নাই। উত্তরটা একটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আছে।
এই দেশে প্রতিদিন গড়ে দশ হাজার বাচ্চা জন্মায়। আর গাইনোকোলজিস্ট আছেন আড়াই থেকে তিন হাজার। একটা স্বাভাবিক প্রসব ছয় থেকে দশ ঘণ্টার কাজ। একটা সিজার বিশ মিনিটের কাজ। এখন আপনি ওই ডাক্তারের জায়গায় বসেন। রাত নয়টা। আপনার চেম্বারে আরও এগারোজন রোগী বসা। কাল সকালে আপনার দুইটা অপারেশন। আপনি কি এই মেয়েটার পাশে সকাল ছয়টা পর্যন্ত বইসা থাকবেন, বিনা পয়সায়, শুধু এই আশায় যে বাচ্চাটা নিজের রাস্তায় নিজে বাইর হইব?
আপনি থাকবেন না। কেউ থাকবে না। আর আপনি পারবেনও না। এতো গাইনেকোলজিস্ট নাই বাংলাদেশে। আর ক্লিনিকের মালিকের হিসাবটা আরও সহজ। স্বাভাবিক প্রসবে ক্লিনিকের আয় প্রায় শূন্য। বিছানা আটকায়ে থাকে দশ ঘণ্টা, বিল ওঠে সামান্য। আর সিজারে ওটি চার্জ, অ্যানেস্থেসিয়া চার্জ, সার্জন ফি, তিন দিনের কেবিন। সিজারের খরচ স্বাভাবিক প্রসবের প্রায় পাঁচ গুণ।
তাহলে ক্লিনিকটা কোনটা বেচবে?
এইটা কোনো ষড়যন্ত্র না। কেউ ঘরে বইসা প্ল্যান করে নাই যে দেশের মেয়েদের পেট কাইটা ফালাইব। এইটা স্রেফ ইনসেন্টিভ। যেই ব্যবস্থায় ধৈর্যের কোনো দাম নাই আর ছুরির দাম আছে, সেই ব্যবস্থায় ছুরিই চলবে। ডাক্তারকে গালি দিয়া এইটা থামবে না। যতক্ষণ ওই দশটা ঘণ্টা কারও চাকরির অংশ না হইতেসে, ততক্ষণ থামবে না। আর ওই দশটা ঘণ্টা যার চাকরির অংশ হওয়ার কথা, তাকে আমরা তৈরিই করি নাই।
সারা দুনিয়ায় স্বাভাবিক প্রসব সামলান ধাত্রীরা, গাইনোকোলজিস্ট না। গাইনোকোলজিস্ট লাগে জটিলতা হইলে। এই দেশে প্রশিক্ষিত ধাত্রী আছেন আট হাজার ছয়শ ছেচল্লিশ জন। তার মধ্যে সরকারি চাকরিতে আছেন দুই হাজার পাঁচশ সাতান্ন জন। দশ হাজার বাচ্চার জন্য দুই হাজার পাঁচশ সাতান্ন জন। দরকার অন্তত বাইশ হাজার। আমরা পদটাই বানাই নাই। তারপর অবাক হই পেট কাটা হইতেসে কেন।
এইবার সবচেয়ে জরুরি কথাটা। সিজার হইলে বাচ্চাটার কী ক্ষতি হয়।
আমাদের শরীরে উপকারী জীবাণুর একটা গোটা জগত আছে। মুখে, পেটে, চামড়ায়, এমনকি ফুসফুসে। এইটার নাম মাইক্রোবায়োম। এই জীবাণুগুলা আমাদের খাবার হজম করায়। ক্ষতিকর জীবাণুর সাথে লড়ে। আর সবচেয়ে বড় কাজটা হইল, এরা আমাদের শরীরকে শিখায়। আমাদের শরীরের নিজের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী আছে। ডাক্তারি ভাষায় এইটার নাম ইমিউন সিস্টেম। এই বাহিনীটা জন্মের সময় কিছুই চেনে না। কোনটা শত্রু আর কোনটা না, এইটা তারে কেউ শিখাইয়া দিতে হয়। শিখায় ওই জীবাণুগুলাই। আর ক্লাসটা হয় জীবনের একদম প্রথম দিনগুলাতে।
মায়ের পেটের ভিতরে বাচ্চা থাকে প্রায় জীবাণুশূন্য একটা জায়গায়। তাহলে সে এই বন্ধু জীবাণুগুলা প্রথম পায় কই?
পায় জন্মের সময়। মায়ের যোনিপথে ওই জীবাণুগুলা থাকে। বাচ্চা যখন ওই পথ দিয়া বাইর হয়, তখন ওইগুলা তার গায়ে, মুখে, নাকে লাইগা যায়। ওইটাই তার প্রথম টিকা। কেউ ওইটার দাম নেয় না, কেউ ওইটা প্রেসক্রাইব করে না। এইটা খোদাতায়ালার দান। আমাদের শিরীর এইভাবেই ডিজাইন করা।
সিজারের বাচ্চা ওই পথটা দিয়া আসে না। সে প্রথমে পায় অপারেশন থিয়েটারের জীবাণু আর যেই হাত তাকে ধরল তার জীবাণু। মায়ের শরীরে জীবানু না অন্য কারো জীবানু। এইটা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে জীবনের প্রথম প্রহরেই ব্যাড়াছ্যাড়া কইর্যা ফেলে।
এই দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশ শিশু খর্বকায়। আমরা ভাবি এইটা শুধু কম খাওয়ার ফল। না। শরীরের ভিতরের জীবাণু আর ইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হইয়া গেলে খাওয়া খাবারটাও কাজে লাগে না। দুনিয়ার পুষ্টিবিজ্ঞানে এখন সবচেয়ে আলোচিত জিনিসটাই এইটা। মানে আমরা একদিকে পুষ্টি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ঢালতেসি, আর অন্যদিকে জন্মের ওই বিশ মিনিটে বাচ্চাটার হজম আর প্রতিরোধের ভিতটাই ধ্বংস কইর্যা দিতেসি।
মা স্থিতিশীল আছেন, বাচ্চা স্থিতিশীল আছে, শুধু ব্যথাটা ধীরে আগাইতেসে, এইটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সিজার করার কোনো কারণই না। প্রসবের জন্য সময় লাগে। সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। আমরা সময়টাকেই রোগ বানায়ে ফেলসি।
তারপর টাকা। শুধু আঠারো সালেই এই দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারিতে খরচ হইসিল প্রায় চার হাজার সাতান্ন কোটি টাকা। ওইটা আঠারো সালের হিসাব, আর তখন হার ছিল আজকের অর্ধেকের নিচে। এই টাকাটা সরকারের বাজেট থেকে যায় নাই। এই টাকাটা গেছে ওই লোকটার পকেট থেকে যে বাইরের বেঞ্চে পলিথিনের ব্যাগ নিয়া বইসা ছিল। জমি বেচা টাকা, ধার করা টাকা, এনজিওর কিস্তির টাকা।
এখন ওই ঘরটাতে ফিরা যাই।
মেয়েটা এখন বাড়িতে। পেটে একটা দাগ। কয়েক বছর পর তার আরেকটা বাচ্চা হবে, আর ওইটাও সিজার হবে, কারণ এই দেশে একবার কাটা মানে সারা জীবন কাটা। চিরজীবনের জন্য বান্ধা কাস্টমার। কী চমৎকার।
স্বাভাবিক জন্মের ওই মুহূর্তে একটা মা তার বাচ্চাকে যেই জিনিসটা দেয়, ওইটার কোনো বিল হয় না। কোনো ফার্মেসিতে ওইটা বিক্রি হয় না। কোনো ডাক্তার ওইটা প্রেসক্রাইব করতে পারেন না। ওইটা দুনিয়ার একমাত্র জিনিস যেইটা শুধু মায়ের কাছেই আছে। আমরা সেই খোদাতায়ালার কুদরত থিকা বাচ্চাটারে বঞ্চিত করতেছি। কিন্তু অবাক ব্যাপার দেখেন, ওই মেয়েটা সারাজীবন ওই ডাক্তারের জন্য দোয়া করবে। বিশ্বাস কইরা যাবে ওই ডাক্তার, ওই হাসপাতাল তার বাচ্চাটাকে বাঁচাইসিলো।