01/09/2025
আনিস বাক্স-পেটরা আর একগাদা বই নিয়ে হলে চলে যাচ্ছে। সে হলে সিট পেয়ে গেছে। জনে জনে পা ছুঁয়ে সালাম করতে করতে আনিস গেলো বড় চাচার ঘরের সামনে... বড় চাচার দরজার সামনে দাড়িয়েই সবকিছু গোলমাল হয়ে গেলো। আনিস যে কাজ কোনদিন করে নি, সেটাই করে বসলো। আনিসও চুপিচুপি দরজার ফুটো দিয়ে উঁকি মারলো। সাথে সাথে বড় চাচা ফুটো দিয়ে পিচকারীতে কালো কালি মেরে দিলেন। আনিসের চশমার এক চোখ আর গাল কালো হয়ে গেলো... আনিস কিছুই না বুঝে বড় চাচাকে সালাম করে চলে গেলো।
পরের দৃশ্যে দেখা যায় আনিস আর মতি একসাথে কুয়ার পাড়ে বসে কালি ধুয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যকার কথোপকথন-
- এই অবস্থায় হলে যাওয়া ঠিক হবে না। তাই না মতি ভাইয়া??
- যাইতে পারেন। বোরখা পইরা যাইতে পারেন।
- বোকার মতো কথা বলছো কেনো? ছেলেরা কি বোরখা পরে!?
- এইটা একটা জ্ঞানের কথা বলছেন!
- আচ্ছা মতি ভাইয়া, কালিটা লাগলো কি করে...!?
এমন সময় কঙ্কা আর তিতলী আগমন। কঙ্কা আনিসকে জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে...?"
উত্তরে আনিস বলে, "বুঝতে পারছি না। হলে যাচ্ছিলাম। বড় চাচার সাথে দেখা করতে গিয়েছি, ফুটো দিয়ে তাকিয়েছি, তারপর থেকে এই অবস্থা। আর হলে যাচ্ছি না।"
কঙ্কা আর তিতলী দুজন'ই আনিসের হলে না যাওয়ার সংবাদ শুনে অসম্ভব খুশি হয়... সাথে সাথে বেজে ওঠে মাকসুদ জামিল মিন্টুর মিউজিকে হাসন রাজার 'নিশা লাগিলো রে' গানের ইন্সট্রুমেন্টাল। পৃথিবীতে কোন পরিচালক টিভির জন্য বানানো ড্রামা সিরিজকে এতো নিখুঁতভাবে বানিয়েছেন কি না আমার জানা নেই... 'আজ রবিবার', সবাইকে রবিবারের শুভেচ্ছা।
হুমায়ূন আহমদের নাটকে 'মতি মিয়া' চরিত্র মানে বরাবরই উচ্চমার্গীয় দার্শনিক। কুয়ার পাড়ে ফুলি বসে থালা বাসন ধুচ্ছিলো। মতি এসে পাশে বসলো। ফুলি লজ্জা পেয়ে বললো," সইরা বসেন.. আপনি দেখি এক্কেবারে কোলে বইসা পড়সেন।"
মতি উঠে হেঁটে দূরে গিয়ে বসবে।
ফুলিঃ ও আল্লাহ্...! তাই বইলা হিন্দুস্তান চইলা যাইবেন...!?
- চুপ থাক...! তোর কাছে বওনের আমার ঠ্যাকা পড়সে...!
-এই...! তুই-তোকারি করেন ক্যান...??
- আমার ইচ্ছা... মতি মিয়া নিজের ইচ্ছায় চলে.. অন্যের ইচ্ছায় চলে না...!
- ওরে বাপ রে...! আফনে দেখি বিরাট ইচ্ছাওয়ালা...!
এরপর মতি উঠে দাঁড়িয়ে লাথি মেরে প্লেটগুলো সব ভেঙ্গে ফেলে দেয়... সে এক মহাজাগতিক দৃশ্য!
মতি ঘর থেকে পালিয়ে গেছে রাতে। সবাই ভেবেছে মতি কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাড়ির মানুষজন জেলও খেটে ফেলেছে। পরদিন সকালে দেখা যায় মতির এসব নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ইব্রাহীমের দোকানে চা খেতে খেতে ইব্রাহীমকে জিজ্ঞেস করছে, "ইব্রাহীম ভাই জীবনটা কি কন দেখি??
-জানি নাহ।
- জীবনটা হইলো একটা কুয়া। দুঃখের কুয়া। যার যতো দুঃখ... তার কুয়া ততো গহীন। আমার কুয়ার কোন তলই নাই।
এমন সময় ফুলি এসে বলে, "এই যে ভদ্রলোক, চা খাইতেসেন?"
- জে খাইতেসি। ক্যান অসুবিধা?? নিজের পয়সায় খরিদ কইরা খাইতেসি!"
- আফনের খবর আছে। বিচার বসছে।
- কিসের বিচার?
- আফনের জন্যে বাড়ির হক্কলে যে জেল খাটসে, সেই বিচার।
ফুলি চলে যাবার পর মতি ইব্রাহীম মিয়াকে বলে, "দেখি আরেক কাপ দেন। বিচার বসছে...! বিচার! মতি মিয়া বিচারের ধার ধারে না। মতি মিয়া কি জিনিস, আইজ সবাই বুঝবো। আইজ একটা বিরাট ফাটাফাটি হইবো। মুখের উপরে চাকরি ছাইরা দিয়া ফুলির হাত ধইরা বাইর হইয়া যাবো... হে... বিচার বসছে!"
ঠিকই পরের দৃশ্যে মতি বিরাট ফাটাফাটি বাদ দিয়ে বড় চাচার হাতে চড় খাওয়ার জন্য মুখ বাড়িয়ে দেয়। চড় দেয়ার আগে বলে, "আস্তে মাইরেন বড় চাচা... আফনের চড়ের কোন আন্দাজ নাই...!"
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। তিতলী গান ধরেছে, "ভ্রমর কইও গিয়া..." এমন সময় আনিস এসে বলে, "আচ্ছা ভাইয়া, তোমরা গান বাজনাগুলো রাত দুপুরে করো কেনো...?? একটা মানুষকে পড়াশুনা করতে দেবে না...!?"
কঙ্কা বলে, "আজ পূর্নিমা আকাশে এত্তোবড় একটা চাঁদ উঠেছে।"
- পূর্ণিমা রাতে চাঁদ তো উঠবেই! এটাই স্বাভাবিক... নতুন তো কিছু নয়। তাছাড়া চাঁদ এত্তোবড় হয় না.. 'এতোটুকু' হয়। (আনিস হাত দিয়ে দেখাবে)
- আমরা ঠিক করেছি ছাদে উঠবো। চাঁদ দেখবো। আপনি উঠবেন...??
- চাঁদ তো জানালা দিয়ে দেখা যায়। সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে উঠতে হবে কেনো...?? কষ্ট হবে না??
তিতলি জিজ্ঞেস করলো, "সুন্দর জিনিস আপনার দেখতে ইচ্ছে করে না...??"
- চাঁদ তো আগেও দেখেছি। এমন তো নয়, যে কোনদিন দেখি নি!
এসব দৃশ্য 'আজ রবিবার' নাটকের দর্শকদের মুখস্ত। যারা দেখে নি, তাঁরা দৃশ্যগুলোর ডেপথটা ঠিক ধরতে পারবে না। আনিসকে নিয়ে বড় চাচার কফিন চিকিৎসা... সে কফিনের দরজা আঁটকে যাবার পর দরজা খোলার জন্য লোক আনতে পাঠানো, আনিসকে কঙ্কা-তিতলীর সাপ দিয়ে ভয় দেখানো, আনিসের বারবার সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পিছলে পড়ে যাওয়া... এগুলো গোল্ড। কোন রিপ্লেসমেন্ট নেই।
নাটকের শুরু হতো হাসন রাজার 'কানাই তুমি খেইর খেলো ক্যানে' গানের ইন্সট্রুমেন্টাল দিয়ে। নাটক শুরু হবার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশ স্তব্ধ। সবাই একসাথে ড্রয়িংরুমে... গ্রামগঞ্জে নেমে যেতো নিশুতি রাত। কারেন্ট গেলে মোটর সাইকেল নিয়ে কেউ কেউ ব্রীজের মোড়ে আনতে যেতো ব্যাটারি। নাটকটা মিস দেওয়া যাবে না... তখন পুনঃপ্রচার বলে কিছু ছিলো না। মিস মানে মিস। সেই দিনের উন্মাদনা এখন খুঁজে না পাওয়া গেলেও ইউটিউবে 'আজ রবিবার' নাটকটা দেখে নিতে পারেন। বিষয়টা পরিষ্কার হবে।
'হুমায়ূন আহমেদ' মানুষটা খুব রহস্যময় ছিলেন... অদ্ভূতভাবে নিজের পছন্দগুলো ঢুকিয়ে দিতেন মানুষের মনের মধ্যে। হুমায়ূন আহমেদ তেমনি হাসন রাজাকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছেন আমাদের মাঝে... মেকিং, স্টোরি আর নাটক রচনা নিয়ে যদি কিছু বলতে হয়, একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি... 'আজ রবিবার' যদি কোন নেটফ্লিক্স মিনি সিরিজ হতো আজকের দিনের, এটার আশেপাশে আসার মতো শুধু আরেকটা মিনি সিরিজ থাকতো, 'কোথাও কেউ নেই'।
হুমায়ূন আহমেদের জন্য ভালোবাসা। যিনি আমাদের পরিবারগুলোকে একসাথে ড্রয়িংরুমে সবাই বসে টিভি দেখার সেই সোনালী দিনগুলো দিয়ে গেছেন। যে কিশোর বা কিশোরী তাঁর কৈশোরে হুমায়ূন আহমেদকে পেয়েছে, তাঁর জীবন অবশ্যই সুন্দর। তাঁর জীবনে 'বিশ্রী' বলে কিছু নেই।