10/09/2024
যখন ছোট ছিলাম আমার প্রায় সব বন্ধুদের একটা করে টিনের পিস্তল ছিলো।
তারা এগুলো দিয়ে গুলাগুলি খেলতো।
আমি অযথাই এদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করতাম,একবার ধরতে দিবে,অথবা কিছু সময়ের জন্য হাতে দিবে এই আশায়। কত আশা ছিলো এই ঈদে না হোক,সামনে ঈদে কিনবই কিনব একটা টিনের খেলনা পিস্তল।
কিন্তু বিশ্বাস করেন।
সেই ঈদটা আমার জীবনে আসেনি, কখনোই এই স্বপ্ন আমার পুরন হয়নি।
বিটিভিতে উমর সানীর একটা ছবি দেখেছিলাম শৈশবে। এক জাতীয় স্টিলের বাঁশি ছিলো,উমর সানী সেই বাশি বাজিয়ে নায়িকার স্মৃতি ফেরাতো, এক হাতে বাজানো হতো সেই বাঁশি । সেই সময় প্রায় সব বাচ্চাদের মুখে এই বাঁশি বাজত। আমি খুব করে মার আচলে ধরে কান্নাকাটি করলাম। কিন্তু কেনা হলোনা এই বাশিটিও।
অনেক দিন জুতা ছারা মাদ্রাসায় গিয়েছি।
একদিন হটাৎ আমাকে চমকে দিয়ে বাবা জুতা নিয়ে আসলেন,সারারাত জুতা পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছি। সকালে উঠে জুতা পড়ে মাদ্রাসায় গেলাম। কিযে আনন্দ লাগছিলো,নিজেকে বড়লোক বড়লোক মনে হচ্ছিল।
সেদিনই জুতা জোরা হারিয়ে গেলো।
মা'র মাইরের ভয়ে সারাদিন বাড়িতে আসিনি।
সারাদিন চোখে জুতা গুলো ভেসেছিলো।
এমন বহু দরিদ্রতার করাঘাতের ঘটনা আমাদের ভাইবোনের জীবনে আছে।
বাবা কল শ্রমিক ছিলো। বড় সংসার, খাবার জোটানোই কষ্ট সাধ্য ছিলো।
আমরা কতটা গরীব ছিলাম একটা ঘটনা বললে বুঝবেন হয়ত।
বাবা চাউল নিয়ে আসলে মা রান্না করবেন, আমরা চার ভাইবোন দুপুরে না খাওয়া, মা বিকেল পর্যন্ত বাবার জন্য অপেক্ষা করে পাশের বাড়ি থেকে চাউল নিয়ে এসে ভাত রান্না করলো, মা ভাতের পাতিল চুলায় রেখে ঘরে আসলেন কি কাজে, গিয়ে দেখেন কুকুর পাতিল ফেলে ভাত খাচ্ছে।
সেই দিনের কষ্টের কথা আর কখনো ভুলা হবেনা এজীবনে।
যত বড় হয়েছি তত বুঝতে পারতাম আমরা গরীব।
এক পর্যায়ে আর কোন কিছুর সখ ভিতরে জাগ্রত হতোনা।
এভাবে কষ্টের ভিতর আমি মাদ্রসায় পড়লাম।
বড় বোনের বিয়ে হলো। দুলাভাই ছিলো প্রবাসী।
তিনি ছোট ভাইকেও সেখানে নিয়ে গেলেন।
সেই সুবাদে কিছুটা সুখের হাতছানি আমরা দেখলাম।
ছোট্ট একটা মাদ্রাসায় চাকরী নিলাম।
মা বাবা বিয়ে করিয়ে দিলেন।
বৌকে খুব যত্নে আমি আমার পরিবারের কষ্টের কথাগুলো আস্তে আস্তে বললাম,যেন কোনদিন আমার মা বাবার সাথে উঁচু সুরে কথা না বলে।
আলহামদুলিল্লাহ বৌ কোনদিন তাদের সাথে মাথা তুলে কথা বলেনি। একটা পুত্র সন্তানের বাবা হলাম।
এরই মাঝে ছোট ভাই বিয়ে করলো।
আমি সেই ধনী গরীবের জাতাঁকলে আবার পড়ে গেলাম।
ভাই প্রবাসী হবার সুবাদে তার বৌয়ের গায় গতর বড়া অলংকার।
সে এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেনা।
আমার বৌকেই সব কাজ করতে হয়।
যৌথ ফ্যামিলি ছোট ভাই টাকা বেশি দেয়।
আমি কেন কম টাকা দেই সংসারে এ নিয়ে মা আমার বৌকে খোঁটা দেয়।
বলে তারা নাকি আরেকজনের টাকায় এই সংসারে খায়।
এসব কারনে যতটা পারি সংসারে টাকা খরচ করার চেষ্টা করি,কিন্তু কারু চোখেই পড়েনা।
এসব করতে গিয়ে সন্তান কে একটা খেলনা গাড়িও কিনে দেয়া হলোনা।
পাশের বাসার ছোট বাচ্চাটা গাড়ি নিয়ে বের হলে আমার দুই বছরের ছেলে না বুঝে জোর করে গাড়িতে উঠতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে কেঁদে কেঁদে বাড়ি আসে।
আমার সামনে আমার শৈশব পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
নিজের মা যদি কোন ছাড় না দেয় আমি কোথায় যাব বলেন তো?
খুবই লজ্জার সাথে বলছি বৌ অসতর্কতা বশত প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে। প্রথম বাচ্চা সিজারের পর খুব তারাতাড়ি আবার প্রেগন্যান্ট হবার ধরুন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ডাক্তার সম্পুর্ণ রেস্টে থাকতে বললো।
তবুও সাত মাস পর সে খুব ভারি হয়ে পরে।
শাশুড়ী আমার মায়ের কাছে তাকে নিয়ে যেতে অনুমতি চায়। মা আমার কথা বললেন।
শাশুড়ী আমাকে ফোন দেয়। আমি মাকে ফোন দেই, মা বলেন তুরা যা ভাল মনে করস কর, দুই বার মা'র সাথে কথা বলে, নিয়ে যেতে অনুমতি দেই। এখন মা আমার সাথে এবং আমার ওয়াইফের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।
বলেনতু আমি কি করবো?
কি করলে তাদের মন পাব?
এখন সব সময় মাথায় কাজ করে, জীবনে নিজের কোন সখ পুরন হলনা, নিজের সন্তানের জন্য কিছু করতে পারছিনা, বৌকে একটা ফল কিনে খাওয়াতে পারছিনা।
শুধু সবার সাথে মিলে থাকবো বলে।
কিন্তু পৃথিবীর কেউ বুঝেনা কেন?
এখন খুব করে আল্লাহকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, আল্লাহ আমি তোমার কাছে চলে যেতে চাই।
একটা নিশ্চিন্ত ঘুম দিতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে।
cp