30/08/2026
জীবনের শুরু ও শেষ; গল্পে গল্পে জীবনের শিক্ষা
সেদিন এক অদ্ভুত ও গভীর দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। দৃশ্যটি দেখার পর থেকে মনের ভেতর এক গভীর চিন্তার ঝড় বইতে শুরু করেছে। বারবার সেই কথাটাই মনে পড়ছে, ভাবছি, আর ভাবছি,,ভাবনার যেন কোনো শেষ নেই।
দৃশ্যটি ছিল দুজন মানুষের। একজন সদ্যজাত শিশু, যে মাত্র কিছুদিন আগে এই পৃথিবীতে পা রেখেছে। আর তার ঠিক পাশেই শুয়ে আছেন এক জরাজীর্ণ বয়োবৃদ্ধ মানুষ, যাঁর জীবনের সফর একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। তারা দুজন একে অপরের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই মনের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। এই নিয়তির খেলা আমরা প্রতিনিয়ত কত রূপেই না দেখি!
নদীর ঘাটে একজন মানুষ যখন নৌকায় উঠছে, তখন অন্য একজন নৌকা থেকে নেমে বিদায় নিচ্ছে। একজন মানুষ যখন গাড়িতে চেপে বসছে, ঠিক তখনই অন্য একজন গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছে।
কেউ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে আনন্দ করছে, আবার কেউ দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ করে অবসরে যাচ্ছে। এভাবেই তো চলছে দুনিয়া—শুরু আর শেষ, শেষ আর শুরু। কিন্তু এই শুরু আর শেষের মাঝখানের সময়টাতে আমাদের অনুভূতিটা আসলে কী?
সেই নবজাতক আর বৃদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের সেই চাহনি আমার নজর কাড়ল, আমিও যেন সম্মোহিত হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজের অজান্তেই
হারিয়ে গেলাম এক গভীর ভাবনার জগতে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যে শিশুটি সবেমাত্র এই পৃথিবীতে এলো, সে এর আগে কোথায় ছিল? কোন জগৎ থেকে সে এলো? সেই অজানা দুনিয়াটা কেমন ছিল? সেখানে সে কীভাবে দিন কাটাত? আর কেনই বা সে সবকিছু ছেড়ে এই মর্ত্যের পৃথিবীতে চলে আসলো? আমার কৌতূহলী মন যেন এই রহস্যের শেষ দেখতে চায়।
ঠিক একইভাবে, যে বৃদ্ধ মানুষটি আজ চলে যাচ্ছেন, তাঁর জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি এখন কোথায় যাচ্ছেন? কেন যাচ্ছেন? কার সাথে যাচ্ছেন? এই চেনা পৃথিবী ছেড়ে একা একা অচেনা এক পথে পা বাড়াতে তাঁর কি একটুও ভয় করবে না? সেখান থেকে কি আর কোনোদিন ফেরা হবে না? যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে কতদিন থাকতে হবে? সেখানকার পরিবেশ কেমন, আর যাঁদের সাথে দেখা হবে তাঁরাই বা কেমন হবেন?
সেখানে কি তাঁর সাথে সবাই ভালো ব্যবহার করবে? তাঁর খাবার-দাবার, আরাম-আয়েশ—সবকিছু কি আগের মতো সময়মতো মিলবে?
মাথার ভেতর এই ধরণের অসংখ্য প্রশ্ন এসে তীব্র তোলপাড় শুরু করে দিল। ভাবনার জটিলতায় আমি যখন প্রায় খেই হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা, ঠিক তখনই এক আচমকা কথার আওয়াজে আমার চমক ভাঙল। যেন আমার ভেতরের সুপ্ত চেতনা এক নিমেষে জেগে উঠল!
আমি এতটাই অবাক হলাম যে মনে হলো আকাশ থেকে পড়েছি। মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমি আর চেনা পৃথিবীতে নেই, কোনো এক ভিন্ন বা অলৌকিক জগতে বিচরণ করছি। নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! আমি স্পষ্ট দেখতে ও বুঝতে পারলাম—পাশে থাকা সেই সদ্যজাত শিশুটি তার পাশের বৃদ্ধ লোকটির সাথে এক অলৌকিক উপায়ে, ‘টেলিপ্যাথি’ বা মনের ভাষায় কথা বলছে!
প্রথমে পুরো বিষয়টা অবিশ্বাস্য এবং অলৌকিক মনে হলেও, আমি নিজেকে সামলে নিলাম। ভাবলাম, যাই হোক না কেন, আগে মন দিয়ে শুনি তারা একে অপরকে কী বলছে। এই সুযোগ হারালে হয়তো পরে সারাজীবন আফসোস করতে হবে। আমি সমস্ত মনোযোগ দিয়ে তাদের নীরব কথোপকথন শোনার চেষ্টা করলাম।
নবজাতক শিশুটি বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে মনের ভাষায় বলল, "কী ব্যাপার! এমন করে আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখছেন?"
বৃদ্ধ গভীর এক দীর্ঘশ্বাস চেপে নরম সুরে উত্তর দিলেন, "কি দেখছি? তোমাকে দেখছি!!!..."
তখন শিশুটি এক চিলতে নিষ্পাপ বিস্ময় নিয়ে বলল, "আমায় দেখার কী আছে? একটা সময় তো আপনিও ঠিক আমার মতোই ছোট আর অবুজ ছিলেন। আবার একদিন আমিও..."
শিশুটির কথা শুনে বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে উঠল। তিনি তাঁর কাঁপাকাঁপা, কুঁচকে যাওয়া হাতটি বাড়িয়ে দিতে চাইলেন নবজাতকের দিকে। কিন্তু শরীরে আর সেই শক্তি নেই। তিনি টেলিপ্যাথিতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "হ্যাঁ রে দাদুভাই... আমিও একদিন তোর মতোই তুলতুলে, নিষ্পাপ ছিলাম। আমার শরীরেও দুধের গন্ধ ছিল। আজ আমার এই চামড়া-কুঁচকানো জরাজীর্ণ হাত-পা দেখে তোর বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না?"
নবজাতক তার ছোট্ট দুটি পা শূন্যে ছুঁড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল (মনের ভাষায়)।
বলল, "বিশ্বাস হচ্ছে না মানে? এক্কেবারে হচ্ছে না! আচ্ছা দাদু, এই যে দুনিয়াটাতে আমি মাত্র পা রাখলাম, এটা দেখতে কেমন? এখানকার মানুষগুলো কেমন?"
বৃদ্ধের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রুবিন্দুতে ঘরের আবছা আলোটা চিকচিক করে উঠল। বৃদ্ধ বললেন, "দুনিয়াটা বড় অদ্ভুত রে দাদু! এখানে যখন তুই প্রথম আসবি, তোর মুখে কোনো ভাষা থাকবে না, কিন্তু তোর কান্না শুনে সবাই হাসবে। আর যখন তুই দুনিয়া থেকে যাবি, তখন তোর মুখে কোনো ভাষা থাকবে না, কিন্তু তোকে দেখে সবাই কাঁদবে।"
শিশুটি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "কী অদ্ভুত! মানুষের কান্না দেখে বাকিরা হাসে? তারা কি খুব দুষ্টু?"
বৃদ্ধ হাহা করে হেসে উঠলেন। এক অদ্ভুত মায়াবী হাসি। বললেন, "না রে পাগলা! তুই যখন মায়ের কোল আলো করে প্রথম কাঁদলি, তখন তোর বাবা-মা, দাদু-দিদিমা সবাই খুশিতে কেঁদে ফেলেছিল। ওটা ছিল আনন্দের কান্না। দুনিয়াটা আসলে একটা মস্ত বড় নাট্যমঞ্চ। এখানে এসে সবাই নিজের আপনজন খুঁজে নেয়, তাদের ভালোবাসে। কিন্তু মস্ত বড় ভুলটা কোথায় জানিস?"
শিশুটি তার বুড়ো আঙুলটা মুখে পুরে চুষতে চুষতে জিজ্ঞেস করল, "কী ভুল, দাদু?"
বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর এবার ভারী হয়ে এল। আবেগ আর কান্নায় তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি বললেন, "ভুলটা হলো, এই দুনিয়ায় এসে আমরা ভুলে যাই যে আমাদের একদিন ফিরে যেতে হবে। আমরা ঘর বাড়ি বানাই, টাকা-পয়সা জমাই, অহংকার করি, আর ভাবি আমরা বুঝি চিরকাল এখানেই থাকব। স্বার্থের জন্য ভাই ভাইয়ের সাথে লড়াই করে, মানুষ মানুষকে কষ্ট দেয়। অথচ দেখ, আজ আমি যখন চলে যাচ্ছি, আমার সাথে কিছুই যাচ্ছে না। এই যে সুন্দর বিছানা, দামী সুটকেস, ব্যাংক ব্যালেন্স—সব এখানেই পড়ে রইল। আমি এসেছিও শূন্য হাতে, যাচ্ছিও শূন্য হাতে।"
বৃদ্ধের চোখ দিয়ে এবার অঝোরে জল ঝরতে লাগল। তিনি ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, "সবচেয়ে বড় কষ্ট কী জানিস দাদুভাই?
আজ আমার যাওয়ার সময় হয়েছে, অথচ আমার নিজের ছেলেটা, যার জন্য আমি সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছি, সে পাশের ঘরে বসে ফোনের ক্যালকুলেটরে হিসাব করছে আমার কয়টা ফ্ল্যাট সে পাবে! আমার শেষ মুহূর্তের একটু আদর নেওয়ার সময়ও তার নেই..."
ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তাদের এই নীরব চ্যাট (টেলিপ্যাথি) শুনে আমার নিজের বুকটাও যেন ফেটে যাচ্ছিল। চোখের জল আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। মানুষের এই স্বার্থপরতা আর মোহ কতটা অন্ধ করে দেয় আমাদের!
শিশুটির নিষ্পাপ মুখটাও এবার যেন গম্ভীর হয়ে গেল। সে তার ছোট্ট হাতটা কোনোমতে বাড়িয়ে বৃদ্ধের কুঁচকানো আঙুলটা স্পর্শ করার চেষ্টা করল। এক অদ্ভুত অলৌকিক ছোঁয়ায় বৃদ্ধের কান্না যেন নিমেষেই থেমে গেল। এক পরম শান্তি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মুখে।
শিশুটি নরম সুরে বলল, "কেঁদো না দাদু। তুমি তো আমায় একটু আগেই বললে, দুনিয়াটা একটা সফর মাত্র। তোমার সফর তো খুব সুন্দর ছিল। তুমি অনেককে ভালোবেসেছ, অনেকের মুখে হাসি ফুটিয়েছ। যারা তোমাকে বুঝল না, ক্ষতিটা তো তাদেরই। তারা এই মোহেই রয়ে গেল, আর তুমি মুক্ত হয়ে যাচ্ছ।"
বৃদ্ধ এবার চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে এখন এক স্বর্গীয় তৃপ্তি। তিনি ফিসফিস করে শেষবারের মতো বললেন, "তোর জীবনটা যেন সুন্দর হয় দাদুভাই। মানুষের মতো মানুষ হবি। অহংকার করিস না, ভালোবাসতে শিখিস..."
ঠিক তখনই ঘরের মনিটরের লাইফ-লাইনটা সোজা হয়ে একটা দীর্ঘ 'বীপ' শব্দ করে উঠল। বৃদ্ধের বুকটা শেষবারের মতো ওঠানামা করে চিরদিনের জন্য শান্ত হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই, পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধের ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কিন্তু সেই কান্নায় বাবার জন্য কোনো হাহাকার ছিল না, ছিল এক ধরণের লৌকিকতা।
আমি ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখলাম, বৃদ্ধের নিথর দেহের পাশে শুয়ে থাকা সেই নবজাতক শিশুটি আর হাসছে না। তার চোখ থেকেও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছে। সে আর টেলিপ্যাথিতে কথা বলছে না, বরং এক সাধারণ মানুষের মতোই চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে। হয়তো সেও বুঝে গেছে—শুরু আর শেষের এই নাট্যমঞ্চে তার নিজের যুদ্ধটা এবার শুরু হয়ে গেল।