14/09/2026
#শেষ_ভালোবাসা
#পর্ব_৭
#লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ
🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫
—আলভীইইই!
মিহির চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। পাশের ঘর থেকে মেহরুন নাহার ছুটে এলেন।
—মিহি! কী হয়েছে?
মিহি মেঝেতে বসে আছে। চোখ দুটো বড় বড়।
মুখ ফ্যাকাশে। সামনে পড়ে থাকা ফোন থেকে আবারও আলভীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—
“ভালো থেকো, আমার মিহি... বিদায়।”
মেহরুন নাহার স্থির হয়ে গেলেন। মিহি হঠাৎ ফোনটা তুলে নিল।
—না।
তারপর দ্রুত আলভীর নম্বরে কল দিল।
The number you have dialed is currently switched off...
—না না না... ফোন বন্ধ কেন?
আবার কল।
বন্ধ।
আবার।
বন্ধ।
মিহির হাত কাঁপছে।
—আলভী, ফোন ধরো।
আবার কল।
—প্লিজ ফোন ধরো।
আবার।
—আমি রাগ করব না। সত্যি বলছি।
আবার।
—তুমি মজা করছ, তাই না?
আবার।
—আলভী...
মিহির কণ্ঠ ভেঙে গেল।
—প্লিজ...
মেহরুন নাহার মেয়ের পাশে বসে তাকে ধরতে গেলেন। মিহি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।
—আমাকে ধরো না!
—মিহি—
—আমাকে আলভীর কাছে যেতে হবে।
সে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেল। আবার উঠে দাঁড়াল।
—ও কোথায় থাকে? আমি জানি। আমি যাব।
—এত রাতে কোথায় যাবি?
—আমার আলভীর কাছে!
মিহি দৌড়ে দরজার দিকে গেল। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন শাহরিয়ার কবির আজমী।
—কোথায় যাচ্ছ?
মিহি বাবার দিকে তাকাল। চোখে ভয়।
—আব্বু... আলভী...
শাহরিয়ার সাহেব চুপ। মিহি বাবার হাত ধরে ফেলল।
—আব্বু, তুমি পুলিশ। তুমি ওকে খুঁজে বের করতে পারবে।
তার কণ্ঠে শিশুর মতো আকুতি।
—প্লিজ, আব্বু। আলভী কোথায় আছে খুঁজে বের করো।
শাহরিয়ার সাহেবের চোয়াল শক্ত হলো।
—রাত হয়েছে। ঘরে যাও।
মিহি স্থির হয়ে গেল।
—তুমি শুনতে পাওনি?
—মিহি—
—ও মরতে যাচ্ছে!
মিহি চিৎকার করে উঠল।
—আমার আলভী মরতে যাচ্ছে আর তুমি আমাকে ঘরে যেতে বলছ?
—নিজেকে সামলাও।
—আমি সামলাতে পারছি না!
মিহি বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরল।
—প্লিজ, আব্বু। আমি তোমার কাছে কোনোদিন কিছু চাইব না। শুধু আজ ওকে এনে দাও।
শাহরিয়ার সাহেব মেয়ের হাত সরিয়ে দিলেন।
—ওই ছেলে নাটক করছে।
মিহি কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
—যদি নাটক না হয়?
কেউ উত্তর দিল না।
—যদি সত্যিই কিছু করে?
মিহির ঠোঁট কাঁপছে।
—তখন তুমি আমার আলভীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?
শাহরিয়ার সাহেবের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি ফুটে উঠল। মিহি আর অপেক্ষা করল না। দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
—মিহি!
মেহরুন নাহার চিৎকার করলেন।
...
রাত দুইটা বত্রিশ।
রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। মিহি খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে। কখন তার স্যান্ডেল খুলে গেছে, সে জানে না। পায়ের নিচে পাথর বিঁধছে। ব্যথা লাগছে না।
তার মাথার মধ্যে শুধু একটা কণ্ঠ—
“বিদায়...”
—না।
মিহি দৌড়াতে দৌড়াতে মাথা নাড়ল।
—তুমি আমাকে বিদায় বলতে পারো না।
চোখের পানি দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে।
—আমি অনুমতি দিইনি।
হঠাৎ একটা গাড়ি তার সামনে এসে ব্রেক করল।
মিহি চমকাল না। গাড়ি থেকে শাহরিয়ার সাহেব নেমে এলেন।
—গাড়িতে ওঠো।
—না।
—মিহি!
—আমি আলভীর কাছে যাব।
—আমি নিয়ে যাচ্ছি।
মিহি থেমে গেল।
—সত্যি?
শাহরিয়ার সাহেব উত্তর দিলেন না। মিহি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল।
—তাড়াতাড়ি চলো।
ড্রাইভার গাড়ি চালু করল।
—আরও জোরে!
—মিহি—
—প্লিজ, আব্বু! ও ভয় পেয়ে যাবে।
শাহরিয়ার সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
মিহি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
—ও একা থাকতে পারে না জানো? মন খারাপ হলে আমার সঙ্গে কথা বলে। আজ আমি ওর ফোন ধরতে পারিনি নাকি? না... আমি তো ধরেছি...
সে নিজের চুল টেনে ধরল।
—আমি কেন বুঝলাম না?
মেহরুন নাহার মেয়ের হাত ধরে বললেন,
—নিজেকে কষ্ট দিস না।
—ও আজ এত কাঁদছিল, মা।
মিহি মায়ের দিকে তাকাল।
—আমি দেখেছি।
—তাহলে জিজ্ঞেস করেছিলি?
—করেছিলাম। ও বলেনি।
হঠাৎ মিহি থেমে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
—আমি যদি আরও জোর করতাম?
মায়ের চোখ ভিজে উঠল।
—মিহি...
—আমি যদি ওকে যেতে না দিতাম?
মিহি নিজের বুক চেপে ধরল।
—আমি যদি একবার পিছনে তাকাতাম?
তার কান্নার শব্দে গাড়ির ভিতরটা ভারী হয়ে উঠল।
শাহরিয়ার সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
...
আলভীর বাসার সামনে মানুষের ভিড়। পুলিশ।
একটা অ্যাম্বুলেন্স। মিহি গাড়ি থেকে নামতেই থেমে গেল। তার চোখ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে।
—এটা কেন?
কেউ উত্তর দিল না। মিহি বাবার দিকে তাকাল।
—অ্যাম্বুলেন্স কেন এসেছে?
শাহরিয়ার সাহেব চুপ। মিহি ধীরে ধীরে সামনে এগোল। একজন পুলিশ সদস্য তাকে আটকাতে গেল।
—ম্যাডাম, ভিতরে যাওয়া যাবেন না।
—সরুন।
—ম্যাডাম—
—আমি বলেছি সরুন!
তার চিৎকারে সবাই তাকাল। মিহি ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল। আলভীর মা রওশন আরা মেঝেতে বসে কাঁদছেন।
—আমার ছেলেটারে ফিরাইয়া দাও আল্লাহ... আমার আলভীরে ফিরাইয়া দাও...
মিহির পা থেমে গেল।
রওশন আরা?
এই মহিলা কাঁদছেন কেন? মিহি ধীরে ধীরে কাছে গেল।
—আন্টি?
রওশন আরা মুখ তুললেন। মিহিকে দেখেই তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তিনি উঠে এসে মিহিকে জড়িয়ে ধরলেন।
—মা রে!
মিহি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
—আন্টি... আলভী কোথায়?
রওশন আরা কাঁদছেন।
—ও কোথায়?
কেউ উত্তর দিচ্ছে না। মিহি এবার একটু জোরে বলল,
—আমি জিজ্ঞেস করছি আলভী কোথায়!
ঠিক তখন দুজন লোক ভিতরের ঘর থেকে একটা স্ট্রেচার বের করল। সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর।
মিহির চোখ সেখানে আটকে গেল। চারপাশের সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে স্ট্রেচারের দিকে এগোল। একজন পুলিশ সদস্য বলল,
—ম্যাডাম, প্লিজ—
মিহি শুনল না।
তার হাত সাদা কাপড়ের দিকে এগোল। কাঁপছে।
—এটা কে?
কেউ উত্তর দিল না।
—আমি জিজ্ঞেস করছি এটা কে?
রওশন আরার কান্না ভেসে এল। মিহি কাপড়টা সরাতে গেল। একজন তাকে আটকানোর চেষ্টা করল।
—না ম্যাডাম—
—ছাড়ুন!
মিহি চিৎকার করল। তারপর এক টানে কাপড়টা মুখের উপর থেকে সরিয়ে দিল। সময় থেমে গেল।
আলভী। চোখ বন্ধ। মুখ শান্ত। অস্বাভাবিক শান্ত।
মিহি তাকিয়ে রইল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
দশ সেকেন্ড।
তারপর হেসে ফেলল। সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
মিহি আলভীর গালে হাত রাখল।
—উঠো।
কোনো উত্তর নেই।
—আলভী।
নীরব।
মিহি তার নাক টেনে দিল।
—অনেক হয়েছে। নাটক বন্ধ করো।
রওশন আরা মুখে আঁচল চেপে কাঁদছেন। মিহি বিরক্ত মুখে বলল,
—দেখো, সবাই ভয় পেয়েছে।
আলভী চুপ।
—আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি।
চুপ।
মিহির হাসিটা একটু একটু করে কাঁপতে শুরু করল।
—আলভী?
সে আলভীর গালে হালকা থাপ্পড় দিল।
—এই।
কোনো উত্তর নেই।
—আমি এসেছি।
মিহির চোখে পানি জমল।
—তোমার মিহি এসেছে।
নীরব।
মিহি এবার দুই হাতে আলভীর মুখ ধরল।
—চোখ খোলো।
কোনো উত্তর নেই।
—আলভী, প্লিজ।
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
—আমি আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে ঝগড়া করব না। মিহির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
—ফুচকা চাইব না।
—শপিংও করব না।
—বিড়ালও রাখব না।
হঠাৎ সে কেঁদে ফেলল।
—তুমি বিড়াল পছন্দ করো না, তাই না? রাখব না। সত্যি বলছি।
চারপাশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মিহি আলভীর বুকের ওপর কান রাখল। কিছু নেই। সে আবার রাখল।
—শব্দ হচ্ছে না কেন?
মিহি পাশের লোকদের দিকে তাকাল।
—ওর হার্টের শব্দ হচ্ছে না কেন?
কেউ উত্তর দিল না।
—ডাক্তার ডাকুন!
মিহি চিৎকার করে উঠল।
—কেউ ডাক্তার ডাকুন!
শাহরিয়ার সাহেব মেয়ের কাছে এগিয়ে এলেন।
—মিহি...
মিহি বাবার দিকে তাকাল।
—আব্বু, ওর হার্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
তার কণ্ঠে অদ্ভুত সরলতা।
—তুমি পুলিশ। কিছু করো।
শাহরিয়ার সাহেবের মুখ শক্ত।
মিহি তার হাত ধরল।
—ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।
—মিহি...
—চলো না!
শাহরিয়ার সাহেব চোখ বন্ধ করে বললেন,
—আলভী মারা গেছে।
মিহি থেমে গেল। তারপর হাসল।
—না।
—মিহি—
—আব্বু মিথ্যা বলছে।
সে চারপাশে তাকাল।
—আব্বু আলভীকে পছন্দ করে না তো। তাই মিথ্যা বলছে।
রওশন আরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। মিহি আবার আলভীর দিকে তাকাল।
—তুমি বলো।
আলভীর মুখে হাত রাখল।
—তুমি তো বলেছিলে আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।
তার ঠোঁট কাঁপল।
—তুমি মিথ্যা বলেছ?
নীরব।
মিহির চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি আলভীর গালে পড়ল।
—আলভী...
হঠাৎ মিহি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—উঠো!
তার চিৎকারে ঘর কেঁপে উঠল।
—উঠো! উঠো! উঠো!
মানুষ তাকে সরাতে গেল। মিহি আরও শক্ত করে আলভীকে আঁকড়ে ধরল।
—কেউ ওকে ধরবে না!
—মিহি!
—ও আমার!
সে পাগলের মতো চিৎকার করছে।
—আলভী আমার! তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ওকে?
কয়েকজন মিলে তাকে সরানোর চেষ্টা করল। মিহি আলভীর শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে।
—ছাড়ব না!
তার নখের আঁচড়ে নিজের হাত কেটে যাচ্ছে।
—তুমি বলেছিলে সারাজীবন আমার হয়ে থাকবে!
মিহি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করল—
—আমাদের ছোট্ট বাসাটা কে বানাবে, আলভী?
চারপাশ নিস্তব্ধ।
—বারান্দায় গাছ লাগাব না আমরা?
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
—গোল্লুকে কে বাসা থেকে বের করে দেবে?
রওশন আরা মেঝেতে বসে পড়লেন।
—তুমি বলেছিলে আমাকে সুখে রাখবে!
মিহির শরীর কাঁপছে।
—তাহলে উঠে আমাকে সুখে রাখো!
কেউ আর চোখের পানি আটকাতে পারল না। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন মিলে মিহিকে আলভীর কাছ থেকে সরিয়ে নিল। মিহি হাত-পা ছুড়ছে।
—আমাকে ছাড়ো!
স্ট্রেচারটা এগিয়ে যাচ্ছে।
—আলভী!
আরও দূরে।
—আলভী, আমি রাগ করিনি!
দরজার কাছে।
—ফিরে আসো!
অ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে স্ট্রেচার তুলে দেওয়া হলো।
মিহি দৌড় দিল।
—আলভীইইই!
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটা ধীরে ধীরে চলে গেল। মিহি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করল। অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে। খালি পায়ে।
—আলভী!
সে দৌড়াচ্ছে।
—আমাকে রেখে যেও না!
অ্যাম্বুলেন্স দূরে চলে যাচ্ছে।
—আমি একা থাকতে পারি না!
মিহির দম বন্ধ হয়ে আসছে।
—তুমি জানো আমি একা থাকতে ভয় পাই!
হঠাৎ তার পা আটকে গেল। মিহি রাস্তায় পড়ে গেল।
হাঁটু ছড়ে রক্ত বের হলো। সে উঠল না। রাস্তার ওপর বসেই দূরে চলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল—
—তুমি তো বলেছিলে... আমার কিছু হলে তুমি ঠিক থাকতে পারবে না। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।
—তাহলে আমার এত কষ্ট হচ্ছে...
মিহির ঠোঁট কাঁপল।
—তুমি ঠিক আছ কীভাবে, আলভী?
পরমুহূর্তেই তার চোখ উল্টে গেল। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেল।
—মিহি!
সবাই ছুটে এল। কিন্তু কেউ জানত না—
সেদিন শুধু আলভীর নিঃশ্বাস থামেনি। সিদরাতুল মুনতাহার ভিতরের প্রাণটাও যেন আলভীর সঙ্গে চলে গিয়েছিল।
আর এরপর যে মিহি চোখ খুলবে—
সে আর আগের সেই হাসিখুশি, ফুচকা পাগল মিহি থাকবে না।
চলবে...