অন্বেষা শেখ

অন্বেষা শেখ ✍️ শব্দে আঁকি অনুভূতির গল্প।
📖 রোমান্স | রহস্য | আবেগ | থ্রিলার
❤️ প্রতিটি গল্প হৃদয়ের গভীর থেকে।
🌸 নতুন পর্ব পেতে পেজটি Follow করুন।

 #শেষ_ভালোবাসা #পর্ব_৭ #লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ 🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫—আলভীইইই!মিহির চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। পাশের ঘর থে...
14/09/2026

#শেষ_ভালোবাসা
#পর্ব_৭
#লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ

🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫

—আলভীইইই!

মিহির চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। পাশের ঘর থেকে মেহরুন নাহার ছুটে এলেন।

—মিহি! কী হয়েছে?

মিহি মেঝেতে বসে আছে। চোখ দুটো বড় বড়।
মুখ ফ্যাকাশে। সামনে পড়ে থাকা ফোন থেকে আবারও আলভীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—

“ভালো থেকো, আমার মিহি... বিদায়।”

মেহরুন নাহার স্থির হয়ে গেলেন। মিহি হঠাৎ ফোনটা তুলে নিল।

—না।

তারপর দ্রুত আলভীর নম্বরে কল দিল।

The number you have dialed is currently switched off...

—না না না... ফোন বন্ধ কেন?

আবার কল।

বন্ধ।

আবার।

বন্ধ।

মিহির হাত কাঁপছে।

—আলভী, ফোন ধরো।

আবার কল।

—প্লিজ ফোন ধরো।

আবার।

—আমি রাগ করব না। সত্যি বলছি।

আবার।

—তুমি মজা করছ, তাই না?

আবার।

—আলভী...

মিহির কণ্ঠ ভেঙে গেল।

—প্লিজ...

মেহরুন নাহার মেয়ের পাশে বসে তাকে ধরতে গেলেন। মিহি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।

—আমাকে ধরো না!

—মিহি—

—আমাকে আলভীর কাছে যেতে হবে।

সে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেল। আবার উঠে দাঁড়াল।

—ও কোথায় থাকে? আমি জানি। আমি যাব।

—এত রাতে কোথায় যাবি?

—আমার আলভীর কাছে!

মিহি দৌড়ে দরজার দিকে গেল। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালেন শাহরিয়ার কবির আজমী।

—কোথায় যাচ্ছ?

মিহি বাবার দিকে তাকাল। চোখে ভয়।

—আব্বু... আলভী...

শাহরিয়ার সাহেব চুপ। মিহি বাবার হাত ধরে ফেলল।

—আব্বু, তুমি পুলিশ। তুমি ওকে খুঁজে বের করতে পারবে।

তার কণ্ঠে শিশুর মতো আকুতি।

—প্লিজ, আব্বু। আলভী কোথায় আছে খুঁজে বের করো।

শাহরিয়ার সাহেবের চোয়াল শক্ত হলো।

—রাত হয়েছে। ঘরে যাও।

মিহি স্থির হয়ে গেল।

—তুমি শুনতে পাওনি?

—মিহি—

—ও মরতে যাচ্ছে!

মিহি চিৎকার করে উঠল।

—আমার আলভী মরতে যাচ্ছে আর তুমি আমাকে ঘরে যেতে বলছ?

—নিজেকে সামলাও।

—আমি সামলাতে পারছি না!

মিহি বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরল।

—প্লিজ, আব্বু। আমি তোমার কাছে কোনোদিন কিছু চাইব না। শুধু আজ ওকে এনে দাও।

শাহরিয়ার সাহেব মেয়ের হাত সরিয়ে দিলেন।

—ওই ছেলে নাটক করছে।

মিহি কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,

—যদি নাটক না হয়?

কেউ উত্তর দিল না।

—যদি সত্যিই কিছু করে?

মিহির ঠোঁট কাঁপছে।

—তখন তুমি আমার আলভীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?

শাহরিয়ার সাহেবের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি ফুটে উঠল। মিহি আর অপেক্ষা করল না। দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

—মিহি!

মেহরুন নাহার চিৎকার করলেন।
...

রাত দুইটা বত্রিশ।

রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। মিহি খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে। কখন তার স্যান্ডেল খুলে গেছে, সে জানে না। পায়ের নিচে পাথর বিঁধছে। ব্যথা লাগছে না।
তার মাথার মধ্যে শুধু একটা কণ্ঠ—

“বিদায়...”

—না।

মিহি দৌড়াতে দৌড়াতে মাথা নাড়ল।

—তুমি আমাকে বিদায় বলতে পারো না।

চোখের পানি দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে।

—আমি অনুমতি দিইনি।

হঠাৎ একটা গাড়ি তার সামনে এসে ব্রেক করল।
মিহি চমকাল না। গাড়ি থেকে শাহরিয়ার সাহেব নেমে এলেন।

—গাড়িতে ওঠো।

—না।

—মিহি!

—আমি আলভীর কাছে যাব।

—আমি নিয়ে যাচ্ছি।

মিহি থেমে গেল।

—সত্যি?

শাহরিয়ার সাহেব উত্তর দিলেন না। মিহি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল।

—তাড়াতাড়ি চলো।

ড্রাইভার গাড়ি চালু করল।

—আরও জোরে!

—মিহি—

—প্লিজ, আব্বু! ও ভয় পেয়ে যাবে।

শাহরিয়ার সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
মিহি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,

—ও একা থাকতে পারে না জানো? মন খারাপ হলে আমার সঙ্গে কথা বলে। আজ আমি ওর ফোন ধরতে পারিনি নাকি? না... আমি তো ধরেছি...
সে নিজের চুল টেনে ধরল।

—আমি কেন বুঝলাম না?

মেহরুন নাহার মেয়ের হাত ধরে বললেন,

—নিজেকে কষ্ট দিস না।

—ও আজ এত কাঁদছিল, মা।

মিহি মায়ের দিকে তাকাল।

—আমি দেখেছি।

—তাহলে জিজ্ঞেস করেছিলি?

—করেছিলাম। ও বলেনি।

হঠাৎ মিহি থেমে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল,

—আমি যদি আরও জোর করতাম?

মায়ের চোখ ভিজে উঠল।

—মিহি...

—আমি যদি ওকে যেতে না দিতাম?

মিহি নিজের বুক চেপে ধরল।

—আমি যদি একবার পিছনে তাকাতাম?

তার কান্নার শব্দে গাড়ির ভিতরটা ভারী হয়ে উঠল।
শাহরিয়ার সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
...

আলভীর বাসার সামনে মানুষের ভিড়। পুলিশ।
একটা অ্যাম্বুলেন্স। মিহি গাড়ি থেকে নামতেই থেমে গেল। তার চোখ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে।

—এটা কেন?

কেউ উত্তর দিল না। মিহি বাবার দিকে তাকাল।

—অ্যাম্বুলেন্স কেন এসেছে?

শাহরিয়ার সাহেব চুপ। মিহি ধীরে ধীরে সামনে এগোল। একজন পুলিশ সদস্য তাকে আটকাতে গেল।

—ম্যাডাম, ভিতরে যাওয়া যাবেন না।

—সরুন।

—ম্যাডাম—

—আমি বলেছি সরুন!

তার চিৎকারে সবাই তাকাল। মিহি ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল। আলভীর মা রওশন আরা মেঝেতে বসে কাঁদছেন।

—আমার ছেলেটারে ফিরাইয়া দাও আল্লাহ... আমার আলভীরে ফিরাইয়া দাও...

মিহির পা থেমে গেল।

রওশন আরা?

এই মহিলা কাঁদছেন কেন? মিহি ধীরে ধীরে কাছে গেল।

—আন্টি?

রওশন আরা মুখ তুললেন। মিহিকে দেখেই তার কান্না আরও বেড়ে গেল। তিনি উঠে এসে মিহিকে জড়িয়ে ধরলেন।

—মা রে!

মিহি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

—আন্টি... আলভী কোথায়?

রওশন আরা কাঁদছেন।

—ও কোথায়?

কেউ উত্তর দিচ্ছে না। মিহি এবার একটু জোরে বলল,

—আমি জিজ্ঞেস করছি আলভী কোথায়!

ঠিক তখন দুজন লোক ভিতরের ঘর থেকে একটা স্ট্রেচার বের করল। সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর।
মিহির চোখ সেখানে আটকে গেল। চারপাশের সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে স্ট্রেচারের দিকে এগোল। একজন পুলিশ সদস্য বলল,

—ম্যাডাম, প্লিজ—

মিহি শুনল না।

তার হাত সাদা কাপড়ের দিকে এগোল। কাঁপছে।

—এটা কে?

কেউ উত্তর দিল না।

—আমি জিজ্ঞেস করছি এটা কে?

রওশন আরার কান্না ভেসে এল। মিহি কাপড়টা সরাতে গেল। একজন তাকে আটকানোর চেষ্টা করল।

—না ম্যাডাম—

—ছাড়ুন!

মিহি চিৎকার করল। তারপর এক টানে কাপড়টা মুখের উপর থেকে সরিয়ে দিল। সময় থেমে গেল।
আলভী। চোখ বন্ধ। মুখ শান্ত। অস্বাভাবিক শান্ত।
মিহি তাকিয়ে রইল।

এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
দশ সেকেন্ড।

তারপর হেসে ফেলল। সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
মিহি আলভীর গালে হাত রাখল।

—উঠো।

কোনো উত্তর নেই।

—আলভী।

নীরব।

মিহি তার নাক টেনে দিল।

—অনেক হয়েছে। নাটক বন্ধ করো।

রওশন আরা মুখে আঁচল চেপে কাঁদছেন। মিহি বিরক্ত মুখে বলল,

—দেখো, সবাই ভয় পেয়েছে।

আলভী চুপ।

—আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি।

চুপ।

মিহির হাসিটা একটু একটু করে কাঁপতে শুরু করল।

—আলভী?

সে আলভীর গালে হালকা থাপ্পড় দিল।

—এই।

কোনো উত্তর নেই।

—আমি এসেছি।

মিহির চোখে পানি জমল।

—তোমার মিহি এসেছে।

নীরব।

মিহি এবার দুই হাতে আলভীর মুখ ধরল।

—চোখ খোলো।

কোনো উত্তর নেই।

—আলভী, প্লিজ।

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

—আমি আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে ঝগড়া করব না। মিহির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

—ফুচকা চাইব না।

—শপিংও করব না।

—বিড়ালও রাখব না।

হঠাৎ সে কেঁদে ফেলল।

—তুমি বিড়াল পছন্দ করো না, তাই না? রাখব না। সত্যি বলছি।

চারপাশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মিহি আলভীর বুকের ওপর কান রাখল। কিছু নেই। সে আবার রাখল।

—শব্দ হচ্ছে না কেন?

মিহি পাশের লোকদের দিকে তাকাল।

—ওর হার্টের শব্দ হচ্ছে না কেন?

কেউ উত্তর দিল না।

—ডাক্তার ডাকুন!

মিহি চিৎকার করে উঠল।

—কেউ ডাক্তার ডাকুন!

শাহরিয়ার সাহেব মেয়ের কাছে এগিয়ে এলেন।

—মিহি...

মিহি বাবার দিকে তাকাল।

—আব্বু, ওর হার্ট বন্ধ হয়ে গেছে।

তার কণ্ঠে অদ্ভুত সরলতা।

—তুমি পুলিশ। কিছু করো।

শাহরিয়ার সাহেবের মুখ শক্ত।

মিহি তার হাত ধরল।

—ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।

—মিহি...

—চলো না!

শাহরিয়ার সাহেব চোখ বন্ধ করে বললেন,

—আলভী মারা গেছে।

মিহি থেমে গেল। তারপর হাসল।

—না।

—মিহি—

—আব্বু মিথ্যা বলছে।

সে চারপাশে তাকাল।

—আব্বু আলভীকে পছন্দ করে না তো। তাই মিথ্যা বলছে।

রওশন আরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। মিহি আবার আলভীর দিকে তাকাল।

—তুমি বলো।

আলভীর মুখে হাত রাখল।

—তুমি তো বলেছিলে আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।

তার ঠোঁট কাঁপল।

—তুমি মিথ্যা বলেছ?

নীরব।

মিহির চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি আলভীর গালে পড়ল।

—আলভী...

হঠাৎ মিহি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

—উঠো!

তার চিৎকারে ঘর কেঁপে উঠল।

—উঠো! উঠো! উঠো!

মানুষ তাকে সরাতে গেল। মিহি আরও শক্ত করে আলভীকে আঁকড়ে ধরল।

—কেউ ওকে ধরবে না!

—মিহি!

—ও আমার!

সে পাগলের মতো চিৎকার করছে।

—আলভী আমার! তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ওকে?

কয়েকজন মিলে তাকে সরানোর চেষ্টা করল। মিহি আলভীর শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে।

—ছাড়ব না!

তার নখের আঁচড়ে নিজের হাত কেটে যাচ্ছে।

—তুমি বলেছিলে সারাজীবন আমার হয়ে থাকবে!

মিহি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করল—

—আমাদের ছোট্ট বাসাটা কে বানাবে, আলভী?
চারপাশ নিস্তব্ধ।

—বারান্দায় গাছ লাগাব না আমরা?

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।

—গোল্লুকে কে বাসা থেকে বের করে দেবে?

রওশন আরা মেঝেতে বসে পড়লেন।

—তুমি বলেছিলে আমাকে সুখে রাখবে!

মিহির শরীর কাঁপছে।

—তাহলে উঠে আমাকে সুখে রাখো!

কেউ আর চোখের পানি আটকাতে পারল না। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন মিলে মিহিকে আলভীর কাছ থেকে সরিয়ে নিল। মিহি হাত-পা ছুড়ছে।

—আমাকে ছাড়ো!

স্ট্রেচারটা এগিয়ে যাচ্ছে।

—আলভী!

আরও দূরে।

—আলভী, আমি রাগ করিনি!

দরজার কাছে।

—ফিরে আসো!

অ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে স্ট্রেচার তুলে দেওয়া হলো।

মিহি দৌড় দিল।

—আলভীইইই!

অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটা ধীরে ধীরে চলে গেল। মিহি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করল। অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে। খালি পায়ে।

—আলভী!

সে দৌড়াচ্ছে।

—আমাকে রেখে যেও না!

অ্যাম্বুলেন্স দূরে চলে যাচ্ছে।

—আমি একা থাকতে পারি না!

মিহির দম বন্ধ হয়ে আসছে।

—তুমি জানো আমি একা থাকতে ভয় পাই!

হঠাৎ তার পা আটকে গেল। মিহি রাস্তায় পড়ে গেল।
হাঁটু ছড়ে রক্ত বের হলো। সে উঠল না। রাস্তার ওপর বসেই দূরে চলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল—

—তুমি তো বলেছিলে... আমার কিছু হলে তুমি ঠিক থাকতে পারবে না। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।

—তাহলে আমার এত কষ্ট হচ্ছে...

মিহির ঠোঁট কাঁপল।

—তুমি ঠিক আছ কীভাবে, আলভী?

পরমুহূর্তেই তার চোখ উল্টে গেল। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেল।

—মিহি!

সবাই ছুটে এল। কিন্তু কেউ জানত না—

সেদিন শুধু আলভীর নিঃশ্বাস থামেনি। সিদরাতুল মুনতাহার ভিতরের প্রাণটাও যেন আলভীর সঙ্গে চলে গিয়েছিল।

আর এরপর যে মিহি চোখ খুলবে—

সে আর আগের সেই হাসিখুশি, ফুচকা পাগল মিহি থাকবে না।

চলবে...

 #এমপি_সাহেবের_অক্সিজেন  #পর্ব_৩০ #লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫জারার হাত কাঁপছে। হাতে পনেরো বছর আগের সেই ছবি...
14/09/2026

#এমপি_সাহেবের_অক্সিজেন
#পর্ব_৩০
#লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ

🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫

জারার হাত কাঁপছে। হাতে পনেরো বছর আগের সেই ছবি। ছোট্ট জারা হাসছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোর শাহরিয়ার ক্যামেরার দিকে নয়। তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছবির পেছনে মাত্র দুটি শব্দ—

“আমার অক্সিজেন।”

জারা ধীরে মাথা তুলল। শাহরিয়ার এখনো চোখ সরিয়ে দাঁড়িয়ে। জারা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল—

—এটা... আপনি লিখেছেন?

কেউ উত্তর দিল না।

জারা আবার বলল—

—শাহরিয়ার ভাই?

—হুম।

—কেন?

শাহরিয়ার চুপ। দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—ও বলবে না। আমি বলি।

শাহরিয়ার গম্ভীর গলায় বলল—

—দাদি।

—আজ আমাকে থামাতে পারবি না।

—দাদি—

—চুপ!

পুরো পরিবার স্থির। দাদি জারার হাত ধরে নিজের পাশে বসালেন। তারপর শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললেন—

—ওই গম্ভীর মুখটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। আজ তোর সব সম্মান শেষ করব।

তূর্য ফিসফিস করল—

—আমি ভিডিও করি?

শাহরিয়ার তাকাল।

তূর্য ফোন পকেটে ঢুকিয়ে দিল।

—স্মৃতি হৃদয়ে রাখব।

জারার চোখ ছবিটার ওপর।

দাদি ধীরে বললেন—

—তুই তখন ছয় বছরের।

জারা তাকাল।

—আর শাহরিয়ার?

—ষোলো।

জারা চোখ বড় করল।

—দশ বছরের বড়!

দাদি বললেন—

—এখন জানলি?

জারা শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

—আপনাকে তো এত বয়স্ক লাগে না। তূর্যের মুখ থেকে হাসি বের হলো। শাহরিয়ার চোখ সরু করল।
জারা দ্রুত বলল—

—দাদি, তুমি বলো।

দাদি হাসলেন।

—তুই ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে এলেই বাড়ি মাথায় তুলতি। কখনো ফুলের টব ভাঙতি, কখনো ছাদে উঠে বসে থাকতি, কখনো রান্নাঘরে গিয়ে খাবার চুরি করতি।

জারা মুখ বাঁকাল।

—আমি খাবার চুরি করতাম না।

শায়লা বললেন—

—ফ্রিজ থেকে পাঁচটা রসগোল্লা কে নিয়েছিল?

—ওটা উদ্ধার করেছিলাম।

—কিসের থেকে?

—ফ্রিজের বন্দিত্ব থেকে।

সবাই হেসে উঠল।

দাদি বললেন—

—আর এই ছেলেটা?

তিনি শাহরিয়ারকে দেখালেন।

—সারাক্ষণ তোর পেছনে।

জারা অবাক।

—উনি?

—হুম। তুই ছাদে গেলে ছাদে। বাগানে গেলে বাগানে। তুই ঘুমালে দরজার সামনে দিয়ে দশবার হাঁটত।
শাহরিয়ার বলল—

—দাদি, বাড়িয়ে বলছ।

দাদি তাকালেন।

—সতেরোবার হাঁটতি। কমিয়ে বলেছি। তূর্য মুখ চেপে হাসছে। জারা শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। লোকটা এখন সত্যিই অস্বস্তিতে। এ দৃশ্য বিরল। দাদি আবার বললেন—

—একদিন তুই উঠানে খেলতে গিয়ে পড়ে হাঁটু কেটে ফেলেছিলি।

জারা চুপ।

—তুই কাঁদছিলি। কিন্তু তোর থেকে বেশি অস্থির হয়েছিল শাহরিয়ার।

জারার চোখ শাহরিয়ারের দিকে।

দাদি বললেন—

—ডাক্তার এসে বলেছিল সামান্য কেটেছে। আর আমার নাতি ডাক্তারকে বলেছিল, ‘ভালো করে দেখেন। ওর অনেক ব্যথা।’

শাহরিয়ার নিচু গলায় বলল—

—স্বাভাবিক।

দাদি হেসে বললেন—

—তারপর সারারাত তোর ঘরের সামনে বসে থাকাও স্বাভাবিক?

জারা স্থির।

—সারারাত?

দাদি মাথা নাড়লেন।

—তুই ঘুমিয়ে ছিলি। ও বসে ছিল।

জারার চোখ ভিজে উঠল। শাহরিয়ার মুখ ঘুরিয়ে নিল। দাদি বাক্স থেকে ভাঙা লাল চুড়িটা তুললেন।

—এটা চিনিস?

জারা মাথা নাড়ল।

—না।

—তোর।

—আমার?

—ওই দিন পড়ে গিয়ে ভেঙেছিল। জারা চুড়িটা হাতে নিল।

—আপনি এটা এত বছর রেখেছেন?

শাহরিয়ার চুপ।

জারা তাকিয়ে।

—বলুন।

—হুম।

—কেন?

শাহরিয়ার শান্ত গলায় বলল—

—ফেলে দিতে ইচ্ছে করেনি।

জারার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি পড়ল। দাদি এবার ছোট্ট ক্লিপটা তুললেন।

—এটাও তোর।

জারা হেসে ফেলল।

চোখে পানি নিয়েই।

—এটাও রেখেছেন?

শাহরিয়ার উত্তর দিল না।

দাদি বললেন—

—তোর ফেলে যাওয়া জিনিস কুড়িয়ে রাখা ছিল ওর কাজ।

তূর্য বলল—

—ভাইয়া তখন থেকেই কালেক্টর।

শাহরিয়ার তাকাল।

—তূর্য।

—জি,

চুপ।

দাদি এবার একটা পুরোনো চিঠি তুললেন।

—এটা সবচেয়ে মজার।

শাহরিয়ার দ্রুত এগিয়ে এলো।

—দাদি, এটা না।

দাদি চিঠি পেছনে লুকালেন।

—কেন?

—দাও।

—না।

জারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

—আমাকে দাও!

শাহরিয়ার বলল—

—জারা।

—চুপ!

শাহরিয়ার আবার চুপ।

মাহির ফিসফিস করল—

—ভাইয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাবির কাছে শেষ।

দাদি চিঠিটা জারার হাতে দিলেন। জারা খুলল।
হাতের লেখা শাহরিয়ারের।

“দাদি, জারাকে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিও না। ও বড় হলে আমি ওকে বিয়ে করব।”

নিচে তারিখ। তেরো বছর আগের। জারা চিঠির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে শাহরিয়ারের দিকে।

—আপনি... এটা লিখেছিলেন?

শাহরিয়ার চোখ বন্ধ করল।

—হুম।

জারা আবার চিঠি পড়ল।

—আমি তখন আট বছরের!

—জানি।

—আর আপনি আমার বিয়ের চিন্তা করছিলেন?

শাহরিয়ার খুব শান্তভাবে বলল—

—আগে থেকে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম।

এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর পুরো ঘর হেসে উঠল।
জারা চোখ বড় করে তাকাল।

—আমি মানুষ না ফ্ল্যাট?

শাহরিয়ারের ঠোঁটের কোণে হাসি।

—আমার জন্য তার থেকেও দামি। জারার হাসি থেমে গেল। চোখ আবার ভিজে উঠল। দাদি তার মাথায় হাত রাখলেন।

—ওর বয়স বাড়ল। দায়িত্ব বাড়ল। রাজনীতি, ব্যবসা, মানুষের ভিড়... সব বাড়ল।

দাদি শাহরিয়ারের দিকে তাকালেন।

—শুধু একটা জিনিস বদলায়নি।

জারা ফিসফিস করল—

—কী?

—তোর জন্য ওর পাগলামি।

জারার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

দাদি বললেন—

—তুই যখন বলতি ওকে বিয়ে করবি না, ও হাসত। আমাদের সামনে কিছু বলত না।

শায়লা ধীরে বললেন—

—কিন্তু পরে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে বসে থাকত।
জারা শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। শায়লা বললেন—

—একবার আমি বলেছিলাম, জারার যদি অন্য কোথাও বিয়ে হয়?

জারা নিঃশ্বাস আটকাল।

—উনি কী বলেছিলেন?

শায়লা হেসে বললেন—

—বলেছিল, ‘হবে না।’

তূর্য বলল—

—ভাইয়ার আত্মবিশ্বাস ছোটবেলা থেকেই ভয়ংকর।

দাদি এবার বললেন—

—তোর মা-বাবা সব জানে।

জারার চোখ বড়।

—তারা?

—হুম। তাই তো সবাই চাইত তোদের বিয়ে হোক।

—আর আমি ভাবতাম শুধু পরিবার ঠিক করেছে।

দাদি মাথা নাড়লেন।

—পরিবার ঠিক করেনি নাতবউ।

জারা তাকাল। দাদি হাসলেন।

—আমার নাতি বহু বছর আগে ঠিক করে বসে আছে।

জারার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে ছবিটা বুকে চেপে ধরল।

—তাহলে আমাকে এখানে আনতে...

দাদি বললেন—

—ওই বদমাশই আমাকে পাঠিয়েছিল।

জারা শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

—আপনি?

—হুম।

—দাদি আমাকে জোর করে নিয়ে এলো—

—আমার কথায়।

—মার্কেটে পাঠানো?

দাদি বললেন—

—আমাদের প্ল্যান।

—সেলসম্যানরা ভাবি বলেছিল—

তূর্য বলল—

—ওটা আল্লাহর বিশেষ রহমত।

জারা হেসে ফেলল। কান্নার মধ্যেই।

—ইরা?

ইরা হাত তুলল।

—এমপি সাহেবের ভয়ংকর পরিকল্পনা।

—অচেনা নম্বর?

শাহরিয়ার বলল—

—প্রথম হ্যালোতেই চিনেছি।

—প্রধানমন্ত্রীর ফোন কেটে দৌড়ে আসা?

শাহরিয়ার চুপ। জারা চোখ মুছল।

—পেঁয়াজের জন্য?

তূর্য বলল—

—আমরা ভাবছিলাম ভাবির হাত কেটে গেছে।

মিশু বলল—

—ভাইয়া সম্ভবত ভাবছিল পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে।

সবাই হাসল। জারা হাসছে। কাঁদছেও। তারপর হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গেল। সে ধীরে শাহরিয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—আপনি এত বছর আমাকে ভালোবেসেছেন?

শাহরিয়ার তাকিয়ে রইল।

—হুম।

—একবারও বলেননি কেন?

—তুই আমাকে পছন্দ করতি না।

—তাই?

—হুম।

—যদি আমি কখনো ভালো না বাসতাম?

পুরো ঘর চুপ। শাহরিয়ার কিছুক্ষণ জারার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল—

—তাহলেও ভালোবাসতাম।

জারার চোখে আবার পানি।

—আর আমার বিয়ে অন্য কারও সঙ্গে হলে?

শাহরিয়ারের চোয়াল শক্ত হলো।

—ওটা ভাবিনি।

—কেন?

—ভাবতে পারি না।

জারা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল।

—আপনি পাগল।

—জানি।

—আমার জন্য?

শাহরিয়ারের চোখে হাসি।

—শুধু তোর জন্য।

জারা আর কিছু বলতে পারল না। হঠাৎ শাহরিয়ারকে জড়িয়ে ধরল। পুরো পরিবার স্থির। শাহরিয়ারও।
যেন এত বছরের অপেক্ষার পরও সে বিশ্বাস করতে পারছে না। জারা নিজে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

তূর্য খুব নিচু গলায় বলল—

—ভাইয়া, হাত দুইটা ব্যবহার করা যায়।

শাহরিয়ার যেন হুঁশে ফিরল। ধীরে নিজের দুই হাত জারার চারপাশে জড়িয়ে নিল। চোখ বন্ধ করল।
দাদি কাঁদছেন। শায়লা চোখ মুছছেন। আর ছোটরা?
মিশু ফোন বের করতেই মাহির বলল—

—ভিডিও কর।

শাহরিয়ার চোখ না খুলেই বলল—

—ফোন নামা।

মিশু সঙ্গে সঙ্গে ফোন নামাল।

জারা শাহরিয়ারের বুকের মধ্যে হেসে ফেলল।

—আপনি জড়িয়ে ধরেও সবাইকে ভয় দেখান?

—অভ্যাস।

—আমাকেও?

—তোকে সবচেয়ে বেশি।

জারা মুখ তুলে তাকাল।

—কেন?

—তুই কথা শুনিস না।

—শুনবও না।

—জানি।

দাদি হঠাৎ বললেন—

—তাহলে বিয়ের তারিখ ঠিক করি?

জারা সঙ্গে সঙ্গে শাহরিয়ারকে ছেড়ে দিল।

—কী!

সবাই হেসে উঠল।

দাদি বললেন—

—কী মানে? এতক্ষণ আমার নাতির বুকে বসে কান্না করলি—

—বসে না! দাঁড়িয়ে!

—একই কথা।

জারা লজ্জায় লাল।

—আমি এখনই বিয়ে করব না।

শাহরিয়ারের মুখ গম্ভীর হলো।

—কেন?

জারা তার দিকে তাকাল।

হঠাৎ চোখে দুষ্টুমি।

—মন বদলে গেছে।

শাহরিয়ার চোখ সরু করল।

—জারা।

—হুম?

—কী বললি?

জারা দুই পা পেছাল।

—আপনাকে বিয়ে করব না।

শাহরিয়ার এক পা এগোল।

জারা আরও পেছাল।

—আমি সিরিয়াস!

—আমিও।

জারা দৌড় দিল।

—দাদিইই! তোমার নাতি আমাকে মারবে!

শাহরিয়ার তার পেছনে।

—দাঁড়া!

—দাঁড়াব না!

পুরো বাড়ি হাসিতে ভরে উঠল। দাদি সোফায় বসে হাসতে হাসতে বললেন—

—এই দুইটাকে বিয়ে দিতে পারলেই আমার শান্তি।

•••

রাত।

জারা নিজের ঘরে এসে দরজা খুলতেই থমকে গেল।
বিছানার ওপর একটা লাল শাড়ি। পাশে গয়নার বাক্স। আর একটা ছোট কাগজ। জারা কাগজটা তুলল। শাহরিয়ারের হাতের লেখা—

“কাল সকাল দশটায় তৈরি থাকিস।”
নিচে—

“আমার অক্সিজেন।”

জারার ঠোঁটে হাসি ফুটল। ঠিক তখন ফোনে মেসেজ এলো। শাহরিয়ার—

“ঘুমা।”

জারা লিখল—

“কেন?”

উত্তর—

“কাল বিয়ে।”

জারার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।

—কীইইই!

পাশের ঘর থেকে মিশু চিৎকার করল—

—ভাবি, লাল শাড়িটা সুন্দর তো?

জারা দরজা খুলে চিৎকার করল—

—তোমরা আবার প্ল্যান করেছ!

নিচ থেকে দাদির গলা—

—শুভরাত্রি নাতবউ!

জারা রেলিং ধরে চিৎকার করল—

—রাখো তোমার নাতবউ! আমি কাল বিয়ে করব না!
ঠিক তখন নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শাহরিয়ার মাথা তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ভয়ংকর শান্ত হাসি।

—কাল সকাল দশটা।

জারা চোখ বড় করল।

—আমি পালাব!

শাহরিয়ার পকেটে হাত রেখে বলল—

—পুরো ঢাকা শহর আমার লোক দিয়ে ঘেরা।

জারা হাঁ করে তাকাল।

তূর্য ফিসফিস করল—

—এমপি পাওয়ারের সঠিক ব্যবহার।

জারা শাহরিয়ারের দিকে আঙুল তুলল।

—আপনি জোর করে বিয়ে করবেন?

শাহরিয়ার মাথা নাড়ল।

—না।

—তাহলে?

শাহরিয়ারের চোখে দুষ্টু হাসি।

—কাল তুই নিজেই কবুল বলবি।

জারা হেসে বলল—

—কখনো না।

শাহরিয়ার শুধু তাকিয়ে রইল।

কারণ সে জানে—

আগামীকাল জারার জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করছে, যার পর ‘কবুল’ না বলে থাকা তার পক্ষে সত্যিই কঠিন হবে।

চলবে...

 #শেষ_ভালোবাসা #পর্ব_৬ #লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ 🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫সকাল আটটা।মিহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আর বার...
13/09/2026

#শেষ_ভালোবাসা
#পর্ব_৬
#লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ

🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫

সকাল আটটা।

মিহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আর বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখছে। আলভীর ফোন এখনো বন্ধ। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি সে।
চোখ বন্ধ করলেই একটা মেসেজ মাথার মধ্যে ঘুরেছে

“কাল শেষবার আমার সঙ্গে দেখা করো।”

শেষবার!

অসভ্যটা এমন কথা লিখল কেন?

আজ সামনে পেলেই আগে দুটো থাপ্পড় দেবে। তারপর কারণ জিজ্ঞেস করবে। মিহি নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বলল,

—না। তিনটা থাপ্পড়।

তারপর একটু ভেবে বলল,

—একটা কম। বেশি মারলে ব্যথা পাবে।

নিজের কথায় নিজেই বিরক্ত হলো।

—ধুর! আমি এত ভালো কেন?

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আরশিয়া নাওয়ার কয়েক সেকেন্ড ধরে বান্ধবীর একা একা কথা বলা দেখছিল।

—শেষ?

মিহি চমকে উঠল।

—তুই কখন এলি?

—যখন তুই নিজের মহানুভবতা নিয়ে গবেষণা করছিলি।

মিহি চোখ ঘুরিয়ে আবার ফোনের দিকে তাকাল।
আরশিয়া এবার তার মুখ খেয়াল করল।

—কী হয়েছে?

—কিছু না।

—আলভীর সঙ্গে ঝগড়া?

—না।

—তাহলে?

মিহি ফোনটা এগিয়ে দিল।

আরশিয়া মেসেজ পড়ে ভ্রু কুঁচকাল।

—“শেষবার দেখা করো” মানে কী?

—সেটাই তো বুঝছি না।

—কল দিয়েছিস?

—ফোন বন্ধ।

আরশিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইল।

—আমার কেমন জানি লাগছে, মিহি।

মিহির বুকটা ধক করে উঠল।

—কেমন?

—জানি না।

মিহি তাড়াতাড়ি ফোনটা কেড়ে নিল।

—উল্টাপাল্টা বলিস না। নাটক করছে। আজ গিয়ে কান টেনে ছিঁড়ে ফেলব। কথাটা বললেও তার নিজের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল না।

তাদের সেই পরিচিত বেঞ্চ। মিহি প্রায় বিশ মিনিট ধরে বসে আছে। আলভী নেই।

একুশ মিনিট।
বাইশ।
তেইশ।

মিহির রাগ বাড়ছে। চব্বিশ মিনিটের মাথায় দূরে পরিচিত অবয়বটা দেখা গেল। মিহি উঠে দাঁড়াল।
আলভী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

আজ তার গায়ে কালো শার্ট। চুল এলোমেলো। চোখ দুটো লাল। মিহির সমস্ত রাগ মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।

—আলভী?

আলভী তার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল। মিহি ভ্রু কুঁচকে তার মুখের কাছে হাত নেড়ে বলল,

—হ্যালো? পৃথিবীতে আছ?

আলভী মৃদু হাসল।

—হুম।

—তোমার কী হয়েছে?

—কিছু না।

—আবার মিথ্যা?

আলভী চুপ।

মিহি তার হাত ধরল।

—বসো।

দুজন পাশাপাশি বসল। আজ অদ্ভুতভাবে আলভী কোনো কথা বলছে না। অথচ সাধারণত মিহির পাশে বসলে তার মুখ বন্ধ করা কঠিন। মিহি কয়েক মিনিট অপেক্ষা করল। তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,

—তুমি আমাকে এখানে তোমার সুন্দর মুখ দেখানোর জন্য ডেকেছ?

আলভী তার দিকে তাকাল।

—আমার মুখ সুন্দর?

মিহি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তত কথা বলছে।

—না। ভুল বলেছি।

—আমি জানতাম।

—বানরের মতো।

—তিন বছর ধরে বানরকে ভালোবাসছ?

—আমার পশুপাখির প্রতি মায়া বেশি।

আলভী হেসে ফেলল। মিহিও হাসল। কিন্তু হাসতে হাসতেই আলভীর চোখ ভিজে উঠল। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। মিহি দেখে ফেলেছে।

—আলভী।

—হুম?

—আমার দিকে তাকাও।

—এভাবেই বলো।

—তাকাও।

আলভী তাকাল। মিহি স্থির হয়ে গেল। তার চোখে পানি।

—তুমি কাঁদছ কেন?

—কাঁদছি না।

—আমাকে বোকা মনে হয়?

আলভী মৃদু হাসল।

—একটু।

মিহি এবার রাগল না। সে খুব আস্তে আলভীর চোখের কোণের পানিটা মুছে দিল।

—কী হয়েছে?

আলভী মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুখটা কি সত্যিই আর দেখতে পাবে না? এই চোখ?
এই রাগ? এই হাসি? আলভীর বুকের ভিতর অসহ্য ব্যথা হলো। সে হঠাৎ বলল,

—তোমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

মিহির হাত থেমে গেল।

—কে বলেছে?

—তোমার বাবা।

—আব্বু তোমার সঙ্গে কথা বলেছে?

—হুম।

মিহির চোখে রাগ জমল।

—কী বলেছে?

—তোমার জীবন থেকে চলে যেতে।

—আর তুমি কী বলেছ?

আলভী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—না।

মিহির চোখ ভিজে উঠল।

—সত্যি?

—হুম।

—তুমি ভয় পাওনি?

আলভী হাসল।

—অনেক।

—তারপরও না বলেছ?

—তোমাকে হারানোর ভয়টা তার থেকেও বেশি।
মিহির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে আলভীর হাত শক্ত করে ধরল।

—আমি কাউকে বিয়ে করব না।

—তোমার বাবা জোর করলে?

—বাড়ি থেকে পালাব।

—আবার?

—হ্যাঁ।

—তারপর তোমার বাবা আমাকে গুলি করবে।
মিহি কান্নার মধ্যেই হেসে ফেলল।

—আমি সামনে দাঁড়াব।

আলভীর হাসি মিলিয়ে গেল।

—এমন কথা বলবে না।

—কেন?

—তোমার শরীরে একটা আঁচড়ও আমি সহ্য করতে পারব না।

মিহি তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

—তুমি থাকলে আমার কিছু হবে না।

আলভী চোখ নামিয়ে নিল।

কেন আজ প্রতিটা কথাই তার বুকে ছুরির মতো লাগছে?

—চলো।

আলভী উঠে দাঁড়াল। মিহি অবাক হলো।

—কোথায়?

—আজ তোমার সব পছন্দের কাজ করব।

—সব?

—হুম।

মিহির চোখ চকচক করে উঠল।

—ফুচকা?

—খাওয়াব।

—আইসক্রিম?

—খাওয়াব।

—বই?

—কিনে দেব।

—শপিং?

আলভী থেমে গেল।

—মিহি, ভালোবাসা প্রমাণের অন্য কোনো মাধ্যম নেই?

মিহি হেসে উঠল।

—আছে।

—কী?

—শপিং।

আলভী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—আমার ভুল হয়েছে।

—কী ভুল?

—প্রেম করা।

মিহি তার হাতে চিমটি কাটল।

—আহ!

—এখন চলো।

সেদিন আলভী সত্যিই মিহির সব আবদার পূরণ করেছিল। ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে মিহি ষোলোটা ফুচকা খেয়েছে। আলভী অবাক হয়ে বলেছে,

—তোমার পেট না গুদাম?

মিহি উত্তর দিলো,

—তোমার টাকায় খাচ্ছি বলে হিংসা হচ্ছে? টাকাটা আমারই। বিয়ের পর সব আমার হবে।

—আমি?

মিহি একটু ভেবে বললো,

—তুমিও আমার।

আলভী আর কিছু বলতে পারলোনা। শুধু তাকিয়ে রইল। বইয়ের দোকানে গিয়ে মিহি তিনটা বই নিলো। আলভী আরও একটা বই নিজে পছন্দ করে দিলো।

—এটা কেন?

—পড়বে।

—গল্প ভালো?

—জানি না।

—তাহলে?

আলভী বইটার প্রথম পাতায় কিছু লিখে বন্ধ করে দিলো।

—বাসায় গিয়ে দেখবে।

—এখন দেখব।

—না।

—কেন?

—সারপ্রাইজ।

মিহি সন্দেহের চোখে তাকালো।

—তুমি প্রেমপত্র লিখেছ?

—আমার বাংলা বানান খারাপ। প্রেমপত্র লিখে প্রেম ভাঙতে চাই না।

মিহি হেসে ফেললো। আলভীও হেসে ফেললো।
সেদিন সূর্য ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিল। মিহি ভেবেছিল এটা তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর একটি। আলভী জানত—
তার কাছে এটা বিদায়ের দিন।

সন্ধ্যায় মিহিকে বাসার সামনে পৌঁছে দিয়ে আলভী বলল,

—মিহি।

—হুম?

—একটু দাঁড়াও।

মিহি থামল।

আলভী ফোন বের করল।

—একটা ছবি তুলব।

—এখন? আমার চুলের অবস্থা দেখেছ?

—তুমি সুন্দর।

মিহি চোখ ছোট করল।

—কিছু চাইছ?

আলভী হেসে ফেলল।

—না।

—তাহলে এত প্রশংসা?

—সত্যি বলছি।

মিহি তার পাশে এসে দাঁড়াল। আলভী ক্যামেরা অন করল। মিহি দুই আঙুল দিয়ে ভি সাইন দেখাল।

—হাসো।

আলভী হাসল। ক্লিক। ছবিটা উঠল। মিহি ছবির দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকাল।

—তোমাকে পেত্নীর মতো লাগছে।

—তুমি পাশে থাকলে পেত্নী হতেও রাজি। আর বাইদাওয়ে আমি কিন্তু ছেলে।

মিহি হেসে ফেলল।

—কাল দেখা হবে?

আলভী চুপ।

—আলভী?

—হুম।

—কাল দেখা হবে?

আলভী মিহির দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ। তারপর মৃদু হাসল।

—ফোনে কথা হবে।

—আমি দেখা করার কথা বলেছি।

—মিহি...

—হুম?

আলভী খুব আস্তে বলল,

—আমাকে ছাড়া বাঁচতে শিখে যেও। মিহির হাসি মিলিয়ে গেল।

—কী?

আলভী হঠাৎ হেসে তার মাথায় টোকা দিল।

—মজা করলাম।

মিহি তার বুকে ঘুষি মারল।

—অসভ্য! এসব নিয়ে মজা করবে না!

—আচ্ছা, সরি।

—আর কোনোদিন বলবে না।

—আচ্ছা।

—প্রমিস?

আলভী থেমে গেল। মিহি হাত বাড়িয়ে দিল।

—প্রমিস করো।

আলভী সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু ধরল না। মিহি ভ্রু কুঁচকাল।

—কী হলো?

আলভী হঠাৎ পিছিয়ে গেল।

—বাসায় যাও। দেরি হচ্ছে।

—আলভী—

—যাও, মিহি।

কণ্ঠটা কেমন কঠিন। মিহি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর অভিমান করে ঘুরে গেল।

—কাল ফোন দিলে ধরব না।

আলভী মৃদু হাসল।

—ধরবে।

—না।

—সাতবার কল দেব।

—সত্তরবার দিলেও না।

—একশোবার?

মিহি পিছনে না তাকিয়েই বলল,

—তখন ভেবে দেখব।

আলভী হেসে ফেলল। মিহি বাড়ির গেটের ভিতরে ঢুকে গেল। একবারও পিছনে তাকাল না।
অভিমান করে। যদি একবার তাকাত—
তাহলে দেখতে পেত,

আরিয়ান আল আলবী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
একজন পূর্ণবয়স্ক ছেলে দুই হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদছে।

রাতে মিহির মনে পড়ল বইটার কথা। সে ব্যাগ থেকে বইটা বের করল। প্রথম পাতা খুলল। আলভীর হাতের লেখা।

“আমার মিহির জন্য— তুমি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা। যদি কোনোদিন আমি তোমার গল্পে না থাকি, তবুও গল্পটা শেষ করে দিও। মাঝপথে থেমে যেও না।”

মিহির হাত কাঁপতে শুরু করল।

—এগুলো কী লিখেছ তুমি?

সে দ্রুত ফোন হাতে নিল। আলভীকে কল দিল।

বন্ধ।

আবার।

বন্ধ।

আবার।

বন্ধ।

মিহির বুকের ভিতর অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক রাত দুইটা সতেরো মিনিটে তার ফোনে একটা ভয়েস মেসেজ এল।

আলভী।

মিহি কাঁপা হাতে প্লে করল। ওপাশ থেকে আলভীর কান্নাভেজা কণ্ঠ—

“মিহি... আমাকে মাফ করে দিও। আমি আর পারছি না। তোমাকে অন্য কারও হতে দেখার শক্তি আমার নেই...”

মিহির হাত থেকে ফোন পড়ে গেল। তার সমস্ত শরীর জমে গেল। আর ভয়েস মেসেজের শেষ কয়েকটা শব্দ ঘরের মধ্যে বারবার বাজতে লাগল—

“ভালো থেকো, আমার মিহি... বিদায়।”

মিহি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—

—আলভীইইই!

চলবে...

 #এমপি_সাহেবের_অক্সিজেন  #পর্ব_২৯ #লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫—আপনি?জারার কণ্ঠ এতটাই নিচু যে প্রায় শোনাই গে...
13/09/2026

#এমপি_সাহেবের_অক্সিজেন
#পর্ব_২৯
#লেখনিতে_অন্বেষা_শেখ

🚫 [ কপি করা নিষেধ ] 🚫

—আপনি?

জারার কণ্ঠ এতটাই নিচু যে প্রায় শোনাই গেল না।
শাহরিয়ার দরজার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তার হাতে ফোন। স্ক্রিনে এখনো জ্বলছে—

UNKNOWN GIRL CALLING...

জারা নিজের ফোনের দিকে তাকাল। কল কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শাহরিয়ারের ফোনের রিংটোনও থেমে গেল। জারা আবার কল দিল। শাহরিয়ারের ফোন বেজে উঠল। আবার কাটল। ফোন থেমে গেল।
আবার দিল। আবার বাজল।

শাহরিয়ার ভ্রু কুঁচকে বলল—

—আর কতবার পরীক্ষা করবি?

জারা ধীরে তার দিকে তাকাল।

—চুপ।

শাহরিয়ার চুপ।

জারা আবার কল দিল।

ফোন বাজল।

এবার তানহা কলটা রিসিভ করলো। শাহরিয়ার ফোন কানে নিল।

তানহা নরম কন্ঠে বলল—

—হ্যালো।

শাহরিয়ারের ফোনে একই গলা। তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে ফোন নামিয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

—আপনি!

—হুম।

—আপনিই!

—হুম।

—এতদিন!

—হুম।

জারা কয়েক সেকেন্ড স্থির।

তারপর চিৎকার—

—দাদিইইইই!

শাহরিয়ার চোখ বন্ধ করল।

—আবার শুরু।

•••

মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে পুরো পরিবার ড্রয়িংরুমে।
দাদি ঘুমের ওড়না ঠিক করতে করতে এসেছেন।
তূর্যের এক চোখ বন্ধ। মাহিরের চুল দাঁড়িয়ে আছে।
মিশু কম্বল গায়ে দিয়ে এসেছে। শায়লা ফুপি উদ্বিগ্ন।
দুই চাচা, দুই চাচি পর্যন্ত হাজির।

দাদি বললেন—

—কী হয়েছে নাতবউ? ভূমিকম্প?

জারা আঙুল তুলে শাহরিয়ারকে দেখাল।

—তোমার নাতি!

দাদি শাহরিয়ারের দিকে তাকালেন।

—কী করেছে?

—প্রতারক!

তূর্য ফিসফিস করল—

—এমপি থেকে প্রতারক। ভাইয়ার রাজনৈতিক
ক্যারিয়ার শেষ।

শাহরিয়ার তাকাতেই সে চুপ। জারা নিজের ফোন তুলে ধরল।

—তানহার নাম্বারের সাথে উনি উল্টো পাল্টা করেছে!

সবাই চুপ।

এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।

মিশু হঠাৎ বলল—

—ও, এটা?

জারা ধীরে তার দিকে তাকাল।

মিশুর মুখ শুকিয়ে গেল।

—মানে... ও মা! এটা!

জারা চোখ সরু করল।

—তুইও জানতি?

—না।

—এইমাত্র ‘ও, এটা’ বললি কেন?

—আমি ঘুমে আছি ভাবি।

—ঘুমের মধ্যে কথা বলিস?

—আজ থেকে বলি।

জারা দুই হাত কোমরে দিল।

—কে কে জানত?

কেউ হাত তুলল না।

জারা বলল—

—সত্যি বলো।

তূর্য খুব ধীরে হাত তুলল। মিশু তার হাত নামিয়ে দিল।

—পাগল? ভাবি মারবে!

জারা চিৎকার করল—

—সবাই জানত?

দাদি শান্তভাবে বললেন—

—আমি জানতাম না।

শাহরিয়ার দাদির দিকে তাকাল।

দাদি বললেন—

—কী? সব দোষ আমার ঘাড়ে দিবি নাকি?

তূর্য বলল—

—আমি শুধু একদিন ধরে ফেলেছিলাম।

মাহির বলল—

—আমি তূর্যের কাছ থেকে শুনেছি।

মিশু বলল—

—আমি মাহিরের ফোন চেক করে জেনেছি।

মাহির চোখ বড় করল।

—তুই আমার ফোন চেক করিস?

—এখন ওটা মূল বিষয় না।

জারা মাথায় হাত দিল।

—এই বাড়িতে ব্যক্তিগত বলে কিছু আছে?

সবাই একসঙ্গে বলল—

—না।

জারা চোখ বন্ধ করল। শাহরিয়ারের ঠোঁটের কোণে হাসি। জারা সেটা দেখে আরও রেগে গেল।

—আপনি হাসছেন?

—না।

—আমি দেখেছি!

—ভুল দেখেছিস।

—আমার চোখ ঠিক আছে।

শাহরিয়ার নিচু গলায় বলল—

—পেঁয়াজ না থাকলে।

তূর্যের মুখ থেকে শব্দ বের হলো।

—ফুসস!

সে মুখ চেপে ধরল।

জারা শাহরিয়ারের দিকে কুশন ছুড়ে মারল।

—অসভ্য!

শাহরিয়ার কুশন ধরে ফেলল।

—আবার?

—আপনি আমার আর তানহা সব কথা শুনতেন?

শাহরিয়ার চুপ।

জারা এক পা এগোল।

—বলেন?

—হুম।

জারা স্থির।

—সব কথা?

—হুম।

—আপনি কীভাবে ওর নাম্বার পেলেন?

শাহরিয়ার তার দিকে তাকাল।

খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—

—আমি এমপি।

জারা ভ্রু কুঁচকাল।

—তাই বলে কী এগুলো করবেন?

—প্রয়োজন হলে।

তারমানে আপনি এটাও জানেন আমিই সে আননোন নাম্বারের মেয়ে?

প্রথম দিন থেকে।

মানে?

তোর হ্যালো শুনেই সেদিন তোকে চিনে ফেলেছিলাম।

—একটা ‘হ্যালো’ শুনে?

—হুম।

জারা অবিশ্বাসে হাসল।

—আপনি মিথ্যা বলছেন।

শাহরিয়ার এবার খুব ধীরে বলল—

—হাজার মানুষের ভিড়েও তোর গলা চিনব।

পুরো ঘর চুপ। জারার হাসি থেমে গেল। শাহরিয়ার তাকিয়ে আছে তার দিকে। একদৃষ্টিতে। জারার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।

তূর্য ফিসফিস করল—

—এবার আমি সিঙ্গেল থাকার কষ্ট অনুভব করছি।

মাহির বলল—

—চুপ থাক।

জারা চোখ সরিয়ে নিল।

—তাহলে প্রথম দিন মিটিং ছেড়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন কেন?

শাহরিয়ার চুপ।

—আপনি তো গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ছিলেন।

—ছিলাম।

—আমার ফোন ধরলেন কেন?

শাহরিয়ার উত্তর দিল না।

জারা আবার বলল—

—বলুন।

শাহরিয়ার খুব শান্তভাবে বলল—

—তোর ফোন ছিল।

—তো?

—তাই ধরেছি।

—এটা কোনো উত্তর?

—আমার জন্য যথেষ্ট।

জারা চুপ। তার মনে পড়ছে। সে তাবহার সাথে কত রাত কথা বলেছে। কত কথা বলেছে। নিজের মনের কথা। এমনকি শাহরিয়ারকে নিয়েও! জারার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।

—আল্লাহ!

শাহরিয়ার ভ্রু তুলল।

—কী?

জারা দুই হাতে মুখ ঢাকল।

—আমি আপনার সামনে আপনারই বদনাম করেছি!

তূর্য এবার মেঝেতে বসে পড়ল হাসতে হাসতে।

—ভাবি কী বলেছিল ?

শাহরিয়ার শান্তভাবে বলল—

—আমি গম্ভীর।

জারা চোখ বড় করল।

—চুপ!

—রাগী।

—চুপ করুন!

—অসহ্য।

—শাহরিয়ার ভাই!

—আর আমাকে বিয়ে করলে তার জীবন শেষ। পুরো পরিবার হেসে উঠল। জারা লজ্জায় লাল।

—আপনি সব মনে রেখেছেন?

—হুম।

—কেন?

—তোর বলা সব কথা মনে থাকে।

আবার নীরবতা। জারা এবার আর চোখ তুলতে পারল না। দাদি মুচকি হাসলেন। শায়লা ফুপির চোখে পানি। জারা ধীরে বলল—

—আপনি তো আমাকে চিনে ফেলেছিলেন তাহলে আমার সঙ্গে রোজ কথা বলতেন কেন?

—ভালো লাগত।

—আমার বকবক?

—হুম।

—আমি তো অনেক কথা বলতাম।

—জানি।

—বিরক্ত হতেন না?

—না।

জারা অবাক হয়ে তাকাল।

শাহরিয়ার বলল—

—তুই সামনে থাকলে যত কথা বলিস, ফোনে তার দ্বিগুণ বলিস। জারা মুখ বাঁকাল।

—আমি আর ফোন দেব না।

—দিবি।

—না।

—দিবি।

—কেন?

শাহরিয়ার স্বাভাবিক গলায় বলল—

—অভ্যাস হয়ে গেছে।

জারা থমকাল।

শাহরিয়ার যোগ করল—

—ঘুম আসে না।

দাদি হঠাৎ বললেন—

—অক্সিজেনও কমে যায়।

জারা দাদির দিকে তাকাল। দাদি তসবিহ পড়তে শুরু করলেন। জারা এবার শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

—এই অক্সিজেনের ব্যাপারটা কী?

শাহরিয়ার উত্তর দিল না।

—আপনি আমাকে না দেখলে সত্যিই এমন বলেন?

তূর্য বলল—

—হুম।

শাহরিয়ার তাকাল।

তূর্য দ্রুত বলল—

—ঘুমের মধ্যে বলেছি।

জারা ধীরে ধীরে সবার মুখ দেখল।

হঠাৎ তার মনে হলো—

সবাই যেন এমন একটা সত্য জানে, যেটা শুধু সে জানে না। নাওরিনের নাটক। ইরার নাটক তানহার নম্বর। প্রথম কলেই গলা চিনে ফেলা। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছেড়ে কথা বলা। ‘অক্সিজেন’।

তোর বলা সব কথা মনে থাকে। হাজার মানুষের ভিড়েও তোর গলা চিনব। জারা ধীরে শাহরিয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—আপনি আমাকে কতদিন ধরে ভালোবাসেন?

শাহরিয়ার স্থির। পুরো পরিবারও। জারা এবার সরাসরি তার চোখে তাকাল।

—সত্যি বলবেন।

শাহরিয়ার চুপ।

—কতদিন?

শাহরিয়ার খুব ধীরে বলল—

—মনে নেই।

জারা ভ্রু কুঁচকাল।

—মানে?

শাহরিয়ারের চোখে হালকা হাসি।

—কবে থেকে ভালোবাসি, সেটা মনে নেই।

জারা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে।

শাহরিয়ার বলল—

—শুধু মনে আছে... যখন প্রথম বুঝেছিলাম ভালোবাসি, তখন তুই অনেক ছোট। জারার চোখ বড় হয়ে গেল।

—কত ছোট?

শাহরিয়ার উত্তর দেওয়ার আগেই দাদি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আলমারির দিকে হাঁটলেন।
জারা অবাক হয়ে বলল—

—কোথায় যাচ্ছ?

দাদি পুরোনো একটা কাঠের বাক্স বের করলেন।
বাক্সটার ওপর ধুলোর আস্তরণ। শাহরিয়ারের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

—দাদি।

দাদি তার দিকে তাকালেন।

—অনেক হয়েছে।

—দাদি—

—চুপ।

দাদি বাক্সটা এনে জারার সামনে রাখলেন।

—তুই সত্য জানতে চাস না?

জারা ধীরে মাথা নাড়ল।

—চাই।

দাদি বাক্স খুললেন। ভেতরে অসংখ্য জিনিস।
পুরোনো ছবি। শুকনো ফুল। একটা ভাঙা লাল চুড়ি।
ছোট্ট একটা চুলের ক্লিপ। আর কয়েকটা চিঠি।
জারা কাঁপা হাতে একটা ছবি তুলল। ছবিতে ছোট্ট একটা মেয়ে। বয়স হয়তো ছয় কিংবা সাত। দুই বেণি।
হাসছে। তার পাশে কিশোর শাহরিয়ার। কিন্তু শাহরিয়ার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। জারা ছবিটার পেছন ঘুরাল।
শাহরিয়ারের হাতের লেখা—

“আমার অক্সিজেন।”

তারিখটা প্রায় পনেরো বছর আগের। জারার হাত কেঁপে উঠল। সে ধীরে শাহরিয়ারের দিকে তাকাল।

—এটা... আমি?

শাহরিয়ার চুপ।

জারার চোখে পানি জমল।

দাদি খুব শান্তভাবে বললেন—

—এবার আমার নাতির গল্পটা তোর জানা দরকার, নাতবউ। জারা ছবিটা বুকে চেপে ধরল।

আর শাহরিয়ার?

এত বছরের মধ্যে প্রথমবার—

দাপুটে এমপি শাহরিয়ার মির্জা জারার চোখের দিকে তাকাতে পারল না।

চলবে...

Address

Dhaka
Narayanganj

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when অন্বেষা শেখ posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share