26/06/2026
প্রথমেই বলে নিই, আমার পরিচয় আমি একজন কৃষিবিদ৷ আম ব্যবসায়ী বা বাগান মালিক নই। আম নিয়ে ফেসবুকীয় আর ইউটিউবীয় বাজারে প্রচলিত হাজার ভীতি আর আতংকের মাঝে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি যে কেন আপনি আম খাবেন, কেন বাজারের আমে ভরসা না পেলে অনলাইনে অর্ডার করে হলেও অবশ্যই আম খাবেন, পরিবারের সদস্যদের আম খাওয়াবেন।
প্রথমেই আমের বিভিন্ন পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে কিছু বলে নিই।
১. কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে আমে রয়েছে ভিটামিন A, C, E, K, ফোলেট, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও খাদ্যআঁশ, যা শরীরকে সতেজ রাখে এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ভিটামিন C ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ আম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে তোলে।
৩. দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে আমে থাকা ভিটামিন A চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৪. ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে ভিটামিন C, বিটা-ক্যারোটিন ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বককে উজ্জ্বল, কোমল ও সতেজ রাখতে সহায়তা করে।
৫. হজমশক্তি উন্নত করে আমের প্রাকৃতিক এনজাইম ও খাদ্যআঁশ হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং পেট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
৬. হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
৭. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক পরিমিত পরিমাণে আম খেলে মিষ্টি খাবারের চাহিদা পূরণ হয়, যা অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৮. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে পরিমিত পরিমাণে আম খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও উপকারী হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৯. মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় ভিটামিন B₆ সেরোটোনিন ও ডোপামিন তৈরিতে সহায়তা করে, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে।
১০. প্রদাহ কমাতে সহায়ক আমে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
১১. শরীরের স্বাভাবিক শোধন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে আমে থাকা পুষ্টি উপাদান লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সমর্থন করে এবং সুস্থ ত্বক বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১২. দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে আমে থাকা বিটা-ক্যারোটিন, কুইরসেটিনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
এবার কিছু খারাপ খবর বলি।
ফেসবুক আর ইউটিউব এর মিথ্যা জগতে আমে ক্যামিকেল দেয়া হচ্ছে, টনিক দেয়া হচ্ছে, "আমের নামে খাচ্ছি ভয়ংকর বিষ" টাইপের কথাবার্তায় এদেশের আতঙ্ক প্রিয় মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। সেটা নিয়েই আম খাওয়া কমেছে, বিক্রি কমেছে। আর এরই ফলে পথে বসতে চলেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীর আম চাষীরা।
এবার কিছু অফটপিকে কথা বলি,
কিছু আজগুবি গুজবে কান দিবেন না।
যেমন আমে ফরমালিন দেওয়া আছে, ইথিলিন দিয়ে পাকানো, ক্ষতিকর ক্যামিকেল দেওয়া ব্লা ব্লা ব্লা.......
১. ফরমালিন দেওয়ার প্রশ্ন ই আসেনা। কারন ফরমালিন সাধারণত দেওয়া হয় প্রোটিন জাতীয় খাদ্যে। আম প্রোটিন জাতীয় কিছু না। তাই বেশিরভাগ ই সম্ভাবনা যে আপনার বিক্রি করা হচ্ছে সেটাতে ফরমালিন দেয়ার সম্ভাবনা খুবই নগন্য।
২. ইথিলিন যদি দেওয়া ই হয় তবে সেটা যথাযথ মাত্রায় দিলে ক্ষতির কোন কারন নাই।
উদাহরণ স্বরুপ, ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বেশির ভাগ আম ইথিলিন দিয়েই পাকানো হয়।
তারা আম পাকার স্টেজে আসার অন্তত ১৫ দিন আগেই পেড়ে নিয়ে ১% ইথিলিন যথাযথ মাত্রায় দিয়ে পাকায়।
৩. অযথা কেমিক্যাল দিতে যাওয়ার কোন দরকার ই নাই।
আর হালকা উজ্জ্বল কালারের জন্য যদি দেওয়া হয় ই সেটা ভালভাবে আম ধুয়ে নিলেই উঠে যাবে।
ভালভাবে ধুয়ে নিলেই এর সমাধান হয়ে যায়।
তাই বিভ্রান্ত হবেন না। নিশ্চিন্তে আম খান।
আরো বেশি সতর্ক থাকতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহীর পরিচিত অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের থেকে নিতে পারেন। সাধারণত তাদের আম ফ্রেস হওয়ার সম্ভাবনা ই ৯৯%.
তবে এক্ষেত্রে একটু সতর্কতা, প্রিমিয়াম নাম দিয়া দেশের নামী-দামী পেজ গুলো যে ২০০/৩০০ টাকা কেজি বিক্রি করে সেসবে আহামরি পার্থক্য নাই।
আরো সতর্ক থাকতে চাইলে আম ভালো ভাবে ডিটারজেন্ট বা সাবান দিয়ে ধুয়ে নিবেন। স্কিনে থাকা সকল কেমিক্যাল রিমুভ হয়ে যাবে।
অযথা গুজবে কান না দিয়ে নিশ্চিন্তে আম খান৷ আমের এই পুষ্টি শরীরে গ্রহন করুন, আমচাষী ভাইদের নায্য দাম পেতে সাহায্য করুন।
কারন, কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে৷
লেখা: কৃষিবিদ তোহিদুর রহমান।
(৪১ তম বিসিএস ক্যাডার)
কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার,
দূর্গাপুর উপজেলা , রাজশাহী।