03/09/2026
গতকাল রাতে যদি আমি আর পাঁচ মিনিট আগে ঐ ফিলিং স্টেশন থেকে চলে যেতাম, তাহলে হয়তো এই ঘটনাটা কখনো লেখা হতো না।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উপর রূপগঞ্জের কাছাকাছি একটা নির্জন ফিলিং স্টেশন আছে।
তখন রাত পৌনে দুইটা।
বাইকে তেল উঠানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ফিলিং স্টেশনে একটা মানুষও নাই।
এমন সময় একটা কালো রঙের প্রাডো গাড়ি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক নেমে এলেন। গায়ে দামী কোট, চোখে চশমা, কিন্তু মুখটা ভয়ে চুপসে আছে। হাত পা থরথর করে কাঁপছে।
"ভাই, একটু সাহায্য করুন, প্লিজ!''
আমি অবাক হয়ে বললাম, "কী হয়েছে স্যার? এত রাতে?"
লোকটা চারপাশটা একবার আতঙ্কিত চোখে দেখে নিয়ে বললেন, "আমি একা সিলেটে যাচ্ছিলাম। কাঁচপুর ব্রিজ পার হওয়ার পর থেকে একটা জিনিস খেয়াল করছি, আমার গাড়ির পেছনের সিটে কেউ একজন বসে আছে।"
"মানে? আপনি একা উঠেননি?"
"আমি একাই গাড়ি ড্রাইভ করে রওনা হয়েছিলাম! গাড়ি লক করা ছিল। কিন্তু আধা ঘণ্টা ধরে রিয়ারভিউ মিররে দেখছি, পেছনের সিটে একটা কালো চাদর মুড়ি দেওয়া লোক বসে আছে। সে নড়ছে না, কিছু বলছে না, শুধু আয়নার দিকে তাকিয়ে একভাবে নিঃশ্বাস ফেলছে। আমি ভয়ে গাড়ি না থামিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছি। ভাই, একটু ভেতরে আলো ফেলে দেখুন না লোকটা কে? আমার ভেতরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না।"
লোকটার অবস্থা দেখে আমার সত্যি মায়া হলো।
বললাম, "চলুন, দেখি কে বসে আছে।"
আমরা দুজন আস্তে আস্তে প্রাডো গাড়িটার দিকে এগোলাম। বৃষ্টির রাতে চারপাশ নিঝুম, শুধু আমাদের জুতোর ছপছপ শব্দ হচ্ছে।
আমি আর লোকটা গাড়ির পেছনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকটা কাঁপতে থাকা হাতে পকেট থেকে রিমোট বের করে আনলক বোতামে চাপ দিলেন।
ক্লিক!
লক খোলার শব্দটা এই নিঝুম রাতে চাবুকের মতো শোনালো।
আমি লোকটাকে পেছনে রেখে মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে আলোটা সোজা গাড়ির পেছনের সিটে ফেললাম।
পেছনের সিটে কেউ নেই। একদম খালি!
আমি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে হেসে ফেললাম। "স্যার, আপনি অতিরিক্ত ক্লান্তিতে চোখে ভুল দেখেছেন। পেছনের সিটে তো কিচ্ছু নেই, খালি!"
লোকটা অবাক হয়ে সামনে এলেন। পেছনের খালি সিটটার দিকে হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে বললেন, "হয়তো অনেকক্ষণ একটানা গাড়ি চালানোর ফলে মাথা ঝিমঝিম করছিল। ভাই, আপনাকে অহেতুক বিরক্ত করলাম।"
লোকটা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়িটা দ্রুত গতিতে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
আর তখনই বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।
আমি ভিজতে ভিজতেই আমার বাইকের কাছে গেলাম। ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা। যতটুকু তেল ছিল, সেটুকু নিয়েই রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবলাম, পথে কোনো একটা পাম্প পেয়ে যাবো।
বাইকে চড়ে স্টার্ট দিয়ে হাইওয়েতে উঠলাম। চারপাশ বৃষ্টিতে ঢাকা। রাস্তা একদম ফাঁকা।
তিন চার কিলোমিটার যাওয়ার পর হঠাৎ বৃষ্টিটা অসম্ভব বেড়ে গেল। এত তীব্র বৃষ্টি যে পাঁচ হাত দূরের রাস্তাও দেখা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আমি বাইকের গতি কমিয়ে ৪০ এ নিয়ে এলাম।
ঠিক তখনই, বাইকের সাইড মিররে আমার চোখ গেল।
বৃষ্টির ফোঁটা জমে থাকা সেই ছোট্ট গোল আয়নাটার দিকে তাকাতেই দেখলাম, আমার ঠিক পেছনে, বাইকের সিটে কেউ একজন বসে আছে!
কালো চাদর দিয়ে শরীরটা মাথা পর্যন্ত মুড়ি দেওয়া।
আমার হাত থেকে বাইকের হ্যান্ডেল কেঁপে উঠলো। অনুভব করলাম, আমার বাম কাঁধের উপর একটা হাত এসে পড়লো!
আমি আতঙ্কে বাইকের কড়া ব্রেক চেপে গাড়ি থামালাম। এক ঝটকায় নেমে দৌড় দিতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না! কাঁধের উপর হাতটা এত শক্ত করে চেপে রাখা যে আমি বাইক থেকে এক ইঞ্চিও সরতে পারলাম না।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাধ্য হয়ে আবার বাইক স্টার্ট দিলাম। এক হাতে কোনোরকম এক্সিলারেটর মুচড়ে সামনের দিকে ছুটতে লাগলাম।
কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার পাশে একটা ছোট চায়ের দোকান চোখে পড়লো। আমি বাইকটা দোকানের সামনে এনে থামালাম।
দোকানদার অবাক হয়ে তাকাতেই আমি চিৎকার করে বললাম, "ভাই, একটু দেখেন তো আমার বাইকের পেছনে কে বসে আছে? আমার কাঁধ শক্ত করে চেপে রাখছে, আমি নামতে পারছি না।"
দোকানদার লাইট নিয়ে এগিয়ে এলো। সে বাইকের পেছনের সিটে আলো ফেললো, চারপাশে ঘুরলো। তারপর ডানে বাঁয়ে মাথা নেড়ে বললো, "কী বলেন ভাই? আপনার বাইকের পেছনে তো কেউ নাই! এত রাতে ভুলভাল দেখছেন নাকি?"
দোকানদার কিছু দেখতে পাচ্ছে না শুনে আমি ভাবলাম, হয়তো অতিরিক্ত ভয় আর ক্লান্তি থেকে আমারও চোখের ভুল হয়েছে।
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে দোকানদারকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর আবার বাইক স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করলাম।
বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েই চলেছে। চারপাশ ঝাপসা।
আরো তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর, হাইওয়ের এক পাশে জঙ্গলঘেরা ফাঁকা জায়গায় হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল।
রাস্তার একপাশে সেই প্রাডো গাড়িটা!
আমি বাইকের গতি কমিয়ে গাড়িটার পাশে এনে থামালাম। ভাবলাম, লোকটাকে গিয়ে বলি, "স্যার, আপনার মতো আমারও চোখের ভুল হয়েছে!"
আমি বাইক থেকে নেমে প্রাডো গাড়িটার ড্রাইভিং সিটের জানালার দিকে এগোলাম। কাচটা আধখোলা ছিল।
ভেতরে মুখ বাড়িয়ে ডাকলাম, "স্যার? স্যার আছেন?"
কোনো উত্তর নেই।
মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে আলোটা ড্রাইভিং সিটে ফেললাম। সিটটা একদম খালি। লোকটা গাড়িতে নেই।
আমার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠলো। লোকটা গেল কোথায়?
ঠিক তখনই, গাড়ির পাশ থেকে আমার নিজের বাইকটার দিকে চোখ গেল।
আমার বাইকের পেছনের সিটে ঐ প্রাডো গাড়ির স্যার বসে আছেন।
তিনি বাইকের সিটে বসে খুব ধীর গতিতে মাথাটা আমার দিকে ঘোরালেন।
তারপর অত্যন্ত নিচু, ঘড়ঘড়ে আর কাঁপা গলায় বললেন-
“ধন্যবাদ ভাই, গাড়িতে জায়গাটা খুব ছোট ছিল, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বাইকের পেছনের সিটটা বেশ খোলামেলা। এবার চলুন, যাওয়া যাক।”
আমি কয়েক সেকেন্ড লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মাথার ভেতর তখন কেউ একসঙ্গে অনেকগুলো দরজা খুলে দিয়েছে।
আমি শুকনো গলায় বললাম, “কোথায় যাবো?”
লোকটা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু ধীরে ধীরে ডান হাতটা তুলে সামনের রাস্তার দিকে ইশারা করলেন।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। কী এক অদ্ভুত বাধ্যবাধকতায় বাইকের পেছনে বসে থাকা লোকটার কথা মেনে নিলাম।
বাইক চলতে শুরু করলো।
আমি রিয়ারভিউ মিররে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলাম না। শুধু সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বাইক চালিয়ে যাচ্ছিলাম। দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। বিশ মিনিট। রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না।
কখনো মনে হচ্ছিল আমি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেই আছি। আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা আমি জীবনে কখনো দেখিনি।
রাস্তার দুই পাশে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে গাছের ছায়া, আর বৃষ্টির পানিতে চকচক করা অ্যাসফল্ট।
আমি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দূরে কাঁচপুর ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। ব্রিজের কাছাকাছি যেতেই পেছন থেকে লোকটার হাত এসে আমার বাম কাঁধে পড়লো।
তিনি খুব আস্তে করে বললেন, “এখানে থামান।”
আমি ব্রেক চাপলাম। লোকটা নেমে গেলেন।
তিনি যেদিকে যাচ্ছেন সেখানে একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে। সেই গাড়ি। কালো রঙের প্রাডো গাড়ি। গাড়িটা ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে কাত হয়ে পড়ে আছে। সামনের অংশটা ভয়াবহভাবে দুমড়ে গেছে। হেডলাইট দুটো নিভে আছে।
লোকটা গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর জানালার কাছে মুখ নিয়ে ভেতরে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।
আমি দূর থেকে চিৎকার করে বললাম, “স্যার! কী হয়েছে?”
লোকটা মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “ভাই, একটু সাহায্য করুন।”
আমি দৌড়ে গাড়িটার কাছে গেলাম। ভেতরে একজন মানুষ আটকে আছে। মুখের একপাশ রক্তে ভেসে গেছে। আমি জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে নাড়ি দেখলাম। কিছু নেই। লোকটা মারা গেছে।
আমার সঙ্গে থাকা লোকটা কান্না থামিয়ে বললেন, “বের করতে হবে।”
আমি বললাম, “কিন্তু লোকটা তো মারা গেছে!”
তিনি বললেন, “জানি।”
আমরা দুজন মিলে মৃত লোকটাকে টানতে শুরু করলাম। অনেক কষ্টে শরীরটা গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে আনলাম। তারপর ব্রিজের উপর শুইয়ে দিলাম।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ব্রিজের স্ট্রিটলাইটের আলোটা লাশের মুখের উপর এসে পড়লো। আমি তাকালাম। আমার শরীরের সমস্ত শক্তি এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। মৃত লোকটাকে আমি চিনি। খুব ভালোভাবেই চিনি। এটা সেই লোক যাকে আমি এতক্ষণ বাইকের পেছনে করে নিয়ে এসেছি।
আমি কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ করতে পারলাম না। আমার চোখ লাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকালাম। একই মুখ। একই চশমা। একই কোট।
আমি পিছিয়ে গেলাম, “আপনি কে?”
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন,
“ভাই, আমার লাশটা পৌঁছে দিন।”
কথাটা বলেই তিনি পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন।
আমি চিৎকার করে বললাম, “স্যার! দাঁড়ান!”
তিনি দাঁড়ালেন না।
বৃষ্টির মধ্যে কয়েক পা যাওয়ার পর লোকটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেলেন।
তারপর। তারপর কিছুই নেই। আমি একা। ব্রিজের উপর একটা মৃতদেহ। একটা দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া প্রাডো গাড়ি। আর আমার বাইক।
আমার হাত এতটাই কাঁপছিল যে ফোন বের করতে দুবার হাত থেকে পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ৯৯৯ এ কল করলাম। পুলিশ এলো প্রায় চল্লিশ মিনিট পর।
আমি তাদের সবকিছু বললাম না। বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, দুর্ঘটনাটা দেখেছি, গাড়ির ভেতর একজনকে পেয়েছি, তাঁকে বের করে এনেছি।
পুলিশ মৃতদেহটা গাড়িতে তুলে নিলো। গাড়িটাও জব্দ করলো। আমি যেহেতু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম, আমাকেও সঙ্গে করে থানায় নিয়ে গেল। থানায় গিয়ে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করতে ঘন্টা দুয়েক লাগলো।
বাড়ি ফিরলাম সকাল দশটায়। নিউজে দেখলাম, গতরাতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাছে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নাম, নওশাদ শিকদার। স্ক্রিনে তার পাসপোর্ট সাইজের ছবি ভেসে উঠলো।
আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।
একই মুখ। একই চোখ। একই মানুষ।
যে মানুষটা প্রাডো গাড়ি নিয়ে আমার সামনে এসে ব্রেক করেছিল। যে মানুষটা আমার বাইকের পেছনে বসেছিল। যে মানুষটা নিজের লাশ দেখিয়ে বলেছিল,
"ভাই, আমার লাশটা পৌঁছে দিন।"
জগতে কতোই না আচানক ঘটনা ঘটে। কতোই না অতীন্দ্রিয় ঘটনা ঘটে। কিন্তু একজন মৃত মানুষ নিজের লাশ পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন জীবত মানুষকে অনুরোধ করে কি-না আমি জানি না৷ জানতেও চাই না।
শুধু জানি, জগতে কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা নেই, লজিক নেই, কিছুই নেই, তবুও ঘটে!
゚
©️ Sohel R Rana ভাইয়ের ওয়াল থেকে ☠️