04/03/2022
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব: ৪
[সূরা বাইয়্যিনাহ]
নামকরণ:
প্রথম আয়াতের শেষাংশ তথা আল বাইয়েনাহ (لَمۡ یَکُنِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ اَهۡلِ الۡکِتٰبِ وَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ مُنۡفَکِّیۡنَ حَتّٰی تَاۡتِیَهُمُ الۡبَیِّنَۃُ ) থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে।
বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য:
সর্বপ্রথম রাসূল পাঠাবার প্রয়োজন বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে এই যে, আহলি কিতাব ও মুশরিক নির্বিশেষ দুনিয়াবাসীরা কুফরীতে লিপ্ত হয়েছে। একজন রাসূল পাঠানো ছাড়া এই কুফরীর বেড়াজাল ভেদ করে তাদের বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। এ রাসূলের অস্তিত্ব তাঁর রিসালাতের জন্য সুম্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে পরিগণিত হতে হবে এবং তিনি লোকদের সামনে আল্লাহর কিতাবকে তার আসল ও সঠিক আকৃতিতে পেশ করবেন। অতীতের আসমানী কিতাবসমূহে যেমন বাতিলের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছিল তেমন কোন মিশ্রণ তাতে থাকবে না এবং হবে পুরোপুরি সত্য ও সঠিক শিক্ষা সমন্নিত।
এরপর আহলি কিতাবদের গোমরাহী তুলে ধরা হয়েছে , বলা হয়েছে তাদের এই বিভিন্ন ভুল পথে ছুটে বেড়ানোর মানে এ নয় যে , আল্লাহ তাদেরকে পথ দেখাননি। বরং তাদের সামনে সঠিক পথের বর্ণনা সুস্পষ্টভাবে এসে যাবার পরপরই তারা ভুল পথে পাড়ি জমিয়েছে। এ থেকে স্বাভাবিকভাবে প্রমাণ হয়, নিজেদের ভুলের জন্য তার নিজেরাই দায়ী। এখন আবার আল্লাহর এই রাসূলের মাধ্যমে সত্য আর এক দফা সুস্পষ্ট হবার পরও যদি তারা বিভ্রান্তের মতো ভুল পথে ছুটে বেড়াতে থাকে তাহলে তাদের দায়িত্বের বোঝা আরো বেশী বেড়ে যাবে।
এ প্রসংগে বলা হয়েছে , মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব নবী এসেছিলেন তাঁরা সবাই একটি মাত্র হুকুম দিয়েছিলেন এবং যেসব কিতাব পাঠানো হয়েছিল সেসবে একটি মাত্র হুকুমই বর্ণিত হয়েছিল। সেটি হচ্ছে: সব পথ ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর বন্দেগীর পথ অবলম্বন করো। তাঁর ইবাদাত, বন্দেগী ও আনুগত্যের সাথে আর কারোর ইবাদাত – বন্দেগী , আনুগত্য ও উপাসনা আরাধনা শামিল করো না। নামায কায়েম করো এবং যাকাত দাও। চিরকাল এটিই সঠিক দীন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। এ থেকেও স্বাভাবিকভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে, আহলি কিতাবরা এই আসল দীন থেকে সরে গিয়ে নিজেদের ধর্মে যেসব নতুন নতুন কথা বাড়িয়ে নিয়েছে সেগুলো সবই বাতিল। আর আল্লাহর এই নবী যিনি এখন এসেছেন তিনি তাদেরকে এই আসল দীনের দিকে ফিরে আসার দাওয়াত দিচ্ছেন।
সবশেষে পরিস্কারভাবে বলে দেয়া হয়েছে, যেসব আহলি কিতাব ও মুশরিক এই রসূলকে মেনে নিতে অস্বীকার করবে তারা নিকৃষ্টতম সৃষ্টি । তাদের শাস্তি চিরন্তন জাহান্নাম। আর যারা ঈমান এনে সৎকর্মের পথ অবলম্বন করবে এবং দুনিয়ায় আল্লাহকে ভয় করে জীবন যাপন করবে তারা সর্বোত্তম সৃষ্টি। তারা চিরকাল জান্নাতে থাকবে। এই তাদের পুরস্কার । আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও হয়েছে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
সূরার ফযীলত:
এই সূরার দ্বিতীয় নাম হল ‘সূরা লাম ইয়াকুন’ হাদীসে বর্ণিত যে, একদা নবী সা. উবাই বিন কা’ব রাদ্বি. -কে বললেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন যে, আমি তোমাকে ‘লাম ইয়াকুনিল্লাযীনা কাফারু’ সূরাটি পাঠ করে শুনাব।’’ উবাই রা.জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহ তাআলা কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন?’ তিনি সা. বললেন, ‘‘হ্যাঁ!’’ অতঃপর এই খুশীতে উবাই রা. -এর চোখে অশ্রু এসে গেল। (সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা ‘লাম ইয়াকুন’ পরিচ্ছেদ)
আগের সূরার ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক:
৯৭ নং সূরা আল ক্বদর এ বর্নিত হয়েছে কখন ওহী আসা শুরু হয়েছিল? ৯৮ নং সূরা আল বায়্যিনাহ এ বর্নিত হয়েছে ওহী আসলে কি? এর প্রভাব কতটুকু? এই পবিত্র কিতাবের সাথে একজন রাসূল পাঠানো হয়েছিলো কেন তা বলা হয়েছে এবং এ সূরার শেষের দিকে (আয়াত ৬ এবং ৭) সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভাল সৃষ্টি এর কথা বর্নিত হয়েছে। আর ৯৯ তম সূরা আল যিলযালের শেষে ক্ষুদ্রতম ভাল ও ক্ষুদ্রতম খারাপ এর কথা বর্ণিত হয়েছে।
------------------------------------------------------------
আয়াতগুলোর তাফসীরের জন্য ভিজিট করুন-
https://www.maunfoundation.org/notes-4-sura-bayyinah/
সূরা ভিজুয়ালাইজেশন- https://www.maunfoundation.org/.../03/Untitled-12-scaled.jpg
সব নোট- https://www.maunfoundation.org/notes
-----------------------------------------------------------
ফুটনোট:
আলোচ্য সূরার আলোকে দ্বীনুল কায়্যিমাহ বা সঠিক ধর্মের উপাদান তিনটি- ইবাদাত, সালাত, যাকাত।
ইবাদাত আসলে ২ টি কাজের সংমিশ্রন:
(১) উপাসনা ও (২) দাসত্ব।
বায়িন্যাহ বা সুস্পষ্ঠ প্রমাণ হলো দুইটি বিষয়ের সমন্বয়ে- কিতাব ও রাসূল।
আল্লাহ শুধু কিতাবের দিক নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন নাই বরং রাসূলকে দিয়ে তাঁর পরিপূর্ন বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম শুধু যৌক্তিক থিওরী নয় সাথে দৃশ্যমান, প্রাক্টিকাল বাস্তবায়নও করে দেখানোর শিক্ষা দেয়। ইসলামী ফিলোসফি অনুযায়ী একটি থিওরী খুব ভাল হতে পারে কিন্তু তা যদি বাস্তবায়নযোগ্য না হয়, কথা ও কাজের মিল যদি না থাকে তাহলে তা শেষ পর্যন্ত ভাল বা আদর্শ বলা যাবে না।
যদি শুধু রাসূল আসেন, কিন্তু কিতাব তাঁর উপর অবতীর্ণ না হয় তাহলে কেউ কেউ বলতে পারে, আমাদের আশেপাশে অনেক ভাল মানুষ আছে কিন্তু আমরা কীভাবে চলবো তা তো জানিনা। আমাদের পাকড়াও করা যাবে না। আবার যদি এমন হয় শুধু কিতাব এলো কিন্তু কোন রাসূল এলেন না তাহলেও মানুষ কুযুক্তি দিতে পারে, এই কিতাব আসলে অনেক কঠিন, আমাদের মত মানুষের পক্ষে এটি সব মেনে চলা সম্ভব না। আমাদের পাকড়াও করা যাবে না। কিন্তু যখন এই কিতাব ও রসূল একই সাথে আসেন তখন আর বলার মত যৌক্তিক কোন অযুহাত থাকে না।
কিতাব ও রাসূলের সমন্বয়ে যে আল বায়্যিনাহ সেটা মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। সবচেয়ে খারাপ সৃষ্টি (শাররুল বারিয়্যাহ) ও সবচেয়ে ভাল সৃষ্টি (খায়রুল বারিয়াহ )।
শাররুল বারিয়্যাহ এর প্রতিদান হলো- তারা দোযখের আগুনের মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। খায়রুল বারিয়াহ এর প্রতিদান হলো- স্থায়ী জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তার প্রতি সস্তুষ্ট।
রাসূলের কাজ হলো- তিনি কিতাব সমূহ তিলাওয়াত করে শুনান।
কিতাবগুলোর পরিচয় দুইটি: (১) সুহুফাম মুতাহহারহ বা পবিত্র কিতাব (২) যাতে আছে সঠিক বিধিবদ্ধ বিধান।
শেষ আয়াতে জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার সূত্র বলে দেওয়া হয়েছে- এটি তার জন্য, যে তার রবকে ভয় করে।
আকিমুস সালাহ- নামাজ প্রতিষ্ঠার কাজ তিনভাবে করা যায়:
• নিজে জামায়াতের সাথে ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। খুশু-খুজু সহ নামাজের হক আদায় করে পড়া।
• পরিবার ও নিকটজনকে নামাজের তাকীদ দেওয়া
• নামাজ শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়ন করা
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর থাকলে যাকাত দেওয়া ফরজ হয়ে যায়। যাকাত ইসলামের তৃতীয় রুকন বা ভিত্তি। তাই আমাদের উচিত যাকাত ফরজ হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখা এবং যথাযথভাবে যাকাত আদায় করা।
-----------------------------------------------------------------------
সূরার পরিচয়, অনুবাদ, ফুটনোটগুলো বেশি করে পড়বেন। নোট থেকে তেমন কিছু মুখস্থ করতে হবে না তবে সূরাগুলোতে যেসব বিষয়ের উল্লেখ আছে সেগুলো আত্মস্থ করে নিলেই হবে- যেমন কোনো ঘটনা উল্লেখ থাকলে এই ঘটনা কিসের প্রেক্ষিতে, এই ঘটনার সাথে কার সম্পর্ক, শিক্ষা কি, কুরআনে এই ঘটনা উল্লেখ করে কি মেসেজে দেওয়া হচ্ছে। কোনো নবীর কথা উল্লেখ করলে তাকে কেন উল্লেখ করা হয়েছে, নবীর কি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে ইত্যাদি।
একটি নোট পড়তে ১/২ ঘন্টা সময় লাগবে।
প্রায় ৪০টি নোট প্রকাশ করা হবে, প্রতিদিন একটি করে।
----------------------------------------------------------------
এই পর্ব সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন থাকলে, অথবা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে, অথবা নমুনা প্রশ্ন নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করতে পারেন এই পোস্টের কমেন্টে। মাউন ফাউন্ডেশনের টীম আপনাদের সাথে অংশগ্রহণ করবে ইনশাআল্লাহ্।