03/11/2024
মৌমাছির জীবন থেকে শিক্ষা-
তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে (তার অন্তরে ইঙ্গিত করে) নির্দেশ দিয়েছেন, গৃহনির্মাণ করো পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে, তাতেও।
[সুরা: নাহল, আয়াত: ৬৮]
মৌমাছি মধু সংগ্রহকারী পতঙ্গবিশেষ। এদের চারটি পাখা থাকে। এরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের নির্যাস সংগ্রহ করে এবং তা থেকে অর্ধতরল মিষ্টি, মধু প্রস্তুত করে। মৌমাছিদের মধ্যে রয়েছে শ্রেণিবিভাগ। এদের এক দল কর্মী মৌমাছি। এরা ফুলের নির্যাস খাদ্যনালির ক্রপ বা হানি স্টমাকে সংগ্রহ করে এবং এখানেই উেসচকের বিক্রিয়ায় তা ডেক্সট্রোজ ও লিভিউলোজে পরিণত হয়। পরিবর্তিত এই অংশটুকু কর্মী মৌমাছি মৌচাকের বিশেষ প্রকোষ্ঠে জমা করে। জমা করা এ তরল অংশই মধু।
মৌমাছি মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি। এরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করে। কোনাকৃতির মৌচাক গঠনের শৈলী দেখে যেকোনো প্রকৌশলী স্বীকার করতে বাধ্য যে মৌমাছির প্রকৌশলবিদ্যা অত্যন্ত উঁচু মানের। মৌমাছির কাজ নির্ভুল ও নিখুঁত। মৌমাছিরা বিভিন্ন জায়গায় ঘর বাঁধে। কখনো পাহাড়ের সুউচ্চ শৃঙ্গে, কখনো মানবগৃহের কোনো স্থানে আর কখনো গাছের ডালে। মৌমাছিরা খুব ভোরে ফুলের সন্ধানে মৌচাক থেকে বেরিয়ে যায়। এদের পরস্পরের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়। এরা রহস্যময় পদ্ধতিতে অন্য মৌমাছিদের জানিয়ে দেয় যে অমুক এলাকায় প্রচুর ফুল পাওয়া যায়! এরপর দলে দলে এরা সেখানে ছুটে চলে। নানা ফুলের নির্যাস খেয়ে মৌমাছি থেকে যে সুপেয় পানীয় বের হয়, তা-ই মধু। মধু বহু রোগের মহৌষধ। মধু উৎপাদনসহ মৌমাছির সার্বিক তৎপরতা মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের বহিঃপ্রকাশ।
মৌমাছি ও মধু সম্পর্কে সবার কমবেশি জানাশোনা আছে। কিন্তু আলোচ্য আয়াতে নতুন দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এক. মৌমাছির কাছে ‘ওহি’ আসে। ‘ওহি’ মানে আসমানি প্রত্যাদেশ। ‘ওহি’ আসে নবী ও রাসুলদের কাছে। তবে ‘ওহি’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ইশারা বা ইঙ্গিত। এ আয়াতে ‘ওহি’ শব্দ ‘অন্তরে ইঙ্গিত’ বা ‘সৃষ্টিগত মহাশক্তি’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
মৌমাছি শুধু বৃক্ষেই ঘর বাঁধে না, এরা পাহাড় ছিদ্র করে সেখানে নিজেদের পছন্দের আবাস গড়ে তোলে। সম্প্রতি আমেরিকার উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ গ্রুপ একটি নতুন প্রজাতির মৌমাছির সন্ধান পেয়েছে। এই প্রজাতির মৌমাছি পাহাড়ে ঘর নির্মাণ করে। গবেষকরা বলেছেন, এ ধরনের মৌমাছি আমেরিকার কলোরাডো প্রদেশ ও ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ডেথ ভ্যালি’ এলাকার মরুভূমির পাহাড় ও শিলা খনন করে নিজেদের বাসা নির্মাণ করেছে। (সূত্র : ইরানভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ইকনা’)
প্রাণিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ৫০০ গ্রাম মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছির দরকার হয় দুই মিলিয়ন ফুল। একই পরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছির ৯০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এরা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় আট কিলোমিটার উড়তে পারে। সারা জীবনে অর্ধেক চা চামচের সমপরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে পারে। একটা মৌচাকে গড়ে প্রায় ৬০ হাজার মৌমাছি থাকে। পুরো পৃথিবী একবার ঘুরে আসতে মৌমাছির জন্য দুই চা চামচ মধুই খাবার হিসেবে যথেষ্ট। মধু সংগ্রহের জন্য একটি মৌমাছি ৫০ থেকে ১০০ ফুলে বসে।
মৌমাছি ছোট একটি প্রাণী। কিন্তু পবিত্র কোরআনে সে প্রাণীকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। মৌমাছির আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘নাহল’। মহান আল্লাহ এ নামে একটি সুরা অবতীর্ণ করেছেন। হাজার বছর আগেই আল্লাহ মৌমাছিদের জীবন সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন। এর অন্যতম কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হলেও মৌমাছি থেকে তাদের শেখার আছে অনেক কিছু। এ আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশনা দিয়ে মৌমাছি সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপ প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন করে দিয়েছেন। সে দায়িত্ব ও নিয়ম উপেক্ষা করার এখতিয়ার ও শক্তি কারো নেই।
কিন্তু মানুষকে মহান আল্লাহ ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তাঁর ইবাদত করে না। মানুষ আল্লাহর দেওয়া সীমিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে।
মৌমাছি মানুষকে পবিত্র রিজিক গ্রহণের শিক্ষা দেয়। মৌমাছি নষ্ট ফুল থেকে মধু আহরণ করে না। তারা পরিষ্কার ও অব্যবহৃত ফুল থেকেই মধুর উপাদান সংগ্রহ করে থাকে। মানুষের উচিত পবিত্র রিজিক গ্রহণ করা। হারাম রিজিক ভক্ষণের মধ্যে কোনো বরকত থাকে না।
মৌমাছি খুবই পরিশ্রমী পতঙ্গ। ফুলের রস মুখে নিয়ে, সেটা থেকে জলীয় অংশ দূর করে শতভাগ ভেজালমুক্ত এক ফোঁটা মধু তৈরি করতে যে শ্রম ও সময় ব্যয় করে সেটা বিস্ময়কর! এক পাউন্ড মধু বানাতে ৫৫০ মৌমাছিকে প্রায় ২০ লাখ ফুলে ভ্রমণ করতে হয়! আবার এক পাউন্ড মধু সংগ্রহ করতে একটি কর্মী মৌমাছিকে প্রায় ১৪.৫ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়! যা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করা সম্ভব! ফুলের সন্ধানে প্রতিটি মৌমাছি, মৌচাকের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসের পুরো এলাকা তারা তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেড়ায়! তাদের ওড়ার গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার। একটি সক্ষম মৌমাছি দৈনিক ১০ কিলোমিটারের মতো পথ পাড়ি দিতে পারে। মানবসন্তান যখন চামচে ভরে মধু পান করে তৃপ্ত বোধ হয়, তখন সে ভাবে না যে এই এক চামচ মধু সৃষ্টিতে কত শত মৌমাছির রক্তক্ষয়ী অবদান লুকিয়ে আছে!
একটি কর্মী মৌমাছির ৪২ দিনের ছোট্ট জীবনে নিজেদের সঞ্চিত মধু পান করার সৌভাগ্য খুব কমই হয়!
মৌমাছির এই ত্যাগের শিক্ষা মানুষ ধারণ করলে পৃথিবীর চেহারা বদলে যেত। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব পতঙ্গের মজুদ করা মধু বিভিন্ন প্রাণী চুরি করে পান করে। মানবজাতিও পরম তৃপ্তিতে মধু পান করে। মধু পানের সময় মৌমাছির ত্যাগের কথা তারা ভুলে যায়। ভুলে যায় মৌমাছির স্রষ্টাকেও!
Moucak Mart
Life's Beautiful
📱01715708092