09/12/2026
আপনার কিশোরী মেয়ে যদি একদিন বলে, “আমাকে হিজাব পরতেই হবে কেন?”
প্রশ্নটা শুনেই হয়তো আপনার ভেতরে একটু ভয় ঢুকে যাবে। মনে হতে পারে, “এতদিন তো ঠিকই ছিল, এখন হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন? ও কি হিজাব ছেড়ে দিতে চাইছে?” কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগে একটা কথা মনে রাখুন, প্রশ্ন করা আর অস্বীকার করা এক জিনিস নয়। অনেক সময় আপনার মেয়ে হিজাবের বিরুদ্ধে নয়, সে শুধু জানতে চাইছে, “আমি যেটা করছি, কেন করছি?”
কিশোর বয়সে এই প্রশ্নটা অস্বাভাবিকও নয়। স্কুলে গিয়ে সে অন্য মেয়েদের দেখে, বন্ধুদের কথা শোনে, নিজের appearance নিয়ে সচেতন হয়, কে তাকে কীভাবে দেখছে সেটাও ভাবতে শুরু করে। তখন তার মনে আসতেই পারে, “আমার বন্ধুদের তো হিজাব করতে হয় না”, “মানুষ আমাকে আলাদা ভাবলে?”, “শুধু মেয়েদেরই কেন?”, “হিজাব কি শুধু মাথায় কাপড় দেওয়ার নাম?” এসব প্রশ্নকে যদি শুধু “এত প্রশ্ন করো কেন?” বলে থামিয়ে দেওয়া হয়, সে হয়তো চুপ করবে, কিন্তু প্রশ্নটা তার ভেতরেই থেকে যাবে।
তাই প্রথমে খুব সহজ করে বলুন, হিজাব কোনো পারিবারিক tradition বা মানুষের বানানো সামাজিক নিয়ম নয়। এটি আল্লাহর আনুগত্যের অংশ। আল্লাহ মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত করতে, নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে, সৌন্দর্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সীমা মানতে এবং তাদের মাথার আবরণ বক্ষদেশের ওপর টেনে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার মুমিন নারীদের বাইরের পোশাক নিজেদের ওপর টেনে নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন।
— সূরা আন নূর, ২৪:৩১; সূরা আল আহযাব, ৩৩:৫৯
তবে এখানেই কথা শেষ করবেন না। শুধু “আল্লাহ বলেছেন, তাই করতে হবে” বললে বিধানটি সত্য থাকে, কিন্তু আপনার মেয়ের মনের সব প্রশ্নের উত্তর নাও হতে পারে। তাকে বুঝতে সাহায্য করুন, আল্লাহর কোনো বিধানই তাকে ছোট করার জন্য নয়। তিনি নারী ও পুরুষ উভয়কেই দায়িত্ব দিয়েছেন, যদিও কিছু দায়িত্বের ধরন আলাদা।
বরং নারীদের পর্দার নির্দেশের আগেই আল্লাহ মুমিন পুরুষদের বলেছেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করতে এবং পবিত্রতা রক্ষা করতে।
— সূরা আন নূর, ২৪:৩০
তাই মেয়েকে কখনো এমনভাবে শেখাবেন না, “তুমি মেয়ে, তোমাকেই ঢাকতে হবে, না হলে ছেলেরা খারাপ হবে।” একজন পুরুষ তার দৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দায়ী, একজন নারী তার নিজের পোশাক, দৃষ্টি ও আচরণের জন্য দায়ী। হিজাব পুরুষের ভুল আচরণের দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নাম নয়; এটি একজন মুমিন নারীর নিজের রবের প্রতি আনুগত্যের অংশ।
আর হিজাবকে শুধু মাথার একটি scarf-এর মধ্যেও সীমাবদ্ধ করবেন না। ইসলামের শালীনতার শিক্ষা পোশাকের পাশাপাশি দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা এবং নারী পুরুষের পারস্পরিক সীমাবোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আবার কোনো মেয়ে হিজাব করতে গিয়ে কষ্ট করছে বলে তার পুরো দ্বীনদারিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করাও ঠিক নয়। মানুষ কখনো কখনো আল্লাহর বিধানকে সত্য বলে বিশ্বাস করেও তা পালন করতে সংগ্রাম করে, আর সেই সংগ্রামের সময়ই তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নসিহাহ, দোয়া এবং নিরাপদ একটি পরিবার।
এখানে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। কিশোরী হলেই যে সে শরয়িভাবে বালেগ হয়েছে, এমন নয়। ছোট বয়স থেকেই হায়া, শালীন পোশাক ও ইসলামী আদবের অভ্যাস তৈরি করা যায়, কিন্তু শরয়ি দায়িত্ব বালেগ হওয়ার পর প্রযোজ্য হয়। তাই বয়স, মানসিক প্রস্তুতি এবং শরয়ি অবস্থার পার্থক্য বুঝে সন্তানকে শেখানো জরুরি।
হয়তো আপনার মেয়ে একদিন বলবে, “মানুষ আমাকে judge করলে?” কথাটা আপনার কাছে ছোট মনে হলেও তার কাছে হয়তো খুব বড়। এমন বয়সে বন্ধুদের স্বীকৃতি, স্কুলের পরিবেশ এবং অন্যরা কী ভাবছে, এগুলো অনেক বেশি অনুভূত হয়। তখন শুধু “মানুষের কথা শুনবে না” বলবেন না। আগে স্বীকার করুন যে তার জন্য বিষয়টা কঠিন হতে পারে, তারপর শেখান, মানুষের মতামত প্রতিদিন বদলায়, কিন্তু একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য মানুষের স্বীকৃতি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়, আল্লাহ তার জন্য মানুষের ব্যাপারে যথেষ্ট হয়ে যান।
— জামে আত তিরমিযি, ২৪১৪
কিন্তু এখানেই আমরা অনেক মা বাবা বড় একটা ভুল করে ফেলি। মেয়ে হিজাব নিয়ে দুর্বলতা প্রকাশ করতেই বলে ফেলি, “খুললে তুমি খারাপ মুসলিম”, “মানুষ কী বলবে?”, “আমাদের মানসম্মান শেষ করে দেবে”, “এভাবে থাকলে তোমাকে কে বিয়ে করবে?” ভয় দেখিয়ে হয়তো কিছুদিন তাকে বাধ্য রাখা যাবে, কিন্তু ভয় সবসময় conviction তৈরি করে না। উল্টো একসময় মেয়েটি হিজাবকে আল্লাহর ভালোবাসার বদলে পরিবার, সামাজিক চাপ আর লজ্জার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলতে পারে।
তার বদলে পাশে বসুন। জিজ্ঞেস করুন, “তোমার কোন জায়গাটা সবচেয়ে কঠিন লাগে?” হয়তো সে বলবে গরম লাগে, হয়তো বন্ধুদের মাঝে awkward লাগে, হয়তো নিজের appearance নিয়ে insecurity আছে, হয়তো কোনো প্রশ্নের উত্তর সে কখনোই পায়নি। সে যা বলবে, মাঝখানে থামিয়ে defence mode-এ যাবেন না। আগে শুনুন, তারপর উত্তর দিন।
আর উত্তর না জানলে বলুন, “আমি নিশ্চিত হয়ে তোমাকে বলব।” সন্তানের সামনে সব প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর জানা মা বাবার দায়িত্ব নয়, কিন্তু সত্য খুঁজে দেওয়ার আন্তরিকতা থাকা দায়িত্ব। কখনো কখনো এই একটি বাক্যই সন্তানকে শেখায়, ইসলাম প্রশ্নকে ভয় পায় না।
আর যদি সে সরাসরি বলে, “আমি হিজাব করতে চাই না”? তখন তার কথাকে হালকা করে দেবেন না, আবার আল্লাহর বিধানকেও অস্পষ্ট করবেন না। আগে বুঝুন সমস্যাটা কোথায়। এটা কি বিশ্বাসের প্রশ্ন, বন্ধুদের চাপ, স্কুলের পরিবেশ, নিজের appearance নিয়ে অস্বস্তি, কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা, নাকি শুধু অভ্যাসের কষ্ট?
বালেগ হওয়ার পর আল্লাহর বিধান মানার দায়িত্ব তার ওপর আসে, এটা তাকে সুন্দরভাবে স্পষ্ট করুন। কিন্তু সেই সঙ্গে তাকে একা ছেড়ে দেবেন না। ধৈর্য ধরে বোঝান, তার কষ্টের বাস্তব সমাধান খুঁজুন, ভালো পরিবেশ তৈরি করুন এবং নিজের জীবন দিয়েও দেখান যে আল্লাহর আনুগত্য শুধু মেয়ের জন্য কোনো নিয়ম নয়, পুরো পরিবারের জীবনধারা।
বিশেষ করে আপনার নিজের আচরণটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি তাকে হিজাব শেখান কিন্তু নিজের কথাবার্তায় অন্যের পোশাক নিয়ে অপমান করেন, মানুষকে ছোট করেন, গীবত করেন বা দ্বীনের ব্যাপারে দ্বৈত মানদণ্ড রাখেন, তাহলে সে আপনার কথার চেয়ে সেই contradiction-টাই বেশি মনে রাখবে। সন্তান আমাদের নসিহাহ শোনে, কিন্তু আমাদের জীবনও খুব মন দিয়ে পড়ে।
একদিন হয়তো সেই মেয়েটাই আয়নার সামনে নিজের হিজাব ঠিক করতে করতে বুঝবে, “আমি এটা শুধু আম্মু বলেছে বলে করছি না। আমি আমার রবের জন্য করছি।” সেদিন হিজাব শুধু তার মাথায় থাকবে না, তার সিদ্ধান্তের ভেতরেও থাকবে।
এটাই তো আসল লক্ষ্য। শুধু এমন একটি মেয়ে বড় করা নয় যার মাথায় হিজাব আছে, বরং এমন একজন মুমিনাহকে বড় করা, যে জানে কেন আল্লাহর আনুগত্য করে, প্রশ্ন এলে উত্তর খোঁজে, দুর্বল হলে আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মতামতের চেয়ে নিজের রবের সন্তুষ্টিকে বড় করতে শেখে।
তাই আপনার মেয়ের “কেন?” শুনে ভয় পাবেন না। হয়তো এই প্রশ্নটাই তার দ্বীনকে শুধু inherited habit থেকে conscious faith-এর দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি দরজা হতে পারে। দরজাটা বন্ধ করে দেবেন না, তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সঠিক পথে হাঁটতে সাহায্য করুন।
আল্লাহ আমাদের কন্যাদের হায়া, উপকারী ইলম, দৃঢ় ঈমান ও সুন্দর চরিত্র দান করুন। আর আমাদের এমন মা বাবা হওয়ার তাওফিক দিন, যাদের কাছে সন্তান দ্বীনের প্রশ্ন নিয়ে এলে ভয় নয়, নিরাপত্তা অনুভব করে। আমিন।
মূল ভাবনা ও রেফারেন্স: Faith & Fiqh, Instagram
— NahWa Ad Deen