19/07/2026
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার শক্তিশালী ১০টি আমল ও দোয়া
শয়তান থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, পাপের দিকে আকৃষ্ট করা এবং ঈমানকে দুর্বল করে দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا
“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।”—সূরা ফাতির: ৬
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন—
“বান্দা ১০টি উপায়ের মাধ্যমে শয়তান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।”—বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ: ২/২৬৭
▪️১. শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া
শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম।
“আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।”
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ
“যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করো।”
—সূরা ফুসসিলাত: ৩৬
▪️২. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর সময় এই দুই সূরা পাঠ করতেন।
হাদিসে এসেছে—
“রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন দুই হাত একত্র করে তাতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন।—সহিহ বুখারি: ৫০১৭
▪️৩. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা
আয়াতুল কুরসির
االلَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَؤُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা'খুযুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস্-সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ। মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ ইন্দাহু ইল্লা বিইযনিহি। ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাই'ইম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা'আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা। ওয়া হুয়াল আলিয়্যুল আযীম।
আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক ও পালনকর্তা। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে? তিনি জানেন তাদের সামনে যা আছে এবং তাদের পেছনে যা আছে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের কোনো অংশই আয়ত্ত করতে পারে না, তবে যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে মোটেই ক্লান্ত করে না। আর তিনি সর্বোচ্চ, সর্বমহান।—সূরা আল-বাকারা: ২৫৫
হাদিসে এসেছে—
“যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।”—সহিহ বুখারি: ২৩১১
▪️৪. সূরা আল-বাকারা পাঠ করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না। যে ঘরে সূরা আল-বাকারা পাঠ করা হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।”—সহিহ মুসলিম: ৭৮০
▪️৫. সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ.
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.
আ-মানার রাসূলু বিমা উনযিলা ইলাইহি মির রাব্বিহি ওয়াল মু'মিনূন। কুল্লুন আ-মানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি, লা নুফাররিকু বাইনা আহাদিম মির রুসুলিহি। ওয়া কালূ সামি'না ওয়া আতা'না। গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাসীর।
লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উসআহা। লাহা মা কাসাবাত ওয়া আলাইহা মাকতাসাবাত। রাব্বানা লা তুআখিযনা ইন নাসীনা আও আখতা'না। রাব্বানা ওয়া লা তাহমিল আলাইনা ইসরান কামা হামালতাহু আলাল্লাযীনা মিন কাবলিনা। রাব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মা লা তাকাতা লানা বিহি। ওয়া'ফু আন্না, ওয়াগফির লানা, ওয়ারহামনা। আন্তা মাওলানা ফানসুরনা আলাল কাওমিল কাফিরীন।
রাসূল তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান এনেছেন এবং মুমিনরাও ঈমান এনেছে। তারা সবাই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। তারা বলে, “আমরা তাঁর কোনো রাসূলের মধ্যে পার্থক্য করি না।” তারা আরও বলে, “আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার ক্ষমা চাই, আর আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন।”
আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। সে যা ভালো কাজ করে তার প্রতিদান সে পাবে এবং যা মন্দ কাজ করে তার দায় তার ওপরই বর্তাবে। “হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করে ফেলি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেমন আপনি আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর চাপিয়েছিলেন। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এমন দায়িত্ব দেবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের গুনাহ মাফ করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। অতএব, কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।”
—সূরা আল-বাকারা – শেষ দুই আয়াত (২:২৮৫–২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।”—সহিহ বুখারি: ৫০০৯, সহিহ মুসলিম: ৮০৮
▪️৬. সূরা গাফিরের প্রথম অংশ পাঠ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
حم ۚ تَنزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
“হা-মীম। এই কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর পক্ষ থেকে।”—সূরা গাফির: ১-২
▪️৭. তাওহিদের যিকির বেশি বেশি করা
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন কাদীর।
“আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি দিনে একশত বার এই যিকির করবে, তার জন্য একশত নেকি লেখা হবে, একশত গুনাহ মুছে দেওয়া হবে এবং সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে নিরাপদ থাকবে।”
—সহিহ বুখারি: ৬৪০৩, সহিহ মুসলিম: ২৬৯১
▪️৮. হারাম দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা
আল্লাহ বলেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
“মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।”
—সূরা আন-নূর: ৩০
▪️৯. অতিরিক্ত কথা ও অতিরিক্ত খাবার থেকে বিরত থাকা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।”—জামে আত-তিরমিজি: ২৩৮০
▪️১০. খারাপ সঙ্গ থেকে বেঁচে থাকা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।”—সুনান আবু দাউদ: ৪৮৩৩, জামে আত-তিরমিজি: ২৩৭৮
শয়তানের বিরুদ্ধে মুমিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো—আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং তাকওয়া।