26/03/2026
“মৃত্যু আলিঙ্গন”
-ডাক্তার!কি করি বলত?শরীরটা দিনকে দিন কেমন মুটিয়ে যাচ্ছে!
-ক্লান্তি লাগে কি?
-না!ক্লান্তি তেমন একটা লাগে না,
তবে হাতির মত শরীর নিয়ে চলতে ফিরতে অস্বস্তি লাগে বৈ কি!
পঞ্চাশ পেরোনো উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের লম্বা লোকটি ডাক্তারের সামনে বসা!
এলাকায় নতুন আসা ডাক্তার ছেলেটা বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ।
বিশেষ কিছু গুণের কারনে লোকটিকে সমীহ করেন ডাক্তার।
-দাদা!মুটিয়ে যাওয়ার মধ্যে বহুবিধ স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে-ভাত রুটি কম খাবেন,ছানা সন্দেশ পাত থেকে হটান,আর পাঁঠার মাংস খাওয়া ছাড়ুন!
-হেশশ!তুমি দেখছি কিছুই জানো না!আমি নিরামিষ ভোজী,নিয়ম করে উপবাস করি!
-ব্যস!ওতেই চলবে দাদা!আপনি শুধু নিয়ম করে সকাল বিকাল দু'বেলা ঘন্টাখানেক হাঁটবেন।আপনার বাড়ির আশেপাশে হাঁটার জন্য দারুন সব জায়গা রয়েছে।
-হুম তাই করতে হবে!
-সবচেয়ে ভাল হয় হাঁটায় আগ্রহ আছে তেমন কাউকে সঙ্গী হিসেবে পেলে…
-চলি হে ডাক্তার!পরের বার যখন আসব দেখো আমাকে দেখে চমকে যেওনা যেন!
_________________________
বিহারের ঘাটশীলার অদ্ভুত এক নির্জন জায়গায় বাড়ি করেছেন তিনি।শহুরে কোলাহল তার একদম ভাল লাগেনা!
চারপাশটা গা ছমছম করা নির্জন,
ঘন জঙ্গলে ঠাসা।বাড়িটির অনতিদূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো টীলা!সেই টীলায় রঙ বেরঙয়ের বিচিত্র ফুল ফোটে।
টীলার নিচে সমতল ভূমের অরণ্যরাজি তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখেন!
খুব ভোরে আর পড়ন্ত বিকেলে তিনি নিয়ম করে হাঁটতে বের হন।এই হাঁটাহাঁটিটা তিনি বেশ উপভোগ করেন।হাঁটতে হাঁটতে থামেন-
পাখিদের গান শোনেন।কখনও কখনও শিস দিয়ে গান করেন।
অরণ্যরাজির নাম না জানা বৃক্ষের ডাল পালা লতা পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন!বুনোফুল!আহা কত নাম না জানা বুনোফুল!কী অদ্ভুত;অরণ্যের সাথে কথা বলা এই মানুষটি!ভোরের মিষ্টি হাওয়ায় দোলে তার ঘন কালো চুল!
অকাল প্রয়াতা প্রথমা স্ত্রী,অসামান্যা রূপবতী গৌরিকে তিনি আজো ভুলতে পারেননি।ঘাটশীলার বাড়ির নাম ফলকে আজো তাই গৌরিকুঞ্জ নামটি শোভা পায়!
এ নিয়ে অবশ্য বয়সের বিস্তর ব্যবধানে বিয়ে করা দ্বিতীয়া স্ত্রী রমা দেবীর কোন আক্ষেপ নেই-আক্ষেপ শুধু স্বামীর প্লানচ্যাট বা প্রেত সাধনা নিয়ে!কী আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত আলোকিত একজন মানুষ,যার লেখা পড়ে তার প্রেমে পড়েছিলেন রমা দেবী!
পিতৃগৃহ ফরিদপুর থেকে কোলকাতার যে লোকটির সাথে সাত পাঁকে বাঁধা পড়লেন রমা।
সে কেন মৃত বাবা,মা,বোন আর স্ত্রী গৌরির আত্মা নামিয়ে কথা বলবে?
এই প্লানচ্যাট তাকে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে!অমাবস্যা-পূর্ণিমার নির্দিষ্ট কিছু রাতে এই প্লানচ্যাট নিয়ে বসে লোকটা!নাহ!এবার থামাতে হবে তাকে!এসব করে করে লেখালেখি শিকেয় উঠছে তার!
_________________________
আজ সন্ধ্যা রাতেই ঘাটশীলায় পাগল করা জ্যোৎস্না উঠেছে!রূপালী জ্যোৎস্না!ঘাটশীলার নির্জন ঘন জঙ্গলে যেন রূপালী আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ।
জ্যোৎস্নার আলোয়,কীট পতঙ্গের উড়াউড়ি,একটানা ঝিঁঝিঁদের ডাক,
থেকে থেকে তক্ষকের উপস্থিতির শব্দ-ভারি সুন্দর লাগছে!
আমাদের গল্পের নায়ক সেই স্থুলকায় লম্বা ভদ্রলোক আর তার তিন বন্ধু আজ টইটুম্বুর জ্যোৎস্নায় হাঁটতে বেরিয়েছেন!
এমন অপরূপ জ্যোৎস্না অনেকদিন উপভোগ করা হয়না!সমতল ভূমি পাড়ি দিয়ে,উঁচু টীলার ঘন জঙ্গুলে পথে হাঁটছেন তারা!
হাঁটতে হাঁটতে অরণ্যের সাথে,
পতঙ্গের সাথে,রূপালী জোস্নার সাথে কথা বলেন নায়ক।তিন বন্ধু তাকে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে যায়।
তিনি আনমনে,বে-খেয়ালে পিছিয়ে পড়েন!
পকেটে পাতার বিড়ি দেশলাই সবই আছে;শুক্লাপক্ষের এই নিশিকালে অরণ্যের রূপ মুগ্ধতায় বিমোহিত নায়ক বিড়ি ধরাতে ভুলে গেছেন একেবারে!বিমুগ্ধ নায়কের অস্ফুট স্বরে শুধু একটি শব্দই বের হয়-অপুর্ব!নিতাই অপুর্ব!
হঠাৎ হরিবল!বলহরি!হরিবল আওয়াজে একদল গ্রামবাসী একটি শববাহী খাটিয়া নিয়ে যাচ্ছে!এ গাঁয়ে আবার কে মারা গেল?কৌতুহলী নায়ক শুধান-কে মারা গেল?
শববাহী লোকেদের হরিবল,বলহরি জপে ছন্দপতন ঘটে।তারা কাঁধ থেকে খাটিয়ে নামিয়ে প্রশ্নকর্তার সামনে রাখল!মৃতের মুখ থেকে সাদা কাপড় সরিয়ে দেয়া হল!
মুহুর্তেই মৃতের মুখ দেখে তীক্ষ্ম এক গগনবিদারি চিৎকার দিয়ে বসে পড়লেন নায়ক!তার শরীর হিম হয়ে আসছে!তিনি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মত কাঁপছেন!
তাকে ফেলে এগিয়ে যাওয়া বন্ধুরা অশুভ কিছু একটা টের পেয়ে দূর থেকে চিৎকার করে সাহস যুগাচ্ছেন তাকে!
-বিভূতিইইই!ভয় পেওনা আমরা আছিইই……এই তো এসে পড়েছি;
বিভূতিইই…!
বন্ধুরা এসে বিভূতিভূষণকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করেন!
ততক্ষনে রহস্যময় মৃতের খাটিয়া নিয়ে লোকেরা হরিবল হরিবল শব্দে উঁচু টীলার গহীন অরণ্য মাঝে হারিয়ে গেছে!
তড়িৎ গতিতে বাংলা সাহিত্যের অসামান্য দিকপাল বিশালদেহী বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যায়কে ধরাধরি করে গৌরিকুঞ্জে নিয়ে আসা হয়!
প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে বিভূতি বারবার বলছিলেন-এটা আমি কি দেখলাম?এটা আমি কি দেখলাম?
উৎসুক শুভাকাঙ্ক্ষীরা শুধান-কি দেখলে বিভূতি?
-ওরা আমার লাশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছিল?ওই খাটিয়ায় আমার মৃত লাশ……উফ!কী বীভৎস!
সেই রাতের সেই আধিভৌতিক ঘটনার পর থেকে বিভূতিভূষণ আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি!
টানা এক মাস জ্বরে ভুগে ভুগে ১৯৫০সালের ১লা নভেম্বর মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়সে পথের পাঁচালি,
অপরাজিত,আদর্শ হিন্দু হোটেল,
আরণ্যক,বিপিনের সংসার,
দুইবাড়ি’র মত বিখ্যাত সব
উপন্যাসের রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন!নিজের মৃত্যুকে নিজে থেকে আলিঙ্গন করার রহস্য আজও তাই দুর্ভেদ্য হয়েই আছে!
শেষ
#সাইফুল আলম