15/06/2026
"সম্পর্কই যখন ভেঙে গেল, তখন আমার দেওয়া সব গহনা কেন সে নিয়ে যাবে?" কিংবা "তালাক হয়ে গেছে, এখন কি শ্বশুরবাড়ির দেওয়া গহনাগুলো আমাকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে?" সংসার ভাঙার কঠিন সময়ে এই প্রশ্নগুলো উভয় পক্ষকেই তীব্র মানসিক অশান্তিতে ভোগায়।
অনেক সময় দেখা যায়, আইন না জানার কারণে স্ত্রী তার আইনসঙ্গত গহনাও শ্বশুরবাড়িতে ফেলে আসেন। আবার অনেক বরপক্ষ মনে করেন, তালাক দিলে সব গহনাই বুঝি ফেরত পাওয়া যাবে। আইন কিন্তু এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত। আজ আমরা জানবো, তালাকের পর আসলে কোন গহনা কার এবং কোনগুলো ফেরত দিতে হয় না।
বস্তুত যা দেখা যায়, জোরপূর্বক গহনা রেখে দেওয়া বা সম্পূর্ণ ফেরতের চাপ:
বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলেই অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রীর অলঙ্কারগুলো স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেন। তাদের ধারণা, সম্পর্ক না থাকলে এই গহনাগুলোর ওপর স্ত্রীর আর কোনো অধিকার থাকে না।
অন্যদিকে, কনেপক্ষও অনেক সময় দ্বিধায় থাকেন যে আইনি জটিলতা এড়াতে গহনাগুলো ফেরত দিয়ে দেওয়া উচিত কি না। এই অজ্ঞতার কারণে অনেকেই নিজের বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
আইনগত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স
বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন, হিন্দু আইন এবং চুক্তি আইন (Contract Act, 1872) অনুযায়ী গহনা ফেরতের বিষয়টি কনেকে দেওয়া উপহারের উৎসের ওপর নির্ভর করে:
১. বরের পক্ষ থেকে দেওয়া গহনা: বিয়ের সময় বা পরে বরের পরিবার কনেকে যে গহনা পরিয়ে দেন, তা আইনগতভাবে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ দান’ বা ‘হেবা’। মুসলিম আইন অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই দান সম্পন্ন হওয়ার পর তা আর প্রত্যাহার বা ফেরত নেওয়া যায় না। সুতরাং, তালাক হলেও বরের দেওয়া গহনা স্ত্রীকে ফেরত দিতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ স্ত্রীর সম্পত্তি।
২. কনের নিজের বা বাবার বাড়ির গহনা: কনের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন বা কনে নিজে যা কিনেছেন, তা তো সম্পূর্ণই কনের নিজস্ব সম্পত্তি বা ‘স্ত্রীধন’। এই গহনা ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
৩. শর্তসাপেক্ষ গহনা (যা ফেরত দিতে হতে পারে): যদি কোনো গহনা বিয়ের সময় কনেকে শুধু ‘পড়ার জন্য’ বা সাময়িকভাবে ব্যবহারের জন্য ধার দেওয়া হয়ে থাকে (যেমন: শাশুড়ি বা দাদীর কোনো পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী গহনা যা পরিষ্কারভাবে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়নি), তবে মালিকানার প্রমাণ সাপেক্ষে তা ফেরতযোগ্য হতে পারে। তবে সাধারণ উপহার হিসেবে দেওয়া গহনার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।
সাধারণ প্রতিকার ও আইনি অবস্থান
আইন অনুযায়ী, তালাক যে পক্ষ থেকেই দেওয়া হোক না কেন (স্বামী বা স্ত্রী), উপহার হিসেবে পাওয়া গহনার মালিকানা স্ত্রীরই থাকে।
১. যদি স্বামী বা তার পরিবার এই গহনা জোরপূর্বক আটকে রাখে, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর অধীনে গহনা বা তার সমমূল্য উদ্ধারের মামলা করতে পারেন।
২. গহনা আত্মসাতের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির নিদির্ষ্ট ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
৩. কোনো পক্ষই যেন গহনা নিয়ে মিথ্যা দাবি করতে না পারে, সেজন্য বিয়ের সময় বা বিচ্ছেদের আপোষনামায় গহনার বিবরণ স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
আইনকানুনগুলো সবার জন্য এক হলেও, প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং দেনা-পাওনার হিসাব সাধারণত ভিন্ন হয়। তাই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে সরাসরি পরামর্শ করা সবসময় শ্রেয়। উপরোক্ত আলোচনায়, সাধারণভাবে প্রতিকারগুলো কী কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হল।
পোস্টটি শেয়ার করুন, তাতে আপনার কাছের মানুষজন সচেতন হবেন, উপকৃত হবেন।
পারিবারিক আইনসহ দাম্পত্য, পরকীয়া, বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাকত্ব ও হেফাজত, নারীর অধিকার এবং অন্যান্য আইনসংক্রান্ত নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট পেতে আমাদের পেজটি Follow করুন।
আপনার কোন প্রশ্ন থাকে হোয়াটসঅ্যাপে +8801715747777 এই নম্বরে অথবা ইনবক্সে মেসেজ লিখুন। আপনার নাম পরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কপিরাইট সংক্রান্ত তথ্য: লেখাগুলো আমার প্রকাশিতব্য বই, “ #যখনবিশ্বাসভাঙে: আইনি পথ ও প্রতিকার“ থেকে নেয়া। সেই ধারাবাহিকতায় কিছু কিছু অংশ প্রকাশিত হচ্ছে। কপি-পেস্ট করলে লেখকের নাম, পরিচয় ও বইয়ের নামসহ করবেন।
অ্যাডভোকেট মমিনুল আলম রাসেল
এলএলএম, এমবিএ, এমএ, ডিসিএপি
আইনজীবী, লেখক, ফ্যামিলি কনসালটেন্ট
সাবেক আইন ও কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ [রবি আজিয়াটা পিএলসি]
সাবেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট [বেক্সিমকো গ্রুপ]
01715747777, 01641000008
#ফ্যামিলিকনসালটেন্ট #আইনসহায়িকা
Copy past 👍 like and share