08/06/2023
যে আঁধারের রং নীল
সূরা আল-ফালাকে আমরা বহুবিধ জিনিসের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই এবং সেই অনিষ্টগুলোর একটা হলো—‘আচ্ছন্ন হয়ে আসা রাত্রির অনিষ্ট।’
وَمِنۡ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ ٣
“(আর আমি আশ্রয় চাইছি) রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে আসে।” (সূরা ফালাক, ১১৩ : ০৩)
তাফসীরকারকগণ এই আয়াতের বেশ কয়েকটা ব্যাখ্যা করেছেন। এমনিতে রাত থেকে পানাহ চাওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ নেই যদিও, তথাপি এখানে ‘আচ্ছন্ন হয়ে আসা রাতের অনিষ্ট’ বলতে তারা যে কয়েকটা বিষয় সামনে এনেছেন তা হলো—রাতে ক্ষতিকর প্রাণী এবং পোকামাকড়ের বিচরণ বেড়ে যায় বলে এখানে সেসব থেকে পানাহ চাওয়া হয়েছে। রাতে ক্ষতিকর আত্মারা, অর্থাৎ যে সমস্ত খারাপ জিন মানুষের অপকার সাধন করে, তাদের বিচরণও বাড়ে বলে এখানে সেসব থেকেও পানাহ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া যে-সকল মানুষের মনে খারাপ অভিসন্ধি কাজ করে, যারা খুব অপরাধ-প্রবণ, খুন-খারাবি, ডাকাতি-রাহাজানির সাথে জড়িত, তারাও তাদের জন্য উপযুক্ত সময় হিশেবে রাতকে বেছে নেয় বলে এখানে রাতের সে সমস্ত খারাপি থেকে পানাহ চাওয়া হয়েছে। (কুরতুবি, তাফসীর, ২০/২৫৬-২৫৭; ওয়াহিদি, আত-তাফসীরুল বাসীত, ২৪/৪৬০-৪৬১; যুহাইলি, আত-তাফসীরুল মুনীর, ৩০/৪৭৫; মাওয়ারদি, তাফসীর, ৬/৩৭৫)
এ-সকল ব্যাখ্যা তো আছেই, সেসবের সাথে কেউ কেউ আরও একটা ব্যাপার যোগ করেছেন আর তা হলো—রাত নামলে শয়তান তার ওয়াসওয়াসা নিয়ে মানুষের মনে জোরালোভাবে প্রবেশ করে এবং তাকে নিমজ্জিত করায় নানাবিধ পাপে। তাই অন্ধকার রাতে এ-সমস্ত শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে এখানে সাহায্য চাওয়া হয়েছে।
রাতের অন্ধকার আচ্ছন্ন হয়ে এলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা বেড়ে যায়। চিন্তা করে দেখুন তো—উত্তর-আধুনিক কালে আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনগুলো শয়তানের সেই ওয়াসওয়াসার কাজে ‘মেঘ না চাইতে জল’ হিশেবে আবির্ভূত হয়েছে কি না!
আজকালকার দিনে পর্নোগ্রাফিতে, অশ্লীল জিনিসে যারা জড়িয়ে আছে, তাদের এ-সকল কাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা রাখে হাতে থাকা স্মার্টফোন। রাতে সাধারণত মানুষের তেমন কাজ থাকে না। কিন্তু যুগ এতো বদলেছে যে—কাজ না থাকাটাই এখন যেন সবচেয়ে বড় কাজ। গভীর রাত পর্যন্ত স্মার্টফোনে চোখ ডুবিয়ে রাখা, মাইলের পর মাইল সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং, নানান ভিডিও দেখা, গেমস খেলা ইত্যাদি করতে যেন আমাদের কোনোই ক্লান্তি নেই। শয়তান তাকে বেহুদা কাজে সময় ব্যয় করতে সারাক্ষণ ফুসলায়। শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে আস্তে আস্তে এ ভিডিও থেকে ও-ভিডিও, এই সাইট থেকে ওই সাইট, এই লিঙ্ক থেকে ওই লিঙ্ক করতে করতে সে যে কখন কোন চোরাবালিতে ডুবে যায়, তার কোনো খেয়াল থাকে না। সে একটা মজা পেয়ে যায় এবং বুঝতে পারে—এ-সকল কাজে ব্যয় করার জন্য রাতটাই যুতসই সময়। সে অপেক্ষা করে থাকে—কখন রাত নামবে, কখন সে একাকী হবে, কখন তার আশেপাশে আর কেউ থাকবে না এবং কখন সে আবার ডুব দেবে প্রতিদিনের চোরাবালিতে। শয়তান তাকে এমনভাবে শৃঙ্খলবন্দী করে রাখে যে—এই শৃঙ্খল ভাঙার ব্যাপারে তার ভেতর কোনো তাড়নাই কাজ করে না।
সূরা আল-ফালাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেই অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাওয়া শিখিয়েছেন, যে অন্ধকার রাতে মানুষ ডুব দেয় আরও গভীর অন্ধকারে। ঘরজুড়ে অন্ধকার, কিন্তু কোনো এক কোণায় ফোন থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক টুকরো নীল আলো। সেই নীল আলো মানুষকে টেনে নিয়ে যায় নীল-রঙা অন্ধকারের জগতে। ঊষার রব আমাদেরকে সেই অন্ধকার এবং তার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকবার তাওফীক দান করুন।
বই : কুরআন থেকে নেওয়া জীবনের পাঠ
লেখক : আরিফ আজাদ
প্রকাশনী : সত্যায়ন প্রকাশন