বইয়ের শহর

Directions Contact the business

বইয়ের শহর Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from বইয়ের শহর, Book shop, Barishal & Dhaka, Barishal.
(1)

30/03/2026

সকল জটিলতা, অস্থিরতা, নানা ভায়োলেন্স, অজস্র অসহ্য যন্ত্রণার খবর,

এর মাঝেও, লেখাপড়াটা যেন ভুলোনা, হে তরুন বয়স।

এখনো এই একটা প্রায় ন্যায্য সিড়ি তোমার হাতের কাছে আছে।

এই অন্যায্য পৃথিবীতে,
এই অসভ্য জটিলতায়
ভিডিও, কন্টেন্ট, মিথ্যা মুখ, শো ম্যানশিপ

এসবের মাঝেও, এখনো লেখাপড়াটা তোমাকে কোথাও একটা জায়গায় ঠিক পৌছে দিবে।

একটা স্থির জীবন দিবে।

ভালো ছাত্র ছাত্রী হওয়াটা এখনো একটা অসাধারন ব্যাপার।

আমি যদি পিছন ফিরে তাকাই,
এই একটা জিনিস আমাকে নানা মুখি জটিলতা থেকে বাঁচিয়েছে।

একট সত্য আত্নবিশ্বাস যুগিয়েছে।
দুপুরের ভাত, বস্ত্র আর বাসস্থান দিয়েছে।

মনে পরে, ক্লাস নাইন টেনে থাকছে কি মারাত্নক যে লেখাপড়া করতাম।

ভালো ছাত্র হবো বলে, কি একটা অলৌকিক জেদ এসে বসলো সে সময়।

সারা দিন রাত পড়ি।
প্রশ্ন সলভ করি।

মাঝে মাঝে রাতের বেলা আম্মা এসে বলে, অনেক হইছে এইবার ঘুমা!

স্কুল শিক্ষিকা আম্মা, কোনদিনও যিনি তার সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে সন্তুষ্ট হইতেন না,
তিনি এসে বলতেছে এইবার ঘুমা কাল পড়িস!

কি যে একটা অদ্ভুত ডিপ প্লেজার এসে ভাসিয়ে দিলো আমাকে !

এখন মনে হয়, ঐ সব রাতগুলোই আসলে আমার ভবিষ্যত গড়েছে।

পড়ালেখা শুধু তোমারে একটা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবেনা।
এইটা তোমার আরো অজস্র অন্যান্য পড়ালেখার একটা অভ্যাসও তৈরি করে দিবে।

সাথে তোমার নিজের ওয়েল ইনফর্মড নলেজ বেইসড ওপিনিয়ন তৈরি হইতে থাকবে।

তুমি সহজে মানুষের স্লেভ হয়ে উঠবা না আর।
নিজের জ্ঞানের প্রতি, নিজের বোধের প্রতি আত্নবিশ্বাস বাড়বে।

প্রিয় কম বয়স
বাংলাদেশের মতন জায়গায়, এখনো লেখাপড়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,
মিজারেবল একটা অস্তিত্ব থেকে বের হয়ে আসার, সবচেয়ে যৌক্তিক উপায়।

দয়া করে এই ছোট্ট গুরুত্বপূর্ণ সত্যটা মনে রেখো।

~ Imran Kais

স্টোলেন ফোকাস (৪)লেখক: ইয়োহান হারিবাংলা তর্জমা: নাহিদ ইসলাম প্রথম যখন আর্ল মিলার বললেন যে মানুষের একইসাথে একাধিক বিষয়ে চ...
28/07/2025

স্টোলেন ফোকাস (৪)

লেখক: ইয়োহান হারি

বাংলা তর্জমা: নাহিদ ইসলাম



প্রথম যখন আর্ল মিলার বললেন যে মানুষের একইসাথে একাধিক বিষয়ে চিন্তা করতে পারার ধারণাটাই ভুল, তখন আমি খানিকটা বিরক্তই হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই তার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতাতেই তো আমি একই সময়ে একাধিক কাজ করি এবং বেশ নিয়মিতই করি। তখনই আমার মাথায় একটা উদাহরণ এসে গেল। আমি টয়লেট সিটে বসে বসে ইমেইল চেক করেছি, একই সময়ে বইয়ের পরবর্তী অংশ নিয়ে চিন্তা করেছি আবার ঐ দিনের পরবর্তী সাক্ষাৎকারের প্রশ্নও সাজিয়েছি।(এমন একটা দৃশ্য আপনার মনে এনে দেওয়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী) তো এর মধ্যে বিভ্রান্তি কোথায়?



কিছু বিজ্ঞানীও আগে আমার মতই ভাবতেন। তারা বিশ্বাস করতেন একই সময়ে একাধিক জটিল কাজ আসলেই করা সম্ভব। তাই তারা গবেষণাগারে মানুষ নিয়ে গিয়ে তাদেরকে একসাথে অনেকগুলি কাজ করিয়ে দেখতে লাগলেন, আর পরীক্ষা করতে থাকলেন কতটা ভালভাবে মানুষ সেই কাজগুলি করতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, যখন মানুষ মনে করে যে তারা একাধিক কাজ একসাথে করছে, তখন আসলে তারা বারবার একটি কাজ স্থগিত রেখে আরেক কাজে যাচ্ছে। তারপর আবার অন্য কাজটি স্থগিত করে আগের কাজে ফিরে আসছে। এত দ্রুত এক কাজ থেকে আরেক কাজের মধ্যে আসা যাওয়া করছে যে মনে হয় যেন দুটি কাজ একই সাথে চলছে। আর্ল বললেন, “তারা আসলে একটা কাজ থেকে আরেকটা কাজে দ্রুত সুইচ করছে। আমাদের মস্তিষ্ক এই সুইচিং ব্যাপারটা ঢেকে রাখে, আমাদেরকে একটা অবিচ্ছিন্ন চেতনার অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য। কিন্তু আসলে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের মস্তিষ্কের সেটিং বদলে একটা কাজ থেকে আরেকটা কাজের দিকে যাচ্ছি। আর এর একটা খেসারত আছে।”



আর্ল ব্যাখ্যা করলেন, এই নিয়মিত সুইচিং বা, দ্রুত কাজ বদলের ফলে আমাদের মনোযোগ নষ্ট হবার ৩টা কারণ আছে। প্রথম কারণটিকে বলা হয় সুইচ কস্ট এফেক্ট। এটা নিয়ে বহু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। ধরুন আপনি ট্যাক্স রিটার্ন ফর্ম পূরণ করছেন, এমন সময় ফোনে একটা টেক্সট মেসেজ আসল। মাত্র ৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে আপনি টেক্সটটা দেখে আবার আপনার ট্যাক্স রিটার্নে ফিরে গেলেন। আর্ল বললেন, “সেই মুহূর্তে তোমার মস্তিষ্ককে নতুন করে সেটিং করতে হয়। আগের কাজটা কি করছিলে, কোথায় ছিলে, কি ভাবছিলে, সবকিছু আবার মনে করে ফিরতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য একটু হলেও সময় লাগে।” গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়টাতে আপনার কাজের দক্ষতা কমে যায়, গতি কমে যায় এবং এই পুরো ব্যাপারটা ঘটে সেই কাজ বদলের জন্যই।



অর্থাৎ আপনি যখন কাজের সময় বারবার টেক্সট চেক করেন, তখন আপনি শুধু ঐ কয়েক সেকেন্ড সময় হারাচ্ছেন না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কাজ থেকে মনোযোগ সরে যাওয়ার পর আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনার সময়টাও। আর সেটা অনেক বেশি সময় নিয়ে নিতে পারে। আর্ল বললেন, “তুমি যদি সারাদিন ধরে চিন্তাভাবনা না করে শুধু এক কাজ থেকে আরেক কাজে লাফিয়ে বেড়াও, তাহলে সেটা আসলে তোমার মস্তিষ্কের সময় ও ক্ষমতা নষ্ট করা ছাড়া কিছুই না।” এর মানে হল, স্ক্রিন টাইম যদি দেখায় আপনি দিনে ৪ ঘণ্টা ফোনে ব্যয় করছেন তাহলে বাস্তবে আপনি আরও অনেক বেশি সময় হারাচ্ছেন।



আর্লের কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, “ঠিক আছে কিন্তু এই প্রভাব নিশ্চয়ই সামান্য, ছোটখাট একটা সমস্যা।” কিন্তু পরে যখন এই বিষয়ে গবেষণাগুলি পড়লাম, তখন বুঝলাম বাস্তবে এই সমস্যাটা আমার ধারণার চেয়েও ভয়াবহ রকম বড়। যেমন- হিউলেট-প্যাকার্ড কোম্পানি একটা ছোট গবেষণা করেছিল তাদের কর্মীদের নিয়ে। প্রথমে তারা দেখলেন কোনও রকম বিরক্তি বা বিভ্রান্তি না থাকলে কর্মীদের আইকিউ কত। এরপর আবার তাদের আইকিউ পরীক্ষা করা হল এমন সময়, যখন তারা নিয়মিত ইমেইল আর ফোন কল পাচ্ছিলেন। গবেষণার ফলাফল বলছে, শুধু ‘প্রযুক্তিগত বিভ্রান্তি’ মানে শুধু ইমেইল আর কল মিলেই কর্মীদের আইকিউ গড়ে ১০ পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছিল। বিষয়টা কতটা গুরুতর সেটার একটা ধারণা দেই। এই ক্ষতিটা হল স্বল্পমেয়াদে গাঁজা খাওয়ার ফলে আপনার আইকিউ-র যে ক্ষতি হয় তার দ্বিগুণ। অর্থাৎ কাজের দক্ষতার বিচারে, টেবিলে বসে ফোনের টেক্সট আর ফেইসবুক মেসেজ বারবার দেখার চেয়ে, গাঁজা টেনে বুঁদ হয়ে থাকলেও বরং আপনি ভাল কাজ করতে পারবেন।



গবেষণা বলছে, ব্যাপারটা এখান থেকে আরও ভয়াবহ হতে শুরু করে। দ্বিতীয় যে প্রক্রিয়ায় এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের মনোযোগের ক্ষতি করে তাকে আমরা বলতে পারি, স্ক্রু-আপ ইফেক্ট বা, ভুল করার প্রবণতা। যখন আমরা কাজ থেকে কাজের মধ্যে বারবার সুইচ করি, তখন এমন কিছু ভুল হতে থাকে যেগুলি একটানা কাজ করলে কখনওই ঘটত না। এর কারণ হিসেবে আর্ল বলেছিলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক সহজেই ভুল করতে পারে। যখন আপনি একটি কাজ থেকে অন্য কাজে সুইচ করেন, তখন আপনার মস্তিষ্ককে আবার পিছিয়ে গিয়ে চিন্তা করতে হয় যে আগের কাজটা ঠিক কোথায় ফেলে এসেছেন।” এই কাজটা কখনও নিখুঁতভাবে হয় না। ফলে ছোটখাট ভুল বা বিচ্যুতি দেখা দিতে শুরু করে। আর্ল বললেন, “যে মূল্যবান সময়টা গভীর চিন্তায় ব্যয় করা উচিৎ ছিল, সেটা চলে যায় ভুল সংশোধন আর আগের চিন্তায় ফিরে আসার চেষ্টায়। তাই আপনার চিন্তা হয়ে যায় আরও অগভীর।”



তারপর আছে একটা তৃতীয় ধরনের ক্ষতি, যেটা মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে বোঝা যায়—আমরা একে বলতে পারি ক্রিয়েটিভিটি ড্রেইন বা, সৃষ্টিশীলতার ক্ষয়। মানে হচ্ছে, আপনি অনেক কম সৃজনশীল হয়ে পড়বেন। কেন? জানতে চাইলে আর্ল পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “নতুন চিন্তা, নতুন উদ্ভাবন আসে কোথা থেকে?” এটা আসে আপনার মস্তিষ্কের পুরানো অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, আর দেখা ও শোনা নানা তথ্যকে নতুন উপায়ে সংযুক্ত করার মাধ্যমে। যদি আপনার মনকে অবসর বা, নিরবচ্ছিন্ন সময় দেওয়া হয়, তাহলে সে নিজ থেকেই আপনার আগের শেখা সবকিছু নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করবে, তাদের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করবে। পুরো ব্যাপারটা ঘটে আপনার সচেতনতার আড়ালে। ঠিক এভাবেই নতুন নতুন আইডিয়া তৈরি হয়। “হঠাৎ করে দুটি ভিন্ন চিন্তার মধ্যে একটা নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে আপনি কখনও ভাবেননি।” এভাবেই নতুন আইডিয়ার জন্ম হয়। কিন্তু আর্ল ব্যাখ্যা করলেন, “যদি আপনার মস্তিষ্কের বেশিরভাগ সময় সুইচিং আর ভুল সংশোধনের পেছনে খরচ হয়, তাহলে আপনার মস্তিষ্ক আর সৃজনশীল সংযোগ স্থাপনের খুব একটা সুযোগ পাবে না। ফলে নতুন ও মৌলিক চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে যাবে।”



পরে আমি একটা চতুর্থ ধরনের প্রভাবের কথাও জানতে পেরেছি। যদিও এ বিষয়ে প্রমাণ তুলনামূলক কম। আমরা এটাকে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা, ডিমিনিশড মেমোরি ইফেক্ট বলতে পারি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (UCLA)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষকে একই সময়ে দুইটি কাজ করতে দিলে পরে তারা কাজগুলির বিষয়ে তেমন ভাল করে কিছুই মনে রাখতে পারে না। যারা একসময় একটি কাজ করে, তাদের তুলনায় এই মানুষগুলির স্মৃতিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতাগুলিকে স্মৃতিতে রূপান্তর করতে মানসিক শক্তি ও স্পেস দরকার। কিন্তু যদি আপনি দ্রুত গতিতে কাজ থেকে কাজের মধ্যে সুইচ করতে থাকেন, তাহলে আপনার স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতা দুটোই কমে যাবে।



অর্থাৎ, আপনি যদি কাজ থেকে কাজের মধ্যে বারবার সুইচ করেন, তাহলে গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী আপনি ধীরে কাজ করবেন, বেশি ভুল করবেন, কম সৃজনশীল হবেন এবং কম বিষয় মনে রাখতে পারবেন। আমি জানতে চাইলাম, আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন কতটা সময় এইরকম কাজ সুইচিং জনিত বিভ্রান্তিতে কাটায়? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইনের ইনফর্ম্যাটিক্স বিভাগের অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্কের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি গবেষণা করে বের করেছেন, একজন আমেরিকান কর্মী গড়ে প্রতি ৩ মিনিটে একবার বিভ্রান্তির শিকার হয়। অন্যান্য গবেষণাগুলিতে আরও দেখা গেছে, আমেরিকার একটা বড় অংশের মানুষ প্রায় সবসময়ই কাজের সময় বাধাগ্রস্ত হয় এবং বারবার এক কাজ থেকে আরেক কাজে সুইচ করে। অফিসের একজন গড়পড়তা কর্মী তার কাজের সময়ের ৪০ শতাংশ এই বিভ্রান্তির মধ্যে কাটায়। তারা মনে করে যে তারা ‘মাল্টিটাস্কিং’ করছে। কিন্তু আসলে তারা মনোযোগ ও ফোকাস হারানোর এই সমস্ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন সময় পাওয়া এখন দুরূহ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, অফিসে কর্মরত বেশিরভাগ মানুষ একটা স্বাভাবিক দিনে টানা এক ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সুযোগ পায় না। আমি প্রথমবার এই তথ্যটা দেখে হতবাক হয়ে বারবার চেক করে দেখেছি—সত্যিই কি এমনটা সম্ভব? কিন্তু এটাই বাস্তব। এমনকি ব্যবসার সবচেয়ে উঁচু পর্যায়েও এই সমস্যা আছে। যেমন- ফরচুন ফাইভ হান্ড্রেড কোম্পানির একজন সিইও দৈনিক গড়ে মাত্র ২৮ মিনিট সময় পান নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য।



মিডিয়াতে যখনই এই সমস্যাটা নিয়ে কথা বলা হয়, তখন এটাকে বলা হয় ‘মাল্টিটাস্কিং’—কিন্তু আমার মনে হয়, পুরানো এই কম্পিউটার টার্ম ব্যবহার করাটাই ভুল। মাল্টিটাস্কিং বললেই আমার মাথায় সবার আগে যেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে, সেটা হল ’৯০ দশকের কো

স্টোলেন ফোকাস_নাহিদ ইসলাম.docxস্টোলেন ফোকাস (১)লেখক: ইয়োহান হারিবাংলা তর্জমা: নাহিদ ইসলামপ্রথম অধ্যায়প্রথম কারণ: বারবার ...
11/07/2025

স্টোলেন ফোকাস_নাহিদ ইসলাম.docx
স্টোলেন ফোকাস (১)

লেখক: ইয়োহান হারি

বাংলা তর্জমা: নাহিদ ইসলাম

প্রথম অধ্যায়

প্রথম কারণ: বারবার কাজ বদলের ও বাছাইয়ের গতি বৃদ্ধি

“আমি বুঝতে পারছি না যে আপনি ঠিক কি চাচ্ছেন” বোস্টন শহরে, টার্গেট সুপার শপ চেইনের একটি আউটলেটে, দোকানী আমার কথা না বুঝে বারবার শুধু বলছিল, “এগুলি আমাদের সবচেয়ে সস্তা ফোন। এই ফোনে ইন্টারনেট খুব ধীরগতির। আপনি তো সেটাই চাচ্ছেন তাই না?” আমি বললাম, “না, আমি এমন একটি ফোন চাই যেটা ইন্টারনেটে যুক্তই হতে পারবে না।” সেই লোক ফোনের পেছন দিকটা খুঁটিয়ে দেখল, ভ্রু কুঁচকে বলল, “এটা খুবই স্লো হবে। আপনি হয়ত ইমেইল করতে পারবেন, কিন্তু আর কিছু…” আমি বললাম, “ইমেইলও ইন্টারনেটেরই অংশ। আমি ৩ মাসের জন্য ডুব মারতে চাই, যাতে এক্কেবারে অফলাইন থাকা যায়।”

আমার বন্ধু ইমতিয়াজ তার পুরানো, ভাঙা ল্যাপটপটা আমাকে দিয়েছিল। অনেক আগেই সেই ল্যাপটপের ইন্টারনেটে যুক্ত হবার যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। দেখলে মনে হবে যেন সেই উনিশ্‌শো কটকটি সালের প্রথম স্টার ট্রেক সিরিজের সেট থেকে তুলে আনা মাল। সিরিজ নির্মাতাদের কল্পনায় দেখা ভবিষ্যতের একটি নিদর্শন। বহু বছর ধরে একটি উপন্যাস লিখব বলে ভাবছিলাম। ঠিক করলাম এই ভাঙা ল্যাপটপ দিয়েই উপন্যাসটা লিখব। তো নিভৃতে নির্জনে উপন্যাস লেখার জন্য, এমন একটা ফোন খুঁজছিলাম যেটা দিয়ে শুধু জরুরি প্রয়োজনে ফোন কল করা যাবে। ফোন নাম্বারটা মাত্র ৬ জনকে দিব ভেবেছিলাম। আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় ছিল, সেই ফোনে যেন কোনওভাবেই ইন্টারনেট ব্যবহার করা না যায়। তাহলে হবে কি হঠাৎ রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে গেলে, আমার মনটা যতই ছটফট করুক না কেন, শত চেষ্টা করলেও আমি অনলাইনে যেতে পারব না।

আমি যখন লোকজনকে বোঝাতাম যে আমার পরিকল্পনাটা কি, তারা মোটা দাগে ৩ রকমের প্রতিক্রিয়া দিত। প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল টার্গেটের ওই বিক্রেতার মত। তারা যেন আমার কথা কিছুতেই বুঝতে পারত না। ভাবত, আমি হয়ত বলতে চাচ্ছি যে ইন্টারনেট ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে দিব। সম্পূর্ণ অফলাইন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা তাদের কাছে এত অদ্ভূত লাগত, যে বারবার ব্যাখ্যা করেও আমি তাদের বোঝাতে পারতাম না। “তাহলে আপনি এমন একটা ফোন চান, যা কোনওভাবেই অনলাইনে যুক্ত হতে পারবে না?” বিক্রেতা জিজ্ঞেস করল। “এমন ফোন আপনি চাইবেন কেন?”

দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি আমার কাছে মোটামুটি আতঙ্কের ব্যাপার। আর ঠিক সে কথাই বিক্রেতা এর পরেই বলল। সে জিজ্ঞেস করল, “জরুরি অবস্থায় কি করবেন? কাজটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কি এমন জরুরি অবস্থা হবে যে আমার অনলাইনে যাওয়াই লাগবে? কি এমন ঘটবে? আমি তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট না, যে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করলে আদেশ দিতে হবে।” সে বলল, “যেকোনও কিছু। যেকোনও কিছুই হতে পারে।” তখন আমার বয়স ছিল ৩৯ বছর। আমি আমার সমবয়সী লোকজনকে বোঝানোর বহু চেষ্টা করেছি, যে আমরা আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় ফোন ছাড়াই কাটিয়েছি। বহুকাল যেভাবে বেঁচে ছিলাম, সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবাটা এমন কঠিন কিছু না। কিন্তু কেউই আমার এই যুক্তি খুব একটা গ্রহণ করেনি।

আর তৃতীয় প্রতিক্রিয়া ছিল ঈর্ষা। আমার অফলাইন ট্যুরের কথা শুনে, লোকজন কল্পনায় হিসেব করা শুরু করে দিত, ফোনে কাটানো সময়টা বাঁচিয়ে কি কি করার যেতে পারে। তখন তারা বলতে শুরু করত যে অ্যাপলের স্ক্রিন টাইম অনুযায়ী, প্রতিদিন কে কত ঘণ্টা ফোনে ব্যয় করে। গড়ে একজন আমেরিকান প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ফোনে ব্যস্ত থাকে। আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ২,৬১৭ বার ফোন স্পর্শ করি। লোকজন মাঝে মাঝে বিষণ্ণ গলায় কিছু শখের কথাও বলত। যেসব শখের কাজ এক কালে তারা করতে ভালোবাসত কিন্তু দীর্ঘদিন হল ছেড়ে দিয়েছে। এই যেমন পিয়ানো বাজানো। তাদের চোখ তখন দূরে কোথাও হারিয়ে যেত।

টার্গেটে আমার কাজের জিনিস ছিল না। মজার ব্যাপার, যুক্তরাষ্ট্রে অবশিষ্ট একমাত্র ইন্টারনেট সংযোগবিহীন ফোন খুঁজে বের করার জন্য আমাকে অনলাইনেই যেতে হয়েছিল। ফোনটার নাম জিটারবাগ। অতি প্রবীণদের জন্য তৈরি করা এই ফোন মেডিকেল ইমার্জেন্সি ডিভাইস হিসেবেও কাজ করে। প্যাকেজিং বাক্স খুলে ফোনটা বের করার পর, ফোনের বিশাল বড় বোতামগুলি দেখে হাসি পেয়েছিল। এই ফোনটার একটা বাড়তি সুবিধা অবশ্য আছে। যদি কখনও হঠাৎ করে উল্টে পড়ে যাই, তাহলে এই ফোনটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিকটস্থ হাসপাতালে খবর পাঠিয়ে দেয়।

সঙ্গে যা যা নিব ভেবেছিলাম, সেসব হোটেলের বিছানার উপর রাখলাম। আমার আইফোনে যেসব রুটিন কাজ করি, সেগুলির বিকল্প খুঁজে নিব বলে ঠিক করেছিলাম। তাই প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা জিনিস কিনে ফেললাম। তো কৈশোরের পর এই প্রথম আমি একটি হাতঘড়ি কিনলাম। সঙ্গে একটি অ্যালার্ম ঘড়িও নিলাম। খুঁজেপেতে আমার পুরানো আইপডটা বের করলাম। তার মধ্যে অডিওবুক আর পডকাস্ট ভরলাম। যন্ত্রটার স্ক্রিনের ওপর আঙুল বোলাতে গিয়ে ভাবছিলাম, ১২ বছর আগে যখন আইপডটা কিনি, তখন এটা কত আধুনিক মনে হয়েছিল! আর এখন, এটার চেহারা দেখলে মনে হবে যেন নূহ নবীর নৌকা থেকে নামানো কোনও জিনিস। ইমতিয়াজের ভাঙা ল্যাপটপটা তো ছিলই আমার কাছে। এখন অবশ্য সেটাকে সাইজ করে, কার্যত একটা ’৯০ দশকের স্টাইলের ওয়ার্ড প্রসেসর ডিভাইস বানিয়ে ফেলেছি। তার পাশেই রাখা ছিল একগাদা ক্লাসিক উপন্যাস। পড়ব পড়ব করে বহু বছরেও পড়া হয়নি। বইয়ের স্তূপের সবার উপরে ছিল ওয়ার অ্যান্ড পিস।

উবারে চড়ে বোস্টনে আমার এক বান্ধবীর বাসায় গেলাম। তার কাছে আমার আইফোন আর ম্যাকবুকটা রেখে যাব। তার বাসায় টেবিলের উপর ডিভাইসগুলি রাখতে গিয়ে একটু কিছুক্ষণ দ্বিধায় ছিলাম। তারপর দ্রুত ফোনের একটি বাটন চেপে ফেরি টার্মিনালের জন্য গাড়ি ডাকলাম, আর চট করে ফোনটা বন্ধ করে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবখানা এমন যেন ফোনটা আমাকে তাড়া করবে। মনের ভিতর একটা আতঙ্কের অনুভূতি জাগলো। ভাবতে লাগলাম আমি আদৌ এসবের জন্য তৈরি আছি তো। ঠিক তখনই স্প্যানিশ লেখক হোসে ওর্তেগা ই গাসেটের একটি কথা মনে পড়ল: “জীবন চলমান, আমরা জীবনের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত না হলেও জীবন থেমে থাকে না... মুখের দুই ইঞ্চি দূরে বন্দুকের নল রেখে ছোঁড়া গুলির মত জীবন আমাদের দিকে ধেয়ে আসে।” নিজেকে বোঝালাম, “এখন না করলে এই কাজ তুমি কখনওই করতে পারবে না। তারপর একদিন মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে ইনস্টাগ্রামের লাইক গুনতে গুনতে মারা যাবে।” তারপর গাড়িতে উঠে বসে আর পিছনে ফিরে তাকাইনি।

বহু বছর আগে আমি সমাজবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে শিখেছিলাম, যেকোনও ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির একটি হল ‘পূর্বপ্রতিশ্রুতি’। মানব জাতির প্রাচীনতম গল্পগুলির একটি, হোমারের লেখা অডিসি’তেও এই ধারণাটি পাওয়া যায়। হোমার লিখেছিলেন, একদা সমুদ্রে এমন একটি অংশ ছিল, যেখানে গেলেই নাবিকরা সব সময় অদ্ভূত কোনও কারণে মারা যেত। সমুদ্রে বাস করত দুই সাইরেন—অর্ধেক নারী আর অর্ধেক মৎস্য রূপের এক অতিপ্রাকৃতিক আবেদনময়ী মিশেল। তারা নাবিকদের গান শুনিয়ে মোহিত করে সাগরের দিকে টানত। নাবিকেরা যখন প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিত, তখন তারা ডুবে যেত। কিন্তু একদিন গল্পের নায়ক ইউলিসিস এই কুহকিনীদের ফাঁদ থেকে বাঁচার একটি উপায় বের করল। যখন তার জাহাজ সাইরেনদের সেই বিপজ্জনক সমুদ্রের দিকে এগুচ্ছিল, তখন সে তার নাবিকদের বলল তার হাত পা সব শক্ত করে মাস্তুলে বেঁধে দিতে। যাতে সে একদম নড়াচড়া করতে না পারে। যখন ইউলিসিস সাইরেনদের গান শুনল, তার মন তখন প্রচণ্ড ব্যাকুল হয়ে উঠলেও সে আর সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে পারল না।

আগে একবার ওজন কমানোর জন্য আমি এই কৌশল ব্যবহার করেছিলাম। এক সময় আমি প্রচুর চিপ্‌স-চকলেট জাতীয় হালকা খাবার কিনে রাখতাম। তখন নিজেকে বুঝ দিতাম যে, ধীরেসুস্থে অল্প অল্প করে এগুলি খাব। কিন্তু এরপর রাত ২টার দিকে হুড়মুড় করে সব সাবাড় করে ফেলতাম। তাই এসব কেনাই বন্ধ করে দিলাম। কারণ রাত ২টায় যতই খিদে পাক, তখন আর আমি প্রিংগেলস কিনতে দোকানে যাব না। বর্তমানে যে আপনি আছেন, এই মুহূর্তের যে আপনি, আপনি নিজের গভীর বাসনার লক্ষ্যগুলি অর্জন করতে চান। আরও ভাল একজন ব্যক্তি হয়ে উঠতে চান। কিন্তু আপনি জানেন যে, আপনি ভুল করবেন এবং প্রলোভনের মুখে হয়ত ভেঙে পড়বেন। তাই ভুল করার সুযোগগুলি কমিয়ে ফেলুন, নিজেকে মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে ফেলুন।

এই কৌশলটা অন্তত স্বল্পমেয়াদে আসলেই কার্যকর কি না, সেটা যাচাই করার জন্য অল্প কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ চালানো হয়েছে। যেমন ২০১৩ সালে, মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মলি ক্রকেট (ইয়েলে গিয়ে আমি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম) কয়েকজন পুরুষকে নিয়ে একটি গবেষণা চালান। তিনি তাদের দুটি দলে ভাগ করেন এবং সবাইকে একটি দুরূহ কাজ করতে দেন। তাদের বলা হল যে, তারা চাইলেই তাদেরকে তাৎক্ষণিক একটি কামোদ্দীপক ছবি দেখতে দেওয়া হবে কিন্তু যদি তারা ধৈর্য্য ধরে কিচ্ছু না করে একেবারে স্থির হয়ে থাকতে পারে, তাহলে কিছুক্ষণ পর তারা চরম কামোদ্দীপক একটি ছবি দেখতে পাবে। প্রথম দলকে বলা হল, তারা যেন মনের জোর না হারিয়ে ধৈর্য্য ধরে। কিন্তু দ্বিতীয় দলটি পরীক্ষণে অংশগ্রহণের আগে তাদের কাছ থেকে ‘পূর্বপ্রতিশ্রুতি’ গ্রহণ করা হল। তারা জোর গলায় প্রতিজ্ঞা করল, “আমরা স্থির হয়ে অপেক্ষা করব, যেন বেশি উত্তেজক ছবিটি দেখতে পারি।” বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছিলেন যে, পূর্বপ্রতিশ্রুতি বদ্ধ লোকগুলি কি আসলেও অন্যদের তুলনায় অধিক সংখ্যায় ও বেশি সময় ধরে ধৈর্য্য ধরতে পারে কি না। দেখা গেল যে, পূর্বপ্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে। যারা মনস্থির করে দৃঢ়ভাবে নিজের কাছে অঙ্গীকার করেছিল, তারা তুলনামূলক অনেক বেশি সময় ধরে ধৈর্য্য ধরে স্থির থাকতে পেরেছিল। তারপর বহু বছর ধরে আরও নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা পূর্বপ্রতিশ্রুতির এই একই প্রভাবের প্রমাণ পেয়েছেন।

প্রভিন্সটাউনে আমার এই যাত্রা ছিল এক ধরণের চূড়ান্ত পূর্বপ্রতিশ্রুতি। আর ইউলিসিসের বিজয় যাত্রার মত আমিও নৌকায় উঠেই শুরু করেছিলাম। ফেরিটা যখন প্রভিন্সটাউনের দিকে রওনা হল, আমি পিছন ফিরে বোস্টন হারবারের দিকে তাকালাম। মে মাস, বসন্তকালে সূর্যের নরম আলোয় পানি জ্বলজ্বল করছিল। জাহাজের পিছন দিকে একটি ভেজা, মার্কিন জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছিল। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফেনীল সমুদ্রের ঢেউ যেন ফেরির পেছনে ধাওয়া করে আসছে, দাঁড়িয়ে তাই দেখতে লাগলাম। প্রায় ৪০ মিনিট পর, দিগন্তে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল প্রভিন্সটাউন। প্রথমেই চোখে পড়ল পিলগ্রিম মনুমেন্টের সরু চূড়াটা। প্রভিন্সটাউন আসলে এক দীর্ঘ, সবুজে মোড়া বালিয়াড়ি, যেখানে আমেরিকা তার শেষ প্রান্তটা আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। এটাই মূল ভূখণ্ডের শেষ প্রান্ত, একদম পথের শেষ। বিখ্যাত লেখক হেনরি ডেভিড থ্যুরো বলেছিলেন, “এখানে দাঁড়ালে মনে হবে, পুরো যুক্তরাষ্ট্রই তোমার পেছনে রয়েছে।” আমি এক ধরনের হালকা উত্তেজনা অনুভব করলাম, যেন একটি ভার নেমে গেছে। ফেনার আড়াল থেকে যখন সৈকতটা স্পষ্ট হয়ে উঠল, আমি হেসে ফেললাম, কেন জানি না। ক্লান্তিতে একদম বুঁদ হয়ে ছিলাম, যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। তখন আমার বয়স ছিল ৩৯, আর ২১ বছর বয়স থেকে আমি একটানা কাজ করে যাচ্ছিলাম। ছুটি বলতে কিছুই ছিল না। সারাক্ষণ তথ্য দিয়ে নিজেকে ঠেসে ভরিয়ে চলেছিলাম, যেন নিজেকে আরও বেশি প্রডাক্টিভ লেখক বানাতে পারি। ধীরে ধীরে আমার জীবনটা একটা বাণিজ্যিক খামারের ফোয়ে গ্রা হাঁসের মত হয়ে গিয়েছিল। যাকে জোর করে ঠেসে ঠেসে খাবার খাওয়ানো হয়, যাতে তার কলিজা একসময় প্যাটে বানানোর উপযোগী হয়ে ওঠে। গত ৫ বছরে আমি ৮০,০০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছি, দুটি বই লেখার জন্য গবেষণা করেছি, লেখা শেষ হলে পরে বইগুলি নিয়ে নানা জায়গায় কথা বলেছি। প্রতিদিন, সারাদিন, আমি চেষ্টা করছিলাম আরও বেশি তথ্য জানার, আরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার, আরও বেশি শেখার, আরও বেশি কথা বলার। এভাবে তাড়াহুড়ো করতে করতে এখন আমার মস্তিষ্ক যেন একটি পুরানো রেকর্ডের মত হয়ে গেছে, যেটা অতিরিক্ত বাজানোর কারণে জায়গায় জায়গায় স্ক্র্যাচ পড়ে গেছে। এত বেশি মাত্রায় এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে কিছুই মনে রাখতে পারছিলাম না। আমি ক্লান্তি নিয়েই এত দীর্ঘ সময় ধরে ছুটে চলেছি যে, কিভাবে অবসর যাপন করতে হয় সেটাই ভুলে গেছি।

যাত্রীরা নামতে শুরু করার পর ফেরিতেই কোথাও একটি মেসেজ আসার পিং শব্দ শুনতে পেলাম। অভ্যাসমত পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি, আরে আমার ফোন কই! এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম, পরক্ষণেই মনে পড়ল ফোন থেকে দূরে থাকব বলেই তো এখানে এসেছি। তখন আরও জোরে হেসে উঠলাম।

জীবনে কবে প্রথম মোবাইল ফোন দেখেছিলাম সে কথা ভাবতে লাগলাম। আমার বয়স তখন ১৪ কি ১৫ বছর, ১৯৯৩ বা ৯৪ সালের কথা। আমি লন্ডনের ৩৪০ নাম্বার বাসের ওপরের ডেকে বসে, স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। স্যুট পরা এক লোক চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে একটি যন্ত্রের মধ্যে কথা বলছিল। যতদূর মনে পড়ে যন্ত্রটা যেন একটি বাচ্চা হাতির সমান ছিল। বাসের ওপরের ডেকে আমরা যত জন যাত্রী ছিলাম, সবাই তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আর আমাদের দৃষ্টি টের পেয়ে সে ক্রমেই আরও জোরে কথা বলছিল। সবার মনোযোগ সে বেশ উপভোগ করছিল। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আরেক যাত্রী বলে উঠল

“শুনছেন ভাই?”

লোকটি বলল, “হ্যাঁ?”

“আপনি একটা চুথিয়া।”

পুরো বাসে যেন একটা নীরব বিস্ফোরণ ঘটে গেল। লন্ডনের গণ পরিবহনের যে অলিখিত নিয়ম—অন্য যাত্রীদের দিকে তাকানো যাবে না, অযথা হাসা যাবে না—সেই নিয়ম ভেঙে আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগলাম। মোবাইল ফোনের জন্মলগ্নে, পুরো লন্ডন জুড়ে এমন ছোট ছোট বিদ্রোহ হয়েছিল। আমাদের কাছে এই যন্ত্রগুলি তখন উদ্ভট ধরনের উপদ্রব মনে হত।

তার ৫ বছর পর জীবনে প্রথমবার ইমেইল পাঠিয়েছিলাম। ১৯ বছর বয়সে তখন সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কয়েক কথা লিখে সেন্ড বাটন ক্লিক করলাম, তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম... কোনও বিশেষ অনুভূতি টের পাই কি না। কিছুই টের পেলাম না, কোনও রকমের তীব্র উত্তেজনা বোধ করলাম না। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, “এই ইমেইল নিয়ে এত মাতামাতির কি আছে?” তখন যদি কেউ আমাকে বলত যে, দুই দশকের মধ্যে মোবাইল ফোন আর ইমেইলের প্রযুক্তি জুটি বেঁধে, আমার জীবনের উপর এমনভাবে ছড়ি ঘোরানো শুরু করবে যে, আমি নৌকায় চেপে পালানোর পথ খুঁজব তাহলে আমি ভাবতাম, ‘ব্যাটা বলে কি!’ কারণ প্রথম দেখায় জিনিসগুলি আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর আর একঘেঁয়ে মনে হয়েছিল।

আমি ব্যাগটা নৌকা থেকে টেনে নামালাম, তারপর ইন্টারনেট থেকে প্রিন্ট করে আনা মানচিত্রটা বের করলাম। অনেক বছর ধরেই গুগল ম্যাপ ছাড়া কোথাও যাই না। ভাগ্য ভাল, প্রভিন্সটাউনে পথ হারানোর কোনও সুযোগই নেই—এখানে একটা মাত্র লম্বা রাস্তা। আপনি হয় বাঁয়ে যাবেন নয়ত ডানে। আমি ডানদিকে গেলাম, এস্টেট এজেন্টের অফিসের দিকে, যাদের কাছ থেকে আমি সমুদ্রের ধারে ছোট্ট একটি কটেজ ভাড়া নিয়েছি। প্রভিন্সটাউনের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কমার্শিয়াল স্ট্রিট। রাস্তার দুপাশে নিউ ইংল্যান্ডের পরিপাটি দোকানপাট—কোথাও লবস্টার বিক্রি হচ্ছে, কোথাও সেক্স টয়। এই দুটি জিনিস অবশ্য একই দোকানে বিক্রি হয় না। ওরকম বিশেষ রুচি প্রভিন্সটাউনেও পরিত্যাজ্য। মনে পড়ল ঠিক কি কি কারণে এই জায়গাটা পছন্দ করেছিলাম। বছর খানেক আগে, আমার বন্ধু অ্যান্ড্রুর সাথে দেখা করতে, বোস্টন থেকে এখানে এসেছিলাম একদিনের জন্য। অ্যান্ড্রু প্রতি বছর গরম কালটা এখানে কাটায়। প্রভিন্সটাউন বিচিত্র এক জায়গা, কেইপ কডের গ্রামগুলির মত পুরানো নিউ-ইংল্যান্ড ধাঁচের সেকেলে ঘরবাড়ি দোকানপাট সবকিছু। তার মধ্যে যেন গড়ে উঠেছে বিশাল এক কামনার পাতালপুরী। বহুকাল ধরে পর্তুগীজ অভিবাসীরা বংশ পরম্পরায় এখানে বসবাস করেছে। তারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। তাই এই শহরে মূলত শ্রমজীবী জেলেদের নিবাস ছিল। তারপর ধীরে ধীরে শিল্পীরা আসতে শুরু করলে জায়গাটা ছন্নছাড়া মানুষের জন্য এক বোহেমিয়ান স্বর্গে পরিণত হল। এরপরে হয়ে গেল সমকামীদের পর্যটনকেন্দ্র। আর এখন এখানে জেলেদের পুরানো কুটিরে এমন সব লোক বাস করে, যাদের চাকরি হল সারাদিন দ্য লিটল মারমেইড কার্টুনের খলনায়িকা উরসুলা সেজে থাকা। আর গ্রীষ্মকালে যখন পর্যটক দিয়ে শহর ভর্তি হয়ে যায় তখন যোনিলেহন নিয়ে গানবাজনা করা।

নির্ভেজাল একটি মনোমুগ্ধকর জায়গা হিসেবে প্রভিন্সটাউন আমার পছন্দ হয়েছিল। ওখানে যাবার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই জায়গাটার মূল চরিত্র বুঝে ফেলেছি, এই ভেবে কিছুটা আত্মতুষ্টিতেই ভুগছিলাম। সাংবাদিক হিসেবে আমার স্বভাবজাত কৌতূহলকে খুব একটা আলোড়িত করবে না, এমন কোথাও যাব বলেই মনস্থির করেছিলাম। ধরুন আমি যদি ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যেতাম তাহলে নিশ্চিত সেখানে গিয়েই বালিনিজ সমাজের রীতিনীতি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করে দিতাম। একের পর এক সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করতাম। তারপর আবার তথ্য সংগ্রহের জন্য উদ্‌ভ্রান্তের মত দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করতে খুব বেশি সময় লাগত না। এসব থেকে দূরে, আত্মশুদ্ধির উপযোগী একটি সুন্দর জায়গা খুঁজছিলাম, শুধু একটু দম ফেলার জন্য। এস্টেট এজেন্ট প্যাট আমাকে গাড়িতে করে বীচহাউজে নিয়ে গেল। বাড়িটা ছিল সমুদ্রের খুব কাছাকাছি, শহরের কেন্দ্র থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে, বলতে গেলে প্রায় পাশের শহর ট্রুরো’তে অবস্থিত। একটি সাদামাটা কাঠের বাড়ি, ৪ ইউনিটে ভাগ করা। নিচতলায় বাম পাশের ফ্ল্যাটটা ছিল আমার। আমি প্যাটকে বললাম মডেমটা সরিয়ে ফেলতে, তাহলে ঝোঁকের মাথায় ইন্টারনেট চালানোর মত কোনও ডিভাইস কিনে ফেললেও অনলাইনে যেতে পারব না। তাছাড়া ডিসের লাইনের সংযোগটাও বিচ্ছিন্ন করে দিতে বললাম। আমার ফ্ল্যাটে দুটি ঘর। বাড়ির সামনে কাঁকর বিছানো ছোট রাস্তা পেরুলেই, অবারিত সমুদ্র যেন আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবে বলে অপেক্ষায় রয়েছে। শুভ কামনা জানিয়ে প্যাট বিদায় নিল আর আমি একা হয়ে গেলাম।

বইগুলি ব্যাগ থেকে বের করলাম। একটি বই বেছে নিয়ে আনমনে পাতা ওল্টাতে লাগলাম। কিছুতেই মন বসল না, তাই বই রেখে বেরিয়ে পড়লাম, হাঁটা ধরলাম সমুদ্রের দিকে। তখনও প্রভিন্সটাউনে পর্যটনের মৌসুম ঠিক মত জমে ওঠেনি। আশেপাশে যত দূর চোখ যায়, মাইলের পর মাইল পর্যন্ত মানুষ বলতে মোটে ৬ জনের মত দেখতে পেলাম। হুট করেই যেন নিশ্চিত হয়ে গেলাম, যে এখানে এসে এক্কেবারে ঠিক কাজটাই করেছি। এতটা নিশ্চয়তার অনুভূতি জীবনে কদাচিৎ আসে। বহুকাল ধরে শুধু চঞ্চল আর ক্ষণস্থায়ী সব জিনিসের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করার চেষ্টায় ছিলাম, যেমন- টুইটার ফিড। ছুটন্ত জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকলে আপনি একধরনের অস্থিরতায় ভুগবেন, সারাক্ষণ আপনার মাঝে একটা উত্তেজনা কাজ করবে। মনে হবে যেন কিছু একটা করতে হবে, ছুটতে হবে, হাত নেড়ে, চেঁচিয়ে জানান দিতে হবে, নাহলে যেন ঘটনা প্রবাহে আপনি ভেসে যাবেন। কিন্তু সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে মনে হল যেন অক্ষয়, অবিচল, অতি প্রাচীন কিছুর দিকে তাকিয়ে আছি। ভাবতে লাগলাম, আমার জন্মের বহু আগে থেকেই এই সমুদ্র ছিল এবং আমার খুচরা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বিস্মৃত হবার বহুকাল পরেও এই সমুদ্র থাকবে। টুইটারে গেলে মনে হবে যেন সারা দুনিয়া আপনাকে নিয়ে, আপনার অহম নিয়ে ব্যস্ত, কখনও তারা আপনার প্রতি অনুরক্ত কখনও বিরক্ত এবং ঠিক এই মুহূর্তে তারা আপনাকে নিয়েই আলোচনায় মত্ত। সমুদ্রে গেলে মনে হবে যেন দুনিয়া আপনাকে স্নিগ্ধ, সিক্ত, নির্লিপ্তভাবে বরণ করে নিচ্ছে। আপনি যত জোরেই চিৎকার করুন না কেন, সে কখনওই তর্ক করবে না।

আমি অনেকক্ষণ সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। এত বেশি স্থির হয়ে থাকাটা আমার কাছে কেমন বিস্ময়কর ঠেকল। সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টের মত এক পলক দেখে স্ক্রল করার পরিবর্তে অবিচল তাকিয়ে থাকা। শেষবার কবে এমন অনুভূতি হয়েছিল, মনে করার চেষ্টা করলাম। জিন্সের প্যান্ট গুটিয়ে সমুদ্রে নামলাম, পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে চললাম প্রভিন্সটাউনের দিকে। কুসুম গরম পানির নিচে, বালির মধ্যে আমার পা একটু করে দেবে যাচ্ছিল। আমার ফ্যাকাসে সাদা পায়ের আশেপাশে ছোট ছোট মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছিল। আমাকে আসতে দেখে কাঁকড়াগুলি আমার আগে আগে ছুটে গিয়ে বালি খুঁড়ে গা ঢাকা দিচ্ছিল। প্রায় ১৫ মিনিট পর এমন অদ্ভূত একটি দৃশ্য দেখলাম যে আর চোখ ফেরাতে পারলাম না। যতই দেখছিলাম ততই বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম। সাগরের মাঝখানে পানির উপর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কোনও নৌকা অথবা ভাসমান কোনও কিছুর উপরে না। অথচ গভীর সমুদ্রের বুকে সে মাথা উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমার সন্দেহ হল, ক্লান্তির চোটে ভ্রম হচ্ছে না তো। আমি লোকটার দিকে হাত নাড়লাম, সেও আমার দিকে হাত নাড়ল, তারপর আবার পানির দিকে মুখ করে দুই বাহু প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকল। দীর্ঘ সময় ওভাবেই ছিল সে, আর আমিও দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছিলাম। তারপর এক সময় আমার দিকে হেঁটে আসতে শুরু করল, দেখে মনে হচ্ছিল যেন সে পানির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছিল।

আমার চোখেমুখে বিভ্রান্তি দেখে লোকটা আমাকে বুঝিয়ে দিল যে, প্রভিন্সটাউনে জোয়ারের সময় পুরো সমুদ্রতট পানির নিচে চলে যায়। তখন বোঝা যায় না যে পানির নিচে সব জায়গায় বালি এক সমান উঁচু নয়। তলদেশে কোথাও বালুর চরা আবার কোথাও বালির ঢিবি, সেগুলির উপর দিয়ে হাঁটলে দেখে মনে হবে যেন আপনি জলের উপর হাঁটছেন। এরপরেও বহুবার তাকে দেখেছি—সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস। পানির দিকে মুখ করে, দুই হাত প্রসারিত করে, ঘন্টার পর ঘন্টা একদম স্থির, অবিচল ভাবে সে আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকত। আমার মনে হল, এটাই বুঝি ফেইসবুক চালানোর বিপরীত কাজ। দুই বাহু প্রসারিত করে, হাতের তালু ছড়িয়ে, একদম ঠায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা।

অবশেষে গিয়ে পৌঁছালাম আমার বন্ধু অ্যান্ড্রুর বাড়িতে। ওর পোষা কুকুরগুলির একটি দৌড়ে এসে আমাকে স্বাগত জানাল। আমরা একসাথে ডিনার করব বলে বেরিয়ে পড়লাম। গত বছর অ্যান্ড্রু দীর্ঘ সময় ছুটি কাটিয়েছে। পুরোটা সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল সে, নীরব ছিল, না কোনও ফোন, না কোনও কথা, একেবারে নিস্তব্ধতা। অ্যান্ড্রু আমাকে বলল

“এই প্রশান্তির ভাবটা উপভোগ কর, এটা বেশিদিন টিকবে না। মনোযোগ নষ্ট হওয়ার কারণগুলি সব একপাশে সরিয়ে রাখলে তখন আসলে বোঝা যায় যে কিসের থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছিলে।”

আমি বললাম, “নাটক কম কর অ্যান্ড্রু।”

তারপর দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়লাম।

পরে কমার্শিয়াল স্ট্রিট ধরে হেঁটে চললাম, পেরিয়ে এলাম টাউন হল, লাইব্রেরি, এইডস মনুমেন্ট, কাপ কেকের দোকান, আর কিছু ড্র্যাগ কুইন, যারা তাদের সেদিন রাতের মঞ্চনাট্যের ফ্লায়ার বিলি করছিল। হঠাৎ শুনলাম গানের সুর ভেসে আসছে কোথাও থেকে। একটা পাব, নাম দ্য ক্রাউন অ্যান্ড অ্যাঙ্কর, সেখানে একদল মানুষ গোল হয়ে পিয়ানোর চারপাশে বসে গান ধরেছে। আমি ঢুকে পড়লাম। অচেনা কিছু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এভিটা এবং রেন্ট গীতিনাট্যগুলির প্রায় সবকটা গান গাইলাম। দারুণ একটি পার্থক্য টের পেয়ে আবারও বিস্মিত হলাম, অচেনা মানুষের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান করা আর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অচেনা লোকেদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করা একেবারেই আলাদা ব্যাপার। প্রথমটি করলে আপনার অহম বিলীন হয়ে যায় অথচ, দ্বিতীয়টি আপনার আমিত্ববোধ আর হামবড়া ভাবটাকেই উস্কে দেয়। সেদিন আমাদের গাওয়া শেষ গানটি ছিল, ডিজনির আলাদিন সিনেমার আ হোল নিউ ওয়ার্ল্ড।

রাত দুটায় একা একা ফিরে যাচ্ছিলাম বীচহাউজে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, জীবনের বিশাল একটা সময় পাড় করেছি নানা রকম ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে। স্ক্রিন থেকে আসা নীল রঙের আলো ঘুম কেড়ে নিয়ে সর্বক্ষণ সজাগ সতর্ক করে রাখে। অথচ সারাদিন ধরে দেখছিলাম কি করে প্রাকৃতিক আলো ফিকে হতে হতে একসময় গহীন আঁধারে চারপাশ ঢাকা পড়ছিল। যেন প্রকৃতি বলছিল, “দিনের আলো নিভে এসেছে, এবার ঘুমাও।” ফিরে দেখি বীচহাউজ একেবারে ফাঁকা। না কোনও টেক্সট, না ভয়েস মেসেজ, না ইমেইল, আর থাকলেও তো আমার জানার কথা না, অন্তত ৩ মাস। বিছানায় শুতে না শুতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। অত গভীর ঘুম শেষ কবে ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই। টানা ১৫ ঘন্টা পর ঘুম ভেঙেছিল।...চলবে

স্টোলেন ফোকাস (২)

লেখক: ইয়োহান হারি

বাংলা তর্জমা: নাহিদ ইসলাম

এরপরের এক সপ্তাহ কেমন যেন ঘোরাচ্ছন্ন অবস্থায় বিশ্রাম করে কেটেছিল। ক্লান্তি আর নিস্তব্ধতা মিলিয়ে নিজেকে ঐ সময়টায় কেমন নেশাগ্রস্ত মনে হত। কখনও ক্যাফেতে বসে অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম, কখনও প্রভিন্সটাউনের লাইব্রেরি আর ৩টা বইয়ের দোকানে যেতাম। পড়া উচিৎ মনে করে আরও কিছু বই কিনেছিলাম। এত পরিমাণে লবস্টার খেয়েছিলাম যে, কোনওকালে যদি বিবর্তনের ধারায় এই প্রজাতির মাঝে চেতনার উদ্ভব হয়, তাহলে ইতিহাসের পাতায় আমাকে তারা স্তালিনের মত গণহত্যাকারী বলে উল্লেখ করবে। হেঁটে হেঁটে গিয়েছিলাম সেই জায়গায়, যেখানে ৪০০ বছর আগে প্রথমবার ইংরেজ পিলগ্রিমরা আমেরিকার মাটিতে পা ফেলেছিল। (অবশ্য ওখানে তারা কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে তেমন কিছু পায়নি, তারপর জাহাজে করে আরও দক্ষিণ দিকে গিয়ে অবশেষে প্লাইমাউথ রকে নেমেছিল।)

মনের মধ্যে আজব আজব সব জিনিস ভেসে উঠছিল। মাথার মধ্যে আশির দশক আর নব্বই দশকের গানের মুখরা বেজেই চলেছিল। খুব ছোট বয়সে শোনা যেই গানগুলির কথা বহু বছর ভাবিনি। যেমন- ব্রোজ ব্যান্ডের ক্যাট অ্যামাং দ্য পিজিয়ন্‌স কিংবা ওশান কালার সিন-এর দ্য ডে উই কট দ্য ট্রেইন। স্পটিফাই ছাড়া গানগুলি পুরোপুরি শোনার কোনও উপায় ছিল না, তাই সৈকতে যাবার সময় হাঁটতে হাঁটতে আপন মনেই গুনগুন করতাম। কয়েক ঘন্টা পর পর ভেতর থেকে কেমন যেন অচেনা একটা অনুভব বুদবুদের মত বেরিয়ে আসার চেষ্টা করত, আর আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করতাম, “এটা কি? কি হচ্ছে?” তারপর মনে পড়ত, “আরে হ্যাঁ, এরই নাম প্রশান্তি।” খালি ২টা ধাতব যন্ত্র ফেলে এসেছিলাম, তাতেই এতটা অন্যরকম লাগছিল কেন? মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে আমি যেন পেটব্যথায় কাঁদতে থাকা দুটি শিশু কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আর এখন, বাচ্চা দুটিকে যেন বেবি সিটারের কাছে রেখে এসেছি। তাদের চিৎকার করে কান্না আর বমি থেকে যেন নিস্তার পেয়েছি।

এক সময় আমার কাছে সবকিছুর গতি মন্থর হয়ে আসে। সাধারণত, আমি প্রতি ঘণ্টা অন্তর খবর দেখি। উদ্বিগ্ন হওয়ার মত টুকরো টুকরো খবর লাগাতার সারাদিন ফোঁটায় ফোঁটায় গিলতে থাকি আর সেগুলি জোড়া লাগিয়ে কোনওরকম অর্থ দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। প্রভিন্সটাউনে এসে আর এই কাজ করতে পারছিলাম না। প্রতিদিন সকালে ৩টা খবরের কাগজ কিনে ধীরে সুস্থে পড়ে শেষ করতাম। তারপর দিনভর খবর নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করতাম না। আবার পরদিন সকালের পত্রিকায় আগের দিনের ঘটনাপ্রবাহ জেনে নিতাম। সারাদিন একের পর এক বিস্ফোরক তথ্যের আঘাতে জর্জরিত না হয়ে, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির একটা পূর্ণাঙ্গ গোছানো চিত্র পেয়ে যেতাম এক বসাতেই। তারপর নিশ্চিন্তে অন্য কাজে মন দিতে পারছিলাম। প্রভিন্সটাউনে যাবার কিছুদিন পরই হঠাৎ একদিন শুনি, ম্যারিল্যান্ডের এক পত্রিকা অফিসে ঢুকে একজন বন্দুকধারী ৫ জন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করেছে। একজন সাংবাদিক হিসেবে ঘটনাটা আমার কাছে খুব গুরুত্ববহ ছিল। আমার প্রাত্যহিক জীবনে এমন ঘটনা ঘটলে, তাৎক্ষণিক ভাবে বন্ধুরা মেসেজ পাঠাত, আমি ঢুকে পড়তাম টুইটার বা ফেইসবুকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে স্ক্রল করতাম। কে কি বলছে, কে কাকে দোষ দিচ্ছে, কে প্রথম খবরটা দিল, এইসব খাপছাড়া তথ্যের জঞ্জালের মধ্য থেকে প্রকৃত চিত্রটা তুলে আনার চেষ্টা করতাম। প্রভিন্সটাউনে কিন্তু হত্যাযজ্ঞের পরের দিন খবরের কাগজের কল্যাণে, মাত্র ১০ মিনিটেই সেই দুঃখজনক ঘটনার সব গুরুত্বপূর্ণ দিক জানতে পেরেছিলাম। হঠাৎ করেই সেই বন্দুকধারীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, মানে কাগজে ছাপানো সংবাদপত্র জিনিসটা আমার কাছে চমৎকার একটা উদ্ভাবন বলে মনে হয়েছিল। আমাদের সবার জন্য অতি জরুরি অত্যাধুনিক এক উদ্ভাবন। তখন বুঝলাম, আমি সচরাচর যেভাবে সংবাদ আহরণ করতাম, তাতে আতঙ্ক বাড়ত। আর ছাপানো পত্রিকার সেই নতুন পদ্ধতি আতঙ্কের বদলে দিচ্ছিল একটি সামগ্রিক ধারণা।

প্রভিন্সটাউনে যাবার প্রথম সপ্তাহেই টের পেয়েছিলাম যে কিছু একটা ঘটছে, আর তাতে করে ধীরে ধীরে যেন আমার মস্তিষ্কের রিসেপ্টরগুলি একটু একটু করে খুলতে শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে যেন আমার মনের একাগ্রতা বাড়ছিল, মনোযোগ ধরে রাখা সহজতর হচ্ছিল। কিন্তু সেই কিছু একটা ঘটনা আসলে কি ছিল? প্রভিন্সটাউনে কাটানো সেই প্রথম দুই সপ্তাহে ঠিক কি ঘটেছিল, আর কেন আমার ওরকম অনুভূতি হয়েছিল, সেসব বুঝেছিলাম আরও পরে, কোপেনহেগেনে গিয়ে।

সুনে লিহম্যান-এর ছেলে দুটি লাফ দিয়ে তার বিছানায় পড়তেই তার মনটা কেমন করে উঠল। সে বুঝতে পারল কিছু একটা সমস্যা আছে। রোজ সকালে তার দুই ছেলে খুশির চোটে চেঁচামেচি করতে করতে লিহম্যান দম্পতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে নতুন দিনের সকাল দেখেই তারা ব্যাপক উচ্ছ্বসিত হয়ে যায়। এমন মধুর দৃশ্য কল্পনা করেই লোকে বাচ্চাকাচ্চা নেয়, আর এমনিতেও সুনে তার ছেলেদের ভীষণ ভালোবাসে। অথচ সকালবেলায় বাচ্চা দুটি খুশির চোটে দাপাদাপি করতে করতে তার কাছে আসলে, সে তাদেরকে জাপটে না ধরে সবার আগে ফোন তুলে দেখত নতুন কোনও ইমেইল এসেছে কি না। সুনে আমাকে বলেছিল, “আমার ফুটফুটে সুন্দর সোনামণিরা আমার বিছানায় উঠে হামাগুড়ি দিত, আর আমি ফোন নিয়ে ইমেইল চেক করতাম।”

প্রতিবার এ কথাটা মনে হলেই তার লজ্জা পেত। সুনে পদার্থবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করার পর, ডেনমার্ক কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করে কিন্তু এক সময় তার মনে হল যে শুধু পদার্থবিদ্যার গবেষণা করলেই হচ্ছে না, তার নিজের মনোজগতে কি ঘটে যাচ্ছে সেটাও একটু তদন্ত করে দেখা দরকার। আমাকে সুনে বলেছিল “মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিলাম বলে এই নিয়ে আমার চিন্তার শেষ ছিল না। মাত্রাতিরিক্ত সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করছিলাম, কোনওভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।” ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের খুঁটিনাটি বিষয় জানার জন্য সুনে সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকত, অথচ এর পুরোটাই ছিল তার জন্য অপ্রয়োজনীয়, একেবারেই পণ্ডশ্রম। এই আসক্তির কারণে না সে বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারছিল, না বিজ্ঞানী হিসেবে তার গবেষণা আগাচ্ছিল। তার ভাষায়, “এক সময় উপলব্ধি করলাম যে, একদিক থেকে দেখতে গেলে তো আমার চাকরিটাই হল আর সবার থেকে আলাদা কিছু চিন্তা করা কিন্তু আমি এমন একটা পরিবেশে ঢুকে গিয়েছিলাম, যেখানে বাকি সবাই যা জানতে পাচ্ছিল আমিও ঠিক সেই একই তথ্য পাচ্ছিলাম, আর আমিও বাকি সবার মত ঠিক একই জিনিস চিন্তা করছিলাম।”

সুনে ভেবেছিল শুধু সে একা নয় বরং আরও অনেকেই হয়ত মনোসংযোগের ক্ষমতা হারাচ্ছে। কিন্তু সে এটাও জানত যে, ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে, যখন মানুষ মনে করেছে গোটা সমাজ হয়ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা কেবল ঐ মানুষগুলি বুড়িয়ে যাচ্ছিল বলে তাদের এমন অনুভূতি হচ্ছিল। ব্যক্তির নিজস্ব অবস্থার অবনতির সাথে গোটা মানব প্রজাতির অবক্ষয়কে গুলিয়ে ফেলাটা খুব সহজ। তখন সুনে লিহম্যানের বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই, তাই মনে তার সন্দেহ উঁকি দেয় যে, ‘আসলেই দুনিয়াটা বদলাচ্ছে নাকি আমি বদমেজাজী বুড়োতে পরিণত হচ্ছি?’ তো ইউরোপজুড়ে আরও অনেক ব

Address

Barishal & Dhaka
Barishal

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when বইয়ের শহর posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to বইয়ের শহর:

Shortcuts

Share

Category