23/08/2021
বাংলাভাষায় ইকবাল-চর্চা ও সংকলনের কথা
মহান দার্শনিক কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল বিশ্বময় আলোচিত কবিদের অন্যতম। একাধারে সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি ও ধর্মীয় অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে কাব্যজগতে তাঁর ভূমিকা অনবদ্য; এমনকি একক বললেও বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হবে না। কাব্যসাহিত্যের শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ বিচারে তিনি অসাধারণ; কিন্তু কাব্যে চিন্তা, দর্শন, সমাজসংকট, মানবজীবনের গতিপথকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তিনি উপমাহীন প্রায়। তাই ইকবালকে শুধু কবি হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাকে কিঞ্চিৎ চেনা হবে মাত্র; কারণ, তিনি বহুমাত্রিক অবস্থানে স্বমহিমায় দীপ্তিমান।
আল্লামা ইকবাল সমগ্র মানবতার, বিশেষত মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ইকবালের কাব্য ও দর্শন নিয়ে অগণন চর্চা হয়। জ্ঞান-গবেষণার আঙিনায় তো বটেই, সাধারণ মানুষের মুখে মুখেও ইকবালের পঙ্ক্তি আবৃত্ত হয় প্রবাদের মতো। তাঁর কাব্যের রোশনিতে উম্মাহর হৃদয়ের ব্যথা ও কথা অনুরণন তোলে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের জ্ঞানাঙ্গনে ইকবাল জ্বলজ্বলে একখণ্ড হীরক।
বাংলাদেশেও ইকবাল এক অমোচনীয় নাম। কবিতার আসরে যেমন তিনি অপরিহার্য, দর্শনের ক্লাসেও তেমনই। ইলমগৃহের বাতায়নে ইকবাল দখিনা সমীরণ। আবার বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ওয়াজ মাহফিলে ইকবাল ওয়ায়েজের গলায় শের। সুতরাং আল্লামা ইকবাল এদেশেও অপরিহার্য জন। এমনকি বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথেই তো আছে ইকবালের সম্বন্ধ। তিনিই প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন উপমহাদেশের মুসলিমদের নিয়ে স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের। তাঁর সেই স্বপ্নের হাত ধরেই দীর্ঘ প্রক্রিয়া পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ আজ স্বতন্ত্র, সার্বভৌম, স্বাধীন একটি রাষ্ট্র।
বাংলাভাষায় ইকবালচর্চার ইতিহাস অনেক পুরোনো। বলা যায়, ইকবাল নিয়ে যখন প্রথম উচ্ছ্বাসের সূচনা, তখন থেকেই তিনি বাংলায়ও স্থান করে নিয়েছেন; যদিও সেই পরিসর ছিল সীমিত। কাজী নজরুল ইসলাম যখন মধ্যগগনে, তখন ‘শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া’র অনুবাদ প্রকাশিত হয়-- ১৯২৮ সালে। কাজী নজরুল ইসলাম এর ভূমিকা লিখেন। আশরাফ আলী খান, মুহম্মদ সুলতান, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ এ সূচনার উদ্বোধক।
ইকবালকাব্য বাংলাভাষায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে পঞ্চাশের দশকে। এই সমৃদ্ধির মূল কুশীলব কবি ফররুখ আহমদ ও সৈয়দ আবদুল মান্নান। সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, সিকান্দার আবু জাফর, আশরাফ সিদ্দিকী, মনিরউদ্দীন ইউসুফরাও বেশ কিছু কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে আবদুল মান্নান তালিব, মতিউর রহমান মল্লিক, রুহুল আমীন খানও টুকিটাকি কাজ করেছেন। তবে বাংলাভাষায় ইকবালকাব্য চর্চায় স্বর্ণোজ্জ্বল নাম দুটিই-- ফররুখ ও সৈয়দ।
বাংলাভাষায় ইকবালের চিন্তা-দর্শনের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাখ্যাতা বিশিষ্ট দার্শনিক ও জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথেই এই গুরুকাজটির বড়ো অংশ সম্পন্ন করেছেন। ইকবালের রাজনৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যায় মওলানা আবদুর রহীমের অবদান জুড়িহীন। এরপরে আবদুল মান্নান তালিব, অধ্যাপক আবু জাফর, ফাহমিদ-উর-রহমান, ড. আবদুল ওয়াহিদ, ড. আবু সাঈদ নূরুদ্দীন এই নামগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পূর্বকালেই ঢাকায় ইকবাল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় অনুবাদক, লেখক মীজানুর রহমানের উদ্যোগে-- অনেকটা ঘরোয়া পরিসরে। ঢাকাকেন্দ্রিক ইকবালচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা এর মাধ্যমে। পরে একাডেমি কালের আবর্তে বিলুপ্ত হলে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আল্লামা ইকবাল সংসদ। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ শতকের প্রারম্ভিকা পর্যন্ত ইকবাল সংসদের ভূমিকা অসামান্য ও প্রশংসনীয়। বাংলাভাষায় ইকবালচর্চার মূল ভান্ডারটি তারা এ সময়ে গড়ে নেয়। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করে সংসদ। পাশাপাশি অনিয়মিত হলেও ‘ইকবাল সংসদ পত্রিকা’ তাদের একটি বড়ো অবদান। সময়ের আবর্তনে নদীর একূল ভাঙে তো ওকূল গড়ে। ইকবাল সংসদের অস্তিত্ব বিলীন না হলেও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে সে বাস্তবতায়।
‘আল্লামা ইকবাল : মননে সমুজ্জ্বল’ সংকলনটি সেই নিষ্প্রাণ শৈত্যে বসন্তের পরশ দেওয়ার ক্ষুদ্র কিন্তু জরুরি প্রয়াস। বাংলাভাষায় আল্লামা ইকবালকে নিয়ে যত বই, স্মরণিকা, সংকলন হয়েছে-- আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রায় সবগুলো সংগ্রহ করেছি। সেই প্রকাশনাগুলোর সারসংক্ষেপ বলা যায় এ সংকলনটিকে। তাই এ সংকলনকে মৌলিক কোনো প্রচেষ্টা বলাটা হবে বাতুলতা। এটি বাগান নয়; বরং বহু বাগান থেকে সংগৃহিত ফুলের মালা। আমাদের উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম এ সংকলনে আছে, তবে তা কঠোর পরিশ্রম আর পরম মমতায় বাগান তৈরির মালিসদৃশ কৃতিত্ব নয়; বরং মালাগাঁথুনির বিনি সুতোর বিন্যাসের তৃপ্তি।
সংকলনটির বেশিরভাগ লেখার উৎস ‘আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা’। সংসদ প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের সংকলন থেকেও বেশ কিছু লেখা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, ড. হাসান জামান, সৈয়দ আবদুল মান্নান, কবি ফররুখ আহমদ, অধ্যাপক আবু জাফর, ড. আবু সাঈদ নূরুদ্দীন, ড. আবদুল ওয়াহিদ-সহ অনেকের বই থেকে আমরা লেখা সংগ্রহ করেছি। মরহুম আলী নদভির দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি নিজেদের উদ্যোগে অনুবাদ করিয়ে সংযোজন করেছি। এ সকল বইয়ের সাথে সম্পৃক্ত লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকদের প্রতি আমাদের অফুরান শ্রদ্ধা।
আমাদের প্রত্যাশা, ‘আল্লামা ইকবাল : মননে সমুজ্জ্বল’ ইকবালচর্চার পথচলায় একটি উল্লেখযোগ্য সংকলনের মর্যাদা পাবে-- মৌলিকত্বে না হলেও বিন্যাস ও ব্যঞ্জনায়। ইকবাল প্রসঙ্গে এ যাবৎ বাংলায় প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোয় সন্নিবেশ করার চেষ্টা করেছি আমরা। তারপরও কলেবরের স্থূলতার কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখাও বাদ দিতে হয়েছে। তবে সান্ত্বনা এই-- যা যা বাদ দিতে হয়েছে, তার চেয়ে যা তুলে এনেছি তা কোনো দিক দিয়েই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যথাসম্ভব স্বল্প সময়ে প্রকাশের লোভ সংবরণ করতে না পারায় কাজের গতি ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত। সুতরাং ভুলত্রুটির সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি। সময়ের সাথে সাথে এ সংকলন আরও ত্রুটিমুক্ত ও সমৃদ্ধ হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। ইকবালের কাব্যসৌন্দর্য, চিন্তার সুবাস, দর্শনের তীক্ষèতা, ঈমানের রোশনিতে আমরা রওশন হব-- এ আরজু এঁকেছি বইটির পাতায়।
('আল্লামা ইকবাল : মননে সমুজ্জ্বল' সংকলনটি বিন্যস্ত হয়েছে ৮ পর্বে। ৬৩টি লেখা সংকলিত হয়েছে এই ৮ পর্বে। পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩২। বইটি প্রকাশ করেছে প্রচ্ছদ প্রকাশন - Prossod Prokashon
বুকোগ্রাফি ক্রেডিট : কবি আতিফ আবু বকর।)