19/04/2026
স্বপ্ন দেখতেন টিপু সুলতান। এবং স্বপ্নে দেখা ঘটনাগুলি টুকে রাখতেন।
১৭৯৯ সালের মে মাসে টিপুর এক বিশ্বস্ত মন্ত্রী মীর সাদিক ইংরেজ সৈন্যদের শ্রীরঙ্গপট্টনম দূর্গে ঢুকিয়ে দেয়। তারা অতর্কিতে আক্রমণ করে টিপু সুলতানকে মেরে ফেলে। ব্রিটিশরা টিপুর দূর্গ দখল করার পর তাঁর সমস্ত সম্পদ হস্তগত করেছিল। এইসময়েই টিপুর ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে কিলপ্যাট্রিক সাহেব সেই স্বপ্নের বিবরণসমৃদ্ধ নোটবুকটি হস্তগত করেন। এটি ছিল ফারসী ভাষায় লেখা। টিপু সুলতানের মুনশী হাবিবুল্লাহ ওই নোটবুকটিকে চিহ্নিত করেন এবং উপস্থিত ব্রিটিশ অফিসারদের এটির সম্পর্কে তথ্য দেন। পরবর্তীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহাদুর এই নোটবুকটিকে অনুবাদ করিয়ে ছাপিয়ে প্রকাশ করেন। বইটির নাম দেওয়া হয় "ড্রিমস অব টিপু সুলতান"। বর্তমানে মূল পান্ডুলিপিটি লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস পাঠাগারে রয়েছে। করাচী থেকে মাহমুদ হোসেনের অনুবাদে ১৯৫৭ সালে এই বইটা পুনরায় প্রকাশিত হয় বিভিন্ন টিকাসমেত।
মোট সাঁইত্রিশটি স্বপ্নের বিবরণীসমৃদ্ধ কড়চাটির প্রথম ষোল পাতায় লেখা আছে এবং পরবর্তী ১৬৬ টি শূন্য ফোলিও রয়েছে। শেষের দিকে এসে আবারও ওই একই ধরণের স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়। এই লেখাগুলোর সময়কালের দিকে নজর দিলে দেখা যায় এগুলো ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে অবধি পর্যন্ত লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ টিপু সুলতান তেরো বছর যাবত নিয়মিত তাঁর স্বপ্নের বিবরণ লিখে গেছেন। কিন্তু শেষের দিকে এসে এই লেখায় প্রচুর বানান ভুল দেখা যায়। তিনি এক হরফের জায়গায় অন্য হরফ বসিয়ে দিয়েছেন। লেখার বাকি অংশেও তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট।
স্বপ্নগুলোর বর্ণনার দিকে তাকিয়ে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন কোন কোন স্বপ্ন তিনি ঘুম থেকে জেগেই লিখেছেন, আবার কোন কোনটি লিখেছেন অনেক পরে। যেগুলো পরে লিখিত হয়েছে সেগুলো কিছুটা এলোমেলো। এমনকি কড়চায় স্বপ্নগুলো তিনি ধারাবাহিক ভাবেও লিপিবদ্ধ করেননি। অর্থাৎ নিজের স্বপ্নগুলো টুকে রাখার ইচ্ছা থাকলেও টিপু সুলতান সেগুলো লেখার মতো যথেষ্ট সময় পাননি কিংবা হয়ত তিনি বিষয়টায় কিছুটা বিব্রতবোধ করতেন।
কি স্বপ্ন দেখতেন টিপু সুলতান ?
এক স্বপ্নে আছে, একটি সুন্দর যুবক তাঁর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করছে, একসময় যুবকটির বুক অনাবৃত হয়ে যাবার পর টিপু বুঝতে পারলেন যে যুবক নয়,সে একজন যুবতী। সেইসময় মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল এবং টিপু বুঝতে পারলেন যে মারাঠাদের বাইরে থেকে পুরুষালী মনে হলেও ঐ তাঁদের মধ্যে পৌরুষ কিছুই নেই এবং যুদ্ধে তাঁদের হার অনিবার্য।
এছাড়াও সালামাবাদে যুদ্ধযাত্রার সময় স্বপ্নে একটি অদ্ভুত গরুকে দেখেছিলেন তিনি, যার মুখটা ছিল বাঘের মত এবং কোন পিছনের পা ছিল না। তিনি সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে এরা হল নাজরীন ( ইংরেজ) যারা দেখতে বাঘের মত হলেও আসলে গোবেচারা। যুদ্ধে এরা মারা যাবে কিন্তু কোন মুসলমানের মৃত্যু হবে না।
স্বপ্নে টিপু সুলতান দেখছেন মারাঠা দূত রঘুনাথ রাও বার্তা এনেছে যে ইংরেজরা ইউরোপের যুদ্ধে এমন নাজেহাল হয়ে পড়েছে যে তারা খুব শীঘ্রই বাংলা তথা ভারত থেকে চলে যাবে।
একটি স্বপ্নে রয়েছে তিনি দিল্লীর কাছে শিবির স্থাপন করেছেন। খুব কাছেই মারাঠা সিন্ধিয়াদের তাঁবু। দিল্লির এক আধিকারিককে টিপু সুলতান বললেন যে তিনি নিজে দিল্লীর সিংহাসনে এক উপযুক্ত সম্রাটকে বসাবেন যাতে ইসলাম আরো শক্তিশালী হয়। এরপর অবিশ্বাসীদের ফৌজকে তাঁরা উপযুক্ত শাস্তি দেবেন। একটি স্বপ্নে আবার রয়েছে যে সাদা হাতিতে চড়ে চীনদেশের দূতরা তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন।
একটি স্বপ্নে আছে যে একজন ফরাসী দূত এসে তাঁকে জানাচ্ছেন যে দশ হাজার শক্তসমর্থ ফরাসী যুবক তাঁর হয়ে লড়ার জন্য প্রস্তুত। এতে টিপু খুশি হয়ে তাঁকে জানালেন যে তাঁর ইসলাম ধর্মাবলম্বী সৈনিকরাও জেহাদ করার জন্য উদগ্ৰীব।
একটি স্বপ্নের বিবরণে লেখা আছে যে তিনি সুমিষ্ট ফল খাচ্ছেন, আবার কোথাও দেখা যায় স্বপ্নে তিনি সুস্বাদু ডাবের জল পান করছেন। একটি স্বপ্নে রয়েছে তাঁর সামনে তিনটি উৎকৃষ্ট খেজুর রাখা হল। টিপু সুলতানের কাছে এই তিনটি খেজুর হল তিনটি কাফের শক্তির প্রতীক। মারাঠা, ইংরেজ ও নিজাম ( নিজাম ইংরেজ ও মারাঠাদের সাথে জোট করেছিলেন বলে টিপু সুলতান তাঁকে কাফের বলে অভিহিত করেছেন।)
টিপুর স্বপ্নে অনেকবারই এসেছে আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় প্রসঙ্গ। তিনি নিজের ধর্মের প্রচার ও প্রসারে খুবই উদগ্ৰ ছিলেন। অবিশ্বাসীদের সৈন্যবাহিনীকে তিনি পর্যুদস্ত করছেন, টিপু সুলতানের স্বপ্নের একটি রেকারেন্ট মোটিফ। টিপুর লেখায় এসেছে মারাঠা ও ইংরেজদের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা ও ঘৃণার প্রসঙ্গ। প্রায় প্রতিটি স্বপ্নকেই টিপু সুলতান নিজের মত করে ব্যাখ্যা করেছেন।
টিপুর এই স্বপ্নের বিবরণ পড়লে তাঁর মনের মানচিত্রের একটা আবছা রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনস্তত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের কাছে এই বইটি এক অমূল্য সম্পদ।