17/03/2020
করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা; চিকিৎসাপেশার বাইরে অন্যান্য পেশাজীবী এবং জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কিছু কথা
প্রশ্ন ১) করোনাভাইরাস কী?
উত্তরঃ করোনাভাইরাস অন্যান্য ভাইরাস জাতীয় জীবাণুর ন্যায় একটা জীবাণু। যুগ যুগ ধরে এই ভাইরাস পৃথিবীতে বিদ্যমান। এর অনেকগুলো প্রজাতি আছে যা প্রাণীদেহে অবস্থান করে। এখন পর্যন্ত এদের মধ্যে মাত্র সাতটি প্রজাতি প্রাণী থেকে মানুষে এবং মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়।
প্রশ্ন ২) করোনাভাইরাস যদি যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে অবস্থান করে তাহলে আমরা কি যুগ যুগ ধরে করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আসছি?
উত্তরঃ হ্যা। আমরা যুগ যুগ ধরেই করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আসছি। আমাদের প্রতি বছর যে সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা হয় সেটার জন্য দায়ী কিছু ভাইরাসের মধ্যে করোনাভাইরাস একটি। করোনাভাইরাসের সাতটি প্রজাতির মধ্যে চারটি প্রজাতি এসবের জন্য দায়ী
প্রশ্ন ৩) যদি তাই হয়, প্রতি বছর তো করোনাভাইরাস দ্বারা মহামারী হয়না। তাহলে এবারের করোনাভাইরাস মহামারী দ্বারা হাজার হাজার রোগীর মৃত্যু ঘটাচ্ছে কিভাবে?
উত্তরঃ অনেক ভাইরাস তার বংশগতির উপাদানে পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন এক ভাইরাসে পরিবর্তিত হতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সে ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি হলেও করোনাভাইরাসেরও খানিকটা সেই ক্ষমতা আছে। ভাইরাস প্রাণীদেহের বাইরে জড় হলেও প্রাণীদেহের ভিতরে সে জীবের ন্যায় আচরণ করে। সেখানে সে তার বংশগতির উপাদান পরিবর্তন করে নতুন ভাইরাস সৃষ্টি করে যা মানবদেহে বিভিন্ন অঙ্গে শক্তিশালী প্রদাহ দ্বারা গুরুতর রোগ তৈরি করে। এখন পর্যন্ত মানবদেহে সংক্রমণ করা করোনাভাইরাসের সাতটি প্রজাতির মধ্যে চারটি প্রজাতি প্রতি বছর সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি সৃষ্টি করে। পঞ্চম প্রজাতির করোনাভাইরাসটি ২০০৪ সালে চীনে মহামারী ঘটায় যার নাম ছিল সার্স করোনাভাইরাস, সেটার সম্ভাব্য বাহক ছিল বাঁদুর। করোনাভাইরাসের ষষ্ঠ প্রজাতির দ্বারা মহামারী হয়েছিল ২০১২ সালে সৌদি আরবে যার নাম ছিল মার্স করোনাভাইরাস, সেটার সম্ভাব্য বাহক ছিল উট। আর এবারের করোনাভাইরাসটির নাম সার্স করোনাভাইরাস-২, যেটা দ্বারা সৃষ্ট রোগের নাম কোভিড-১৯। এটার সম্ভাব্য বাহক সামুদ্রিক কোন প্রাণী। এ ভাইরাসটি অন্যান্য করোনাভাইরাস থেকে আলাদা, এটি এর বংশগত উপাদানকে পরিবর্তিত করে যথেষ্ট শক্তিশালী ভাইরাসে পরিণত হয়েছে। এটি তাদেরকে খুব বাজেভাবে আক্রান্ত করে যারা বয়স্ক, যাদের আগে থেকে ফুসফুস, বৃক্ক, যকৃত ইত্যাদি অঙ্গের রোগ আছে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। বর্তমান করোনাভাইরাস যাদেরকে বাজেভাবে আক্রান্ত করেছে, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে এবং যে পাঁচ হাজারের উপর মানুষ মারা গিয়েছে তাদের প্রায় ৮০% এর বয়স ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে। আর পঞ্চাশ বছর বয়সের নিচে যেসব মানুষ আক্রান্ত হয়েছে তাদের প্রায় শতভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছে। আর গড়ে ৫০-৭০ বছর বয়স্ক রোগীরদেরও প্রায় ৯৫ শতাংশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। মোটের উপর সব বয়সী রোগীদেরকে গড় করলে ৩ শতাংশ রোগী করোনাভাইরাস দ্বারা মৃত্যুবরণ করেছে। এজন্যই এবারের করোনাভাইরাস এতটা ভয়ঙ্কর। কারণ ৩ শতাংশও কম নয়
প্রশ্ন ৪) করোনাভাইরাস কিভাবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়?
উত্তরঃ হাঁচি, কাশির মাধ্যমে বায়ুবাহিত হয়ে শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে ও ত্বকের সংস্পর্শ দ্বারা।
প্রশ্ন ৫) কিভাবে করোনাভাইরাসের মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়?
উত্তরঃ করোনাভাইরাসে সম্ভাব্য আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে যেতে না দেয়া যাকে বলে হোম আইসোলেশন বা হোম কোয়ারেন্টাইন (রোগের লক্ষন প্রকাশ হওয়া থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত), রোগীকে মাস্ক ব্যবহার করতে বলা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাত দিয়ে মুখমন্ডল স্পর্শ করা এড়িয়ে চলা।
প্রশ্ন ৬) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লক্ষন কি কি?
উত্তরঃ জ্বর (প্রায় ৬৬% রোগীর থাকে), সর্দি, কাশি, গলাব্যথা (প্রায় ৮০% রোগীর থাকে, শ্বাসকষ্ট (প্রায় ৫০% রোগীর মৃদু শ্বাসকষ্ট, ৮০% গুরুতর রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট), অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া। এছাড়াও অল্প সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা, প্রচন্ড মাথা ব্যথা ও শরীর ব্যথা, জন্ডিস ইত্যাদি উপসর্গ থাকতে পারে।
প্রশ্ন ৭) উপরোক্ত উপসর্গগুলোর প্রায় সবগুলোই তো সাধারণ সিজনাল ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) রোগের লক্ষন। তাহলে এখনকার জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি লক্ষন থাকলে তাকে সিজনাল ফ্লু না বলে করোনাভাইরাস কেন বলব?
উত্তরঃ যেহেতু বর্তমানে সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারী ঘটাচ্ছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই করোনাভাইরাসকেই প্রথমে বিবেচনা করতে হবে। তাছাড়া আক্রান্ত দেশ থেকে অনেক প্রবাসী আমাদের দেশে ফিরেছেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে তো দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কিন্তু যদি ইনফ্লুয়েঞ্জা না হয়ে করোনাভাইরাস হয় তাহলে সর্বনাশ। সেজন্যই এখন যত জ্বরের রোগী সর্দিকাশি, গলাব্যথা ইত্যাদি নিয়ে আসবে তাদেরকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা একই উপসর্গ সৃষ্টিকারী অন্যান্য ভাইরাস যেমন রাইনোভাইরাস, প্যারামিক্সোভাইরাস ইত্যাদি বিবেচনা করা যাবে না। এক্ষেত্রে আশঙ্কাকে অযথা বলা যাবে না। এই আশঙ্কা সচেতনতারই পরিচায়ক।
প্রশ্ন ৮) করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে জনগণের প্রতি সহজ নির্দেশনা কি?
উত্তরঃ প্রথমেই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আতঙ্কে হতবুদ্ধি হওয়া যাবে না কিন্তু অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। কোন জ্বর, সর্দিকাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গযুক্ত রোগীর অবস্থা তীব্র খারাপ না হলে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ অধিকাংশ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর জন্য প্যারাসিটামল, বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর তরল পান করাই যথেষ্ট। আসলে এধরণের রোগীদের ঘরের বাইরেই বের হবার দরকার নেই, ঘরে থেকেই হোম আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিত। কারণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ঘরের বাইরে বের হবার অর্থই হচ্ছে আশেপাশের সংস্পর্শে আসা সুস্থ মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসকে ছড়িয়ে দেবার সম্ভাবনাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করা।
যারা সুস্থ তাদের কিছু করণীয় আছে; সংক্ষেপে সেগুলো হলোঃ
জনসমাগম এড়িয়ে চলা যেমন গণপরিবহন, বক্তৃতাস্থান, সভা, সেমিনার, স্টেডিয়াম ইত্যাদি। শিক্ষার্থীদেরকে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ে যেতে না দেয়া; বিবাহ, বৌভাত ইত্যাদি অনুষ্ঠান যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা ইত্যাদি।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম মেনে চলা, কয়েক ঘন্টা পরপর সাবান দ্বারা হাত ধোয়া, হাত কোনক্রমেই মুখ, নাক, চোখে না নেয়া, হাঁচি আসলে রুমাল বা টিস্যু দিয়ে নাক, মুখ ঢেকে হাঁচি দেয়া এবং তৎক্ষণাৎ হাত ধুয়ে ফেলা।
প্রশ্ন ৯) কি দিয়ে বারবার হাত ধুতে হবে?
উত্তরঃ সাবান (ডিটারজেন্ট নয়) এবং বাজারে প্রচলিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার (অবশ্যই কমপক্ষে ৭০% এলকোহল থাকতে হবে তাতে)।
প্রশ্ন ১০) সবাইকে কি মাস্ক ব্যবহার করতে হবে?
উত্তরঃ না, যাদের করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগের লক্ষন আছে তারা মাস্ক পরিধান করবে, বাকিদের মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ যদি ধুলাবালি থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পরতে চায়, সে পরবে। সুস্থ মানুষ মাস্ক পরলে বরং তার করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বাড়তে পারে! কারণ কারো হাত যদি চেয়ার, টেবিল, বইখাতা, টাকা ইত্যাদি হতে স্পর্শ দ্বারা করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয় তাহলে মাস্ক মুখে পরতে হলেও জীবাণু সংক্রমিত তার হাত মুখমন্ডলকে স্পর্শ করবেই। তাতে বরং ভাইরাস সংক্রমনের সম্ভাবনা বেড়েই যায়। প্রায় মাসখানেক আগে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ ব্যপারটি সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন।
করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা; চিকিৎসাপেশার বাইরে অন্যান্য পেশাজীবী এবং জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কিছু কথা
প্রশ্ন ১১) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়াতে একেক সময় একেক কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ছে। কার কথা বিশ্বাস করবো?
উত্তরঃ যার তার কাছ থেকে নয়, করোনাভাইরাস এবং করোনাভাইরাস মহামারী হতে করণীয় সম্পর্কে জানুন এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে। আইনবিদের কাছ থেকে যেমন আইনের ধারা সবচেয়ে সঠিক ও সুন্দরভাবে জানা যায়, প্রকৌশলীর কাছ থেকেই যেমন ইমারত নির্মাণের সঠিক নিয়ম জানা যায় তেমনই চিকিৎসকের কাছ থেকেই রোগ এবং রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জেনে নিতে হয়, অন্য কারো কাছ থেকে নয়। নইলে তাতে বিভ্রান্তিই শুধু বাড়ে, লাভের পরিবর্তে ক্ষতিই হয়। সেজন্য করোনাভাইরাসের চিকিৎসাবিষয়ক সম্পর্কিত যেকোন তথ্য চিকিৎসকের কাছ থেকেই জানুন, অন্য কারো কাছ থেকে নয়।
প্রশ্ন ১২) অনেকে বলছে, গ্রীষ্মকাল এলে করোনাভাইরাস কমে যাবে, করোনাভাইরাস অধিক তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না বা এর সংক্রমণ করার ক্ষমতা কমে যায়। তাই আমাদের করোনাভাইরাস নিয়ে ভয়ের কিছু নাই। এটা কতটুকু সত্যি?
উত্তরঃ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশের তাপমাত্রা কত হয়, ৩৫, ৩৬, ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস? করোনাভাইরাসকে যখন পরীক্ষাগারে কৃত্তিমভাবে বংশবৃদ্ধি করানো হয় তখন তাকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা বরং করোনাভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। আর এটা তো সাধারণ বুদ্ধির কথা যে, যে ভাইরাস আমাদের দেহের ভিতরে বংশবিস্তার করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে সে অবশ্যই ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বেশ স্বচ্ছন্দে বাঁচতে পারে। কারণ আমাদের দেহের ভিতরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, জ্বর হলে সেটা ৩৯, ৪০, ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তো হয়ই। আর জ্বরের সময় দেহের ভিররে করোনাভাইরাস নিশ্চয়ই মরে যায় না।
প্রশ্ন ১৩) করোনাভাইরাস ও হার্ড ইমউনিটি শিরোনামে ব্রিটেনের উদাহরণ দিয়ে অনেকে বলছে,ব্রিটেন ইচ্ছে করে স্কুল,কলেজ বন্ধ করেনি কারণ তারা চায় তাদের শিশু,তরুন প্রজন্ম করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করুক যেহেতু এটা দ্বারা আক্রান্ত এই বয়সের রোগীদের মৃত্যুর হার অতি নগণ্য(করোনাভাইরাস দ্বারা মৃত রোগীদের ৯০% বয়স্ক ও যাদের দেহে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ,ফুসফুস,লিভার,কিডনী ইত্যাদির রোগ আছে তারাই অধিকতর মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে,শিশুকিশোর,তরুনেরা নয়)।তাই ইংল্যান্ডের অনুকরণে আমরাও কি স্কুল, কলেজ খোলা রাখবো হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের আশায়?ব্রিটেন শুধু বয়স্কদের শরীরে করোনাভাইরাস প্রবেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে।আমরাও কি তাই করবো?
উত্তরঃ প্রথমে জানতে হবে,হার্ড ইমিউনিটি কি?কোন জীবাণু সুস্থসবল মানুষের দেহে প্রবেশ করলে তার রক্তে রোগ প্রতিরক্ষাবাহিনী সে জীবাণুকে ধ্বংস করে,কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা(এন্টিবডি প্রোটিন ও মেমোরি সেল তৈরি করে রাখে যেন ভবিষ্যতে সেই একই জীবাণু দেহে আবার প্রবেশ করা মাত্র এই এন্টিবডি তাকে ধ্বংস করে ফেলে,মেমোরি সেল দ্রুতগতিতে এন্টিবডি তৈরি করে সে জীবাণুর বিরুদ্ধে।তখন আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে সেই জীবাণুর একটা সদস্যও বেঁচে থাকতে পারে না।ফলে তার কাছ থেকে সেই জীবাণু অপরের দেহেও ছড়াতে পারে না।এভাবে কোন নির্দিষ্ট জীবাণু যদি কোন দেশের জনগণের কমপক্ষে৭০%সুস্থ-সবল মানুষের দেহে প্রবেশ করে তাহলে তাদের দেহে সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে যে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরক্ষা শক্তি সৃষ্টি হয় তাতে করে বাকি ৩০%জনগণের দেহে সে জীবাণু সংক্রমণ করার মতো জীবাণুই থাকে না।এটাকেই হার্ড ইমিউনিটি বলে।সারা বিশ্বে শিশুদের যে কতগুলো নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেয়া হয়,সেটার উদ্দেশ্যও হার্ড ইমিউনিটি সৃষ্টি করা।আমাদের দেশে এখন প্রায় প্রতিটি মানুষের শরীরে পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি,মেমোরি সেল তৈরি হয়ে আছে কারণ আমাদের প্রায় সবাইকেই ছোটবেলায় পোলিওর টিকা খাওয়ানো হয়েছে।এখন কেউ চাইলেও পোলিও ভাইরাসকে জীবাণু অস্ত্র হিসেবে আমাদের দেশে ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে পোলিও আক্রান্ত করতে পারবেনা আমাদের মধ্যে সৃষ্ট হার্ড ইমিউনিটির কারণে,যদি না পোলিও ভাইরাসটিকে জেনেটিক মিউটেশনের দ্বারা নতুন পোলিও ভাইরাস হিসেবে তৈরি করা হয়।কারণ সেক্ষেত্রে এই পোলিও ভাইরাসটা হবে নতুন পোলিও ভাইরাস যার বিরুদ্ধে আমাদের অতীতের পুরনো পোলিও টিকার দ্বারা সৃষ্ট হার্ড ইমিউনিটি কোন কাজে আসবে না।
এবারের করোনা সম্পর্কে পুরোপুরি গবেষণা এখনো শেষ হয়নি।এটা কতটুকু হার্ড ইমিউনিটি দিবে সেটাও অনিশ্চিত।আর শিশু,তরুনেরা এথেকে প্রায় শতভাগ সুরক্ষিত হলেও তারা রোগাক্রান্তকালীন সময়ে যে হাঁচিকাশি,সংস্পর্শ দ্বারা বয়স্কদের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়াবে না,এরই বা নিশ্চয়তা কি?তখন বয়স্করা বিপদে পড়বে। তাই বিদ্যালয়,মহাবিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা উচিত।
প্রশ্ন ১৪) উপসর্গের তীব্রতা অধিক না হলে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যেতেই নিষেধ করা হচ্ছে, এটা কি রোগীর মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?
উত্তরঃ না, এটা মোটেও মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়। রোগীর যেমন চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার আছে তেমনই অপরেরও অধিকার আছে রোগীর কাছ থেকে সংক্রমিত না হবার। আর এই রোগের চিকিৎসা গ্রহণের জন্য হাসপাতাল তো দুরের কথা, রোগীকে ঘরের বাইরেই যাবার দরকার নেই। এমনিতে সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি হলে আমরা কি করি? চিকিৎসকের কাছে কয়জন চিকিৎসা নিতে যাই এজন্য? কয়েকদিন প্যারাসিটামল ও হিস্টাসিন জাতীয় ঔষধ তো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঔষদের দোকান থেকে কিনে খাই সেজন্য। এবারও সেই একই কাজ করবো। শুধু আমার কাছ থেকে ভাইরাসটা চারপাশের শতশত মানুষের মধ্যে যেন ছড়াতে না পারে সেজন্য নিজেকে ঘরের মধ্যে ৭-১৪ দিন বন্দী করে রাখবো, নিজের স্বার্থে নয়, অপর সকলের স্বার্থে। এটাই কি অধিকতর মহানুভবতা, মানবাধিকার সুরক্ষার উৎকর্ষতর বহিঃপ্রকাশ নয়? সুস্থ, সবল, পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাযুক্ত মানুষের দেহে করোনাভাইরাস কিছুই করতে পারলো না কিন্তু তার কাছ থেকে যেসকল বয়স্ক মানুষ বা পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধহীন মানুষের দেহে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিলো! এটা যেন না ঘটে সেজন্যই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকতে বলা। এটাা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন? আবার দেখা গেলো, আপনার জ্বর, সর্দিকাশি, গলাব্যথা হয়তো করোনাভাইরাস দ্বারা হয়নি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা হয়েছে। সেজন্য আপনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতালে হাজারো রোগীর মধ্য হতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোন রোগীর কাছ থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে গেলেন এবং আপনার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়ালেন। আপনি ভালো হয়ে গেলেন ঠিকই কিন্তু আপনার পরিবারের কোন বয়স্ক সদস্য করোনাভাইরাসে মারা গেলেন। ব্যাপারটি কেমন হবে তখন? বস্তুত আমাদের সম্মানিত, গুরুজন বয়স্কদেরকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই করোনাভাইরাসে আমরা অল্পবয়সীরা আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে নিজেদেরকে ৭-১৪ দিন ঘরে আবদ্ধ করে রাখবো।
আপনি আপনার গুরুজনদেরকে কতটুকু সম্মান করেন, ভালবাসেন, এটা তার একটা পরীক্ষাও বটে। কারণ ভালবাসা, শ্রদ্ধা, ভক্তি, সম্মান বাক্য দ্বারা অতি সামান্যই প্রকাশিত হয়, সেসব বরং কর্ম দ্বারাই সবচেয়ে বেশিটুকু প্রকাশিত হয়। তাই এই বছরে, এই সময়টাতে জ্বর, সর্দিকাশি, গলাব্যথা হলেই নিজেকে গৃহবন্দী করে ফেলুন।
করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা; চিকিৎসাপেশার বাইরে অন্যান্য পেশাজীবী এবং জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কিছু কথা
প্রশ্ন ১৫) বয়স্ক মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার লক্ষন দেখা দিলে কি করতে হবে?
উত্তরঃ যদি উপসর্গের তীব্রতা সামান্য হয় তাহলে তারাও অন্যান্য রোগীর ন্যায় হোম আইসোলেশনে থাকবেন।তার কাছ থেকেও পরিবারের অন্য সদস্য এবং পরিবারের বাইরে কেউ যেন আক্রান্ত হতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।কিন্তু উপসর্গের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করলেই স্বাস্থ্যবিভাগ কর্তৃক নির্ধারণকৃত হাসপাতালে তাদেরকে ভর্তি করতে হবে।বাড়িতে থাকাকালে সে ব্যক্তির সেবাশুশ্রূষা পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তির পরিবর্তে কোন শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুন-তরুনী বা যুবক-যুবতী কেউ করবে। কারণ তাদের কেউ তার কাছ থেকে আক্রান্ত হলেও তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা অতি নগণ্য। এবং, যে ব্যক্তি তার সেবা-শ্রূশুষা করবে সেও হোম আইসোলেশনে থাকবে।
প্রশ্ন ১৬) সারসংক্ষেপ কি দাঁড়ালো?
উত্তরঃ উদ্বিগ্ন হয়ে হতবুদ্ধি হয়ে ভয়ে কাতর হওয়া যাবে না। জ্বর, সর্দিকাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদির একটা বা কয়েকটা লক্ষন দেখা দিলেই নিজেকে হোম আইসোলেশনে নিতে হবে। জনসমাগম যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধিগুলো যথাসম্ভব মেনে চলতে হবে। বয়স্করা যেন আক্রান্ত হতে না পারে সে ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ না থাকলে বয়স্কদের ঘরের বাইরে বের হবারই দরকার নেই।গ্রামে গঞ্জে অনেক বয়স্ক ব্যক্তিই সময় কাটাতে বাজারে,চায়ের দোকানে আড্ডা দেন।আগামী কয়েক মাসের জন্য এগুলো বাদ।রোগীকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখে,শারীরিক পরীক্ষা দ্বারা একটা রোগ মোটামুটিভাবে নির্ণয় না করে মুঠোফোনে রোগীর কাছ থেকে কয়েকটা উপসর্গ শুনে তাকে কয়েকটা ঔষধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়াটা শুধু অন্যায় এবং আইনত নিষেধই নয়,সেটা ভয়ঙ্করও বটে। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারীতে জ্বর, সর্দিকাশি,গলাব্যথা,শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গের রোগী ঘর হতে বের না হয়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসকের চেম্বারে না গিয়ে চিকিৎসককে মুঠোফোনে জানান।এই বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন চিকিৎসক তাতে বিরক্ত হবেন বলে মনে হয় না।প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে গ্রুপ খুলে সেখানে একজন চিকিৎসককে সংযুক্ত করুন এবং আলোচনা করুন,চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত কোন রোগী চিকিৎসককে করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত করলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এবং হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে যেহেতু চিকিৎসককে তো রোগীর কাছে যেতেই হবে। আর খোদ চিকিৎসকই হোম আইসোলেশনে চলে গেলে রোগীদের চিকিৎসা দিবে কে, হাসপাতাল চালাবে কে?চিকিৎসকদেরকে এন-৯৫ বিশেষ মাস্কসহ পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট(পিপিই)সরবরাহ করার মতো সভ্য এবং যোগ্য জাতি এখনো আমরা হয়ে উঠতে পারিনি।বরং কেউ কেউ বলছে,সময় নাকি এসেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর জন্য চিকিৎসকদের প্রাণ উৎসর্গ করার!
সকলে সুস্থ থাকুন,নীরোগ থাকুন।পরম করুণাময় সকলের মঙ্গল করুন।
(সমাপ্ত)
ডা. শৈবাল
১লা চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।