03/03/2022
বই পর্যালোচনাঃ তবু বেঁধে রাখি মন
এই সমাজে একটা মেয়ের ডিভোর্স মানে সে সকল কলঙ্কের মূল, অশুভ ছায়া, অশুভ শক্তি। এর পেছনে যা কিছু হোক, জানার প্রয়োজন নেই। মেয়ের অপরাধ শূন্য হলেও সব দোষ তাকে চাপিয়ে সমাজ পূণ্য করতে চায়। সমাজ যে কেবল বর্বর নিয়মে পুরুষতান্ত্রিক হয়ে আছে, তাতে পুরুষদের বুলিতে মেয়েটি দুশ্চরিত্রা, তা নয়। বরং ভয়ংকর ভাবে এই সমাজের নারীদের কাছেই তাদের জাত ডিভোর্সি মেয়েরা কলঙ্কিত হয়। এমন কি বহু বছর সংসারের পর যে নারীর ডিভোর্স হলো, তার থেকেও হতে হয়। কি ভয়ংকর এই রূপ! নারী তার জাতকে মুখের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এসব উপেক্ষা করে না পারে ডিভোর্স প্রাপ্ত মেয়ে চলতে, আর না পারে নতুন করে জীবন সাজাতে স্বচ্ছ এবং নতুন কারো হাত ধরতে। সমাজের এমন গল্প নিয়েই সুহাসিনী আপুর হাত ধরে রচিত ‘তবু বেঁধে রাখি মন’ উপন্যাসটি।
দুই বছর সংসারের পর ডিভোর্স। অথচ রূপকথা রাহাতকে পছন্দ করে পারিবারিক ভাবে বিয়ে করে। এই ছেলেটার প্রতি রূপকথার ভালো লাগা হতে হলো, যে কি না দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার নিশ্চয়তা দিতে জানে না! যাইহোক, এটা মেয়েদের একটা দোষ। যে ছেলেটা তাদের সম্মানের সাথে ভালোবেসে নিজের করতে চায়, এরা তাকে অবহেলায় একটা জনম পার করাবে। শেষমেষ পড়তে হয় অসুন্দর মনের কাছে। অয়ন তাকে খুব ভালোবাসতো; ফুফাতো ভাই রূপকথার। কিন্তু ওরা পারিবারিক ভাবে কানাডা চলে যাওয়াতে আর যোগাযোগ হয়নি। তাতে একটা অধ্যায় হারিয়ে রাহাতের সাথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই রাহাতই কি না দেড় বছরের মাথায় অন্যের আকাশে সুখ বিলায়! সেই আকাশের জন্য রাহাত দেশে চাকরি না নিয়ে সুইজারল্যান্ডে চাকরি নেয় তার পাশে থাকার জন্য। আবার না ছাড়ছে রূপকথাকে পারিবারিক কিংবা সামাজিক ভয়ে। প্রিয় মানুষ অন্যের সুখে নিবিড় হয়ে থাকলে এভাবে কোনো মেয়ে সংসার করতে পারে! সবে তো তাদের পথচলা শুরু ছিলো।
সহ্য করা যায় না আবার ফেলে দেয়াও যাচ্ছে না, এমন সম্পর্ক থেকে রাহাতকে মুক্তি দিতে দু’জনই মধ্যস্থতা করে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়। তাছাড়া আর কি করা! প্রিয় মানুষটার পরোকীয়া দেখে সয়ে যাওয়া? সম্ভব না কারো পক্ষে। এরচেয়ে মৃত্যু ভালো। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আসার পর পরিপূর্ণ ডিভোর্সের আগে পর্যন্ত রূপকথাকে কথার তীরে বারবার বিদ্ধ করতে একটুও তার অনুশোচনা জাগেনি। ডিভোর্স পেপারে সই করে যখন রূপকথা বাইরে এক কোণে বসে ঝাপসা চোখে অন্ধকার দেখছিলো, রাহাত তখন সই করে হুট করে চলে যায়। দুই বছর সংসার করা মানুষটাকে বলে যাবার প্রয়োজন বোধটুকু জাগলো না। কতো ভালোবাসতো রূপকথা তাকে, এটা তার মূল্য! অথচ এই অসহায়ত্ব সময়ে একজন সরল মানুষের আবির্ভাব ঘটে। রূপকথা তার মনে স্বচ্ছতাও দেখতে পায়। কিন্তু কিছু করার নেই।
একা সব সামাল দিয়ে বাড়ি আসলো, পরিজনদের পরে জানালে শোকের মাতম কম বইবে ভেবে ধীরে জানানোর পরিকল্পনায় নিজেকে পাথর বানাবার চেষ্টা। এরপর চাচাতো বোন তিন্নির বিয়ের উপলক্ষে অয়নকে ফিরে পেলে, অয়নের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্তেও কিছু করার ছিলো না। কারণ রূপ কথা তো ডিভোর্সি মেয়ে। এই ডিভোর্সের গল্প তিন্নির বিয়ের আমেজ নষ্ট না হওয়ার জন্য আপাতত সময় আড়াল রাখতে চেয়ে সম্ভব হয়নি। এখন সমাজ তার বিপক্ষে। পুরো পৃথিবী নিষ্ঠুর হয়ে তাকে বারবার জখম করতে থাকে, গুটিকয়েক অংশ ব্যতীত। অয়ন সব প্রতিকূলতায় রূপকথার পাশে আপ্রাণ থেকে আপন করতে পারেনি।
নিশীকথার আবদারে রূপকথার প্রশান্তির জন্য ভ্রমণের পরিকল্পনায় কক্সবাজার আসা। এই সুবাদে মাস চারেক পর সেই সরল মানুষ তবুও’র মুখোমুখি হয়ে, তাকে পরিপূর্ণ সমর্পিত হতে দেখে রূপকথার সরে আসতে হলো। অপরাধ, সমাজের চোখে সে ডিভোর্সি অশুভ শক্তি। না পারে কাউকে ধরতে, না পারে রাহাতের অস্তিত্ব মুছতে। অজস্র যন্ত্রণা সয়ে সয়ে তবু বেঁধে রাখে মন।
মুহাম্মদ উমর ফরহাদ
বইঃ তবু বেঁধে রাখি মন
লেখকঃ Suhasini - সুহাসিনী
প্রচ্ছদঃ সাহাদাত হোসেন
প্রকাশনাঃ চন্দ্রভুক প্রকাশন
#বইরিভিউ