29/03/2024
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব (তিন)
বগুড়া থেকে মোংলা যাওয়ার দুটো পথ আছে। বাস আর ট্রেন। সরাসরি কোনো বাস মোংলা যায় না। বগুড়া থেকে যেতে হবে আরিচা ঘাটে। যমুনা নদী পার হয়ে ওপাড় থেকে আবার বাসে উঠতে হবে। আর ট্রেনে গেলে বাসে যেতে হবে সান্তাহার। সেখান থেকে ট্রেনে যেতে হবে খুলনা। খুলনা থেকে বাসে যেতে হবে মোংলা। আনোয়ার ট্রেনেই যাবে বলে ঠিক করে। সান্তাহারে রুপসা এক্সপ্রেস বেলা সাড়ে ১২টায়। আর বগুড়া থেকে সান্তাহারে বাস যেতে লাগবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। সে হিসাবে ট্রেন ধরতে হলে আনোয়ারকে সকাল ১০টার মধ্যে বাসে উঠতে হবে। সে কারণে সাত সকালে রাজ্জাক সাহেবের সাথে দেখা করতে আসা। যত তাড়াতাড়ি দেখা হবে ততই সময় পাওয়া যাবে। আনোয়ার রাজ্জাক সাহেবের দোকানে এলো সকাল সোয়া ৯টার দিকে।
-রিকশা থেকে নেমেই তিনি আনোয়ারকে দেখে বললেন, কি মিয়া রওনা দিলা নাকি?
- আনোয়ার মুছকি হেসে বলে, হ্যাঁ। আপনার সাথে দেখা করতে এলাম।
- তো কিভাবে যাবা মোংলা? পথ তো কম নয়। তোমাকে আগে যেতে হবে খুলনা। এরপর সেখান থেকে বাসে মোংলা।
- জি¦ খুলনাতেই যাচ্ছি ট্রেনে।
- ট্রেনে মানে সান্তাহার হয়ে?
-জি¦
রাজ্জাক সাহেব বুঝলেন যুবক তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছে। কিছুটা বিব্রতও মনে হচ্ছে তাকে।
তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, সরকারি চাকরি পাইলা। তাও আবার কাস্টমসের চাকরি। কাঁচা পয়সার কারবার। পাত্রী দেখা শুরু করেছি। সবকিছু মিললে তোমাকে খবর দিবো। আর ভুলে যেওনা কিন্তু। চিঠি লিখো, উত্তর দেই বা না দেই।
আনোয়ার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সেই সম্মতি চিঠির নাকি পাত্রীর খোঁজা তা বোঝা গেল না। বিদায়ের সময় রাজ্জাক সাহেবের পায়ে সালাম করতে গেল। অমনি রাজ্জাক সাহেব আনোয়ারকে বুকে টেনে নিলেন।
-আরে সালাম করতে হবে না। আমি কি আর সালাম পাওয়ার মতো অত দামি মানুষ? তুমি নতুন চাকরিতে যোগদান করতে যাচ্ছ। এটাই আমার জন্য বড় আনন্দের!
রাজ্জাক সাহেবকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলো আনোয়ার। বললো, আপনার ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারবো না। আপনি সহযোগিতা না করলে আমি চাকরি তো দুরে থাক, বগুড়া শহরেই বাস করতে পারতাম না। আমি সারাজীবন আপনার কথা মনে রাখবো।
আনোয়ারের কান্নায় রাজ্জাক সাহেবের চোখও ভিজে আসলো। কিছুক্ষণ কিছুই বলতে পারলেন না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, কাপড়চোপড় ঠিকমতো নিয়েছো তো? কাঁথা-বালিস?
-আনোয়ার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললো, কাপড়চোপড় নিয়েছি। কাঁথা বালিস লাগবে না। আমার বসের সাথে কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, কাঁথা বালিশ, মশারি-এগুলো সবই আছে পোর্টের কাস্টমস রেস্ট হাউজে। ওখানেই থাকবো আমি।
ছুটে চলেছে খুলনাগামী রকেট এক্সপ্রেস। দেশের উত্তর থেকে সোজা দক্ষিণে। বৃটিশরা বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেললাইন করেছিল উত্তর থেকে দক্ষিণে। সম্ভবত এই অঞ্চলে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য ভালো ছিল। সেটাকে আরও উন্নত করার জন্যই এই প্রয়াস। আনোয়ার বসেছেন জানালার পাশে। ট্রেনের জানালা দিয়ে অনেক দুরের গ্রাম দেখা যায়। গ্রামগুলো কেমন যেন ঘুরছে। মনে পড়লো ছোটবেলায় বাড়িতে যাওয়ার সময় রেললাইনের সমান্তরাল বিদ্যুতের খুঁটির সংখ্যা নিরুপণের খেলা খেলতেন ভাইবোনদের সাথে। সেই ভাইবোনরা আজ সাথে নেই। থাকলে আবার সেই ছোট বেলায় ফিরে যাওয়া যেতো। মাঝে মাঝে ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটার সিগন্যালে থামছে। তাতে যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে নানা রকম মন্তব্য করছে। ট্রেন চলন্ত অবস্থায়ও কেউ কেউ মন্তব্য করছেন কিন্তু বাতাসের শো শো শব্দে সেগুলো আনোয়ারের কানে আসছে না। তবে চলন্ত ট্রেনে হকারদের গলার তীব্র আওয়াজ কানে না এসে উপায় নেই। কেউ বিক্রি করছে বাদাম, চিপস, চানাচুর, সিগারেট, মোয়া, চকলেট আরও কতো কি! পুরো ট্রেন হিসাব করলে হকারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়ে যাবে। আনোয়ার মনে মনে ভাবে, এসব হকাররা ট্রেনের উপর ব্যবসা করে টাকা আয় করছে, অথচ রেল কর্র্তৃপক্ষ এদের কাছে থেকে একটি টাকাও পাচ্ছে না। বরং এরা সবাই ট্রেনে যাতায়াত করছে বিনা টিকিটে। একদিকে এরা যাত্রীদের বিরক্ত করছে, অন্যদিকে ট্রেনে বিনা পয়সায় ভ্রমণ ও ব্যবসা করছে। রেল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেই এদের বিনা পয়সায় ভ্রমণ বন্ধ করে যাত্রীদের একটু স্বস্তি দিতে পারে। অথবা এদের টিকিট বাধ্যতামূলক করে লোকসানের অঙ্ক কমাতে পারে।
(চলবে)