28/04/2026
𝗟𝗮𝗱𝗱𝗲𝗿 𝗼𝗿 𝗥𝗼𝗮𝗱
রেশমা
𝟮𝟲
আজ থেকে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। রাহাত সকালের নাস্তা শেষে শোবার ঘরের বিছানায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে।
নীলা দু’কাপ চা নিয়ে বসলো এক কাপ চা রাহাতকে এগিয়ে দিয়ে খবরের কাগজের বিশেষ পাতাটা হাতে নিল।
রাহাত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ওদের কী কী কিনতে হবে আজকে কিনি ।
নীলা বলল, আজকে?
তবে আবার কবে?
আগে বললে ভালো হত।
রাহাত কিছু বলল না।
নীলা আর কথা বাড়ালোনা। চা শেষ করে শাশুড়ির সাথে কথা বলে টুনির মাকে কাজ বুঝিয়ে দিল।
শপিং আরো কিছুটা বাকি কিন্তু রোদ রুবাব বিরক্ত শুরু করেছে। তারা আর ঘুরতে পারবেনা, বাসায় যাবে। রাহাত সবাইকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। বসার জায়গা নেই, একটু দাড়িয়ে থাকতেই একটা টেবিল ফাঁকা হলো। সঙ্গে সঙ্গেই তারা সেখানে বসে পড়ল।।টেবিল পরিষ্কারের কাজ চলছে রাহাত বাচ্চাদের বলল, যাও তোমরা ওদিকে গিয়ে দেখ কী খাবে? একটু পরে রোদ, রুবাব ফিরতেই ওয়েটার আসল। তারা নিজেদের পছন্দ জানিয়ে দিলে রাহাত মেনুটা নিয়ে বলল, ওগুলোর সাথে আমাদের জন্য এই ৭নং দুইটা আর চারটা কোল্ডড্রিংকস দিবেন।ওয়েটার ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, স্যার একটু অপেক্ষা করতে হবে। মিনিট কুড়ি লাগতে পারে।
রাহাত ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গিয়েছে। নীলা তার টুইন দুটোর সাথে খুনসুটিতে মেতে উঠল।
বাসায় ফিরতে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হল। রাহাত আসরের নামাজ শেষে বিছানায় হেলান দিয়ে টি.ভি. ছেড়ে বসল।
নীলা বাসায় এসেই নিচে শাশুড়ির রুমে গেল। দুপুরের খাবার পর ঔষুধ খেয়েছে কিনা জানতে । শাশুড়ি নীলাকে খুব পছন্দ করেন।
নীলা শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করল, মা টুনির মাকে দেখছিনা কই গেছে?
কই আর যাবে, বাগানে বোধহয়।
রোদ, রুবাবের রেস্টুরেন্টে ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। তাইতো দুজনকে নুডুলস দিয়ে রাহাতকে এককাপ চা দিয়ে ওয়াশরুমে গেল। আসরের ওয়াক্ত প্রায় শেষের দিকে সে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল তারপর দ্রুত ড্রেস চেঞ্জ করে অযু করে আসরের নামাজ পড়ে সোফায় বসলো।
সন্ধ্যার পর শাশুড়ির শাড়ির ব্যাগ নিয়ে নীলা নিচে নামল। টুনির মা নীলাকে দেখে বলল, ভাবী ভালোই হলো আমার আর উপরে উঠতে হলোনা খালাম্মা, বড় ভাবী ডাকছে আপনারে।
মা ঘরে নেই?
না। পোলাপানের চিল্লাচিল্লি শুনছেননা। ভাইজানও তো ওখানে আছে। বিরাট সুন্দর গরুদুটা। ছাগল দুইটাও দেখার মতো।
আমরা বাসাতে ছিলামনা মাকে একা রেখে কই গেছিলা?
বাগানের ঐ পশ্চিম দিকের দেওয়ালের ওপারে একটা এক তলা বাসা আছে ঐ বাসার বেডি যে কী দজ্জাল শাউর ননদরে তো দেখতেই পারেনা। আর সেই নিয়া ব্যাডার সাথে কয়দিন পর পর ঝগড়া। আজকে তো সেই ঝগড়া মারামারি। শাউরিডা মাটির মানুষ। ঔ ব্যাডা এই দুনিয়াই জাহান্নাম দেখা ফালাইছে বেডিডারে বিয়া কইরা।
মানুষের ব্যাডার খবর না নিয়ে নিজের ব্যাডার খবর নাও।
কী যে কন ভাবী, হেতো বেহেস্তয় আছে,হের কামতো খালি মুখে পান দিয়ে গেটে বসে থাকা।
বিয়ের আগেও মুখে পান দিয়ে গেটে থাকতো। তখন তো তুমি কাজ বাদ দিয়ে একটু পর পর খোঁজ নিতা।
তহন আর এহন কি এক। তখন তো আর টুনির মা আছিলাম না। তখন ছিলাম ফরিদা, ফরি।
সেও কি এখন মজনু থেকে টুনির বাপ হয়ে গেছে?
ফরিদাকে কিছু বলতে না দেখে নীলা আবার হেসে বলল, তোমাকে তো আর লাল নীল ফিতা দিয়ে দুই বেণী করতে দেখিনা। কালকে মনে করে আমার থেকে টাকা নিয়ে মজনুকে দিও তোমার জন্য লাল নীল ফিতা আনবে।
নীলা শাশুড়ির রুমে শাড়ির ব্যাগ রেখে বলল চল যাই। দুপুরের ভাত আছে? থাকলে গরুকে খাওয়ানোর বালতিটা বের করে নিয়ে আসো।
নীলার বাচ্চাদের আনন্দ দেখতে খুব মজা লাগছে। নীলার ও ইচ্ছে করছে বাচ্চাদের সাথে খেলতে। পাঁচ ভাইবোন মিলে চাঁদের আলোয় কানামাছি খেলছে। মাহিনকে চোখ বেঁধে বুড়ি বানিয়েছে। রাহাত মাহিনকে বলল, তুই এখনো বড় হবিনা। মাহিন সময়টা উপভোগ করছে তাইতো সে ছোট্ট করে বলল চাইলে তুমিও যোগ দিতে পার।
নীলা শায়লা দাড়িয়ে আছে। পাশে শাশুড়ি তার দুই ছেলে চেয়ারে বসে গল্প করছে। তাদের জন্যও চেয়ার দেওয়া আছে।
সাদাদ নীলাকে বলল, নীলা গরু ছাগল কেমন,পছন্দ হয়েছে?
নীলা বলল, জ্বী ভাই খুব ভালো হইছে। নীলা আরো বলল, মা, ভাবী গতবারের চেয়ে এবারের গুলা বেশি ভালো হয়েছেনা?
সাদাদ বলল, তোমার ভাবীও সেটাই বলছিল।
টুনির মা গরুর সামনে পানির বালতি রেখে নীলার পাশে দাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, সেজো ভাবী মজনু তো আর মজনু নেই, টুনির বাপ হইয়া গ্যাছে।
ফরিদার কথা শুনে নীলা শব্দ করে হেসে উঠল।
শায়লা বলল, কী হইছে রে নীলা। নীলা হাসিতে কিছু বলতে পারলোনা। ফরিদা আবার বলল, সত্যি ভাবী এই চার পাঁচ দিন আগে হেই টুনির জন্য চুরি ফিতা কিনছে। অবশ্য আমার জন্য সেন্ডেল আনছে।
নীলা বলল, সান্ডেল কেন?
হেই দেখছে আমি সেন্ডেলের ফিতা জোড়া দিয়া পরতেছি। তই ভাবী, হেই কিন্তু টুনির বাপ হইয়া ভালাই আছে। আমারে ভালাই খেয়াল রাহে,আদর যত্নে রাহে।
শায়লা টুনির মাকে বলল, টুনির মা কী সব বলছিস।
ফরিদা বলল, আপনারা আমাকে টুনির মা বললেই ভালো লাগে।
নীলা এক হাত মুখে দিয়ে অন্য হাতে শায়লাকে টেনে নিয়ে হাঁটতে লাগল।
রাতের খাবার শেষে সকালে কী কী করতে হবে টুনির মাকে বুঝিয়ে দিয়ে, শাশুড়ির আর কিছু লাগবে কিনা দেখে উপরে গেল। রোদ রুবাব সোফায় বসে টিভি দেখছে, নীলা টিভি বন্ধ করে দিল বলল, এখন ৯:৫০ তাড়াতাড়ি দুজন ফ্রেশ হয়ে ঘুমুতে যাও। রোদ বলল তুমি কি আমাদের সাথে একটু থাকতে পারবে তাহলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরব।
নীলা রুমে গিয়ে দেখল, রাহাত টিভি দেখছে, সে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে হেলান দিয়ে রাহাতের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে মাথা ম্যাসাজ করতে লাগল। রাহাতকে টিভি বন্ধ করে পাশ ফিরতে দেখে নীলা বলল, এখন ঘুমাবে নাকি?
হুম বলে রাহাত আরাম করে শরীরটা ছড়িয়ে দিল।
নীলা আরো মিনিট দশেক রাহাতের চুলে হাত বুলিয়ে রাহাতকে একটা আলতো চুমু দিয়ে ঘুমের চেষ্টা করতে লাগল।
নীলার ঘুম হঠাৎ ভেঙ্গে গেল তৃস্নায় গলা শুকিয়ে গেছে । এক অদ্ভুত স্বপ্ন তাকে জাগিয়েছে। দেখলো সে গোলকের ভিতরে ছুটছে, ছুটতে ছুটতে সে হাপিয়ে উঠছে, তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে যখনি গোলক থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে তখনি কিছু একটা টেনে তাকে বিত্তের কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে।
আজ সকালে নীলার ঘুম ভাঙলো অনেকটা বেলা হবার পর, ফজরের ওয়াক্ততে জাগা পায়নি। দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে সাত পেরিয়েছে রাহাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে এখনো ঘুমে। রাহাত হয়ত আজ ভোরে উঠতে পারেনি। রাহাত উঠলে শব্দে সে জেগে যেত । সে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে কোরআন তেলোয়াত করল। ইতিমধ্যে রাহাত উঠে পড়েছে। রাহাতের চেহারায় রাগ,বিরক্তি স্পষ্ট। রাহাত খুব সহজে তার অনুভূতি লুকাতে পারেনা, মুখের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট দেখা যায়। নীলা একটু বোঝার চেষ্টা করল কী হলো আবার? সে মনে মনে হেসে দিল। রাহাত কি ভাবছে সে স্মৃতিকর্তার কাছে তার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে।উহু সে এক আজব লোকের সাথে জুড়েছে। অন্যায় করবে সে আবার দুঃখী চেহারাও করে রাখবে সে আর সামলাতে হবে আমাকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল, এখন খাবে?
হু। তোমার ছেলেরা কই?
দ্যাখো হয়ত গরু ছাগলের সাথে বন্ধুত্ব করতেছে।
নীলা নিচ থেকে রান্না শেষে গোসল করতে রুমে ঢুকতেই রাহাত বলল, প্রেমে পড়েছো নাকি? তোমার প্রেমিক ফোন করেছিল।
নীলা থমকে দাড়ালো, প্রেমিক? মনে মনে বলল, তারতো একটা প্রেমিকের বড্ড প্রয়োজন।
ল্যান্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রাহাত বলল, তিন তিনবার ফোন করল, আমার কণ্ঠ শুনেই কেটে দেয়।
তাই বলে আমার প্রেমিক?
তাহলে কে ফোন দিচ্ছে?
যে কথা তুমিও বিশ্বাস করোনা, এমন কথা বলোনা প্লিজ। নীলা আর কোন কথা না বলে ওয়াশরুমে গেল। ঝরর্ণা ছেড়ে নীলা স্থির হয়ে ভিজতে লাগল।
মানুষের সামনে সৃষ্টিকর্তা দুটো পথই খোলা রেখেছেন, আবার তাকে যে কোন রাস্তায় চলার সামর্থ ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ চাইলেই সে ডুবে যেতে, স্রোতে ভেসে যেতে পারে। আবার সে চাইলেই স্রোতের বিপরীতে দাড়িয়েও নিজের পা দুটো দৃঢ রেখে সোজা, সঠিক পথে চলতে পারে।
নীলা রাহাতকে ভালো করেই বুঝতে পারে, অনুভবও করতে পারে তার অনুভূতিগুলো। তবে রাহাত কি সেটা বুঝে? আলহামদুলিল্লাহ, সৃষ্টিকর্তার সমস্ত পরিকল্পনাই নিখুঁত। যতক্ষণ জীবনটাকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব হয় ততক্ষন জীবনটা সত্যিই সুন্দর। রাহাত আসলে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। প্রকৃতি শূন্যতাকে পছন্দ করে না। সে তো প্রেমে পড়েছেই, আরো গভীরভাবেই সে ইসকে জড়াতে চায়, তবে মাঝে মাঝে প্রেমে ভাটা পরে। আবার মাঝেমাঝে মনে হয় সম্ভব না, এতো ভার নিয়ে শিকল পরে এখানে থেকে ইসক ধরে রাখা অসম্ভব। নিজের অধিকার ভুলে বা ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন করা অনেক কঠিন, কষ্টকর। তাঁর কাছে এক নাম্বার চাওয়া এটাই, তাঁর সাথে প্রেমে ভাটা পড়ুক আর যাইহোক শেষটা যেন গভীর ইসকের সাথেই হয় আর খুশিতে নতুন পথের যাত্রা শুরু করতে পারে ।
দুপুরে খেয়ে রাহাত নীলা বিশ্রাম নিচ্ছে নীলা পাশ ফিরে রাহাতকে বলল, শোন বিকেলে তুমি কোথাও যাবে?
কেন?
গাড়ি থাকলে আমাদের বাসায় যাব ভাবছি, রাতেই ফিরব।
তোমার ছেলেরা কি যাবে?
ওদেরকে নিবোনা, একাই যাব। আর মনে হয়না ওরা গরু ছাগল ছেড়ে যাবে।
কয়টার দিকে যাবে?
এই ঘন্টাখানিক পর।
ঠিক আছে তাহলে একটু রেস্ট নিই।
নীলা রেডি হয়ে রাহাতকে বলল, এই আমি গেলাম।
রাহাত আরামোড়া ভেঙ্গে উঠতে উঠতে বলল, দশ মিনিট দাড়াও।
নীলা বলল, তোমাকে যেতে হবেনা, বেশি রাত করব না, তাড়াতাড়ি ফিরব ।
রাহাত বলল, এবার ড্রেস কিনবেনা?
নীলা বলল,গত ঈদের সবগুলো এখনো পরা হয়নি। দুইটা নতুন শাড়ি,একটা থ্রিপিচ আছে। অপ্রয়োজনীয় কোন কিছুরই আমার প্রয়োজন নেই রাহাত।
রাহাত উঠতে উঠতে বলল, দশ মিনিট।
নীলা ভালো করেই জানে সে ড্রেস না কিনলেও রাহাত তার সাথেই যাবে। উহু যন্ত্রনা, নীলা তার যন্ত্রনাকে সঠিক সংজ্ঞাই সংজ্ঞাইতো করতেই পারেনা। কখনো তা পাহাড়ের মতো ভার, কখনো তা অস্থিরতার, কখনো তা অস্বস্তির, কখনো তা একটু উষ্ণতার, কখনো তা তিক্ততার আবার কখনো তা মধুময়।
চলবে…………….