06/11/2022
আমরা যে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার এবং সমাজে বেড়ে উঠে এখনো জীবন-যাপন করছি তার অনেক রং, রস ও রূপ রয়েছে। এসবের অন্যতম একটি হলো ঘরের কর্তার মাইনের টাকা বা সারা মাসের উপার্জন।
এই টাকাটা সাধারণত তিন পদ্ধতিতে বণ্টন ও ব্যয় করা হয়।
১. কর্তা মাসের সব বাজার বাকিতে করেন। বেতন পেয়ে সামান্য হাতখরচা রেখে বাকি সব টাকা মুদি দোকান, সবজিওয়ালা, ফার্মেসি, দুধওয়ালা আর ভাড়া ও বিল-বাট্টায় বিলিয়ে দিয়ে বসে থাকেন। এতে বাকির খাতা একটু একটু করে লম্বা হয়। বছর শেষে বোনাস আর এদিক-ওদিকের বাড়তি কিছু আয় দিয়ে তা শেষ করতে হয়।
২. কর্তা সব টাকা নিজের পকেটে রাখেন। বাসার যখন যা লাগে, এনে দেন। বাসার লোকজন তার আয়-রোজগার, ব্যয়ের পরিমাণ আর চলমান অবস্থা সম্পর্কে তেমন খোঁজখবর রাখে না। রাখতে চায়ও না। তারা শুধু তাদের প্রয়োজনটুকু জানান দিয়ে অপেক্ষায় থাকে।
৩. কর্তা তার নিজের হাতখরচা রেখে বাকিটা গিন্নির হাতে তুলে দেন। গিন্নি মাথা খাটিয়ে সেই টাকায় মাস পার করেন। এ ক্ষেত্রে কর্তার চেয়ে গিন্নির টেনশনটা থাকে বেশি।
এবার আসি আমার অভিজ্ঞতায়।
মোটামুটি বুঝ হওয়ার পর একটা সময়ে এসে খেয়াল করলাম, আব্বা তার উপার্জনের সব টাকা আম্মার হাতে তুলে দিচ্ছেন। প্রতিদিন বাজারে যাওয়ার সময় আম্মার কাছ থেকে বাজারের লিস্ট আর টাকা নিয়ে যান। বাজার শেষে ঘরে ফিরে হিসেব করে বাকি টাকা ফিরিয়ে দেন।
আমাদের বাসায় এখনো আমার দুই ভাই মাসের আয়-উপার্জন থেকে ব্যক্তিগত হাতখরচের টাকা রেখে বাকিটা আম্মার হাতে তুলে দেন। আমি আলাদা ও দূরে থাকি বলে এই নিয়মের বাইরে আছি।
তবে বাসায় আমি বউয়ের হাতে টাকা-পয়সা তুলে দিই না। চাইলে দিই।
ছোটকালে আব্বার সবকিছুই আমার ভালো লাগলেও এই বিষয়টা ভালো লাগত না। চিন্তা করতাম, পুরুষ মানুষ টাকা কামাবে, পকেটে নিয়া ঘুরবে, একাউন্টে রাখবে, খরচ করবে। বউয়ের হাতে টাকা দিতে যাবে কেন? বউকে হিসাব দিতে যাবে কেন?
কিন্তু চল্লিশ বসন্তের দোরগোড়ায় এসে বাপজানের সেই সিদ্ধান্তকে এখন বড় বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছে।
যখন উপার্জনের টাকা নিজের পকেটে থাকে তখন বাসার লোকজনের কাছে মাসের শুরু আর শেষ বলে কিছু থাকে না। ব্যাপারটা অনেকটা ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন' পর্যায়ে চলে যায়। যখন তখন ফোন করে বলবে, আসার সময় এইটা নিয়া আইসেন। ছেলে ফোন করবে, মেয়ে ফোন করবে। এটা-ওটা লাগবে। এনে দিতে হবে। কীভাবে আসবে তা জানার দরকার নেই। আর বড় কিছু হলে আগে মায়ের কানে দেবে। মা এসে বাপের কানে দেবে। টাকা নেই বললে বলবে, ‘আমরা চাইলেই আপনার টাকা শেষ হয়ে যায়!”
আর আব্বা যখন আম্মার হাতে টাকা তুলে দিত। তখন আম্মার সামনে পুরো মাস টেনে নেয়ার চিন্তা থাকত। কোথায় খরচ না করলেই নয়, কোন জিনিসটা এ মাসে না হলেও চলে, কার কোন আবদার পূরণযোগ্য তা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে আগাত।
আমি বলছি না, আপনারা বউয়ের হাতে টাকা তুলে দিন। এসব ব্যাপার একেক পরিবারে একেক রকম ফলাফল বয়ে আনে।
আমার বলার উদ্দেশ্য হলো সীমিত আয়ে সংসার চালাতে চাইলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। এখন আপনার মা বা বউ যদি মধ্যবিত্তের সংগ্রাম দেখে উঠে আসে, তাহলে মাইনের টাকা ওনার হাতে তুলে দেয়া যেতেই পারে।
তবে কেউ যদি মনে করেন, বউয়ের হাতে টাকা তুলে দিলে সংসারে নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়বেন তাহলে এই পথে পা বাড়ানোর চিন্তা না করাই ভালো।
বি. দ্র. এই লেখা আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনের জন্য। আপনার মতো উচ্চ বা উচ্চ মধ্যবিত্তের জন্য নয়।
বই: গল্প কল্প চিন্তা
লেখক: আহমাদ ইউসুফ শরীফ
Sanchalan Prokashoni - সঞ্চালন প্রকাশনী