02/07/2026
আয়িশাকে বোর্ডিং এর খাবারে দিয়েছি প্রায় দেড় মাস হলো। দুপুরের খাবার দিয়েই দিতাম। একদিন ও হঠাৎ বললো, আম্মু আমি বোর্ডিং এর খাবার খাবো। সাধারণত বাচ্চারা হঠাৎ করেই অহেতুক কথা বলে না। এই কথা বলার পেছনেও কোনো কারণ তো থাকতেই পারে। তাছাড়া সেখানে হাইজেন কেমন মেইনটেইন হয়, লাইনে প্লেট নিয়ে দাড়িয়ে ও আদৌ খাবার নিতে পারবে কিনা, সেটা ক্যারি করে ২ তলা নীচে নেমে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে একা খেতে পারবে কিনা- এসব ভেবে বললাম, আচ্ছা তবে এখন না.… কয়েকদিন পর থেকে খেও!
এরপর ২-৩ দিন পার হয়ে গেলে ও আবার বললো, সবাই মজা করে খায়, আমিও খাবো, প্লিজ আমাকে বাসা থেকে খাবার দিও না। ওর এমন আগ্রহ দেখে আমি ওর বাবাকে জানালাম যে মেয়ে তো চাচ্ছে মাদ্রাসার বোর্ডিং এর খানা খেতে। আপনার কি মনে হয়? দিবো নাকি? ওর বাবা বললেন, ওর আগ্রহ থাকলে দিতে পারো।
আমিও ভাবলাম আরেকটু।
এই যে একটা প্লেট নিয়ে লাইনে দাড়াবে, ভাত যতটুকু দিবে খেতে হবে নষ্ট করা যাবে না, তরকারি পছন্দের নাও হতে পারে কিন্তু খেতে হবে, নিজেকে নিজে সার্ভ করতে হবে, কিচেন থেকে ২য় তলা নীচে নেমে যেতে হবে ক্যান্টিনে, সেখানে জায়গা না পেলে সাথে নিয়ে যাওয়া জায়নামাজ বিছিয়ে ক্লাসের ফ্লোরে বসে খেতে হবে, সময়ের ভিতর খেয়ে শেষ করতে হবে, খাওয়া শেষে নিজের প্লেট নিজে ধুয়ে ফেলতে হবে, তারপর তা ব্যাগেও রাখতে হবে! শুধু তাই না, ময়লা হলে সেটাও নিজেকে ক্লিন করতে হবে।
আরও কিছু বিষয় আছে! আয়িশা আসিয়া যে মাদ্রাসায় দিয়েছি সেটার মুহতামিমা থেকে শুরু করে গেটেকিপারও মহিলা। পুরো মাদ্রাসা পর্দাবৃত, আলহামদুলিল্লাহ, একটা পুরুষ মানুষ নাই! সব শ্রেণীর পরিবারের মেয়েরা ওখানে পড়ে। আমার খাদেমা খালার মেয়েও ওখানেই পড়ে। ওরা একসাথে বসে একই খানা খায়, একই পড়ার টেবিল শেয়ার করে। যেহেতু পুরো মাদ্রাসা পর্দাবৃত সেহেতু বাতাস যাতায়াত কম ই হয়। দুপুরের খানার পর স্বাভাবিকভাবে মাদ্রাসা অপরিষ্কার হয়ে যায়৷ কিন্তু বোর্ডিং এর খানা খেলে ছাত্রীদের তা মিলেমিশে পরিষ্কার করতে হয়। এসি নেই ওখানে অবশ্যই! তাই এসব কাজ করতে গেলে ওর গরম লেগে যাবে, এমনিও গরমে ঘামতেই থাকে৷ আরও গরম লাগবে, ঘেমে শেষ হয়ে যাবে! জেনারেটর ও নেই! কারেন্ট যায় দিনে ১০ বার৷ তখন ফ্যান থাকে টোটালি অফ! এর ভিতর হিজাব খোলা যাবে না কোনোভাবেই!
বেশকিছুক্ষণ ভাবার পর মনের ভিতর থেকে কে যেনো বলে উঠলো, ❝তো??? তো কি হয়েছে...?!❞
নিজেকে সার্ভ করবে, ময়লা ক্লিন করবে, সব শ্রেণীর বাচ্চাদের সাথে খাবে, মাছ খাবো না শাক খাবো না ভাজি খাবো না শুধু মুরগি খাবো.. এটা বলার সুযোগ নাই!!- তো কি হয়েছে??
প্লেট হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খানা নিতে হবে- তো?? তো কি হয়েছে??
খানা শেষ সবার সাথে ক্লিনিং করতে হবে!!- এন্ড!?! সো হেয়াট??
আসলেই তো?? সো হোয়াট??
জীবনে অনেক শিক্ষার ই দরকার আছে৷ আমি যেটা বাসার বসে শেখাতে গেলে বেগ পেতে হবে, হতে পারে ও বোর্ডিং এ খেলে সেগুলো তালে তালে শিখে যাবে। আরও অনেক আদব কায়দা রপ্ত করবে। ওখানে লুতুপুতু করার কেউ নাই! মাছ খাও না??- তাহলে শুধু ডাল দিয়ে খাও! - একথা মা বলতে পারবে না কিন্তু মাদ্রাসা থেকে ঠিকই বলতে পারবে! আর অনেক ভেবে বুঝলাম, আমি চাই ও এই বাস্তবতা ফেস করুন!
আমি চাই ওর নিজের করা ময়লা ক্লিন করুক, আরেকজনের করা ময়লাও ক্লিন করার মানসিকতা ক্যারি করুক, ক্লিন করতে গিয়ে ওর গরম লাগুক, ও ঘেমে যাক... কারণ এটাই তো জীবনের বাস্তবতা। আমি চাই ও প্লেট হাতে নিয়ে লম্বা লাইনে দাড়িয়ে থেকে দেখুক যে ওর পছন্দের তরকারি আজ রান্না হয়নি... তারপর ওর মন খারাপ হোক, তবুও শুধু ডাল দিয়েই ও খেয়ে উঠুক আর আলহামদুলিল্লাহ বলার সুযোগ পাক। কারণ কোটি কোটি মানুষ এর চেয়ে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জীবন চালাচ্ছে আর তারপরও আল্লাহ থেকে নিরাশ হয়নি!
আমি মা, বাসায় আসলে আমি তো লুতুপুতু করবোই! ও বাসায় ফিরলে সবচেয়ে আগে আমি আমার সব কাজ বাদ দিয়ে ওকে জিগেস করি, মা তোমার আজ কম কষ্ট হয়েছে নাকি বেশি??
ও আমাকে কি বলে জানেন??- বলে, আম্মু... কষ্ট হইসে কিন্তু ইটস ওকে!
এই কষ্ট হবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই মেনে নিতে হবে- আমি ওর মা হিসেবে এটাই চাই! অনেক তরবিয়ত অনেক আদব শুধুমাত্র বাসাতে হয় না। ওদের মাদ্রাসার বেতন ৫০০ টাকা৷ বেতন শুনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন হাইফাই কোথাও আমার বাচ্চাকে আমি দিই নাই!
আমি জীবনে অনেক কিছুই শিখিনি। আমি চাই তা সবই আফিয়াত আর কল্যাণের সাথে আমার আল্লাহ আমার সন্তানের সবচেয়ে উত্তম অভিভাবক.... ওকে শেখার তাওফিক দিন।
অন্যথায়... হাফেজা আলেমা হবে, পর্দা করবে.... আমার সন্তানদের শারয়ী জীবনের জন্য শুধু এটুক ই আমার লক্ষ্য নয়। ওদের জন্য আমার লক্ষ্য আরও বিষদ... আরও বিস্তর! ইন শা আল্লাহ, ওয়ামা তাওফিকিয়া ইল্লা বিল্লাহ!
দুয়ার মুহতাজ!
✍️ নূর উইদিন || Noor Within