15/06/2023
বুক রিভিউ দ্য প্রফেট
মুল : লেজলি হ্যাজেলটন
ভাষান্তর : আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ
লেজলি হ্যাজেলটন একজন অ্যাগনস্টিক ইহুদী। অ্যাগনস্টিক শব্দের অর্থ হচ্ছে অজ্ঞেয়বাদী। অর্থাৎ যারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত না। এই তথ্য শোনার পরেই যেকোনো মুসলমানের মনে হতে পারে, এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একে ইহুদী, তার উপর অ্যাগনস্টিক, তিনি যখন রাসুল (সা) এর জীবনী লিখবেন, সেই জীবনী কি পড়া উচিত হবে? সেখানে তো নিশ্চয়ই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মিশ্রণ থাকবে, থাকবে ইহুদী দৃষ্টিভঙ্গি!
কিন্তু বইটি পড়লে বোঝা যায়, এই সন্দেহ পুরাই অমূলক। লেজলি হ্যাজেলটন এমনভাবে রাসুল (সা)-এর জীবনী তুলে ধরেছেন, অল্প কিছু জায়গা বাদে অধিকাংশ সময় পাঠকের মনেই হবে না যে তিনি ভিন্নধর্মী বা সংশয়বাদী কারো লেখা পড়ছেন।
যেমন ধরা যাক রাসুল (সা)-এর নবুওয়্যাত প্রাপ্তির ঘটনাটি। ব্যক্তিগতভাবে লেজলি নিজে যা-ই বিশ্বাস করুন না কেন, বইয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন, সেদিন রাসুল (সা) ওহী লাভের যে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছেন, তা মিথ্যা হতে পারে না। তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য।
বইটির ভেতরেও তার এরকম মন্তব্য বার বার উঠে এসেছে, যেখানে তিনি রাসুল (সা)-এর বক্তব্যকে দ্বিধাহীনভাবে সত্য বলে রায় দিয়েছেন। আর দশজন পশ্চিমা লেখকের বিপরীতে গিয়ে রাসুল (সা)-কে তিনি তুলে ধরেছেন একজন সৎ, ধর্মপ্রাণ, সকলের শ্রদ্ধাভাজন মানুষ এবং নেতা হিসেবে।
ইউরোপ-আমেরিকার ওরিয়েন্টালিস্ট ইতিহাসবিদগণ যেভাবে আধুনিক পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থার আলোকে ইসলামকে এবং রাসুল (সা)-কে বিচার করে, তার কঠোর সমালোচনা করেছেন লেজলি। এবং সেটা করতে গিয়ে তিনি রাসুল (স)-এর বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, একের পর এক যুদ্ধ, একাধিক বিয়ে, নয় বছর বয়সী আয়েশা (রা)-কে বিয়েসহ এমন সব বিষয়কে সমর্থন জানিয়েছেন এবং সেগুলোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন, যেগুলো এমনিতে অন্যান্য পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের ইসলামবিরোধিতার প্রধান অস্ত্র।
লেজলির বইয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে থেকে মানবিকভাবে রাসুল (সা)-কে দেখার চেষ্টা করেছেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাসুল (সা) এর মানসিক অবস্থা কীরকম ছিল, কোনো ঘটনায় তার অনুভূতি কীরকম ছিল, সেগুলো অনুমান করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া রাসুল (সা)-এর সাথে মক্কার কুরাইশদের যে দ্বন্দ্ব, সেটাকেও তিনি নিছক ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখিয়ে বরং মক্কার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিচারে তুলে ধরেছেন, যেই দৃষ্টিভঙ্গিটা অন্যান্য জীবনীকারদের লেখায় খুব বেশি উঠে আসে না।
তবে লেজলি হ্যাজেলটনের লেখা পুরোপুরি ত্রুটিমুক্তও নয়। বইটিকে ঠিক সিরাত গ্রন্থ বলা যায় না। এটা বরং এক ভিন্নধর্মের অনুসারী এক পর্যটকের মুগ্ধ দৃষ্টিতে উঠে আসা ইসলামের নবীর জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। বইয়ে কিছু কিছু ঘটনার বর্ণনা সুন্নি ইসলামিক সিরাত গ্রন্থগুলোতে যেভাবে এসেছে, তার চেয়ে একটু ভিন্নভাবে এসেছে। কেউ যদি এর আগে রাসুল (সা)-এর কোনো জীবনী না পড়ে থাকেন, তাহলে তার জন্য এই বইটি না পড়াই ভালো হবে। কিন্তু যদি ইসলামের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে কারও পরিষ্কার ধারণা থাকে, এবং অন্তত একটি সিরাত গ্রন্থ পরিপূর্ণভাবে পড়া থাকে, তাহলে একজন বিধর্মীও যে রাসুল (সা)-এর জীবনকে কত মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে পারেন, সেটা জানার জন্য হলেও এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।