02/11/2020
বইঃ আমার মা'র বাপের বাড়ি
লেখকঃ রানী চন্দ (১৯১২-১৯৯৭)
নদীর ঘাটের কাছে/ নৌকো বাঁধা আছে/ নাইতে যখন যাই/ দেখি সে জলের ঢেউয়ে নাচে…’ এমনি হারানো স্মৃতির ঢেউয়ে পা ডুবিয়ে আনমনে বসে রানী বলেন হারানো স্বাদের বেড়াতে যাওয়ার গল্প। রানীর গল্পে নারী আছে, আছে খুকি… আর আছে খুকির চোখের অনাবিল দৃষ্টি, নিরন্তর মেখে নেওয়া ভালোবাসার স্নিগ্ধ আশ্রয়। সে লেখায় তত্ত্ব নেই, জিজ্ঞাসা নেই, প্রতিবাদ নেই, বিশ শতক নেই, বিশ্বযুদ্ধের হাহাকার নেই...আছে শান্তি, আছে বেড়ানোর ছলাৎ-ছল্ আনন্দময় মধুস্মৃতি। রানী – শ্রীমতী রানী চন্দ (১৯১২-১৯৯৭)। রবীন্দ্র এবং অবনীন্দ্র স্নেহধন্যা রানী তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন মায়ের কথা বলতে, মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া ছোট্ট গ্রাম গঙ্গাধর খোলার (যা পরে গঙ্গাধরপুর হয়ে ওঠে) অকিঞ্চিৎকর জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রবহমানতার কথা বলতে।
রানী অনেক বেড়িয়েছেন, পূর্বকালে-উত্তরকালে তাঁর ভ্রমণ রত্নখচিত পেটিকার অব্যর্থ সন্ধান। স্বামী শ্রীঅনিল চন্দের সঙ্গে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, শান্তিনিকেতনের নাচের দলের সঙ্গে, স্বামীর অনুমতির পরোয়া না করে জেল-ভ্রমণের ঘন রোমাঞ্চ কাহিনি, স্বামীর মৃত্যুর পর একা, অথচ কোন না কোন দলের সঙ্গী হয়ে বেরিয়ে বেড়ানোর সর্ষে তাঁকে অনবরত চালিত করেছে ভারতবর্ষের পথে-ঘাটে, আর পাঠক পেয়েছেন পরম রসের আস্বাদ, এ কেবলমাত্র বাঙালি পাঠকের কপালগুণ। রানীর ভ্রমণের সেই সব স্তরভেদ শুরু হওয়ার আগের এই সর্বপ্রথম ভ্রমণস্মৃতি নিয়েই এই সংখ্যার রানী-চারণ। সদ্যবিধবা অল্পবয়সী মায়ের সঙ্গে, মামাদের সঙ্গে নৌকোয় চড়ে যাওয়া “আমার মা’র বাপের বাড়ি’’ (১৯৭৭, বিশ্বভারতী)। ছোট্ট রানীর ছোট্ট ছোট্ট দেখা প্রায় পঞ্চাশ বছর পর বই লেখার সময় নীল আকাশের মতো বড় হয়ে উঠেছে।
রানীর জন্ম ১৯১২-য়। বাবা পুলিশকর্মী কুলচন্দ্র দে-র মৃত্যু ১৯১৬-য়, অর্থাৎ রানীর চার বছর বয়সে; তারপর মা নাবালক সন্তানদের নিয়ে উঠে এলেন ঢাকা শহরের একপ্রান্তে গেণ্ডারিয়ায় ‘আমগাছওয়ালা বাড়ি’ তে। রানীর সবচেয়ে বড় দাদা, পরবর্তী কালের বিখ্যাত শিল্পী মুকুল দে তখন বিলেতে। ঢাকার ‘ইডেন হাই স্কুল’-এর ছাত্রী পাঁচ বছর বয়সী রানী স্কুলের লম্বা গরমের আর পুজোর ছুটিতে মা, দিদি, শিশু ভাই আর দুই বড় দাদার সঙ্গে যান মামারবাড়িতে, আনন্দে আর উত্তেজনায় অস্থির ছোট্ট মন কেবলি আঙুল গুনতে মগ্ন, ঠিক তারপরেই, “মামাদের একজন আসেন আমাদের নিয়ে যেতে। বুড়িগঙ্গার ঘাটে সারি সারি নৌকো বাঁধা—এক মাল্লাই, দো মাল্লাই, তিন মাল্লাই, চার মাল্লাই—। যত মাল্লাই নৌকো ততজন মাঝি থাকে তাতে। আকারেও বড় হয় সেই অনুপাতে। …পরদিন ভোর না হতে ঘোড়ার গাড়িতে করে সবাই বুড়িগঙ্গার ঘাটে এসে উপস্থিত হই। মালপত্র ওঠাবার আগেই আমরা ঝাঁপাঝাঁপি শুরু করে দিই নৌকোয় উঠতে।…’’
এরপর পথ…বাংলাদেশের কোমল জলপথ বালিকার সমস্ত মনোযোগ টেনে রাখে। উত্তাল ধলেশ্বরী নদীতে নৌকো ঢুকলে সবার মনের উচাটন ভয় রানীর উৎসুক মনকে নিবিষ্ট করে তার মায়ের কার্যকলাপ দেখতে “মা চোখ বুজে শুয়ে থেকে থেকেই বলে ওঠেন--“ধলেশ্বরী আইলো নাকি ও—ও মাঝিভাই?” ধলেশ্বরী এসেছে শুনে মা দু' চোখ টিপে বালিশের ভিতর মাথাটা আরো গুঁজে দেন; ‘রাম’ নাম নেন।’’ তারও অনেক পরে আসে শান্তধারা, সেখানে নদীর চরে নেমে মায়ের হাতে বানানো লুচি আলুরদম হালুয়ার স্বাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় অর্ধশতবর্ষ পরে লিখতে বসা মা-হারানো রানীর বোবাকান্নার মুক্তবাতাস। এই লেখায় তিনি ‘পূর্ণশশী’ মাকে পান, পান মায়ের মেয়েবেলার গল্প, মায়ের শিল্পীসত্তার সান্নিধ্য। মায়ের সমস্ত বিশিষ্টতার সঙ্গে উঠে আসে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া গ্রামজীবনের শুধু স্নিগ্ধ নয় স্মৃতিকাজল মাখা ছবি। রবীন্দ্রনাথ রানীকে বলেছিলেন, “গ্রামের ভালোর দিকটা যেমন আছে খারাপ দিকও আছে। খারাপ দিকটা বাদ দিয়ে যা সুন্দর--সেইটুকুই শুধু ছবির মতো ফুটিয়ে তুলবি। গ্রামের জীবন তো আর পাবি না ফিরে।...”
কভারঃ হার্ডকভার
পৃষ্ঠাঃ ১২৮
দামঃ ১৮০ টাকা
বইটি কিনতে ইনবক্স/কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।