16/02/2022
মান্ডালা আর্ট - পর্ব ৩
-কেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা মান্ডালা তৈরি করেন
মান্ডালা মেডিটেশনের জন্য মনকে কেন্দ্রীভূত করে। একই প্যাটার্নে মনকে কেন্দ্রীভূত করতে করতে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়, যখন এর বাইরে আর কোনো ভাবনা মনে প্রবেশ করতে পারে না। মান্ডালাকে মনের মধ্যে এমনভাবে গেঁথে নেওয়া হয়, যেন এর প্রতিটা খুঁটিনাটি মনের মধ্যে যখন ইচ্ছা তখন বিশ্লেষণ করা যায়। মান্ডালার মধ্যে নিজের সত্তাকে একীভূত করে ফেলা হয়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ভাষ্যে, মান্ডালা তান্ত্রিক যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নবিশ সন্ন্যাসীদের শেখানো হয়, মান্ডালা কীভাবে আঁকতে হবে, কীভাবে মননে উপস্থাপন করতে হবে এবং আচার-অনুষ্ঠানের সময় কখন কোন মন্ত্র জপ করতে হবে।
তারা মান্ডালাকে বিশুদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করেন। তারা বিশ্বাস করেন এই বিশুদ্ধতাকে মননে ধারণ করতে পারলেই নিজেকে শুদ্ধ করে মোক্ষ লাভের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানুষ যেমন বাইরের জগৎ থেকে নানানভাবে বিভ্রান্ত হয়, তার মনও তার মধ্যে নানারকমের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আর এই বিভ্রান্তি থেকে মননকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। কিছু কিছু তান্ত্রিক মান্ডালায় পার্থিব জগৎ থেকে সুরক্ষা ও বিচ্ছিন্নতাকে বিমূর্তভাবে চিত্রায়িত করা হয় চারটি আবরণী চক্রের মাধ্যমে- অগ্নি চক্র, বজ্র চক্র, অষ্ট মন্দির চক্র এবং পদ্ম চক্র। অর্থাৎ, জ্ঞান, বিশ্লেষণ, প্রয়োগ এবং মুক্তি। এই চার চক্রের মাধ্যমে সব বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব বলেই তারা মানেন। বাহ্যিক আচার এবং আত্মিক সাধনাকে একক অবিচ্ছেদ্য পরিপূর্ণতায় আনার জন্য মান্ডালার গুরুত্ব তাদের কাছে অপরিসীম। এই চার চক্রের মাঝখানে নানা রকমের চতুর্ভুজ এবং বৃত্ত সন্নিবেশিত করে এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান সৃষ্টি করা হয়, যেখান থেকে সাধক বুদ্ধত্ব লাভের পথে এগিয়ে যাবে। তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতবাদের আচার মান্ডালার ওপরে অনেকাংশেই নির্ভর করে। এমনকি যেখানে বস্তুগত মান্ডালা উপস্থাপন করা হয় না, সেখানেও মননের মাঝে মান্ডালা সৃষ্টি করাই একজন সাধকের ধ্যানের পদ্ধতি। তিব্বতি বৌদ্ধরা আবার মান্ডালাকে বিশ্বজগতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাদের মান্ডালার প্রতিটা খুঁটিনাটি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করে এবং আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে।
এমনকি একই প্রতীকের একাধিক অর্থও হতে পারে। তান্ত্রিক বৌদ্ধদের মান্ডালা যেখানে পার্থিব জগৎ থেকে মুক্তিলাভ করে বোধিলাভের কথা বলে, তিব্বতি মান্ডালা সেখানে বিশ্বজগতের মাছে বিলীন হওয়ার পথ দেখায়। বজ্রযান মতাবলম্বীরা তন্ত্রসাধনা শুরুর আগে একজন নবিশ সাধককে দিয়ে দশ হাজারের বেশি মান্ডালা আঁকিয়ে থাকেন।
আঁকা শেষে বালু দিয়ে তৈরি এই মান্ডালা আবার মুছে ফেলা হয়। মহাবিশ্বের কোনো কিছুই চিরন্তন নয় এই বোধ হয় থেকে তৈরি হয় বালুর তৈরি এই মান্ডালা। আবার এত কষ্ট করে তৈরি করা এই মান্ডালা মুছে ফেলার মধ্য দিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয় দুঃখ নিরাময় পদ্ধতি হবে বালুর মতোন। বালু যেমন কোনো আকৃতি ধারণ করে না, মনও হবে সে রকম। কোনো দুঃখই চিরস্থায়ী হবে না মননে।