01/02/2023
#পথের_গল্প বইয়ের কিছু অংশ 😍😍😍
#হারিয়ে_যাবার_গল্প:
🙂গল্পটা কীভাবে বলব কিংবা বললেও লোকে বিশ্বাস করবে কি না ঠিক
বুঝতে পারছি না। সত্যি কথা বলতে কি প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হবার পরেও
আমার নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে এমন কিছু সত্যিই ঘটেছে!
নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগছে!😅
গত প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে হাজার বছরের পুরানো ভাইকিংদের সভ্যতার
নিদর্শন, রেনেসাঁ যুগের ক্যাসেল, পৃথি বী বিখ্যাত ড্যানিশ কুকি বানাবার
ছোট্ট কারখানা, গরুর ফার্ম, চিজ-পনির বানাবার পদ্ধতি আর অসম্ভব
সুন্দর নরডিক প্রকৃতি দেখে যখন মনপ্রাণ ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে,
তখন কে জানত সৃষ্টি কর্তা আমার জন্য এই সফরের সেরা সারপ্রাইজটা
তখনো তুলে রেখেছিলেন হঠাৎই উপহার দেবেন বলে!
অফিসের কাজে ডেনমার্ক এসেছি। এই প্রথমবার আসা। দিন দশেকের
প্রোগ্রাম। উইকএন্ড কাটিয়ে কোপেনহেগেন থেকে গতকাল রোববার
আবার ফিরছিলাম ‘অরহুস’ শহরে। সোমবার হেড অফিসে কয়েকটা মিটিং করে এ যাত্রা ডেনমার্কট্রিপের ইতি টানা হবে। দুপুরে কোপেনহেগেনের সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে অরহুসের দেড়টার ট্রেনের টিকেট কাটলাম। তখন কেবল সোয়া বারোটা বাজে, ইনফরমেশন থেকে বলল সাড়ে বারোটায় অরহুসের দিকে একটা ট্রেন যাবে, আমি চাইলে সেটাতে করেও চলেযেতে পারি। ভাবলাম খারাপ কী— আগে পৌঁছে বরং হোটেলে রেস্ট নেয়া যাবে। চড়ে বসলাম সাড়ে বারোটার ট্রেনেই।
🎯ফার্স্ট ক্লাসের সাইলেন্ট জোনের টিকেট— কোনো শব্দ করা নিষেধ,
এমনকি টেলিফোনে কথাও বলা যাবে না। টুপি-হাতমোজা খুলে, ব্যাগ স্যুটকেস গুছিয়ে চুপচাপ তাই বসে পড়লাম। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা।
হারিয়ে যাবার গল্প
সময় কাটাতে সাথে থাকা অ্যালেক্স রাদারফোর্ডের ‘মোঘল— রাইডার্স ফ্রম
দ্যা নর্থ’ খুলে ডুবে গেলাম বাবরের সাথে অভিযানে! মাঝে মাঝে ট্রেনের
পাবলিক অ্যাড্রেস (PA) সিস্টেমে ড্যানিশ ভাষায় কী কী যেন বলছিল।
একবার বেশ অনেক্ষণের জন্য থেমে থাকল মনে হলো। আবারো ড্যানিশ
ভাষায় কী কী যেন সব বলল। আমার কম্পার্টমেন্ট থেকে দেখলাম বেশ
কয়েকজন নেমে গেল মনে হলো। আমি তো আর ড্যানিশ বুঝি না, তাই
পিএ’তে কী বলছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বইয়েই ডুবে রইলাম।
প্রায় তিন ঘণ্টার মতো পার হলে, বাবর যখন কাবুল জয় করে দিল্লির
দিকে যাত্রা শুরু করেছেন, তখন ভাবলাম মনে হয় প্রায় পৌঁছে গেছি।
একবার গুগল ম্যাপে দেখে নেয়া যাক কোথায় আছি। ম্যাপে গিয়ে আমার
অবস্থান দেখে রীতিমতো আক্কেলগুড়ুম! এ কি! ম্যাপ তো দেখাচ্ছে আমি
ডেনমার্কের উত্তরে অরহুসের দিকে না গিয়ে বরং পশ্চিমের দিকে যাচ্ছি
এবং প্রায় পশ্চিমের কোনায় চলে এসেছি! তাড়াতাড়ি আবার ম্যাপ রিফ্রেস
করলাম কোথাও ভুল হচ্ছে কি না! না! সেই একই অবস্থান দেখাচ্ছে!
কিন্তু তা তো হবার কথা না! এবার তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ খুলে
ট্রেনের ওয়াইফাইতে কানেক্ট করে আবার গুগল ম্যাপে ঢুকলাম! নাহ্! সেই
একই অবস্থান দেখাচ্ছে— উত্তর দিকে যাবার পরিবর্তে আমি ট্রেনে করে
পশ্চিমে ছুটে চলছি!
নিয়মকানুনের মাথা খেয়ে এবার সামনে বসা এক ড্যানিশ বুড়োকে
জিজ্ঞাসা করলাম “আমি জানি এটি সাইলেন্ট জোন, কথা বলা নিষেধ
কিন্তু তারপরও বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমার যাবার কথা অরহুসে। এই ট্রেন
কি অরহুসে যাচ্ছে না?” বুড়ো কিছুচোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল “নাহ,
ট্রেনের ইঞ্জিনে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল; তাই অরহুসের যাত্রীদের পথে
‘ওডেন্স’ নামের এক বড় স্টেশনে অন্য ট্রেনে করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
আর এই ট্রেনের ইঞ্জিন চেঞ্জ করে বাকি যাত্রীদের নিয়ে এখন চলছে
একদম পশ্চিমের শহর ‘ব্লভাদ’-এ এবং প্রায় পৌঁছেও গেছে আর হয়তো
৪০-৪৫ মিনিট লাগার কথা!” শুনে আমার চোখ চড়কগাছ! বলে কি! এত
কিছু ঘটল কখন! এক সিট পরে এক বুড়িও বসে ছিল। সে কিছুটা বিরক্তি
নিয়েই বলল “এতবার ট্রেনে অরহুসের যাত্রীদের নেমে যেতে বলল, তুমি
না নেমে বসে ছিলে কেন?” এইবার আমি কিছুটা উষ্ণভাবেই বললাম
“আরে দুনিয়ার সবাই কি ড্যানিশ ভাষা বোঝে না কি? এত গুরুত্বপূর্ণ
একটা কথা আর তোমাদের ট্রেন কোম্পানিই বা কোন আক্কেলে ইংলিশে
রিপিট না করে শুধুড্যানিশ ভাষায় বলল!”
ড্যানিশরা এমনিতে খুব হেল্পফুল। আমার অবস্থা দেখে কয়েকজন সিট
থেকে উঠে এসে মোবাইলে কী সব টেপাটেপি করে বলল পরের স্টেশনে
নেমে যেতে। ওখান থেকে উল্টো পথে আবার যাত্রা শুরু করতে, যদি
আজ রাতে কোনো ট্রেন পাওয়া যায়! চিনি না, জানি না— কোথায় নামব!
আমার রীতিমতো মাথায় হাত! কী আর করা নেমে পড়লাম। নামার
সময় কয়েকজন আবার বারবার করে বলল আমি যেন কোনোভাবেই
আবার এখান থেকে অরহুসের ট্রেনের টিকেট না কাটি। যেহেতু ট্রেন
কোম্পানি আমাকে ঠিকমতো জানায়নি যে পথে ট্রেন চেঞ্জ করতে হবে,
সুতরাং বিনা টিকেটে আমাকে জায়গামতো পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব তাদের।
আমার কোনোভাবেই উচিত হবে না নতুন করে টিকেট কাটার! আমি মনে
মনে বললাম টিকেট তো ব্যাপার না; কিন্তু আগে তো ট্রেন থাকতে হবে।
নাহলে তো মাথায় বাজ! কাল সকালে অফিস ধরব কী করে!!
যা হোক নেমে পড়লাম পরের স্টেশনে। এ সময়ে ডেনমার্কের দিন খুব
ছোটো থাকে— আলো ফোটে আটটার দিকে আর চারটা সাড়ে চারটা
বাজলেই ঝুপঝাপ অন্ধকার! তখন প্রায় সন্ধ্যা হবহব করছে। মাইনাসের
কাছাকাছি তীব্র শীতে ধূসর আকাশ! যেখানে নামলাম সেটি আসলে ছোট্ট
একটা গ্রাম! ‘জ্যাঁরুপ’ বা এরকম কিছু একটা নাম। স্টেশন বলতে
আসলে শুধু একটা প্ল্যাটফর্ম আর বসার জন্য কয়েকটা বেঞ্চ। ব্যাস আর
কিছু না! কোনো দোকানপাট কিংবা অফিস রুমও নেই! আরো ভয়াবহ
ব্যাপার হলো নেমে দেখি পুরো স্টেশনে আমিই একমাত্র মানুষ! ডেনমার্কে এটি অবশ্য খুব বেশি অস্বাভাবিক না। এদের একেকটা গ্রামে ২০০-৩০০ মানুষ থাকে। তাই স্টেশনগুলোও এরকম জনশূন্য হয়। শীতে রীতিমতো ঠকঠক কাঁপছি। কোথায় নেমেছি, কখন ট্রেন, আদৌ ট্রেন আর আছে কিনা কিছুই জানি না। যদি ট্রেন না থাকে তবে এই গ্রামে আজ রাত কাটাতে হবে— কোথায় থাকব, ভালো হোটেল যে নেই তা নিশ্চিত, আদতে কোনো হোটেল আছে কি না তাই বা কে জানে! সেক্ষেত্রে রাত কাটাব কোথায় আল্লাহ্ই জানেন! আশেপাশে এমনকি মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই কাউকে কিছুজিজ্ঞাসা করব। এদিকে রীতিমতো অন্ধকার হয়ে এসেছে। শূন্য ডিগ্রি ঠান্ডা বাতাসে আক্ষরিক অর্থেই জমে যাচ্ছি বলা যায়— এক কাপ গরম কফির জন্য এখন মনে হয় আমি একশ’ ডলারও
দিয়ে দিতে পারি!
বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর দেখলাম বেশ কিছুটা দূরে একটা ছোট্ট
কাঠের কেবিনের মতো, ভেতরে আলো জ্বলছে। যা থাকে কপালে এগিয়ে
গেলাম। কাছে গিয়ে বুঝলাম এটি একটি ছোট্ট টুকটাক জিনিসের দোকান
কাম কফিশপ। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি পুরো দোকানে যথারীতি
কেউ নেই, শুধুমাত্র ২৫-৩০ বছরের একজন ড্যানিশ মেয়ে কাউন্টারে
বসা— মনে হলো সেই কুক, সেই ক্যাশিয়ার, সেই ওয়েটার! কথা বলতে
শুরু করতে বুঝলাম গ্রামের মেয়ে, সে আবার ইংলিশ বোঝে না। আমি
কী বলছি আগামাথা তেমন কিছুই বুঝতে পারছে না। সব বাদ দিয়ে
ভাবলাম জান বাঁচানো ফরজ— আগে কফি তো খেয়ে নেই, তারপর
বাকিটা দেখা যাবে। খাবারের কিছুবৈশ্বিক সাইজ ল্যাংগুয়েজ আছে; তা
দিয়েই বোঝালাম যে গরম কফি চাই। সাথে যদি স্ন্যাকস টাইপের কিছু
থাকে। কিছুক্ষণ পরে এক মগ গরম কফি এলো আর সাথে কুকিজ!
বিখ্যাত ড্যানিশ কুকিজ্! তাও আবার ঘরে বানানো!
কফিতে চুমুক দিয়ে একটু ধাতস্থ হলে মাথা কাজ করা শুরু করল। প্রথমেই ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি না তো। মাত্র দুদিন আগে ট্রেনে করে যাওয়ার সময়
ছবির মতো সুন্দর গ্রামগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম ইস্, যদি এরকম
একটা গ্রামে নেমে যাওয়া যেত; শীতের রাতে সরাইখানায় বসে কফি খেতে
খেতে গল্প করা যেত! আর এখন আমি সত্যিই নেমে পড়েছি ডেনমার্কের
নাম না জানা কোনো এক গ্রামে; বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, হাতে গরম কফির মগ
আর সামনে ড্যানিশ কুকি! হ্যাঁঁ, আড্ডা জমানোর অংশটা এখনোও অপূর্ণ,
কারণ আছে মাত্র একজন মানুষ এবং সে কি না আবার ভাষা বোঝে না।
তবে পুরোটাই আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন একটা কল্পনার অংশ। হয়তো
ট্রেনে বেসে ঝিমুনিতে স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন ভাঙলে দেখব কিছু না ট্রেনেই বসে
আছি, চুপচাপ অরহুসের দিকে যাচ্ছি।
পরপর দুমগ গরম কফি আর ড্যানিশ কুকি শেষ করে গুগল ট্রান্সলেটর
অ্যাপখানা দিয়ে ট্রান্সলেট করে করে ছোট্ট এই দোকানের কুক-কাম-
ক্যাশিয়ার-কাম-ওয়েটারকে বহু কষ্টে অনেকক্ষণ ধরে ভেঙে ভেঙে
বোঝালাম যে আমি ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছি, অরহুসে যাওয়া দরকার
যেভাবেই হোক। কাল সকালে আমার মিটিং আছে। সে কি আমাকে
বলতে পারে পরের ট্রেন কখন কিংবা আদৌ কোনো ট্রেন আর আছে কি
না কিংবা এখানে কোনো ট্যাক্সি আছে কি না, আর থাকলে কীভাবে ট্যাক্সি
খানা ডাকা যায়! আর এসবের কিছুই যদি না থাকে তবে কমপক্ষে এই
গ্রামে কোনো হোটেল বা সরাইখানা আছে কি না, যেখানে আমি অন্তত
রাত্রিটা কাটাতে পারব?
সব শুনে মেয়েটি কী বুঝল কে জানে, দেখলাম সে কাউন্টারের পেছনের
পর্দা দেয়া একটা দরজা খুলে বের হয়ে সাইকেল নিয়ে হনহন করে
কই যেন চলে গেল! আমি ভাবলাম পালাল না কি! নাকি উলটা-পালটা
কিছু বুঝে লোকজন ডেকে আনতে গেল আমার জন্য ধোলাইয়ের ব্যবস্থা
করতে! কি বিপদ! এখন করি কী!
পনের-বিশ মিনিট পর শব্দ পেয়ে বুঝলাম, নাহ ফিরে এসেছে। সাথে
লোকজন নেই, একাই। এক গাল হাসি দিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে
একখানা বই বের করে দিল, নেড়েচেড়ে বুঝলাম ট্রেনের টাইমটেবল্।
যাক ব্যাপারটা বুঝেছে তাহলে! এবার আমার পালা। ঘেঁটে ঘেঁটে বহু কষ্টে
বের করলাম যে এই স্টেশনের উপর দিয়ে আরো প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর
আজ রাতের শেষ ট্রেনখানা যাবে।
রীতিমতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক! পৃথি বীর প্রায় বাইরের সম্পূর্ণ
অজানা এই গ্রামে অন্তত রাত কাটাতে হবে না। আরেক মগ গরম কফি
উদরস্থ করে ভাষা-না-বোঝা সেই কুক-কাম-ক্যাশিয়ার-কাম-ওয়েটারকে
অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে হেঁটে হেঁটে আবার স্টেশনে ফিরে এলাম। যথা
সময়ে ট্রেন এলো। এই স্টেশন থেকে আমিই একমাত্র যাত্রী।
কয়েক স্টেশন পরে আরো একটা ট্রেন চেঞ্জ করে গভীর রাতে যখন
অরহুসের হোটেলে এসে পৌছালাম রুম হিটার চালু করে কম্বল মুড়ি দিয়ে
বিছানায় শুয়ে তখন পুরো ব্যাপারটাই যেন মনে হচ্ছিল পরাবাস্তব এক
অভিজ্ঞতা! আদিভৌতিক! মাত্র দুদিন আগে করা মনের ইচ্ছা সৃষ্টি কর্তা
এভাবে পূরণ করে দিবেন কে জানত! আসলেই তিনি কিনা পারেন! সারা
জীবনে না ভোলার মতো একটা স্মৃতি তিনি দিয়ে দিলেন বলা যায়।
অবিশ্বাস্য! অদ্ভুদ।
বইঃ পথের গল্প
লেখকঃ গালীব বিন মোহাম্মদ
প্রি-অর্ডার করতে কল করুন-📞০১৩১১-১৮৩২০৪
মুদ্রিত মূল্যঃ ৫০০ টাকা
২৫% ছাড়েঃ ৩৭৫ টাকা
প্রি-অর্ডারের শেষ সময়ঃ ০৭/০২/২৩
#গালীব_বিন_মোহাম্মদ #পথের_গল্প #বুকসঅ্যান্ডকিটস #বই #অনলাইনবুক #পড়ুয়া #মনকথা