Haatpur-হাটপুর

Directions

Haatpur-হাটপুর হাটের খবর ঘরে বিকি
(1)

১.তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাওয়ার পর চোখের ওপর থেকে টুপি সরিয়ে রাখলেন হাফিজ। আঁটসাঁট জায়গায়টায় ভালো ঘুম হয়নি। দুপুরে অবশ...
17/07/2026

১.

তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাওয়ার পর চোখের ওপর থেকে টুপি সরিয়ে রাখলেন হাফিজ। আঁটসাঁট জায়গায়টায় ভালো ঘুম হয়নি। দুপুরে অবশ্য গভীর ঘুমের তুলনায় মৃদু ঘুম ভালো। শরীরে শক্তি ফিরে আসে। গা ঝেড়ে উঠে গাড়ির পেছনের সিট থেকে নেমে ড্রাইভিং সিটে বসলেন তিনি। এক ঢোক পানি পান করে গলা ভিজিয়ে দ্বিতীয়বার শুরু করলেন আয়ের পথচলা, ‘বিসমিল্লাহ...’

রিয়াদের পথঘাট হাফিজের চিরচেনা। কতকাল ধরে এ শহরের অলিগলি ঘুরছেন ভাঙাচোরা এক ট্যাক্সি নিয়ে। তবু জীবনটা দারুণ কেটে যাচ্ছে। এই শুকরিয়ার পেছনে আল্লাহর রহমতের কথা তার বারবার মনে পড়ে। শৈশব থেকে বেশ কিছু ভালো বন্ধু পেয়েছিলেন তিনি। তাদের সাহচর্যে ইসলামের নির্যাস আস্বাদন করে এখন প্রতিনিয়ত নফসের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। বন্ধু তামিমের কথা মনে পড়ছে তার। তামিম এখন অনেক বড় শাইখ। আবারও যদি সবাই একসাথে বসে দ্বীনের আলাপনে ডুবে থাকা যেত...

হৃদয়পটে আঁকা স্মৃতি মুছে গেল একপাশ থেকে ভেসে আসা ডাক শুনে, ‘ট্যাক্সি!’

ফুটপাতের ওপর চারজন তরুণ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাক্সিটা তাদের কাছে যেতেই সামনের ছেলেটি বললো, ‘আশ-শারকিয়াহ যাবেন?’

ছেলেটির গড়ন দেখে অনুমান করা যায় তার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হতে পারে। বাকিরাও তার কাছাকাছি। হাফিজ কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকলেন। রিয়াদ থেকে আশ-শারকিয়াহ বেশ দূরে, চারশো মাইলের রাস্তা। যেতে যেতে প্রায় রাত হয়ে যাবে। কিন্তু ছেলেগুলোকে দেখে মনে হলো বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে, হাফিজের মনে মায়াও জেগে উঠলো। হয়তো কোনো চালক যেতে রাজি হচ্ছে না। তাদের পৌঁছে দিয়ে ঠিকঠাক ফিরে আসতে পারবেন কিনা সেই হিসাব কষে তিনি বলে উঠলেন, ‘জি, যাব।’

খুশি মনে উঠে পড়লো তারা। যথারীতি চলতে শুরু করার পর গাড়িতে কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিলেন হাফিজ। যাত্রীদের পক্ষ কোনো বিব্রতকর চাহনি দেখা গেল না। অনেক সময় যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া অনুকূলে থাকে না, তা চেহারা দেখে বুঝতে পারেন হাফিজ। এই ছেলেগুলো ভালো। কথোপকথন শুনে বোঝা গেল, সামনের ছেলেটির নাম মারুফ। তারা সবাই ব্যবসায়িক কোনো কাজে আশ-শারকিয়াহ যাচ্ছে, মারুফ এই দলটির প্রধান। ছেলেগুলোকে অভদ্র মনে হলো না হাফিজের। মৃদু স্বরে কথা বলছে, অপ্রয়োজনীয় হাসি-ঠাট্টা নেই। তিলাওয়াত শেষ হলে ইসলামিক দারসের ক্যাসেট চালু করলেন তিনি।

যাত্রাপথে আসরের ওয়াক্ত এসে গেল। মসজিদে যাওয়া যেত, তবে মহাসড়কে মসজিদগুলো একটু দূরে দূরে। এখন গাড়িতে গ্যাস নেই বললেই চলে। একটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে উপযুক্ত জায়গায় গাড়িটা পার্ক করলেন হাফিজ। যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘চলুন, একসাথে সালাত আদায় করি।’

গাড়ি থেকে নেমে দরজা আটকে মারুফ নামের ছেলেটির কাছে গিয়ে তার সিটের দরজাটা খুলতে যাবেন হাফিজ, এমন সময় মারুফ বলে উঠলো, ‘ভাই, থামুন।’

মারুফের চেহারায় অস্বস্তি। হাফিজ একটু অবাক হয়ে পরক্ষণেই হেসে বললেন, ‘এখন আসরের ওয়াক্ত চলছে।’

মারুফ একবার পেছনে তার বন্ধুদের দিকে তাকালো। তাদের অভিব্যক্তিও ঠিক তার মতন। মারুফ ফিরে হাফিজের দিকে তাকিয়ে যা বললো, তা শোনার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

‘আমরা সালাত আদায় করি না।’

বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো হাফিজের সামনে! কেউ কীভাবে বলতে পারে সে সালাত আদায় করে না! তিনি কিছুতেই এ কথা মানতে পারছেন না। অবর্ণনীয় এক মানসিক কষ্টের শিকার হয়ে বলে উঠলেন তিনি, ‘কী বলছেন আপনারা!’

হাফিজ কোনো দা'ঈ নন। ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার অভ্যাস তার নেই। কিন্তু সালাতকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন তিনি, বিস্ময় প্রকাশের পর কিছু কথা না বলে থাকতে পারলেন না।

‘একজন মুসলিম কীভাবে বলতে পারেন যে তিনি সালাত আদায় করেন না! ভাইয়েরা আমার, আল্লাহকে ভয় করুন। আমরা মুসলিম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় আমাদের জন্য ফরজ। হাশরের দিন সালাতের হিসাব বিশেষভাবে নেওয়া হবে। সেদিন আল্লাহকে এই কথা বলতে পারবেন যে আমরা সালাত আদায় করি না? আল্লাহর পাকড়াওকে ভয় করুন। এখনো সময় আছে, সালাতের দিকে আসুন। হাইয়্যা আলাস সালাহ! জান্নাতের পথে হাঁটুন! সালাত ছেড়ে দিলে জাহান্নামের আগুনে হাজার বছর ধরে জ্বলতে হবে!’

হাফিজ আরো কত কথা বলে ফেলেছেন খেয়াল নেই। খুব আঘাত পাওয়ার কারণে এলোমেলোভাবে খানিকটা তিরস্কার করে ফেলেছেন তাদের। কথা থামানোর পর ভেবেছিলেন তারা ধমক দিয়ে বলবে, ‘নিজের চরকায় তেল দাও! তুমি কে আমাদেরকে বিচার করার? বাধ্য করার অধিকার কে দিয়েছে তোমাকে?’ কিন্তু এমন কোনো দৃশ্যের দেখা মিললো না। বরং মারুফ মাথা নীচু করে বসে আছে, তার মুখশ্রী বলছে সে লজ্জিত। কিছুক্ষণ পর সে মাথা উঠিয়ে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘চল, সালাত আদায় করে নিই।’

মারুফ ও তার বন্ধুদের দরজা খুলে নামতে দেখে হাফিজ ভীষণ খুশি হলেন। তিনি রূঢ়ভাবে কথা বলার জন্য দুঃখিত হওয়ার আগেই মারুফ বলে উঠলো, ‘আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী এমনটা করার জন্য। আমরা সালাত আদায় করবো, কোনো সমস্যা নেই।’

মুচকি হাসলো ছেলেটা, যা দেখে হাফিজের অন্তর শীতল হয়ে এলো। তারা একটি ফাঁকা জায়গা দেখে সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেল। ছেলেগুলোর অনুরোধে ইমামতির দায়িত্ব মিলে গেল হাফিজের। কসরের দুই রাকাআত সালাত আদায়ের জন্য হাত বাঁধলো সবাই। সূর্য একটু একটু করে হেলে পড়ছে পশ্চিম কোণে।

২.

মসজিদ প্রাঙ্গণ পেরিয়ে শাইখ তামিম হুসেইন পকেট থেকে ছোট চিরকুট বের করলেন। তালিকায় আছে পেঁয়াজ, ডিম ও কিছু সবজি কেনার কথা। ভোরবেলা বাজারের সবজিগুলো বেশ টাটকা থাকে। ফজরের ওয়াক্ত শেষে ইশরাকের সালাত আদায় করে সেদিকের পথ ধরলেন তিনি। লোকে তাকে সম্মান করে এসব কাজ করে দিতে চাইলেও তিনি হাসিমুখে নাকচ করেন। ধীর পায়ে হেঁটে কিছু দূরে যেতেই ফোন ভাইব্রেট করা শুরু করলো। বাড়ির লোক কিনা... এই ভেবে ফোনটা বের করে খানিক চমকে উঠলেন তিনি।

বহুদিন ধরে দেখা-সাক্ষাৎ নেই এমন এক বন্ধুর ফোন পেয়ে শাইখ তামিম চিন্তিত বোধ করছেন। কলটা ধরে সালাম দিলেন তিনি। ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ বন্ধু।’

স্বল্পক্ষণে খোঁজখবর নেওয়া শেষে বন্ধু হাফিজ কথোপকথন দীর্ঘ করলেন না। চলে গেলেন মূল প্রসঙ্গে, ‘আমি কাল এমন এক বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি, যেটা তোমাকে না বলা পর্যন্ত আমার শান্তি মিলছে না।’

‘কী হয়েছে হাফিজ!’ শাইখ তামিমের কণ্ঠে শঙ্কার আভা। হাফিজ বললেন, ‘কাল আমার ট্যাক্সিতে চার জন যাত্রী উঠেছিলেন। রিয়াদ থেকে আশ শারকিয়াহ যাচ্ছিলাম আমরা। মাঝপথে আসরের ওয়াক্ত হলে আমি নেমে উনাদের সালাত আদায়ের জন্য ডাকলাম। উনাদের মধ্যে মারুফ নামের একজন আমাকে কী বলেছিল জানো?’

‘কী?’

‘আমরা সালাত আদায় করি না।’

‘আউযুবিল্লাহ!’

আহত হৃদয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শাইখ তামিম। এ কথা শোনার আগে বধির হয়ে গেলে ভালো হতো... অন্তর দহনের যাতনা তিনি কাউকে দেখাতে পারেন না। এই কথা এখন আশেপাশের বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য সত্য। মুসলিম ব্যক্তি সালাত আদায় করে না, এরকম মানুষ দিন দিন যেন বাড়ছে। তবে হাফিজের পরের কথাগুলো তাকে আরো বিস্মিত করলো।

‘আমি বেশ কিছুক্ষণ নাসিহাহ করার পর ছেলেগুলো আমার সঙ্গে সালাত আদায়ের জন্য গাড়ি থেকে নামলো। আমাকে ইমাম বানিয়ে তারা পেছনে দাঁড়ালো। সালাম ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি, তিনজন ছেলের সালাত আদায় শেষ, একজন তখনও সিজদাহয় পড়ে আছে। ছেলেটি ছিল মারুফ।’

শাইখ তামিম চুপচাপ শুনছেন। বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই এই ঘটনার মাঝে রয়েছে হিকমাহ।

‘ছেলেটির বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টা শুরু করেছিল। একজন বললো, “জীবনেও সালাত আদায় করোনি, আর এখন তুমি সিজদাহয় পড়ে আছো! নতুন শাইখ এসেছেন শহরে!” আরেকজন বলেছে, “আহা! তুমি তো অনেক সময় নিয়ে ফেলছো। যেন এক সিজদাহয় সোজা জান্নাতে!”

‘কাজটা ঠিক হয়নি।’

শাইখ তামিমের কথাটা শুনে ভাঙা গলায় হাফিজ বললেন, ‘কাজটা যে তখন ঐ পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই ছিল না, এ কথা তারা কেউ কল্পনাতেও আনেনি। তারা হাসতে হাসতে হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল। কারণ তাদের বন্ধু এসব কথা শুনে মোটেও নড়াচড়া করেনি, মাথা ওঠায়নি। একজন বললো, “আমাদের কথা শুনে ওর হেসে ফেলার কথা...” এই বলে ছেলেটা বন্ধুর পাশে বসে পড়লো। পিঠে আলতো করে হাত রাখতেই গড়িয়ে পড়লো শরীরটা।’

‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...’ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন শাইখ তামিম। ওপাশে বন্ধু হাফিজ কেঁদে ফেলেছেন, ‘ছেলেটির বন্ধুরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। সবাই তাকে কত ডাকাডাকি করলো, ধাক্কা দিয়ে জাগাতে চাইলো, মুখে পানি ছিটিয়ে দিলো। জেগে উঠলো না মারুফ। গ্যাস স্টেশনের লোকেদের সাহায্যে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলে ডাক্তার যখন জানালেন সে মারা গেছে, তখন বন্ধুরা হাহাকার করে কেঁদে উঠলো। বারবার বলছিল, একটু আগেও সে আমাদের সাথে ছিল! এটা সম্ভব নয়!’

‘হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন উনারা। বন্ধু হাফিজ, আল্লাহর পরিকল্পনা কতই না উত্তম! তুমি যদি ভয় পেয়ে সালাতের আহবান না জানাতে, যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে তাদেরকে তুচ্ছ করতে, তাহলে ছেলেটা অন্ধকারেই থেকে যেত। আর মালাকুল মওত তাকে নিকৃষ্ট অবস্থায় পেতেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করো।’

হাফিজ কান্না থামিয়ে বললেন, ‘এজন্যই তোমাকে ফোন করেছি শাইখ। ছেলেগুলোকে বলছিলাম, আপনারা কান্নাকাটি না করে আলহামদুলিল্লাহ পড়ুন। তিনি সিজদাহরত অবস্থায় মারা গেছেন। আর হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, যে যেই অবস্থায় মারা যাবে, বিচার দিবসে সে সেই অবস্থায় আল্লাহর সামনে উত্থিত হবে। ছেলেটা বললো, আমরা সালাত আদায় করি না। অথচ সালাতেই তার মৃত্যু হলো। আল্লাহর দয়া কত বড়! তিনি সেই ছেলের বিনয়কে ভালোবেসেছেন বলে আমার অনুমান।’

ভেজা পাঁপড়ি রুমাল দিয়ে মুছে শাইখ তামিম চলতে শুরু করলেন, ‘হাফিজ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্রের আমল। এছাড়াও হতে পারে সালাতের মাঝে ছেলেটি এত বেশি অনুতপ্ত ছিল যে তাওয়াবুর রহিম সেই তাওবা ভীষণ পছন্দ করেছেন। তাই তাকে সিজদাহয় মৃত্যু দিয়েছেন। যা কিনা অনেকের স্বপ্ন।’

কথা বলতে বলতে গন্তব্যে যাচ্ছেন শাইখ তামিম। বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এখানে কত লোক আসছে, যাচ্ছে... জান্নাতেও একটি বাজার আছে। যেখানে কিছু কিনতে হলে টাকা পরিশোধ করতে হবে না। বলা হবে, এর মূল্য আগেই পরিশোধ করা হয়ে গেছে! সেই জান্নাতে প্রবেশের জন্য সবসময় ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া জরুরি। যদি কেউ ডাকে কল্যাণের পথে, তবে তাতে অংশ নেওয়া উত্তম। আর ভুল পথে চলা মানুষকে সঠিক দিশা দেখানোর সৌভাগ্য থেকেও বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। শাইখ তামিম দুআ করলেন, তার বন্ধু হাফিজ যেমন ইসলামের দাওয়াহ দিয়েছেন সাধ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক মুসলিম যেন এই বিষয়টাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতে পারে।

_____________________________

গল্প : হাইয়্যা আলাস সালাহ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
✍️ নাবিলা মুস্তাফা
বই : প্রস্থানের পথে (সমকালীন প্রকাশন থেকে প্রকাশিতব্য)

#হাটপুর

অনেকেই দুয়া কবুলের আমল খোঁজেন। তাদের জন্য দুয়া কবুলের পরীক্ষিত আমল! #হাটপুর
08/07/2026

অনেকেই দুয়া কবুলের আমল খোঁজেন। তাদের জন্য দুয়া কবুলের পরীক্ষিত আমল!

#হাটপুর

১.এনগেইজমেন্ট ভেঙে যাওয়ার খবরটা এলো হঠাৎ করে।আনাস তখন বোনের বিয়ের খরচাপাতি জোগাড় করতে ব্যস্ত। এমন সময় পাত্রের বাবা ফোন ক...
03/07/2026

১.
এনগেইজমেন্ট ভেঙে যাওয়ার খবরটা এলো হঠাৎ করে।

আনাস তখন বোনের বিয়ের খরচাপাতি জোগাড় করতে ব্যস্ত। এমন সময় পাত্রের বাবা ফোন করে জানালেন—এ বিয়েতে আগানো সম্ভব না। এনগেইজমেন্টের দু মাসের মাথায় তাদের মনে হলো রীম তাদের পরিবারের উপযুক্ত নয়!

কথা বাড়ায়নি আনাস। তার নিজের স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার বেশিদিন হয়নি। সেই ক্ষত এখনো তাজা, কিন্তু আদরের ছোট বোনের মন ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারটি তার কাছে অসহনীয়। বাবা মারা গেছেন শৈশবে। আনাসের মনে আছে বাবার স্মৃতি, রীমের কিছুই মনে নেই—সে তখন কোলের শিশু। বড় ভালোবাসে আনাস বোনকে। রীমের গায়ে ফুলের টোকাও সে সহ্য করতে পারে না। মায়েরও কম আসকারা পায়নি রীম। চাচারাও যথেষ্ট স্নেহ করেন। সবমিলিয়ে, বাবা না থাকলেও পরিবারের সবার আদরেই বড় হয়েছে, আহ্লাদি হয়েছে। একটু কষ্টই মেনে নেয়া ওর জন্য কষ্টকর, সেখানে এনগেইজমেন্ট ভেঙে যাওয়ার আঘাত রীমের জন্য বুকের ওপর পাহাড় চেপে বসার মতন। সে আর আগের মতো হাসে না, কথা বলে না, ঘুরতে যায় না। শুধু ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদে। খাওয়া-দাওয়া তো বাদই বলতে গেলে।

দিনদিন রীমকে স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরে যেতে দেখে মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তোর এই অবস্থা আমি সহ্য করতে পারছি না, মা। তুই কেন আগের মতো হাসিস না? আমাদের সাথে গল্প করিস না? যেটা হয়নি, সেটা হয়নি। দেখিস, করিমের চেয়ে ভালো ছেলের সাথে তোর বিয়ে হবে। ওকে তুই ভুলে যা।’

রীম কিছুই শোনে না।

একদিন সকালে মা বললেন, ‘অনেক দিন তো হয়ে গেল, মা। দেখ, ওই ছেলে হেসে-খেলে জীবন কাটাচ্ছে, আর তুই কেন নিজেকে ঘরে বন্দি করে কাঁদতে থাকবি? তুইও খাওয়া-দাওয়া কর, শপিং কর, গাড়ি নিয়ে ঘোর। আজ যাবি নাকি একটু ঘুরতে? বাইরে গেলে হয়তো ভালো লাগবে।’

রীমের মন বলল—মা ঠিকই বলেছেন। প্রাইভেট কার নিয়ে একাই বেড়িয়ে পড়ল সে। অনেক দিন পর বাইরে বেরিয়ে ভালোই লাগছিল কিন্তু একটু পরই মনে পড়তে লাগল—সেই ছেলেটির ছবি, তার সাথে করা গল্প, বিয়ের পোশাকের পরিকল্পনা, কনে সাজের পরিকল্পনা। মন ভাক্রান্ত হয়, চোখ বেয়ে অশ্রু নামে, আশেপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে। এক পর্যায়ে গাড়ির কন্ট্রোল গাড়ি ফেলে রীম। ফলাফল—দুর্ঘটনা।

রাস্তার আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে দেখে—গাড়ির অবস্থা ভালো নয়, চালকের অবস্থা আরও খারাপ। রীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে দিয়ে এলো তারা। মনের মতো শরীরেও গুরুতর আঘাত পেল রীম। আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। খবর পেয়ে হাসপাতালে ভিড় করল তার মা-ভাই, চাচা, মামা, আরও কত কত আত্মীয়। কম স্নেহের মেয়ে তো নয়!

কন্যার অবস্থা দেখে রীমের মা তো মুর্ছা যায় যায়। মাতমে হাসপাতালের ছাদ ভেঙে পড়ে! ‘হায়! আমার মেয়ের কী হলো! হায় আমি কেন ওকে গাড়ি নিয়ে বেরুতে বললাম! আমি যদি ওকে বাইরে যেতে না বলতাম তাহলে ওর এই অবস্থা হতো না।’

রীমের চাচি সান্ত্বনা দিয়ে তাকে বললেন, ‘এমন কথা বলবেন না, ভাবি। আমরা কেউ তাকদিরের বাইরে যেতে পারি না। ‘যদি আমি ওটা করতাম তাহলে, এমন হতো’, ‘যদি এটা না করতাম, তাহলে এমন তো না’—জাতীয় কথা বলতে নবিজি নিষেধ করেছেন।'
কিন্তু রীমের মায়ের কান্না থামে না।

আত্মীয়দেরকে স্বস্তি দিতে দশ ঘণ্টা পর চোখ মেলে তাকাল রীম। ডাক্তার বললেন—শুধু মা আর ভাই, আপনারা দেখে আসতে পারে। ধীর পায়ে আনাস ঢুকল আইসিইউতে। রীম তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অক্সিজেন মাস্ক খোলা। হাটু গেড়ে বসল আনাস। রীম তার হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল—ভাইয়া, আমাকে তুমি মাফ করে দিয়ো, ভাইয়া।

আনাস বলল, ‘কী বলছিস এসব! পাগলি!’

‘বলো আমাকে মাফ করবে? আমি যদি মরে যাই, আমার ওপর কোনো রাগ রাখবে না, বলো?’

‘কী যে বলিস তুই! তোর ওপর রাগ করতে যাব কেন রে?’

‘ভাইয়া, আমাকে মাফ করে দিয়ো কিন্তু।'

মাকে ডেকে রীম বলল, ‘মা, আমি যদি মারা যাই—আমাকে রাতে কবর দিয়ো না, দিনেরবেলা দিয়ো। তুমি তো জানো, আমি অন্ধকারে ভয় পাই। রাত আমার ভালো লাগে না।’

‘এসব কী বলছিস। এমন কথা বলবি না। তুই ভালো হয়ে যাবি, মা, ইনশাআল্লাহ।’ রীমের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

কিন্তু সবাইকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে পরদিন দুপুরে রীম আখিরাতে পারি জমাল। রীমের মা আর ভাইয়ের অবস্থা আর না-ই বলি!

হাসপাতাল থেকে কাগজপত্র তোলা, পৌরসভা থেকে মৃত্যুসনদ তোলা—ইত্যাদি করতে করতে সন্ধ্যা। সব রীতি শেষ হলো রাত নয়টা-দশটা নাগাদ। কিন্তু দাফনের পালা আসতেই রীমের মা কিছুতেই মেয়েকে দাফন করতে দিবেন না। ‘আমার মেয়ে বলে গেছে—দিনের বেলা কবর দিতে। রাতে ও ভয় পায়। ওকে এখন কবর দেয়া যাবে না।’

এদিকে রীমের চাচা বলতে লাগলেন, হাদিসে এসেছে লাশকে দ্রুত দাফন করা উচিত।

আস্তে আস্তে আরও মানুষ যোগ দিলো তাদের সাথে। একদলের মতামত—মেয়ে যখন বলে গেছে, তাহলে ভোরে বা সকালবেলা দাফন করা হোক।

আরেক পক্ষের মত—লাশ তাড়াতাড়ি দাফন করা উত্তম। সকাল হতে অনেক দেরি। ততক্ষণে মৃতদেহ বিকৃত হতে শুরু করবে। তাই এখন কবর দেওয়াই ভালো।

ব্যাপক তর্ক হতে লাগল। রীমের মা করলেন আরেক কান্ড। অন্য দেশের তুলনায় মিশরে একটু ভিন্ন ধরনের কবরের প্রচলন রয়েছে। কবরস্থানে অনেকগুলো ঘরের মতো থাকে—তবে মাটির নিচে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে হয়। মাটির নিচে একটা ঘরে আবার কয়েকটি কামরার মতো থাকে, একেকজনকে কবর দেয়ার জন্য। একজনকে কবর দিয়ে দেয়া হলে সেই কামরার মুখ সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। একাধিক কামরা বিশিষ্ট একেকটি ঘর নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য। ঘরের দরজায় তালা দেওয়া থাকে। এই তালা খুলে প্রিয় জনের কবর জিয়ারত করতে পারে মানুষ।

তো, রীমের মা গিয়ে তাদের পরিবারের কবরের দরজায় বসে রইলেন। এই রাতে রীমকে দাফন করতে দিবেনই না তিনি।

কিন্তু রীমের মায়ের জেদের চেয়ে রীমের চাচার গলার জোর আর ক্ষমতা বেশি। ফলে রাতেই কবর দেয়া হলো রীমকে।

২.
ইয়াসির একজন তুরাবি। কবরস্থানে পাহারা দেয়ার কাজ উনার। অনেক বছর যাবৎ এ দায়িত্বে আছেন তিনি। ১০-১৫ বছর তো হবেই। আর দশটা দিনের মতো সে রাতেও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাড়ি থেকে কবরস্থানে এসেছিলেন। কবরস্থানের মূল ফটকের সামনে নিজের নির্দিষ্ট স্থানে বসে দুয়া-দুরদ পড়ছিলেন। এমন সময় কানে এলো আওয়াজটা। ঠিক স্পষ্ট না।

ইয়াসির উঠে দাঁড়ালেন। কবরস্থানের সুনসান নিরবতার ফায়দা লোটে অনেক অপরাধী। শুয়ে থাকা শত শত মানুষগুলো তো আর প্রতিবাদ করতে পারে না। তারা এখন লাশ, কঙ্কাল। এই সুযোগে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এই তো সপ্তাহ খানিক আগে তিন-চারটা ছেলে গাঁজা নিয়ে বসেছিল। ইয়াসির লাঠি হাতে তাড়া করতেই পালিয়ে গেল। ওরা আবার আসেনি তো?

মাঝামাঝে অপরাধীদের মাঝে যেতে ভয়ও লাগে। যদি তার ওপরই আক্রমণ করে বসে। তবুও টর্চ হাতে আওয়াজের উৎস সন্ধান করতে লাগলেন ইয়াসির। যতই এগিয়ে যাচ্ছেন, স্পষ্ট হচ্ছে আওয়াজ।

মেয়েলি কান্নার শব্দ! আর্তনাদ!

ইয়াসির এসে থামলেন একটি পারিবারিক কবর-ঘরের সামনে। এখানেই শব্দটি সবচেয়ে তীব্র।

ইয়াসির ওই কবরটি ছেড়ে আরও কয়েক পা সামনে গেলেন।

না! ওই কবরটিই কান্নার উৎস।

নাম ফলকে টর্চ ফলে তিনি কবরটির তথ্য জেনে নিলেন। সেটা অবশ্য না করলেও হতো। কবরস্থানের প্রত্যেকটি কবর ঘরকে তিনি চিনেন নিজের ঘরের মতোই। চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারবেন কোন কবর-ঘরটি কোন পরিবারের।

আতর্নাদ যে কবর থেকে আসছে, সেটি সেলিম সাহেবদের পারিবারিক কবর। ইয়াসির তুরাবি ভালো করেই জানেন। এখানেই তো গত রাতে সেলিম সাহেবের ভাতিজিকে দাফন করা হলো। ইয়াসির নিজে মেয়েটির কবরের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।

মেয়েটির লাশটিই এই কবরস্থানের এ পর্যন্ত শেষ দাফন ছিল। ইয়াসির নিজে অংশগ্রহণ করেছেন। তাই হয়তো মনে হচ্ছে এই কবর থেকে আওয়াজ আসছে। মনের ভুলও হতে পারে। এই মনে করে ইয়াসির নিজের জায়গায় ফিরে এসে, চেয়ারে বসে মোবাইলে কুরআন তিলওয়াত চালু করে দিলেন।

পরের রাতে আবার একই ঘটনা। কবরস্থানের ভেতরের দিক থেকে আওয়াজ আসতে লাগল—ইয়াসির গেলেন, সেলিম সাহেবদের পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে থামলেন।

তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটল ইয়াসির তুরাবির সাথে। মনে মনে ভাবলেন তিনি—নাহ। এবার তো মেয়েটির পরিবারের সাথে কথা না বললেই নয়! মেয়েটি ইয়াতিম ছিল, তাই তার চাচা—সেলিম সাহেবের সাথেই দেখা করতে হবে।

পরদিন সকালে ইয়াসির গেলেন সেলিম সাহেবের কাছে। সালাম-কুশলের পর তার গত তিন রাতের অভিজ্ঞতা জানালেন। বললেন, ‘সেলিম সাহেব, কবরটা আপনাদের খুলে দেখা উচিত। আমারও কয়েক বার খুলে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু আমার তো সে অধিকার নেই। আপনারা—পরিবারের লোকেরা ব্যবস্থা নিন। কে জানে, আপনাদের মেয়ে যদি বেঁচে থাকে! তার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে।’

পুরো ঘটনা শুনে গম্ভীর হয়ে পড়লেন সেলিম সাহেব। একটু ভেবে বললেন, ‘যদি দিনের বেলা কবরটি খুলে দেখতে যাই—জানেন তো, পৌরসভা থেকে অনুমতিপত্র আনতে হবে। কবর খোলার সময় প্রশাসনের লোকও সাথে থাকবে। আমাদের মেয়ে যদি বেঁচে থাকে তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু খারাপ কিছু যদি হয়...বুঝতেই পারছেন, বংশের নাম খারাপ হবে। পাড়ার লোকেরা দশটা কথা ছড়াবে। তারচেয়ে বরং, কাজটা আমরা রাতে করি? আমি থাকব, আপনি থাকবেন, আর আমার ভাতিজা—মেয়েটির ভাই আনাসকে ডাকব। আমাকে যা বললেন, আপনি আর কাউকে বলেননি তো এই ঘটনা?’

‘না।’ একটু থেমে ইয়াসির বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে রাতে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।'

৩.
নিশুতি রাত। অমাবস্যার পথে এগিয়ে যাওয়া চাঁদটি মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে দাঁড়িয়ে আছে আনাস। সাথে আছে তার চাচা সেলিম ও ইয়াসির তুরাবি। তুরাবি নাকি তিন দিন ধরে নারী কণ্ঠের কান্না-আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছেন। তার মতে আনাসের ছোটবোন রীমের কবরই সেই কান্নার উৎস। তুরাবির মনে হয়েছে রীম বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। এজন্য তিনি চান আনাসের পরিবার কবরটি খুলে দেখুক। সেই উদ্দেশ্যেই আসা এখানে।

একটু পর আনাসও শুনতে পেল সেই শব্দ। সেলিম সাহেবও। সত্যি! কবরের ভেতরে যেন কেউ চিৎকার করছে। কানে আসলেই হৃদয় বলে—কবরের ভেতরে জীবন্ত কেউ আছে; তাকে এক্ষুনি উদ্ধার করা দরকার!

আনাসরা আর দেরি করল না। তুরাবি চাবির ঝোলা থেকে একটি চাবি বের করে আনাসদের পারিবারিক কবরের দরজার তালা খুললেন। এরপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। তার পেছন পেছন নেমে এলেন সেলিম ও আনাস।

কিন্তু সিঁড়িতে পা রাখতেই বন্ধ হয়ে গেল কান্না।

তুরাবি লোহার হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে রীমের কবরের সিমেন্ট আলগা করলেন। এরপর সেলিম ও আনাসের দিকে তাকিয়ে বললেন—‘আপনারাই খুলুন।'

দরজা খুলল আনাস। ভ্যাপসা-পচা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা খেল। তারপরও সাহস করে কাফন একটু তুলে ফেলল সে।

আহ! রীমের দেহে পচন শুরু হয়েছে। আনাসের আদরের ছোটবোন রীম! চাইলেও এখন যার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করা যাবে না। বেণী ধরে টান দিয়ে খুনসুটি করা যাবে। রীম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।

চোখ ভিজে আসে আনাসের। সে আবার কাফন দিয়ে ঢেকে দিলো রীমের লাশের উন্মুক্ত অংশটি। বাকি দুজনকে বলল—‘ও বেঁচে নেই, বাইরে চলুন। আপনাদের সাথে একটা কথা শেয়ার করতে চাই।’

‘কী কথা?’

‘আগে বাইরে যাই, তারপর বলছি।'

উপরে উঠে এলো তিন জনে। আহ! স্বস্তির বাতাস। কবরের পচা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিল এতক্ষণ।

এবার সেলিম জানতে চাইলেন, ‘আনাস, কী যেন বলবে বলছিলে তুমি?’

‘চাচা, এক্সিডেন্টের পর রীমের যখন জ্ঞান ফিরে তখন আমার কাছে বারবার মাফ চাচ্ছিল, মনে আছে? আমি তখন বুঝতে পারিনি ও কেন মাফ চাচ্ছে। ওর কোনো অপরাধই আমি মনে করতে পারছিলাম। তবে...’

‘তবে কী?’

‘তবে তুমি তো জানোই হেবা—মানে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে রীমের সম্পর্ক ভালো ছিল না। অথচ হেবা রীমের বেস্টফ্রেন্ড ছিল। রীমের সাথেই আমি ওকে প্রথম দেখি। কিন্তু আমি যখন থেকে হেবাকে বিয়ে করতে চেয়েছি তখন থেকেই রীমের আপত্তি। বলেছিল—‘আর কোনো মেয়ে পেলে না তুমি?' কিন্তু আমি হেবাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।’

‘তাহলে তোমরা আলাদা হলে কেন?' জানতে চাইলেন ইয়াসির।

‘হেবার সাথে বিয়ে হওয়ার কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম—হেবা আর রীম একে-অপরের সাথে কথা বলে না। ভাবলাম—মেয়ে মানুষ, দুজনের বয়স এখনো কম। রীম হয়তো ভাবছে বিয়ে করে ওর প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা কমে গেছে। কিন্তু তা তো নয়। আস্তে আস্তে ও বুঝতে পারবে ভাইয়ের ভালোবাসা আগের মতোই আছে। আর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুদিন পর ঠিক হয়েওছিল। এরপর একদিন রীম আমাকে ওর ঘরে ডেকে নিয়ে বলে—“ভাইয়া! আমি তোমাকে মানা করেছিলাম হেবাকে বিয়ে করতে। ও ভালো মেয়ে না। তুমি তো শুনলে না। দেখো, ও এখনো আরেকটা ছেলের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছে।” রীম আমাকে কিছু স্ক্রিনশট দেখাল—হেবা ও একটি ছেলের রোমান্টিং কথোপকথন! স্ক্রিনশটগুলো দেখে আমার মাথায় বাজ পড়ল। ছুটে গেলাম নিজের ঘরে—তর্ক-বিতর্ক, রাগারাগি শেষ পর্যন্ত ছাড়াছাড়িতে পৌঁছল। এখন মনে হচ্ছে—হেবার কথাও শোনা উচিত ছিল আমার। ওর নিজের পক্ষের যুক্তিগুলো সেদিন আমি শুনতে চাইনি। ওর কাছে মাফ চাওয়া উচিত আমার।’

‘সুবহানআল্লাহ!' ইয়াসির বললেন, ‘হু! নিজের স্ত্রীর ব্যাখ্যা না শুনে তুমি ভুল করেছ। এখন ভালো করে যাচাই করো—তোমার বোন মেয়েটির সাথে কোনো অন্যায় করেছে নাকি সে যা বলছিল সব সত্য। মেয়েটির কাছে রীমের হয়ে মাফ চেয়েও নিয়ো। আর শোনো, যদি সম্ভব হয়—দুজনেই যদি রাজি থাকো—কোনো মুফতি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে দেখো—তালাকটা ফিরিয়ে নেয়া যায় কি না। যা ঘটেছিল, তুমি একবার তালাক বলেছ নাকি কয় বার বলেছ—খুটিনাটি সব মুফতির কাছে খুলে বলবে। এমন কিছু অবস্থা থাকে যেখানে বিয়ে টিকিয়ে রাখা যায়। তবে এসব বিষয় আলিমগণই ভালো বলতে পারবেন। আমার মনে হচ্ছে, তোমরা দুজন মাফ না করলে তোমার বোন কবরেও শান্তি পাবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।’

৪.
আনাস আর দেরি করেনি, দুদিনের মাঝেই হাজির হেবার বাড়িতে। তাকে দেখে হেবা নিজ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকল। হেবার মাও অনেক কথা শুনিয়ে দেয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তবে তিনি রীমের মৃত্যুর খবরটি জানতেন। শোকাহত একজনকে কথা দিয়ে আঘাত করা তার সাথে যায় না। রীমের কবর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসার কথা শুনে তার মনটা আরও নরম হয়ে গেল। নিজেই অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে হেবাকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এলেন।

হেবা আনাসের দিকে তাকাল না। সোফায় বসল পর্যন্ত না। একদিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেন এসেছ, এখানে?’

‘সত্যিটা জানতে!’

‘সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন সত্য-মিথ্যা দিয়ে কী কাজ!’

‘হেবা! রীমের কবর থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছে প্রতি রাতে। তুরাবি নিজে শুনেছেন। হসপিটালের বেডে শুয়ে আমার হাত ধরে রীম বারবার বলছিল—আমি যেন ওকে মাফ করে দিই। আমার মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে—আমরা তোমার সাথে অন্যায় করেছি। রীম তোমার সাথে অন্যায় করেছে।’

‘আমি তখন তোমাকে কত বার করে বলেছি, আমার অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক নেই। তুমি আমার কোনো কথাই শোনোনি।’

‘আমি লজ্জিত, হেবা!’

হেবার চোখে পানি। ধরা গলায় সে বলতে লাগল, ‘প্রথমে আমার মাথা কাজ করছিল না—এই ধরনের স্ক্রিনশট রীম কোথা থেকে পেল। পরে জেনেছি, মুরাদ, মানে যেই ছেলেটার সাথে আমার চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট রীম তোমাকে দেখিয়েছিল, সে আর রীম মিলে স্ক্রিনশটগুলো তৈরি করেছে। মুরাদ আগ থেকেই আমাকে উত্ত্যক্ত করত। কলেজে গিয়ে আর দশ জনকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম তোমাকে, তাও করোনি। সম্পর্কই শেষ করে দিলে।’

‘হেবা! আমি তো বলছি, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। রীম হিংসার বশে তোমার সাথে যা করেছে, অন্যায় করেছে। আর তুমি কি জানো, এর শাস্তি ও দুনিয়াতেও পেয়েছিল? ওর এনগেইজমেন্ট ভেঙে গিয়েছে। এতে ও ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল। আর এখন মৃত্যুর পরেও...। হেবা! প্লিজ, তুমি ওকে মাফ করে দাও। তোমরা তো এক সময় ভালো বন্ধু ছিলে, তুমি কি চাও ও মৃত্যুর পরও কষ্ট পেতে থাকুক?’

হেবার মন গলে যায়। রীম তার সংসার ভেঙেছে বটে, তবে এরজন্য রীমের আখিরাতে শাস্তি সে চায় না। তাছাড়া ক্ষমা মহৎ গুণ। একজন সাহাবি, যাদের কাছ থেকে কষ্ট পেয়েছেন, প্রতি রাতে তাদেরকে মাফ করে দিতেন। নবিজি ﷺ তাঁকে জান্নাতি বলে আখ্যায়িত করেন। হেবা রীমকে মাফ করে দেয়।

এরপর আনাস হেবার কাছে জানতে চায়, সে আবার তার সাথে সংসার করতে রাজি কি না। প্রথমে অবাক হয় হেবা। কিছু দিন সময় নিয়ে জানায় সে রাজি। দুজন মিলে একজন মুফতি সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে। সব শুনে মুফতি সাহেব জানান, তারা আবার সংসার শুরু করতে পারবে।

হেবা আনাসের ঘরে ফিরে আসার পর রীমের কবর থেকে আর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাননি ইয়াসির তুরাবি।

গল্প : কবর থেকে ভেসে আসছিল মেয়েটির কান্নার আওয়াজ
✍️মাহবুবা উপমা
বই : প্রস্থানের পথে
( 'সমকালীন প্রকাশন' থেকে প্রকাশিতব্য ইনশাআল্লাহ)
©হাটপুর

৩.‘এখানেও একটি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে। নাম কাওকাব ইসলাম। বয়স একচল্লিশ...’তুরাবীর সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছেন মাজিদ। ততক্ষণে...
30/06/2026

৩.

‘এখানেও একটি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে। নাম কাওকাব ইসলাম। বয়স একচল্লিশ...’

তুরাবীর সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছেন মাজিদ। ততক্ষণে অল্প-স্বল্প আহার সেরে একটি চেয়ারে বসে আছি আমি। সব তথ্য মিলে গেলে আমার ডাক পড়লো। টিস্যু দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললাম, ‘এই লোকের পরিবারের কাউকে দেখছি না যে?’

‘কী বলবো ডাক্তার মুহাম্মাদ!’ বেশ হতাশাব্যঞ্জক ভঙ্গিতে বললেন মাজিদ, ‘তার ভাই একবাক্যে অনুমতি দিয়েই খালাস। এরপর কোনো যোগাযোগ করেননি তারা। না এখানে এসেছে, আর না দ্বিতীয়বার জানতে চেয়েছে পরবর্তী পদক্ষেপ কী।’

মাজিদের কথা শুনে বেশ অবাক হলাম। সাধারণত পোস্টমর্টেম, অটোপসি – এগুলোর বিরোধিতা করে থাকে পরিবারের লোকজন। যদিও তাদের নিষেধাজ্ঞা সবসময় শোনা হয় না, তবে দায়িত্ব ও সৌজন্যতার খাতিরে যোগাযোগ করা হয়ে থাকে। এই মৃতদেহ পরীক্ষার ক্ষেত্রে এত সহজে অনুমতি মিলে গেল, বিষয়টা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

একই প্রক্রিয়ায় কবরের ওপর সিমেন্টের ঢালাই ভেঙে দরজার তালা খুললেন তুরাবী। হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা সরানোর সঙ্গে সঙ্গে বিকট গন্ধে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো প্রায়। তুরাবী ভাই কাশতে কাশতে সরে গেলেন। বিশ্রী গন্ধ! আমি বহু মৃতদেহ নানান অবস্থায় পরীক্ষা করেছি। পুরো শরীরে ধারালো যন্ত্র চালিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে অভ্যস্ত। দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, নদীতে ডোবা, কঠিন অসুখে আক্রান্ত – কোনো অবস্থাতেই এরকম জঘন্য গন্ধ পাইনি!

ইতোমধ্যে তুরাবী জায়গাটা ছেড়ে চলে গেছেন। তার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমাকে আমার কাজ শেষ করতেই হবে। নাকে রুমাল চেপে স্থির হয়ে বসলাম। ভেতরে ঘন কালো আঁধার। টর্চ লাইট জ্বালিয়ে আশপাশ দেখতে গিয়ে চোখ কপালে! কী বীভৎস দৃশ্য!

প্রায় দুই মিটার লম্বা ধূসর রঙের একটি সাপ মৃতদেহের পাশে। খুব দ্রুত নড়াচড়া করছে সেটা। ফনা তুলে ‘হিস হিস’ শব্দে বদ্ধ জায়গাটার নীরবতা ভাঙছে। কিন্তু এটিই একমাত্র চমক নয়। বরং আরও ভয়ানক কিছু আমার চোখের সামনে তখনও আসেনি। টর্চ লাইট ঘুরিয়ে লাশের ওপর আলো ফেলতেই আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে এলো যেন! আরেকটি কালো সাপ পুরো মৃতদেহের ওপর আটকে আছে। এই সাপের গতি ধীর। আঠালো কালো তরল নির্গত করছে সাপটা। ঘৃণা ও ভয়ের অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে দিশেহারা বোধ করছি আমি। কাজ এগিয়ে নিতে এই সাপ দুটো সরানো প্রয়োজন। বাক্সে একটি ছড়ির মতো যন্ত্র আছে যেটা খাটো করে রাখা হয়। তা বের করে সাপ দুটোকে ভয় দেখানোর জন্য লম্বা করলাম। মাটিতে বাড়ি দেওয়ার আগেই দেখলাম, কিছু একটা কবরের কোণে পড়ে আছে। ভালোভাবে দেখতে গিয়ে বিস্ময়ের চূড়ান্তে পৌঁছে গেলাম আমি!

কুচকুচে কালো মোটা একটা বিড়াল মরে পড়ে আছে। বিড়ালটার মুখ হা করা, জিহ্বা মাটি ছুঁয়েছে। চোখ দুটো মাথা থেকে গলে বেরিয়ে এসেছে। টর্চের আলো চারিদিক ছড়িয়ে দেখলাম, কতগুলো মৃত ইঁদুরে কবরটা ভরে আছে। আবার কিছু ইঁদুর জীবিত দৌড়াদৌড়ি করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কবর জুড়ে ছোট ছোট পোকা। সংখ্যায় সেগুলো এতটাই বেশি যে, তাদের কিলবিল আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসছে।

দুটো সাপ, একটি মৃত বিড়াল, জীবন্ত-মৃত ইঁদুর, অসংখ্য কীট – সব মিলিয়ে আমার অনুভূতি বিবশ। কী করতে হবে, কীভাবে সামলে উঠবো, কিছুই মাথায় নেই। একা একা কাজ করা সম্ভব নয়। সব এভাবেই রেখে দরজাটা সরিয়ে ওপরে উঠে গেলাম, ‘তুরাবী ভাই!’

সবাই বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তুরাবী ভাই কাছে আসতে আসতে নাকে গামছা চেপে ধরলেন। আমি করুণ সুরে বললাম, ‘কবরের অবস্থা ভয়াবহ। আমার একার পক্ষে এই মৃতদেহ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। আপনি আমাকে সাহায্য করুন। একটা বড় লাঠি নিয়ে আসুন।’

তুরাবী ঠিক বুঝতে পারলেন না বিষয়টা কী। তবে প্রশ্ন না করে কথামতো কাজ করলেন তিনি। আমি কবরে ঢোকার পর তিনিও ঢুকলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বমি করে ফেললেন। একান্ত নিরুপায় না হলে আমি কাউকেই এখানে ডাকতাম না। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা চিন্তার বাইরে। তুরাবী কোনো রকম নিজেকে সামলে লাঠি দিয়ে ধূসর রঙের সাপটাকে আঘাতের চেষ্টা করলেন। কবরের এক কোণে সরু ছিদ্র দেখে বলে উঠলাম, ‘ভাই, ঐদিকে যেন সাপ চলে যায় সেভাবে বাড়ি মেরে দেখুন।’

তুরাবী ভাই অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। ধূসর রঙের সাপ সেই ছিদ্র দিয়ে অন্য কবরে চলে গেলে তুরাবী বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! কী ভয়ানক দৃশ্য!’

এতক্ষণে বিড়ালটার দিকে তার নজর পড়েছে। তিনি আপনমনে বলছেন, ‘এই ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে বিড়ালটা এখানে আসা অসম্ভব!’

তুরাবী যা বলছেন, তা নিঃসন্দেহে সঠিক। কিন্তু এখন আলাপনের সময় নয়। কালো সাপটাকে সরানো হয়নি। তুরাবী আবার বমি করে ফেললেন। বিদঘুটে আঠালো তরলে পুরো লাশ মাখামাখি। বহু কষ্টে সাপটাকে মৃতদেহ থেকে নামানো গেলেও সেটা কবর ছেড়ে গেল না। ওই ছিদ্রের কাছেও যায়নি। এই ফাঁকে দ্রুত আমরা দুজন মৃতদেহটা টেনে তুলে ধরলাম। কবর থেকে বাইরে বের করার পরপরই দম বন্ধ করা দুর্গন্ধে চারিদিক এলোমেলো হয়ে এলো।

তুরাবী প্রায় দৌড়ে জায়গাটা ছেড়ে বাঁচলেন যেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম, কাছাকাছি যত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন, সবাই দূরে সরে গেছেন। সবচেয়ে কাছে যেই মানুষটা দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিও আমার থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরত্বে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজ শুরু করে দিলাম। কবরে থাকতেই দেখেছি, লোকটার মুখ পুরোপুরি মাংসবিহীন। তবে সেই সময় এই নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ ছিল না। এখন কাফনের কাপড় সরানোর পর হতাশা ছাড়া আর কিছু প্রকাশ করার অনুভূতি নেই। পুরো শরীরে শুধু হাড়। চামড়া, মাংস, শিরা-উপশিরা, সবকিছু পচে-গলে শেষ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই লোকটার হাড়ের রং নীল। আমার জীবনে কখনো মৃতদেহের নীল রঙের হাড় দেখিনি। সাদা, হলদে সাদা, হলদে বাদামি অথবা বাদামি দেখেছি। কিন্তু নীল? কখনোই নয়!

মৃতদেহের মাথায় গুলির আঘাতের চিহ্ন দেখে নিশ্চিত হলাম, পাবলিক প্রসিকিউটরদের তালিকাভুক্ত লোকটিই এই লোক। দ্রুত পরীক্ষা করে আবারও কাফনে লাশ জড়িয়ে রাখলাম। তুরাবী ভাই তৃতীয়বারের মতো বমি করে চেহারায় বেদনার ছাপ মেখে আমাকে সাহায্য করতে এলেন। লাশটা কবরে নামানোর সময় দেখলাম, সেই কালো সাপ তো আছেই, ধূসর রঙের সাপও ফিরে এসেছে। শুধু তাই নয়, তারা এখন লাশ রাখার জায়গায় বসে আছে। কোণে পড়ে থাকা বিড়ালটা টেনে এনে মাঝে রেখেছে। এতকিছুর মধ্যে লাশটা রেখে আসতে আমাদের দুজনেরই মন সায় দেয়নি। আমরা সাপ তাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলাম।

প্রায় আধা ঘণ্টা যাবৎ চেষ্টার পর শুধু ধূসর সাপটাকে সরাতে পারলেও কালো রঙের সাপ সেখানেই রয়ে গেল। বিড়ালটা ছড়ি দিয়ে ঠেলে দূরে পাঠিয়ে লাশটা নামিয়ে রেখে দ্রুত দরজা আটকে দিলাম। বাইরে বেরিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বসে পড়লাম। এতক্ষণ কীভাবে কাজ করেছি জানি না। আল্লাহর রহমত না থাকলে এই বিকট গন্ধে আমার মৃত্যু অনিবার্য ছিল!

তুরাবী বমি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চুপচাপ একটি চেয়ারে বসে আছেন চোখ বন্ধ করে। আমি মাজিদের কাছে গিয়ে রিপোর্ট জমা দিলাম। তাদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে এই মৃতদেহের সবকিছু মিলে গেছে। মাজিদের মুখে স্বস্তি দেখতে পেলাম না। তিনি রিপোর্ট হাতে নিয়ে বললেন, ‘ঝামেলাটা পার হলো আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু, খুশি হতে পারছি না। আপনি দেখছেন? এখনো দুর্গন্ধে আশপাশ কেমন আবর্জনার স্তূপের মতো হয়ে আছে!’

‘আবর্জনার চেয়েও বাজে গন্ধ। এমনকি পশুর বিষ্ঠার চেয়েও!’ নাক-মুখ কুঁচকে কথাটা বললেন আবিদ।

মাজিদও ঠিক এই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন কিন্তু আবিদের মতো অকপটে বলতে পারেননি। বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে আমরা অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমি ও তুরাবী ভাই একই গাড়িতে বসে আছি। দুজনেই অস্বাভাবিক রকমের নিশ্চুপ। ড্রাইভার ভাই টুকটাক খাতির জমাতে চাইছেন। কিন্তু আমাদের কারো মুখ থেকে একটি শব্দ বের হলো না।

অফিসে পৌঁছে প্রথমে আমার কাজগুলো সম্পন্ন করে কাওকাব ইসলামের তথ্যাদি বের করলাম। তার ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়েছিল তার ভাইয়ের সঙ্গে। নাম্বারটা এখানে উল্লেখ করা আছে। মাজিদকে এগিয়ে আসতে দেখে বললাম, ‘এই নাম্বারে কল করার অনুমতি আছে কি? আমি আজ যা দেখেছি, তাতে মৃত মানুষটার জীবন সম্পর্কে না জানা পর্যন্ত আমার মন অস্থির থেকে যাবে।’

মাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি কল করে দেখুন আগে। তারপর আসল কথা বলছি।’

‘আসল কথা? কী কথা?’

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মাজিদ আবার বললেন, ‘আগে ফোন করে দেখুন। তারা ধরেন কিনা।’

আমি অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে সেই নম্বরে কল করে অপেক্ষা করছি। ওপাশ থেকে নিরুত্তর শব্দ ভেসে এলো। তিনবার ফোন করার পরও কেউ ধরলো না। অবশেষে অধৈর্য হয়ে মাজিদকে বললাম, ‘কেউ তো ধরছে না! আপনি যদি কিছু জেনে থাকেন তাহলে আমাকে বলুন মাজিদ। নিশ্চয়ই আমার জানার অধিকার আছে?’

‘আমি জানতাম তারা কেউ কথা বলতে চাইবে না। যাক... যা বলছিলাম। জি, আপনার জানার অধিকার আছে। আপনি যেই নথির খাতা ধরে আছেন সেখানেই উল্লেখ আছে। এই যে দেখুন...’

মাজিদ একটি লেখার দিকে আঙুলের ইশারা করে বললেন, ‘কাওকাব ইসলাম পাঁচ বছর জেল খেটেছিল।’

‘জেল!’

বিস্ময় প্রকাশ করে উঠলে মাজিদ শক্ত মুখে বললেন, ‘জি, তাও কোনো সাধারণ বিষয়ের জন্য নয়। সে ছিল শিশু নির্যাতক। ছেলে-মেয়েদের শারীরিক নির্যাতন করতো। একটি বাচ্চাকে গুরুতর আহত করার পর তার জেল হয়েছিল। পাঁচ বছর কারাবন্দি জীবন কাটিয়ে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে নিজেকে পরিবর্তন করেনি। একই কাজ করে গেছে বারবার। আর এভাবেই একদিন, আন্দোলনের মাঝে পড়ে তার মাথায় একটি বুলেটের আঘাতে সে মৃত্যুবরণ করে।’

‘সুবহানাল্লাহ!’ কথাটা ছাড়া আর কিছু বলার ভাষা পেলাম না। নিকৃষ্ট মানসিকতার অমানুষটার কুকর্মের কারণে আজ তার এই পরিণতি। তার পক্ষে কেউ আসেনি, কেউ কথা পর্যন্ত বলতে ইচ্ছুক নয়! মাজিদ আমার অবস্থা দেখে কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ডাক্তার, আমাদের চেনা জগৎটা খুব অচেনা হয়ে যায় যখন আমরা মৃত্যু সম্পর্কিত বিষয়গুলো গভীরভাবে ভাবতে শিখি। আসুন, আসরের সালাত আদায়ের সময় হয়ে এসেছে।’

৪.

হোটেলের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। মিশরের প্রাণচঞ্চল পথঘাট দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের স্বপ্নের কথা, যা আমি গুরুত্ব দিইনি। অথচ তা ছিল আমার জন্য একটি সংকেত, পূর্বপ্রস্তুতি।

বিশাল এক গাছ। চক্ষু শীতল করা সবুজ পাতায় ঘেরা। তার নীচে একটি কালো মোটা বিড়াল ডাকছে। চিৎকার করছে শ্রুতিহীন সুরে। এর বিপরীতে, গাছটার একদম চূড়ায় একটি সাদা কবুতর। ভীষণ মায়াবী পাখিটার শরীর থেকে যেন আলো ছড়াচ্ছে। একদিকে বিড়ালের বিরক্তিকর আর্তনাদ, অন্যদিকে মোলায়েম পাখির দ্যুতি।

এই স্বপ্নের বাস্তব রূপ আজ দেখে এলাম। কতই না বৈপরীত্য দুই দুনিয়ায়! একজন পার্থিব জীবনে পেয়েছে মাত্র উনিশ বছর। কিন্তু এই অল্প বয়সে সে বিপুল সওয়াব অর্জন করেছে একটি সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে। সব কাজের শুরুতে সে ভেবেছে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা। আর অনুভব করেছে মুসলিম ভাইদের বেদনা। দরদী তরুণ ছেলেটির দানের হাত ছিল প্রসারিত। তাকে খুব বেশি আমল করতে হয়নি। যা সে করেছে তাতে শুধু ইখলাসের কথা মাথায় রেখেছে।

হোটেলে পৌঁছে আমার চোখের সামনে ভেসে এলো ছোট ছোট শিশুদের খেলাধুলার দৃশ্য। সামনে একটি প্লে-গ্রাউন্ডে বাচ্চারা খিলখিল করে হাসে আর খেলে। এইসব কোমল শিশুদের যেই সত্তা আঘাত করতে দ্বিধা করেনি, সেই সত্তার আসল ঠিকানায় এখন দুটো বড় সাপ। সারাক্ষণ তার সঙ্গে। অগণিত ইঁদুর ও কীটের সঙ্গে তার বেলা গড়াচ্ছে। যেই পায়ে চলে সে খারাপ কাজের দিকে অগ্রসর হতো, সেই পায়ে এখন শুধু হাড়। তাও নীল রঙের। বিষের যন্ত্রণায় অসহ্য নীল রং যেমন হয়।

মনে পড়ে যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলেছিলেন, ‘মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গা, জীবিতকালে তার হাড় ভাঙারই মতো।’ (১)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাই তাঁর প্রিয় বান্দাকে হিফাজত করেছেন মৃত শরীরটা সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে। আমার কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। অন্যদিকে বিকৃত অন্তরের মানুষটার মৃতদেহ হয়ে গেছে বিকৃত। এবং সে ছিল এমন এক পরিস্থিতিতে যে তাকে টানাহেঁচড়া করে উপরে নিয়ে পরীক্ষা করতে হয়েছে।

‘স্যার, চলে এসেছি।’

ড্রাইভারের কথায় মৌনতা ভাঙলো। ভাড়া মিটিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আকাশটা দেখলাম। ছলছল চোখে বললাম, ‘হে আল মুই'জ! তুমিই সম্মান দানকারী। আল মুদ্বিল্লু! তুমিই বেইজ্জত দানকারী। অতএব আমাদের মতো সাধারণ মুমিনদের তুমি রক্ষা করো। সম্মানিত করো তোমার রহমত দ্বারা। এবং ক্ষমা করে দিয়ে অসম্মান থেকে হিফাজত করো।’

_____________________________________

(১) সহীহ : আবূ দাঊদ ৩২০৭, ইবনু মাজাহ্ ১৬১৬, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৬৭, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৪৪৭৮, ইরওয়া ৩/৭৬৩, ইবনু হিব্বান ৩১৬৭।

গল্প : সাদা-কালো স্বপ্ন
✍🏽 নাবিলা মুস্তাফা
বই : প্রস্থানের পথে

#হাটপুর

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Haatpur-হাটপুর posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share