17/07/2026
১.
তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাওয়ার পর চোখের ওপর থেকে টুপি সরিয়ে রাখলেন হাফিজ। আঁটসাঁট জায়গায়টায় ভালো ঘুম হয়নি। দুপুরে অবশ্য গভীর ঘুমের তুলনায় মৃদু ঘুম ভালো। শরীরে শক্তি ফিরে আসে। গা ঝেড়ে উঠে গাড়ির পেছনের সিট থেকে নেমে ড্রাইভিং সিটে বসলেন তিনি। এক ঢোক পানি পান করে গলা ভিজিয়ে দ্বিতীয়বার শুরু করলেন আয়ের পথচলা, ‘বিসমিল্লাহ...’
রিয়াদের পথঘাট হাফিজের চিরচেনা। কতকাল ধরে এ শহরের অলিগলি ঘুরছেন ভাঙাচোরা এক ট্যাক্সি নিয়ে। তবু জীবনটা দারুণ কেটে যাচ্ছে। এই শুকরিয়ার পেছনে আল্লাহর রহমতের কথা তার বারবার মনে পড়ে। শৈশব থেকে বেশ কিছু ভালো বন্ধু পেয়েছিলেন তিনি। তাদের সাহচর্যে ইসলামের নির্যাস আস্বাদন করে এখন প্রতিনিয়ত নফসের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। বন্ধু তামিমের কথা মনে পড়ছে তার। তামিম এখন অনেক বড় শাইখ। আবারও যদি সবাই একসাথে বসে দ্বীনের আলাপনে ডুবে থাকা যেত...
হৃদয়পটে আঁকা স্মৃতি মুছে গেল একপাশ থেকে ভেসে আসা ডাক শুনে, ‘ট্যাক্সি!’
ফুটপাতের ওপর চারজন তরুণ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাক্সিটা তাদের কাছে যেতেই সামনের ছেলেটি বললো, ‘আশ-শারকিয়াহ যাবেন?’
ছেলেটির গড়ন দেখে অনুমান করা যায় তার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হতে পারে। বাকিরাও তার কাছাকাছি। হাফিজ কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকলেন। রিয়াদ থেকে আশ-শারকিয়াহ বেশ দূরে, চারশো মাইলের রাস্তা। যেতে যেতে প্রায় রাত হয়ে যাবে। কিন্তু ছেলেগুলোকে দেখে মনে হলো বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে, হাফিজের মনে মায়াও জেগে উঠলো। হয়তো কোনো চালক যেতে রাজি হচ্ছে না। তাদের পৌঁছে দিয়ে ঠিকঠাক ফিরে আসতে পারবেন কিনা সেই হিসাব কষে তিনি বলে উঠলেন, ‘জি, যাব।’
খুশি মনে উঠে পড়লো তারা। যথারীতি চলতে শুরু করার পর গাড়িতে কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিলেন হাফিজ। যাত্রীদের পক্ষ কোনো বিব্রতকর চাহনি দেখা গেল না। অনেক সময় যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া অনুকূলে থাকে না, তা চেহারা দেখে বুঝতে পারেন হাফিজ। এই ছেলেগুলো ভালো। কথোপকথন শুনে বোঝা গেল, সামনের ছেলেটির নাম মারুফ। তারা সবাই ব্যবসায়িক কোনো কাজে আশ-শারকিয়াহ যাচ্ছে, মারুফ এই দলটির প্রধান। ছেলেগুলোকে অভদ্র মনে হলো না হাফিজের। মৃদু স্বরে কথা বলছে, অপ্রয়োজনীয় হাসি-ঠাট্টা নেই। তিলাওয়াত শেষ হলে ইসলামিক দারসের ক্যাসেট চালু করলেন তিনি।
যাত্রাপথে আসরের ওয়াক্ত এসে গেল। মসজিদে যাওয়া যেত, তবে মহাসড়কে মসজিদগুলো একটু দূরে দূরে। এখন গাড়িতে গ্যাস নেই বললেই চলে। একটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে উপযুক্ত জায়গায় গাড়িটা পার্ক করলেন হাফিজ। যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘চলুন, একসাথে সালাত আদায় করি।’
গাড়ি থেকে নেমে দরজা আটকে মারুফ নামের ছেলেটির কাছে গিয়ে তার সিটের দরজাটা খুলতে যাবেন হাফিজ, এমন সময় মারুফ বলে উঠলো, ‘ভাই, থামুন।’
মারুফের চেহারায় অস্বস্তি। হাফিজ একটু অবাক হয়ে পরক্ষণেই হেসে বললেন, ‘এখন আসরের ওয়াক্ত চলছে।’
মারুফ একবার পেছনে তার বন্ধুদের দিকে তাকালো। তাদের অভিব্যক্তিও ঠিক তার মতন। মারুফ ফিরে হাফিজের দিকে তাকিয়ে যা বললো, তা শোনার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
‘আমরা সালাত আদায় করি না।’
বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো হাফিজের সামনে! কেউ কীভাবে বলতে পারে সে সালাত আদায় করে না! তিনি কিছুতেই এ কথা মানতে পারছেন না। অবর্ণনীয় এক মানসিক কষ্টের শিকার হয়ে বলে উঠলেন তিনি, ‘কী বলছেন আপনারা!’
হাফিজ কোনো দা'ঈ নন। ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার অভ্যাস তার নেই। কিন্তু সালাতকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন তিনি, বিস্ময় প্রকাশের পর কিছু কথা না বলে থাকতে পারলেন না।
‘একজন মুসলিম কীভাবে বলতে পারেন যে তিনি সালাত আদায় করেন না! ভাইয়েরা আমার, আল্লাহকে ভয় করুন। আমরা মুসলিম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় আমাদের জন্য ফরজ। হাশরের দিন সালাতের হিসাব বিশেষভাবে নেওয়া হবে। সেদিন আল্লাহকে এই কথা বলতে পারবেন যে আমরা সালাত আদায় করি না? আল্লাহর পাকড়াওকে ভয় করুন। এখনো সময় আছে, সালাতের দিকে আসুন। হাইয়্যা আলাস সালাহ! জান্নাতের পথে হাঁটুন! সালাত ছেড়ে দিলে জাহান্নামের আগুনে হাজার বছর ধরে জ্বলতে হবে!’
হাফিজ আরো কত কথা বলে ফেলেছেন খেয়াল নেই। খুব আঘাত পাওয়ার কারণে এলোমেলোভাবে খানিকটা তিরস্কার করে ফেলেছেন তাদের। কথা থামানোর পর ভেবেছিলেন তারা ধমক দিয়ে বলবে, ‘নিজের চরকায় তেল দাও! তুমি কে আমাদেরকে বিচার করার? বাধ্য করার অধিকার কে দিয়েছে তোমাকে?’ কিন্তু এমন কোনো দৃশ্যের দেখা মিললো না। বরং মারুফ মাথা নীচু করে বসে আছে, তার মুখশ্রী বলছে সে লজ্জিত। কিছুক্ষণ পর সে মাথা উঠিয়ে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘চল, সালাত আদায় করে নিই।’
মারুফ ও তার বন্ধুদের দরজা খুলে নামতে দেখে হাফিজ ভীষণ খুশি হলেন। তিনি রূঢ়ভাবে কথা বলার জন্য দুঃখিত হওয়ার আগেই মারুফ বলে উঠলো, ‘আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী এমনটা করার জন্য। আমরা সালাত আদায় করবো, কোনো সমস্যা নেই।’
মুচকি হাসলো ছেলেটা, যা দেখে হাফিজের অন্তর শীতল হয়ে এলো। তারা একটি ফাঁকা জায়গা দেখে সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেল। ছেলেগুলোর অনুরোধে ইমামতির দায়িত্ব মিলে গেল হাফিজের। কসরের দুই রাকাআত সালাত আদায়ের জন্য হাত বাঁধলো সবাই। সূর্য একটু একটু করে হেলে পড়ছে পশ্চিম কোণে।
২.
মসজিদ প্রাঙ্গণ পেরিয়ে শাইখ তামিম হুসেইন পকেট থেকে ছোট চিরকুট বের করলেন। তালিকায় আছে পেঁয়াজ, ডিম ও কিছু সবজি কেনার কথা। ভোরবেলা বাজারের সবজিগুলো বেশ টাটকা থাকে। ফজরের ওয়াক্ত শেষে ইশরাকের সালাত আদায় করে সেদিকের পথ ধরলেন তিনি। লোকে তাকে সম্মান করে এসব কাজ করে দিতে চাইলেও তিনি হাসিমুখে নাকচ করেন। ধীর পায়ে হেঁটে কিছু দূরে যেতেই ফোন ভাইব্রেট করা শুরু করলো। বাড়ির লোক কিনা... এই ভেবে ফোনটা বের করে খানিক চমকে উঠলেন তিনি।
বহুদিন ধরে দেখা-সাক্ষাৎ নেই এমন এক বন্ধুর ফোন পেয়ে শাইখ তামিম চিন্তিত বোধ করছেন। কলটা ধরে সালাম দিলেন তিনি। ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ বন্ধু।’
স্বল্পক্ষণে খোঁজখবর নেওয়া শেষে বন্ধু হাফিজ কথোপকথন দীর্ঘ করলেন না। চলে গেলেন মূল প্রসঙ্গে, ‘আমি কাল এমন এক বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি, যেটা তোমাকে না বলা পর্যন্ত আমার শান্তি মিলছে না।’
‘কী হয়েছে হাফিজ!’ শাইখ তামিমের কণ্ঠে শঙ্কার আভা। হাফিজ বললেন, ‘কাল আমার ট্যাক্সিতে চার জন যাত্রী উঠেছিলেন। রিয়াদ থেকে আশ শারকিয়াহ যাচ্ছিলাম আমরা। মাঝপথে আসরের ওয়াক্ত হলে আমি নেমে উনাদের সালাত আদায়ের জন্য ডাকলাম। উনাদের মধ্যে মারুফ নামের একজন আমাকে কী বলেছিল জানো?’
‘কী?’
‘আমরা সালাত আদায় করি না।’
‘আউযুবিল্লাহ!’
আহত হৃদয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শাইখ তামিম। এ কথা শোনার আগে বধির হয়ে গেলে ভালো হতো... অন্তর দহনের যাতনা তিনি কাউকে দেখাতে পারেন না। এই কথা এখন আশেপাশের বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য সত্য। মুসলিম ব্যক্তি সালাত আদায় করে না, এরকম মানুষ দিন দিন যেন বাড়ছে। তবে হাফিজের পরের কথাগুলো তাকে আরো বিস্মিত করলো।
‘আমি বেশ কিছুক্ষণ নাসিহাহ করার পর ছেলেগুলো আমার সঙ্গে সালাত আদায়ের জন্য গাড়ি থেকে নামলো। আমাকে ইমাম বানিয়ে তারা পেছনে দাঁড়ালো। সালাম ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি, তিনজন ছেলের সালাত আদায় শেষ, একজন তখনও সিজদাহয় পড়ে আছে। ছেলেটি ছিল মারুফ।’
শাইখ তামিম চুপচাপ শুনছেন। বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই এই ঘটনার মাঝে রয়েছে হিকমাহ।
‘ছেলেটির বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টা শুরু করেছিল। একজন বললো, “জীবনেও সালাত আদায় করোনি, আর এখন তুমি সিজদাহয় পড়ে আছো! নতুন শাইখ এসেছেন শহরে!” আরেকজন বলেছে, “আহা! তুমি তো অনেক সময় নিয়ে ফেলছো। যেন এক সিজদাহয় সোজা জান্নাতে!”
‘কাজটা ঠিক হয়নি।’
শাইখ তামিমের কথাটা শুনে ভাঙা গলায় হাফিজ বললেন, ‘কাজটা যে তখন ঐ পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই ছিল না, এ কথা তারা কেউ কল্পনাতেও আনেনি। তারা হাসতে হাসতে হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল। কারণ তাদের বন্ধু এসব কথা শুনে মোটেও নড়াচড়া করেনি, মাথা ওঠায়নি। একজন বললো, “আমাদের কথা শুনে ওর হেসে ফেলার কথা...” এই বলে ছেলেটা বন্ধুর পাশে বসে পড়লো। পিঠে আলতো করে হাত রাখতেই গড়িয়ে পড়লো শরীরটা।’
‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...’ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন শাইখ তামিম। ওপাশে বন্ধু হাফিজ কেঁদে ফেলেছেন, ‘ছেলেটির বন্ধুরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। সবাই তাকে কত ডাকাডাকি করলো, ধাক্কা দিয়ে জাগাতে চাইলো, মুখে পানি ছিটিয়ে দিলো। জেগে উঠলো না মারুফ। গ্যাস স্টেশনের লোকেদের সাহায্যে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলে ডাক্তার যখন জানালেন সে মারা গেছে, তখন বন্ধুরা হাহাকার করে কেঁদে উঠলো। বারবার বলছিল, একটু আগেও সে আমাদের সাথে ছিল! এটা সম্ভব নয়!’
‘হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন উনারা। বন্ধু হাফিজ, আল্লাহর পরিকল্পনা কতই না উত্তম! তুমি যদি ভয় পেয়ে সালাতের আহবান না জানাতে, যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে তাদেরকে তুচ্ছ করতে, তাহলে ছেলেটা অন্ধকারেই থেকে যেত। আর মালাকুল মওত তাকে নিকৃষ্ট অবস্থায় পেতেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করো।’
হাফিজ কান্না থামিয়ে বললেন, ‘এজন্যই তোমাকে ফোন করেছি শাইখ। ছেলেগুলোকে বলছিলাম, আপনারা কান্নাকাটি না করে আলহামদুলিল্লাহ পড়ুন। তিনি সিজদাহরত অবস্থায় মারা গেছেন। আর হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, যে যেই অবস্থায় মারা যাবে, বিচার দিবসে সে সেই অবস্থায় আল্লাহর সামনে উত্থিত হবে। ছেলেটা বললো, আমরা সালাত আদায় করি না। অথচ সালাতেই তার মৃত্যু হলো। আল্লাহর দয়া কত বড়! তিনি সেই ছেলের বিনয়কে ভালোবেসেছেন বলে আমার অনুমান।’
ভেজা পাঁপড়ি রুমাল দিয়ে মুছে শাইখ তামিম চলতে শুরু করলেন, ‘হাফিজ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্রের আমল। এছাড়াও হতে পারে সালাতের মাঝে ছেলেটি এত বেশি অনুতপ্ত ছিল যে তাওয়াবুর রহিম সেই তাওবা ভীষণ পছন্দ করেছেন। তাই তাকে সিজদাহয় মৃত্যু দিয়েছেন। যা কিনা অনেকের স্বপ্ন।’
কথা বলতে বলতে গন্তব্যে যাচ্ছেন শাইখ তামিম। বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এখানে কত লোক আসছে, যাচ্ছে... জান্নাতেও একটি বাজার আছে। যেখানে কিছু কিনতে হলে টাকা পরিশোধ করতে হবে না। বলা হবে, এর মূল্য আগেই পরিশোধ করা হয়ে গেছে! সেই জান্নাতে প্রবেশের জন্য সবসময় ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া জরুরি। যদি কেউ ডাকে কল্যাণের পথে, তবে তাতে অংশ নেওয়া উত্তম। আর ভুল পথে চলা মানুষকে সঠিক দিশা দেখানোর সৌভাগ্য থেকেও বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। শাইখ তামিম দুআ করলেন, তার বন্ধু হাফিজ যেমন ইসলামের দাওয়াহ দিয়েছেন সাধ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক মুসলিম যেন এই বিষয়টাকে নিজের দায়িত্ব মনে করতে পারে।
_____________________________
গল্প : হাইয়্যা আলাস সালাহ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
✍️ নাবিলা মুস্তাফা
বই : প্রস্থানের পথে (সমকালীন প্রকাশন থেকে প্রকাশিতব্য)
#হাটপুর