03/10/2024
মাষ্টারমাইন্ড --
(তিন)
১৫ আগষ্ট। শুক্রবার। মেজর ফারুকের জন্মবার।
তার জন্মের পরপরই ফজরের আজান হয়েছিলো।কাজেই এই দিনটি তার জন্য শুভ। তার চেয়ে বড় কথা, আন্ধা হাফেজ সিগন্যাল পাঠিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন মহেন্দ্রক্ষন এসেছে। এখন ফারুক ইচ্ছে করলে তার কার্য সমাধান করতে পারেন। আন্ধা হাফেজ তার মঙ্গলের জন্য একটি তাবিজ ও পাঠিয়েছেন।তাবিজ ফারুকের কাছে পৌছানো যায় নি। আল্লাহপাকের এক বিশেষ নাম ও তিনি ফারুককে জানিয়েছেন।সারাক্ষণ এই নাম জপলে ফারুক থাকবেন বিপদমুক্ত।
নামটি হল ইয়া মুয়াখখেরু' অর্থাৎ হে পরিবর্তনকারী।
ফারুকের স্ত্রী ফরিদা কোরআান শরীফ নিয়ে জায়নামাজে বসেছেন। শুভ সংবাদ না-পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোরআান পাঠ করেই যাবেন।
ফজরের আজান হচ্ছে। মেজর ফারুকের ট্যাঙ্কবহর বের হয়েছে।
হরিদাসের চুল কাটার দোকান সোবহানবাগে।তার দোকানের একটু সামনেই ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর রোডের মাথা। সঙ্গতকারনেই হরিদাস তার দোকানের সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছে ---
শেখের বাড়ী যেই পথে,
আমার সেলুন সেই পথে।
সাইনবোর্ডে লেখা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষন করে। তবে হরিদাস পথচারীদের জন্য এই সাইনবোর্ড টাঙ্গায় নি। তার মনে ক্ষিন আশা, কোনো একদিন এই সাইনবোর্ড বঙ্গবন্ধুর নজরে আসবে। তিনি গাড়ী থেকে নেমে এগিয়ে আসবেন। গম্ভীর গলায় বলবেন,সাইনবোর্ডে কি সব ছাতা-মাথা লিখেছিস। নাম কি তোর? দে আমার চুল কেটে দে? চুল কাটার পর মালিশ।
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এ ধরনের কথা বলা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, বরং স্বাভাবিক। সাধরন মানুষদের সাতে তিনি এমন আচরন করেন বলেই তিনি বঙ্গবন্ধু।
১৫ আগস্ট শেষ রাতে হরিদাস তার দোকানে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গলো -- মড়মড় শব্দ হচ্ছে -- দোকান ভেঙ্গে পড়ছে। হরিদাস ভুমিকম্প হচ্ছে ভেবে দোকান থেকে বের হয়ে হতভম্ভ।এটা আবার কি??
আলিশান এক ট্যাঙ্ক তার দোকানের সামনে ঘুরছে। ট্যাঙ্কের ধাক্কায় তার দোকান ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে। ট্যাঙ্কের ঢাকনা খোলা। দুই জন কালো পোশাকের মানুষ দেখা যাচ্ছে। দোকান ভেঙ্গে ফেলার জন্য কঠিন কিছু কথা হরিদাসের মাথায় এসেছিলো। সে কোনো কথা বলার আগেই ট্যাংকের পেছনের ধাক্কায় পুরো দোকান তার তার মাথার উপর পড়ে গেলো। পনেরই আগষ্ট হত্যাকা্ডের সুচনা ঘটল হরিদাসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
ঢাকা মসজিদের শহর।সব মসজিদে ফজরের আযান হচ্ছে। শহরের দিন শুরু হয় মধুর আযানের ধ্বনিতে। আজান হচ্ছে। আজানের ধ্বনির সাথে নিতান্তই বেমানান কিছু কথা বঙ্গবন্ধুকে বলছে এক মেজর, নাম তার মহিউদ্দিন। এই মেজরের হাতে স্ট্যানগান। শেখ মুজিবের হাতে পাইপ। তার পরনে সাদা পান্জাবী এবং ধুসর চেক লুঙ্গি।
শেখ মুজিব বললো তোমরা কি চাও? মেজর বিব্রত ভঙ্গিতে আমতা আমতা করতে লাগল। শেখ মুজিবের কঠিন ব্যক্তিত্বের সামনে দাড়িয়ে তার পক্ষে অসম্ভব। হয়ে পড়েছিলো। শেখ মুজিব আবার বললেন -তোমরা কি চাও?
মেজর মহিউদ্দিন বললেন স্যার একটু আসুন।
কোথায় আসব?
মেজর আবারো আমতা আমতা করে বলল, স্যার, একটু আসুন।
শেখ মুজিব বললেন তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও?
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে কাজ করতে পারে নাই, সে কাজ তোমরা করবা?
এ সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে ছুটে এল মেজর নুর। শেখ মুজিব ফিরে তাকানোর আগেই সে ব্রাশ ফায়ার করলো। সময় ভোর পাচটা চল্লিশ শেখ মুজিব সিড়িতে লুটিয়ে পড়লেন। তখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে তার প্রিয় পাইপ।
বত্রিশ নম্বরের বাড়ীটিতে কিছুক্ষনের জন্য নরকের দরজা খুলে গেল। একের পর এক রক্তভেজা মানুষ লুটিয়ে পড়তে লাগল।
সকাল সাতটা
বাংলাদেশ বেতার ঘনঘন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করছে। উল্লসিত গলায় একজন বলছে, আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী মুজিব সরকারকে এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছে। সারাদেশে মার্শাল " ল " জারী করা হলো।
দেশ থমকে দাড়িয়েছে।
কি হচ্ছে কেউ জানে না। কি হতে যাচ্ছে তাও কেউ জানে না। মানুষের আত্মার মতো দেশের ও আত্মা আছে।কিছু সময়ের জন্য বাংলাদেশের আত্মা দেশ ছেড়ে গেলো ------
পৃষ্টা: ১০০- ১০১ (,চুম্বক অংশ)
দেয়াল --
উপনয়াসিক হুমায়ুন আহমেদ।