21/06/2026
হাজারীবাগের পুরনো গলিটা দিনের বেলায়ও খুব একটা স্বস্তির না। রোদ ঠিকমতো ঢোকে না, বাতাস ঢুকলেও যেন ঘুরপাক খেয়ে আটকে থাকে। গলির দু’পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো এত কাছাকাছি যে, মনে হয় তারা পরস্পরের গোপন কথা ফিসফিস করে বলছে। দেয়ালের রং একসময় হয়তো সাদা ছিল, বা হলুদ, বা হালকা নীল—এখন আর বোঝার উপায় নেই। বছরের পর বছর জমে থাকা ধুলো, স্যাঁতসেঁতে ছোপ, শ্যাওলার দাগ সব মিলিয়ে দেয়ালগুলো যেন নিজের রং নিজেই মুছে ফেলেছে।
এই গলিটা ঢাকার ভেতরেই, অথচ ঢাকার মতো নয়। বাইরে মূল রাস্তায় বাস, রিকশা, মানুষের চিৎকার, হর্নের কোলাহল—সব মিলিয়ে যে শহরটা চেনা লাগে, গলির মুখ পেরোলেই সেটা হঠাৎ থেমে যায়। শব্দগুলো যেন সাহস করে ভেতরে ঢুকতে পারে না। গলির ভেতরে ঢুকলেই কানে আসে অন্য ধরনের শব্দ—দূরের কোনো ভাঙা জানালার ঝাঁপটার খটখট, অদৃশ্য কোথাও থেকে আসা পানির ফোঁটার টুপটাপ, কখনো বা কোনো অচেনা পাখির কর্কশ ডাক, যেটা দিনের বেলায় খুব কমই শোনা যায়।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করলেই গলিটা বদলে যায়। সূর্য ডোবার আগেই এখানে অন্ধকার জমতে থাকে। আকাশে তখনো আলো আছে, কিন্তু গলির ভেতরে সেই আলো এসে পৌঁছায় না। লোহার পুরনো বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঝুলে থাকা একটা মাত্র স্ট্রিটলাইট আছে, সেটাও সবসময় জ্বলে না। জ্বললেও আলোটা কেমন অসুস্থ—হলুদাভ, কাঁপা কাঁপা, ঠিক যেন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।
এই গলির নাম কেউ ঠিকঠাক জানে না। সরকারি কাগজে হয়তো একটা নাম আছে, কিন্তু সেটা কেউ ব্যবহার করে না। আশপাশের লোকজন একে বলে ‘ভূতের গলি’। কথাটা প্রথমে হাসির ছলে বলা হলেও, এখন আর কেউ হাসে না। নামটা যেন গলির গায়ে লেগে গেছে।
আগে সন্ধ্যার পর এখানে মানুষজন একেবারেই আসত না। দিনের আলো থাকতেই যারা ঢুকত, কাজ সেরে দ্রুত বেরিয়ে যেত। দোকানপাট নেই বললেই চলে। দু’একটা ছোট ঘর আছে, যেগুলোতে মানুষ থাকে কিনা বোঝা যায় না। জানালায় আলো জ্বলে না, দরজার সামনে কারও জুতো থাকে না। মাঝেমধ্যে সকালে দেখা যায়, কোনো এক দরজার সামনে একটা পানির বোতল বা ভাঙা বালতি রাখা—তারপর আবার দিনের শেষে সব উধাও।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি একটু বদলেছে।
গত কয়েক মাসে গলিতে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। খুব বেশি না, তবে আগের তুলনায় স্পষ্ট। সন্ধ্যার পরেও দু’একজনকে ঢুকতে দেখা যায়। কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে ছোট পুঁটলি, কেউ বা মোবাইল ফোনটা শক্ত করে ধরে আছে—যেন আলোটা হাত থেকে পড়ে গেলে সে নিজেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
কেউ জিজ্ঞেস করলে তারা ঠিকঠাক উত্তর দেয় না। বলে, ‘একটা কাজ আছে।’ বা ‘একজনের সাথে দেখা করতে এসেছি।’ আবার কেউ কিছুই বলে না। চোখ নামিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যায়।
এই পরিবর্তনটা আশপাশের মানুষ লক্ষ করেছে। চায়ের দোকানে বসে গল্প করা লোকজন এখন আর আগের মতো নির্ভার না। গলির কথা উঠলেই গলার স্বর নিচু হয়ে আসে। কেউ বলে, ‘ওদিকে আজকাল লোকজন যাচ্ছে বেশি।’ আরেকজন বলে, ‘ভালো লক্ষণ না।’ কেউ কেউ আবার যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে—ঢাকা বড় হচ্ছে, মানুষ বাড়ছে, জায়গার অভাব—সব গলিতেই তো মানুষ যাবে। কিন্তু যুক্তিগুলো খুব বেশিদূর এগোয় না। কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামে একটা দীর্ঘ নীরবতায়।
কারণ এই গলির ইতিহাস আছে। লিখিত না, মুখে মুখে বেঁচে থাকা ইতিহাস।
কেউ বলে, অনেক বছর আগে এখানে একটা পরিবার থাকত। এক রাতের মধ্যে সবাই নিখোঁজ হয়ে যায়। ঘর ঠিকঠাক, জিনিসপত্র সব আছে, শুধু মানুষ নেই। কেউ বলে, গলির একেবারে শেষ মাথায় একটা পুরনো দালান আছে, যেটা দিনের আলোয়ও অদ্ভুত লাগে। সেখানে রাত হলে নাকি আলো জ্বলে—কিন্তু সেই আলো বিদ্যুতের না, মোমের না, আগুনেরও না।
এসব কথা যে একেবারে বানানো, তা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না। আবার কেউ প্রমাণও দিতে পারে না। গলিটা নিজেই যেন সব প্রশ্নের উত্তর গিলে খেয়ে ফেলে।
বর্ষাকালে জায়গাটা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। গলির মাটি কাঁচা না, পুরো পাকা। তবু কোথা থেকে যেন পানি উঠে আসে। হাঁটলে মনে হয় মাটির নিচে কিছু নড়ছে। ড্রেনের মুখগুলো অস্বাভাবিক বড়, আর সেগুলো থেকে মাঝেমধ্যে এমন গন্ধ আসে, যা শুধু নোংরা পানির গন্ধ নয়। তার ভেতরে কেমন একটা পচা, পুরনো, ভুলে যাওয়া কিছুর গন্ধ মিশে থাকে।
সন্ধ্যার পর কেউ যদি একা একা গলির ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে, তার নিজের পায়ের শব্দই তাকে ভয় দেখাতে শুরু করে। মনে হয় পেছনে আরেক জোড়া পা হাঁটছে। ঘাড়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, অথচ ঘুরে তাকালে কাউকে দেখা যায় না।
এই গলিতে সময়ও ঠিকঠাক চলে না। বাইরে আজান পড়লে বোঝা যায় সন্ধ্যা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয়, সময় আটকে আছে। মিনিটগুলো লম্বা হয়ে যায়, আর সেকেন্ডগুলো কেমন যেন ভারী।
যে কারণে এই গলির মানুষজন এখন বেড়েছে, সেটা কেউ প্রকাশ্যে বলে না। তবে গোপনে ফিসফিস করে একটা কথা ছড়িয়ে পড়েছে—এখানে নাকি কিছু পাওয়া যায়। এমন কিছু, যেটা শহরের আর কোথাও মেলে না। কারও মতে সেটা সমাধান, কারও মতে প্রতিশোধ, আবার কারও মতে মুক্তি।
কিন্তু যারা একবার ঢুকেছে, তারা সবাই আগের মতো ফিরে আসে না।
কেউ ফিরে আসে আরও চুপচাপ হয়ে। কেউ ফিরে এসে হঠাৎ অকারণে হাসে। কেউ আবার ফিরে আসে না একেবারেই।
হাজারীবাগের পুরনো এই গলি তাই শুধু একটা রাস্তা না। এটা একটা সীমা। দিনের আর রাতের সীমা। চেনা আর অচেনার সীমা। আর খুব সম্ভবত—মানুষ আর অমানুষের মাঝখানের সীমা।
কথাসাহিত্যিক আরিফ খন্দকারের নতুন থ্রিলার উপন্যাস 'অকূলপাথার' বইটি সংগ্রহ করতে অর্ডার করুন Boi Junction - বই জংশন বুকশপে। অর্ডার করতে Boi Junction - বই জংশন বুকশপের ইনবক্সে ম্যাসেজ করুন অথবা বই জংশনের এই নাম্বারে কল করুন, 01823-818887
বইয়ের সাথে থাকছে—
লেখকের অটোগ্রাফ,
চিঠি ও
বুকমার্ক।
বি:দ্র: অর্ডার করার ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যে বই পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।