14/09/2026
চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের মো. রায়হান। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাত মাস। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্থানীয় একটি মাহফিলের মাঠে বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে তার। সন্তানকে ফিরে পেয়েছেন বাবা নাজিম উদ্দিন, তবে আগের সেই রায়হান আর নেই তার ডান পা।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় গ্রামের নয়া পাড়ার বাসিন্দা রায়হান। তার বাবা নাজিম উদ্দিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। দীর্ঘদিন আগে রায়হানের মায়ের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। নিখোঁজ হওয়ার আগে রায়হান সৎ মায়ের সঙ্গে থাকত বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের পর কক্সবাজারে গিয়ে একটি চক্রের কবলে পড়ে রায়হান। পরে তাকে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে একটি স্থানে আটকে রাখা হয়। সেখানেই তার ডান পা কেটে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজারে যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয়ের পর ট্রেনের ছাদে করে কমলাপুরে পৌঁছায়। পরে কয়েকজন লোক তাকে চারপাশে বাগান ও মাঝখানে একটি ঘর থাকা একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল।
রায়হান জানায়, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেনে দুর্ঘটনায় তার পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এরপর তাকে প্রতিদিন ভিক্ষা করানো হতো এবং ভিক্ষার টাকা প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। তার সঙ্গে থাকা অনেকেরই হাত-পা ছিল না বলে দাবি করেছে সে। সেখানে দুই পুরুষ ও এক নারী ছিল, যার নাম সালমা বলে জানায় রায়হান। একপর্যায়ে তাকে বাড়ি ঘুরে আসার কথা বলে একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। পরে সে চুনতির একটি মাহফিলে যায় এবং সেখানেই বাবার সঙ্গে দেখা হয়।
নাজিম উদ্দিন বলেন, রায়হান একটি হেফজখানায় পড়ত। দুষ্টুমি বেশি করায় মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে নিজের সঙ্গে কাজে নিয়ে যেতেন। প্রায় সাত মাস আগে ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে সেলুনে পাঠানোর পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মাহফিলে স্থানীয় এক ব্যক্তি রায়হানকে দেখে নাজিমকে খবর দেন। ছুটে গিয়ে ছেলেকে খুঁজে পান তিনি। দীর্ঘ সাত মাস পর বাবা-ছেলের সেই সাক্ষাৎ মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দুজন। তখনই নাজিম দেখেন, ছেলের একটি পা নেই। তাঁর দাবি, চক্রটি এতদিন রায়হানকে আটকে রেখেছিল এবং ভিক্ষার জন্য তাকে হুইলচেয়ারও দিয়েছিল। পরে রায়হান ৩৫০ টাকা বাসভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।
নাজিম জানান, ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর অভাবের কারণে থানায় জিডি বা অভিযোগ করতে পারেননি।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদী বলেন, রায়হানকে দেখে তিনি মর্মাহত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্র শিশুটির জীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। তিনি ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হলেও পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা জিডি করেনি। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল এবং পরে কমলাপুরে নেওয়া হয়। তাই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে রায়হানের নিখোঁজের ঘটনায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার সন্ধান চেয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে রায়হান দাবি করেছিল, জায়গা নিয়ে বিরোধের মামলায় তার বাবা কারাগারে রয়েছেন এবং সৎ মায়ের মারধরের কারণে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে ট্রেনে করে কমলাপুরে আসে। তার ছোট ভাইকেও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে ভিডিওতে জানিয়েছিল সে।